বাবরি মসজিদে আজ রামমন্দির প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে

ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্ম বিশ্বাসী আলাদা বিষয়।বিশ্বাসীদের আধিপত্য যেখানে বেশী সেখানে অন্যায় টা ন্যায়ে পরিণত হয়।কারণ তাদের কাছে সেটা ন্যায় মনে হয়।যুগের বিবর্তনে তাই স্বীকৃত।ভারতের মুসলিম শাসকরা যদি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করার আগে মুসল্লি তথা ভারতে মুসলিম ইতিহাস সমৃদ্ধ করতো? আজ ভারতের মুসলমানদের এই করণ পরিণতি হতো না।

১৮৮৫

বিতর্কের শুরুটা কিন্তু বহু আগে। সেই সময়ে মোহন্ত রঘুবীর দাস নামে অযোধ্যার এক পুরোহিত ও রামায়ণ বিশেষজ্ঞ প্রথম মামলাটি করেন। ফৈজাবাদ কোর্টে মামলা করে তিনি জানান, বাবরি মসজিদের চত্বরের বাইরের চাবুতারায় (উঁচু বাঁধানো স্থান) রামচন্দ্রের জন্মস্থান। ইতিহাসের লম্বা গতিপথে সেখানে মোগল আক্রমণের সময়ে মসজিদ গড়ে উঠলেও আসলে এখানে মন্দির ছিল এক সময়ে। সেই স্থানটিতে তাঁরা মন্দির তৈরি করতে চান, কিন্তু তত্কালীন সেক্রেটারি অব স্টেট (লর্ড উডহাউজ) সেটি বাতিল করে দিয়েছেন। তাই তিনি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। যদিও সেই সময়ে বিশেষ এগোয়নি মামলা।

রামের জন্ম বাবরী মসজিদের স্থানে নয়, আমাদের নেপালের অযোধ্যাপুরীতে: নেপালের প্রধানমন্ত্রী

রামের জন্ম বাবরী মসজিদের স্থানে নয়, আমাদের নেপালের অযোধ্যাপুরীতে: নেপালের প্রধানমন্ত্রী

  হিন্দুদের দেবতা রামের জন্ম ভারতের অযোধ্যায় নয় নেপালের চিতওয়ানের মাদি পৌরসভা এলাকার অযোধ্যাপুরীতে। মাদি পৌরসভার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সেখানে রামের মূর্তি নির্মাণের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া প্রতিনিধিদের পরামর্শ দেন অযোধ্যাপুরীতে রামের জন্ম তা প্রচার করতে। রোববার নেপালের দ্য হিমালয়া টাইমস এ খবর জানায়। যদিও রামের জন্মভূমি দাবি করে ১৯৯২ সালে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা শহীদ করে ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে।

২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বাবরি মসজিদের জমিটিকে হিন্দুদের জন্য রাম মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দেয় ৫ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ। তবে বাবরী মসজিদের জমিটি হিন্দুদের দেবতা রামের জন্মভূমি ছিলো বলে যে দাবি করা হয়, আদালতে তার প্রমাণ মেলেনি। মানুষের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এই রায় দেয়া হয়।

ইতিমধ্যে গত ৫ আগস্ট বাবরী মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে শনিবার মাদি পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান শিবহরি সুবেদির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে এদিন মাদি পৌরসভার মেয়র ঠাকুর প্রসাদ দাকালসহ মাদি থেকে আসা একটি প্রতিনিধির সঙ্গে ২ ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। সুবেদি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ভারতের উত্তর প্রদেশে রামের জন্ম নয় নেপালের অযোধ্যাপুরীতে রামের জন্ম।

আমার কাছে যেসব প্রমাণ আছে সেগুলো নির্দেশ করে নেপালের অযোধ্যাপুরীতেই রামের জন্ম হয়েছে। সুবেদি নামের মাদি পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান বলেন, আমরাও বিশ্বাস করি চিতওয়ানের অযোধ্যাপুরী থেকে পারসার থরি এলাকার বাল্মিকি আশ্রমে রামের জন্ম হয়েছে।

ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য দিল কুমার রাওয়াল জানান, প্রধানমন্ত্রী অযোধ্যাপুরীর আশেপাশের এলাকা সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিনিধি দলকে প্রধানমন্ত্রী আরও প্রমাণ সংগ্রহের জন্য খনন কাজ শুরু করতে বলেছেন।

অযোধ্যাপুরীকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ভূমি প্রদান করবে বলে জানিয়েছেন নেপালি প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার মূর্তি স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়েছে, তারা মাদি পৌরসভার নাম পরিবর্তন করে অযোধ্যাপুরী রাখার চেষ্টা করবেন।

এতে করে স্থানটির ধর্মীয় গুরুত্ব বাড়বে। ১৫২৮ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহরে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের স্থানকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেবতা রামচন্দ্র বা রামের জন্মভূমি হিসেবে আঠারো শতক থেকে দাবি করা হয়। হিন্দুদের দাবি মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে সেনাপতি মীর বাকী পূর্বে অবস্থিত রামমন্দিরের ওপর বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেছেন।

১৯৪৯-৫০ : 

এই সময়েই মূলত তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক। ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর মধ্যরাতে বাবরি মসজিদ চত্বরের সেই বিতর্কিত স্থান থেকেই মেলে একটি পুরোনো রামমূর্তি। এমনিতেই দেশভাগ, অন্তর্বর্তী সরকার ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে তুমুল সাম্প্রদায়িকতার ঝড় চলছিল সেই সময়ে। আর তাতে যেন অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায় এ ঘটনা। বিভিন্ন স্থানের হিন্দু রামভক্তরা এখানে মন্দির তৈরির দাবি করতে থাকেন। অন্যদিকে মুসলমানরা তার প্রতিবাদে সরব হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে গোটা চত্বরটা সিল করে ডিসপুটেড ল্যান্ড হিসাবে চিহ্নিত করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।

১৯৫০:

এরপরেই ১৯৫০ সালে ১৬ জানুয়ারি মন্দির পক্ষের নেতা গোপাল সিং বিশারদ ফৈজাবাদ কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন। বাবরি মসজিদ সংলগ্ন স্থানটিতে- যেখান থেকে মূর্তিটি উদ্ধার হয়েছে, সেখানে পুজোপাঠের অধিকার চাওয়া হয়। এবং সেই সঙ্গে মূর্তিটি যেখান থেকে পাওয়া গিয়েছে, সেখান থেকে যাতে সরানো না হয়, তার নির্দেশিকা দাবি করেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সাময়িকভাবে জন্মস্থান থেকে মূর্তি সরানো যাবে না বলে নির্দেশ জারি করে ফৈজাবাদ আদালত। এলাহাবাদ আদালতেও তার পক্ষেই সায় দেওয়া হয়।

এরপর সেই বছরেরই এপ্রিলে উত্তরপ্রদেশের গোবিন্দবল্লভ পন্ট শাসিত কংগ্রেস সরকার আদালতের এই ইঞ্জাকশান তোলার জন্য মামলা করেন। অন্যদিকে ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে বিতর্কিত স্থানে পুজোপাঠ চলতে থাকার অনুমতি চেয়ে মামলা করেন রাম জন্মভূমি মন্দির ট্রাস্টের প্রধান পরমহংস রামচন্দ্র দাস। এই ট্রাস্ট আবার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যদিও তিনি নিজেই আবার মামলা তুলে নেন।

১৯৫৯-৬১ :

১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে অখিল ভারতীয় আখড়া পরিষদের প্রধান নির্মোহী আখড়া একটি মামলা করেন। সেখানে তিনি নিজেকে জন্মভূমির আসল মালিক বলে দাবি করেন।

এদিকে ১২ বছরে ধরে যদি কোনও জমি, সম্পত্তি অনধিকৃত ও বিতর্কিত হিসাবে গণ্য হয়, সেক্ষেত্রে তার আদি মালিকদের আর মালিকানা থাকে না। এর ফলে চিন্তিত হয়ে পড়েন উত্তরপ্রদেশের সুন্নি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ওয়াকিফ-এর সদস্যরা। তাই জমির দাবি বজায় রাখতে ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর, ১২ বছর হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগেই নড়েচড়ে বসেন তাঁরা। অযোধ্যার মুসলিম বাসিন্দাদের ডেকে এনে সকলে মিলে বিতর্কিত চত্বরটির দখল নেন। সেখানেই তাঁরা প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং মূর্তি সরানোর দাবি করতে থাকেন।

১৯৮৬ :

এই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি আদালত হিন্দু পুজার্থীদের জন্য খুলে দিতে হবে জমির প্রবেশপথ। এই রায়ের প্রতিবাদে গঠিত হয় বাবরি মসজিদ অ্যাকশান কমিটি।

১৯৮৯ :

ভিএইচপি-র সহ-সভাপতি এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দেবকীনন্দন আগড়ওয়ালা এরপর আসরে নামেন। তিনি এবছর ১ জুলাই এলাহাবাদ আদালতের লখনউ বেঞ্চে মামলা করেন। সেখানে তিনি বলেন, ১৫২৫ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থপতি ভারত আক্রমণ করেন। ১৫২৮ সালে বাবরের হানায় ধ্বংস হয় রামমন্দির। এরপর সেখানেই তৈরি হয় বাবরি মসজিদ। এর প্রমাণ হিসাবে ১৯২৮ সালের ফাজিয়াবাদের জেলা গেজেটে প্রদত্ত একাধিক তথ্য তুলে ধরেন তিনি। এরপর ১৪ অগস্ট জমিটিতে যেভাবে পুজো চলছে তা চালু রাখার নির্দেশ দেয় আদালত।

এর পরেই রাজীব গান্ধী শাসিত কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সরকার ভিএইচপি-কে রামমন্দিরের শিলান্যাসের অনুমতি দেয়। রামমন্দিরের প্রথম ইঁটটি স্থাপন করা হয়।

১৯৯২ :

বিতর্কিত জমির ভবনটি এই সালের ৬ ডিসেম্বর ভেঙে ফেলা হয়। শুরু হয় তুমুল বিতর্ক ও অশান্তি। প্রতিবাদ, পাল্টা প্রতিবাদে জ্বলতে থাকে অযোধ্যা। কেন এমনটা ঘটল তার তদারকি করতে বিচারপতি লিবেরহ্যানের অধীনে তৈরী হল বিশেষ কমিটি। রিপোর্ট দিতে বেঁধে দেওয়া হল ৩ মাসের সময়সীমা। এই সময়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে জারি হল রাষ্ট্রপতি শাসন। ভেঙে দেওয়া হয় কল্যাণ সিং শাসিত বিজেপি সরকার।

১৯৯৩ :

এই সময়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমারাও অযোধ্যার বিশেষ জমি অধিগ্রহণ অ্যাক্ট পাশ করেন। এর মাধ্যমে বিতর্কিত জমিটি সরকারি সম্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পিটিশন জমা করেন ইসমাইল ফারুকিসহ মসজিদপন্থী নেতৃত্ববৃন্দ।

১৯৯৪: 

“ইসলাম ধর্ম পালনের জন্য মসজিদ অত্যাবশ্যক নয়। বিশ্বের যে কোনো স্থানে, এমনকি খোলা মাঠেই চাইলে নামাজ পাঠ করা যায়,” রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়, “তাই রাষ্ট্রের এই জমি অধিগ্রহণ করা সংবিধানবিরুদ্ধ নয়।” এর ফলে ৬৭.৭ একরের মধ্যে ২.৭৭ একরের বিতর্কিত জমিটুকু অধিগ্রহণ করে সরকার।

১৯৯৬ :

এলাহাবাদ আদালতে এই মামলার বিভিন্ন সাক্ষীদের মৌখিক বিবৃতি নেওয়া শুরু হয়।

২০০২-০৫ :

এলাহাবাদ হাইকোর্টে শুরু হয় শুনানি। বিতর্কিত স্থানে হিন্দুদের দাবিমাফিক আগে মন্দির ছিল কিনা তা খুঁড়ে দেখে যাচাই করার ভার দেওয়া হয় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে। ২০০৩ সালে জুনে খননকাজ শুরু করার পরেই হিন্দুদের দাবিকে সমর্থন জানায় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রত্নতত্ত্ববিদরা। তাঁরা জানান সেখানে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের প্রমাণ পেয়েছেন বিতর্কিত জমি খনন করে।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের রিপোর্টকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করেন মসজিদ পক্ষ। সেই বছরেই উপপ্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবাণীসহ ৭ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করে সিবিআই। ক্রমেই বাড়তে থাকে অশান্তি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্চ মাসে বিতর্কিত জমিতে সকল ধর্মীয় কার্যকলাপ বন্ঝ রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

২০০৯ :

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর কাছে রিপোর্ট পেশ করল লিবেরহান কমিশন।

২০১০ :

৩০ সেপ্টেম্বরের রায়ে, বিতর্কিত জমিতে তিনভাগে ভাগ করল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। একটি দেওয়া হল সুন্নি ওয়াকিফ বোর্ডকে। একটি নির্মোহী আখড়াকে। অন্যটি রামলাল্লার দলকে। হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেল অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা ও সুন্নি ওয়াকিফ বোর্ড।

২০১১ :

হাইকোর্টের সুরেই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। বর্তমান অবস্থাই জারি থাকবে- জানানো হল।

২০১৬ : 

২৬ ফেব্রুয়ারি বিজেপির লোকসভার মন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যন স্বামী বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির করার অনুমোদন চাইলেন।

২০১৯ :

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করলেন। তৈরি হল মধ্যস্ততাকারী প্যানেল। কিন্তু মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ব্যর্থতার পর ৬ অগস্ট থেকে শুরু হল দৈনিক শুনানি।

৯ নভেম্বর ২০১৯ :

রামজন্মভূমি কেসে রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। জানানো হল, হিন্দুরা তাদের জন্য দেওয়া জমিতে মন্দির করতে পারবে। অন্যদিকে অযোধ্যাতেই একটি মসজিদ তৈরির জন্য ৫ একর জমি প্রদান করা হল মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য।

৬ই ডিসেম্বর
বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সেই মুহূর্ত

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ছিল রবিবার। সেদিন অযোধ্যায় জড়ো হওয়া কয়েক লক্ষ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাড়ে চারশো বছরের বেশি সময় আগে স্থাপিত বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলে। তাদের ঠেকাতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহত হন কয়েক শত হিন্দুত্ববাদী কর্মী।

ঘটনার প্রতিক্রিয়ার দেশটির কয়েকটি রাজ্যে তাৎক্ষণিকভাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়।

বাংলাদেশে ঐ ঘটনার প্রভাব তৈরি হয় পরদিন ৭ই ডিসেম্বর। এর পরের কয়েকটি দিন বেশ ঘটনা বহুল ছিল বাংলাদেশের জন্য।

৭ই ডিসেম্বর, ১৯৯২

সেদিন ছিল সোমবার। আগের দিনই ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙ্গেছে সেখানকার হিন্দুত্ববাদীরা। ঢাকার থেকে প্রকাশ হওয়া বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকগুলোর সব কটির প্রধান শিরোনাম ছিল এ বিষয়টি নিয়েই।

সেদিন বাংলাদেশের সব কয়টি রাজনৈতিক দল এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছিল। মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকেও বিষয়টির নিন্দা করা হয়।

কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুরে পৌঁছানোর আগেই ঢাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। বিভিন্ন জেলায়ও একই ধরণের বিক্ষোভ মিছিল হয় বিক্ষুব্ধ ইসলামী জনতার ব্যানারে।

দুপুরের মধ্যে সেই বিক্ষোভ পরিণত হয় সহিংসতায়।

 

৮ই ডিসেম্বর
স্থানীয় পত্রপত্রিকায় খবর অনুযায়ী, বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে ৮ই ডিসেম্বর সারাদেশে হরতাল ডাকে কয়েকটি ইসলামী দল।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জায়গা হচ্ছে আল্লাহর ঘর মসজিদ । কিন্তু ওই ঘর যদি কেউ ভেঙে দেয় তা হবে খুবই নিকৃষ্ট কাজ। বলছিলাম ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদের কথা। এই মসজিদ ভাঙতে প্রথম আঘাত করেছিলেন যে ব্যক্তি তার নাম বলবির সিং।

কিন্তু মহান আল্লাহ’র অশেষ রহমতে সেই বলবির সিং আজ নওমুসলিম মুহাম্মদ আমের। যে ব্যক্তি একদিন মসজিদ ভেঙে দিয়েছিলে তিনিই এখন পথে পথে ঘুরে আল্লাহ’র ঘর পুনর্নির্মাণ ও নতুন মসজিদ নির্মাণ করছেন। কিন্তু কিভাবে তার এই বদলে যাওয়া, আসুন জেনে নেই।

বলবির সিং এর কথা

  জন্মসূত্রে আমার নাম বলবির সিং । ১৯৭০ সালের ৬ ডিসেম্বর হরিয়ানা প্রদেশের পানিপথ জেলার এক রাজপুত পরিবারে আমার জন্ম। আমার বাবা ছিলেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। যেকোনো ধরণের জুলুম-নিপীড়নের বিরোধী ছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশ-বিভাগের সময় হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তিনি দেখেছিলেন। সে সময়কার ব্যপক মুসলিম হত্যাকে দেশের জন্য বড় ধরনের কলঙ্ক মনে করতেন তিনি। অবশিষ্ট মুসলমানদেরকে পুনর্বাসনের ব্যাপারে তিনি খুবই সাহায্য করেছেন। তিনি তাঁর বিদ্যালয়ের মুসলমান ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে বিশেষ খেয়াল রাখতেন।
গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে আমি পানিপথে গিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই। মুম্বাইয়ের পর পানিপথ ছিল শিবসেনার সবচেয়ে মজবুত কেন্দ্র। বিশেষ করে যুবক শ্রেণী ও স্কুলের লোকেরা শিবসেনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। অনেক শিবসেনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং আমিও পানিপথ শাখায় আমার নাম লেখাই।
পানিপথের ইতিহাস তুলে ধরে সেখানকার যুবকদের মধ্যে মুসলিম সম্রাটদের বিরুদ্ধে বিরাট ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ান হতো। আমার বাবা যখন জানতে পারলেন যে, আমি শিবসেনায় নাম লিখিয়েছি তখন তিনি আমাকে ইতিহাসের সূত্র ধরে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। সম্রাট বাবর বিশেষ করে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ন্যায় ও ইনসাফ এবং অমুসলিমদের সঙ্গে করা তার আচরণের কাহিনী তিনি আমাকে শোনান এবং আমাকে বলতে চেষ্টা করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময়কার জুলুম-নিপীড়ন, হত্যা ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাবলী শুনিয়ে আমাকে শিবসেনার যাবতীয় কর্মকান্ড থেকে ফিরিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার বাবার সেসব চেষ্টা বিফলে যায়। আমার উপলব্ধিতে কোনো কিছুই ধরা পড়েনি।

বাবরি মসজিদ ধ্বংস

বাবরি মসজিদ ধ্বংস

অযোধ্যা

অযোধ্যা (ভারত)
স্থান অযোধ্যা, ভারত
তারিখ ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২
লক্ষ্য বাবরি মসজিদ
হামলার ধরন দাঙ্গা
নিহত ২,০০০ (মসজিদ ভাঙার পর সংগঠিত দাঙ্গা সহ) 
হামলাকারী দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও ভারতীয় জনতা পার্টির কর সেবক

১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং এর সহযোগী সংগঠনের হিন্দু কর্মীরা উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতে ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। ঐ স্থানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো দ্বারা আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে আগত লোকজন সহিংস হয়ে উঠার পর ধ্বংসযজ্ঞটি সংগঠিত হয়।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী অযোধ্যা হল রামের জন্মভূমি। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সেনাপতি মির বাকি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা বাবরি মসজিদ নামে পরিচিত। তিনি যে স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন তা কিছু হিন্দুর কাছে রাম জন্মভূমি বলে অভিহিত হয়ে থাকে। আশির দশকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তাদের (ভিএইচপি) তাদের রাজনৈতিক সহযোগী ভারতীয় জনতা পার্টিকে সাথে নিয়ে ঐ স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য প্রচারাভিযান চালায়। রাম মন্দির নির্মাণের জন্য কিছু শোভাযাত্রা ও মিছিল আয়োজন করা হয়েছিল। এসব শোভাযাত্রা ও মিছিলের মাঝে অন্তর্ভুক্ত ছিল রাম রথ যাত্রা, যার নেতৃত্বে ছিলেন লাল কৃষ্ণ আদভানি।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভিএইচপি ও বিজেপি ঐ স্থানে দেড় লাখ করসেবককে নিয়ে একটি শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রা চলাকালীন সময়ে তারা সহিংস হয়ে পড়ে এবং আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে মসজিদটি ভেঙে ফেলে। পরবর্তীকালে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায় যে, ঘটনাটির সাথে ৬৮ জন জড়িত, যাদের মাঝে কিছু বিজেপি এবং ভিএইচপির নেতারও নাম বিদ্যমান। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দরুন ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মাঝে সৃষ্টি হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যা কয়েকমাস ধরে চলেছিল। এছাড়া, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ও তাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়েছিল।

ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেই, ১৯৯২ সালের ছয়ই ডিসেম্বর সেখানে জড়ো হওয়া কয়েক লক্ষ উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানুষ আকস্মিকভাবে ওই মসজিদ ধ্বংস করেন নি।

ভারতের একটি অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা আজ শুক্রবার প্রকাশিত এক স্টিং অপারেশনে এই দাবি করে বলেছে যে ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, এমনকী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও-ও জানতেন যে সেদিন বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হবে।

অনুসন্ধানী সংবাদ সংস্থা কোবরা পোস্ট আজ প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে জানিয়েছে যে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার জন্য রীতিমতো আত্মঘাতী দল তৈরি করা হয়েছিল, দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল আর সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে ডায়নামাইট দিয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নেতারা।

ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে যেসব হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রী বা স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে, তাঁদের কথাবার্তা গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করে কোবরাপোস্ট দাবি করেছে অনেকদিন ধরে পরিকল্পনা ছিল মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার।

কারা ওই পরিকল্পনার কথা জানতেন, কীভাবে গুজরাতে প্রশিক্ষণ শিবির হয়েছিল – সবই ধরা পড়েছে গোপন ক্যামেরায়। কোবরাপোস্ট গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করা কথোপকথোনগুলি প্রকাশ করেছে, যে স্টিং অপারেশনের নাম তারা দিয়েছে অপারেশন জনম্‌ভূমি।

অপারেশন জনম্‌ভূমি নামের প্রতিবেদন প্রকাশ করার সময়ে সংবাদ সংস্থার সম্পাদক অনিরুধ বহেল, যিনি নিজেও একজন প্রখ্যাত স্টিং অপারেশন বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক, তিনি বলেন যে বাবরি মসজিদ- রামমন্দির বিতর্ক নিয়ে একটা গবেষণাধর্মী বই লেখার কথা বলে তাঁদের সংস্থার সহযোগী সম্পাদক কে. আশীষ চার-পাঁচটি রাজ্য ঘুরে কথা বলেছেন হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রী আর স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে।

ওই স্টিং অপারেশনের ভিডিওগুলিতে এরকম ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে যে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা কল্যাণ সিং – সবাই জানতেন যে সেদিন বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হবে। যদিও এতদিন প্রকাশ্যে বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলে এসেছেন যে ৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বরের ঘটনা আকস্মিকভাবেই ঘটিয়েছিল উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী জনতা।

ভারতের নির্বাচনের আগে এই প্রতিবেদন সামনে আসায় বিজেপির অভিযোগ কংগ্রেস দল এই প্রতিবেদন তৈরি করিয়েছে।

বিজেপি-র মুখপাত্র মুখতার আব্বাস নকভি বলছিলেন, “কংগ্রেস দল ষড়যন্ত্র করছে যে কীভাবে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ আর সৌহার্দ্যের পরিবেশটা নষ্ট করা যায়। বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করছে তারা। বাবরি মসজিদ রাম জন্মভূমির মতো একটা অতি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে স্টিং অপারেশন করানো হয়েছে।“

বিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন যাতে ওই স্টিং অপারেশনের ভিডিও প্রচার-প্রসার না করতে দেওয়া হয়, নাহলে ভোটের আগে সাম্প্রদায়িক অশান্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করে বিজেপি।

অন্যদিকে কংগ্রেস এই প্রতিবেদনের জন্য বিজেপি-র দিকেই আঙ্গুল তুলে বলছে যে ভোটের আগে এধরনের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেই পুরনো মন্দির-মসজিদ বিবাদকে ফের তুলে এনে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে।

দলের মুখপাত্র মীম আফজল সাংবাদিকদের বলছিলেন, “বাবরি মসজিদ রাম মন্দিরের মতো বিষয় নির্বাচনের আগে ওঠানোর অর্থই হল ওই ইস্যুগুলোকে আবারও বাঁচিয়ে তোলা, পুরনো ক্ষত আবারও নতুন করে খুঁচিয়ে দেওয়া। আর সেভাবেই ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে ভোটের আগে।“

উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যাতে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিকে ঘিরে অনেক দশক ধরেই বিতর্ক চলছিল, হয়েছে বহু মামলা মকদ্দমাও।

হিন্দুদের একটা অংশ বিশ্বাস করেন, যে জায়গায় মোগল সম্রাটরা বাবরি মসজিদ বানিয়েছিলেন, সেটাই হিন্দুদের আরাধ্য ভগবান রামচন্দ্রের জন্মস্থান। সেই মন্দির ভেঙ্গেই মসজিদ তৈরি হয়েছিল।

আশির দশকের শেষ দিক থেকে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ওই মসজিদ ভেঙ্গে রামমন্দির তৈরি করার দাবিকে একটা রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করেন, যার মধ্যেই কয়েক লক্ষ উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী জনতা ৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় বাবরি মসজিদ। আর তার পরেই ভারত জুড়ে চলেছিল দাঙ্গা, যাতে প্রায় দু হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

আদালতের রায় 

২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরী মসজিদ যে স্থানে ছিল সেই ভূমি সম্পর্কিত রায় দেয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টের তিন জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাদের রায়ে ২.৭৭ বা ১.১২ হেক্টর ভূমি সমান তিনভাগে ভাগকরার রায় প্রদান করেন। যার এক অংশ পাবে হিন্দু মহাসভা রাম জন্মভূমিতে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য, দ্বিতীয় অংশ পাবে ইসলামিক সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এবং বাকি তৃতীয় অংশ পাবে নির্মোহী আখরা নামে একটি হিন্দু সংগঠন। যদিও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদ কোন মন্দির কে ধ্বংস করে তার উপরে করে উঠছে কিনা এই বিষয়ে তিনজন বিচারক একমত হতে পারেননি, তারা শুধুমাত্র একমত হতে পেরেছেন, মসজিদের নিচে মন্দির অথবা মন্দিরের মতো কোনো স্থাপনার অস্তিত্ব ছিল। ভারতের পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক করা খননকার্যের জরিপ আদালত দ্বারা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং তারা মনে করেছে যে স্থাপনাটির অস্তিত্ব মসজিদ নির্মাণের পূর্বে থেকে ছিল সে স্থাপনাটি একটি বিশাল হিন্দু মন্দির ছিল। 

২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই মামলার শুনানি করে।  ৯ নভেম্বর ২০১৯ সালে ৫ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয় ২.৭৭ একরের সে জমিটি মন্দির নির্মাণের জন্য কোন ট্রাস্টকে হস্তান্তর করতে হবে। আদালত সরকারকে এটাও নির্দেশ দেয় যে, মসজিদ নির্মাণের জন্য সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড কে ৫ একরের একটি জায়গা দিতে হবে।

বাবরি মসজিদ রায়: কার প্রতিক্রিয়া কী?

কয়েক দশকের হিন্দু-মুসলিম বিবাদ, হিন্দুত্ববাদীদের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা, মামলা এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়৷ বহু প্রতীক্ষিত এ রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ৷

    
default

ভারতের অযোধ্যার এক বিতর্কিত জমি নিয়ে কয়েক দশক অপেক্ষার পর শনিবার রায় ঘোষণা করে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত৷ রায়ে ওয়াকাফ বোর্ডের আর্জি এবং নির্মোহী আখড়ার জমির উপর দাবি দুটোই খারিজ করে দেন বিচারকরা৷ বিতর্কিত সেই জমিতে একটি ট্রাস্টের অধীনে মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত৷ পাশাপাশি, একটি মসজিদ গড়তে কাছাকাছি অন্য কোথাও মুসলমানদের পাঁচ একর জমি দিতেও বলা হয়েছে রায়ে৷

রায় ঘোষণার পরপরই এক টুইটে সাধুবাদ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ তিনি বলেন, পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সময় দেয়া হয়েছে৷ এবং এই রায়ের ফলে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে৷

এরপরপরই আরেকটি টুইটে তিনি ভারতের জনগণকে ধন্যবাদ জানান৷ তিনি ১৩০ কোটি ভারতীয় এ নিয়ে ধৈর্য দেখিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রমাণই দিয়েছে৷রায়ের পরপরই টুইট করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও৷ তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট আজ অযোধ্যা ইস্যুতে রায় ঘোষণা করেছে৷ আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে৷ এটা সব ভারতীয়ের ভ্রাতৃত্ব, বিশ্বাস ও ভালোবাসা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়৷”ষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভগবত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘‘অযোধ্যা ইস্যুতে আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সাধুবাদ জানাই৷ এই রায়কে কারো জয় বা কারো পরাজয় হিসেবে দেখাটা ভুল হবে৷ অতীতের বিভেদ ভুলে রাম মন্দির নির্মাণে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে৷”

শিবসেনার প্রধান উদ্ধভ ঠাকরে বলেছেন, ‘‘আজকের দিন ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে৷” আদালতের রায় মেনে দ্রুত রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিতে এক বিবৃতিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ৷

আজমীর শরীফের দেওয়ান সৈয়দ জয়নুল আবেদীনও এ রায় সবাইকে মেনে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা কারো জয় পরাজয়ের বিষয় নয়৷ আমাদের সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নেয়া উচিত৷ যা হয়েছে, দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমাদের এই বিরোধের এখানেই সমাপ্তি টানা উচিত৷”

একই আহ্বান এসেছে দেশটির শিয়া ও সুন্নি মতাবলম্বী ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকেও৷

শিয়া নেতা মওলানা কালবে জাওয়াদ বলেছেন, এখনও রিভিউ পিটিশনের সুযোগ থাকলেও বেশিরভাগ মুসলিম এই রায় মেনে নিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নিয়েছি৷ আমি মনে করি এই বিষয়টির এখানেই সমাপ্তি ঘটা উচিত৷”

সুন্নি কেন্দ্রীয় ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান জাফর আহমাদ ফারুকিও আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন এবং একে চ্যালেঞ্জ করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন৷

দিল্লী জামে মসজিদের শাহী ইমাম সৈয়দ আহমেদ বুখারি এ নিয়ে আর জল ঘোলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘ভারতের মুসলিমরা শান্তি চায়৷ ‘‘হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা বিরোধ এখানেই শেষ হওয়া উচিত৷”

তবে, এই রায় নিয়ে অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ৷ অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি জানিয়েছেন, মামলার রায়ে তারা সন্তুষ্ট নন৷ সুপ্রিম কোর্টকে সর্বোচ্চ আদালত বলে মানলেও তিনি মনে করেন সুপ্রিম কোর্টও সবসময় ‘নির্ভুল’ নয়৷ ভারতীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘‘সংবিধানে আমাদের সম্পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে, আমরা আমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছি৷ দান হিসেবে পাঁচ একর জমি আমাদের দরকার নেই৷ আমাদের এই পাঁচ একর জমি প্রত্যাখ্যান করা উচিত৷”

তবে ওয়াইসির বক্তব্যের পালটা প্রতিক্রিয়ায় ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি বলেছেন, কিছু মানুষের ‘তালিবানি মানসিকতা’ রয়েছে এবং তারা দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর ‘আস্থাশীল’ নয়৷

তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র (ছেলের নাতি) তুষার গান্ধী৷ এক টুইটে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘এই সুপ্রিম কোর্টে গান্ধী হত্যা মামলার বিচার হলে নাথুরাম গডসেকে (মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী) একইসঙ্গে খুনি এবং দেশপ্রেমিক বলে রায় দেয়া হতো৷”

অসন্তোষ প্রকাশ করে উত্তর প্রদেশ সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী জাফরিয়াব জিলানী ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ‘‘আমরা রায়কে সম্মান করলেও সন্তুষ্ট নই৷ আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় না হওয়ায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমে নেবো৷” উত্তর প্রদেশ সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড এ মামলায় একটি পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে৷

বার্তাসংস্থা এপি জানিয়েছে, ইসলামাবাদে তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশী রায়ের সমালোচলা করেছেন৷ এ রায়কে মোদী সরকারের ‘ঘৃণাসূচক মানসিকতার’ বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি৷

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *