ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক-মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ)

সুচনাঃ

মইনুদ্দিন চিশতী হলেন চিশতীয় ধারার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক। তিনি গরিবে ‘নেওয়াজ’ নামেও পরিচিত। ১১৩৮ ইংরেজিতে (৫৩৭ হিজরী) মধ্য এশিয়ায় খোরাসানের অন্তর্গত সিস্তান রাজ্যের সানজার নামে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সৈয়দ খাজা গিয়াস উদ্দীন, মার নাম সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা মাহিনুর। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে সুফিবাদ প্রচারে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব l

শিক্ষাঃ

৯ বছর বয়সেপবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করেন। অতঃপর ১৩ বছর পর্যন্ত পিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানে দ্বীনি ইলমে গভীর ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।প্রথমেই জাহেরী এলেম শিক্ষার জন্যহাজির হলেন বোখারা,সমরখন্দে।দীর্ঘ দিনসেখানে অবস্হান করে বুৎপত্তি অর্জনকরলেন জাহেরী এলমের সমস্ত শাখাপ্রশাখায়।হুজুর গরীবে নেওয়াজ পিতারসান্নিধ্যে প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা অর্জনকরেন। ৯ বছর বয়সে তরজমাসহ পবিত্রকুরআন শরীফ মুখস্থ করেন। অতঃপর ১৩বছর পর্যন্ত পিতার সার্বিক তত্ত্বাবধানেকুরআন, হাদিস, ফিকহ্, উসুল, তাফসীর,আরবী সাহিত্য ব্যাকরণ, মানতিক, হিকমতদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে গভীর বুৎপত্তি লাভকরেন। এছাড়াও তিনি প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা ইমামুল হারামাইন হযরত আবুলমা’আলী (রহঃ) এর নিকট শরীয়তের বিভিন্নসুক্ষাতিসুক্ষè বিষয়ে পান্ডিত্য লাভকরেন। সমরকন্দের প্রখ্যাত আলেম হযরতশরফুদ্দীন ও বোখারার প্রখ্যাত মুহাদ্দিসহযরত হুসামুদ্দীন (রহঃ) এর নিকট দীর্ঘপাঁচ বছর অধ্যয়ন করে আনুষ্ঠানিকশিক্ষার কৃতিত্বপূর্ণ পূর্ণতা অর্জনকরেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ)বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানেযুগশ্রেষ্ঠ ওলী হযরত ওসমান হারুনী (রহঃ)এর নিকট মুরীদ হন এবং মুর্শীদের খেদমতে২০ বছর অতিবাহিত করেন।  

সুফিসাধনার সুচনাঃ পনেরো বছর বয়সে তার পিতামাতা মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে একটি বাতচক্র (উইন্ডমিলও একটি ফলের বাগান উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। কথিত আছেএকদিন তিনি তাঁর ফলবাগানে পানি দিচ্ছিলেন, তখন তার ফলবাগানে আসেন বিখ্যাত সুফি শেখ ইব্রাহিম কুন্দুজী  যুবক মইনুদ্দিন তটস্থ হয়ে যান এবং কুন্দুজীকে কিছু ফল দিয়ে আপ্যায়ন করেন। এর প্রতিদান স্বরূপ কুন্দুজী মইনুদ্দিনকে এক টুকরা রুটি দেন ও তা খেতে বলেন। এই পর তিনি তার সম্পত্তি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র গরীবদের মাঝে বিতরণ করে দেন। এরপর তিনি বিশ্বের মায়া ত্যাগ করে জ্ঞানার্জন ও উচ্চ শিক্ষার জন্য বুখারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

সুফিসাধনার পূর্নাতাঃ মঈনুদ্দীন চিশতী বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিস্তিয়া তরীকার অপর প্রসিদ্ধ ছুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন। তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খেলাফত বা ছুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন।

উপমহাদেশে মঈনুদ্দীন চিশতীঃ তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে সুফিবাদ প্রচারে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বীয় পীর উসমান হারুনীর নির্দেশে ভারতে আগমন করে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তারই মাধ্যমে বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। 

তরিকার আমলঃ ভারতের বিভিন্ন দরবারের চিশতীয়া তরীকার আমলওযীফা ইত্যাদির মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। উপযুক্ত বুযুর্গগণের নামে প্রচলিত পুস্তকাদিতে এ সকল তরীকা’ বা পদ্ধতির কিছুই দেখা যায়না। আবার এ সকল পুস্তকে যে সকল যিকর-ওযীফার বিবরণ রয়েছে সেগুলিও প্রচলিত চিশতীয়া তরীকার মধ্যে নেই। চিশতীয়া তরীকার ক্ষেত্রেও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী বিবরণের সাথে সাইয়েদ আহমদ ব্রেলবীর বিবরণের পার্থক্য দেখা যায়। আবার তাঁদের দুইজনের শেখানোর পদ্ধতির সাথে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচলিত চিশতীয়া তরীকার ওযীফা ও আশগালের পার্থক্য দেখা যায়। এগুলির কোনটি অরিজিনাল আর কোনটি বানোয়াট তা জানার কোনো উপায় নেই। (হাদিসের নামে জালিয়াতী পৃষ্ঠা –  )

চিশতীয়া তরিকার শাজরা শরিফ

হয়রত মুহম্মদ (দঃ) ১) হযরত আলী (কঃ) ২) হযরত হাসান বসরী (রাঃ) ৩) হযরত আবদুল ওয়াহেদ (রঃ) ৪) হযরত খাজা ফজর (রঃ) ৫) হযরত ইব্রাহিম ইবনে আদম বালখী (রঃ) ৬) হযরত খাজা হোবায়ারা (রঃ) ৭) হযরত খাজা মোমশাদ (রঃ) ৮) হযরত আবু এহছাক (রঃ) ৯) খাজা আঃ এবনে ছামায়ান (রঃ) ১০) খাজা মোহম্মদ (রঃ) ১১) খাজা নাসিরউদ্দীন (রঃ) ১২) খাজা মওদুদ চিশতী (রঃ) ১৩) কাজা হাজি শরীফ জেন্দান (রঃ) ১৪) খাজা ওসমান হারুনী (রঃ) ১৫) খাজা গরিবে নেওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) এই তরিকা মতে আব, আতশ, খাক, বাদ (পানি, আগুন, মাটি, বায়ু, এবং নুর (জ্যোতি)-কে আনাসির-এ খামসা বা পঞ্চভূত বলে।

উপদেশ বাণী

হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী মানুষের মাঝে যে উপদেশের বাণী রেখে গেছেন তা শুধু তরিকতপন্থীদের নয় সকল মানুষের জীবনের পাথেয় হওয়া উচিত।
তিনি বলেছেন- * কোনো মুসলমান ভাইকে হেয় জ্ঞানে উৎপীড়নে যে ক্ষতি হয়, অন্য কোনো পাপ কাজে মানুষের সেই পরিমাণ ক্ষতি হয় না। *কেয়ামতের আজাব থেকে মুক্তি পেতে হলে বিপন্ন, দুস্থ ও উৎপীড়িতদের খেদমত করতে হবে। অভাবগ্রস্তদের অভাব মোচন করে এবং ক্ষুধার্তদের আহার প্রদান করে। * দানশীলতা নেয়ামতের চাবি। *তিনি প্রকৃত আরেফ যিনি কোনো অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে খালি হাতে ফেরান না। * নেককার ব্যক্তির সংশ্রব নেক কর্ম থেকে উত্তম। পক্ষান্তরে পাপকর্ম থেকে ব্যক্তির সংশ্রব অধিকতর মন্দ। * আ্ল্লাহ পাক যাদের ভালোবাসেন তাদের মাথার ওপর বারিধারার মতো বিপদ বর্ষণ করেন। * পৃথিবীতে প্রত্যেক জামানায় হাজার হাজার অলি-আল্লাহ বিদ্যমান থাকেন। তাদের অনেকেই থেকে যান দৃষ্টির আড়ালে। সুতরাং পৃথিবীকে কখনই আউলিয়া শূন্য মনে করো না। * সর্বাবস্থায় বদনে প্রশান্তি এবং হাসির আভা বিদ্যমান থাকা আরেফ ব্যক্তিদের অন্যতম লক্ষণ। * আরেফের মস্তকে বিরামহীনভাবে নূর বর্ষিত হয়। * নীরবতা আরেফের স্বভাব। * আরেফ ঐ ব্যক্তি যিনি নিজেরে হৃদয়কে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর হাজার হাজার তাজাল্লি তার ওপর বিকশিত হয়। * তিনটি বস্তুর মাধ্যমে ইমানের পরিপূর্ণতা লাভ হয়। আল্লাহ ভীতি, আল্লাহপ্রাপ্তির কামনা, আল্লাহর প্রেম। * তারাই প্রকৃত প্রেমিক, যাদের হৃদয় প্রতি মুহূর্তে জিকিরে নিমগ্ন থাকে, কিন্তু মুখ দেখে তা বোঝা যায না। * তরিকতপন্থীদের জন্য ৫টি জিনিস দেখা এবাদত হিসেবে গণ্য মাতাপিতাকে দেখা, কুরআন শরিফ দেখা, আলেমে রব্বানীকে দেখা, বায়তুল্লাহ শরিফ দেখা, স্বীয় মুর্শিদকে দেখা।

খিলাফত লাভ

ওলীয়ে কামেলখাজা ওসমান হারুনী (রহঃ) তার শিষ্যেরমধ্যে বেলায়েতের ঝলক দেখতে পেয়ে খাজামঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) কে খিলাফত প্রদানকরেন। খাজায়ে খাজেগান আপন পীরমুর্শিদের অনুমতিক্রমে জ্ঞানী, গুণী,পন্ডিত, দার্শনিকসহ অসংখ্য ওলীর সাথেসাক্ষাত করেন। খাজা বাবা বাগদাদ শরীফেগাউছুল আজম বড়পীর হযরত আব্দুলকাদির জিলানী (রহঃ) এর সাহচর্যে ৫৭ দিনঅবস্থান করেন। এ সময় গাউসে পাক খাজাবাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ইরাকেরদায়িত্ব শায়েক শিহাবুদ্দীনসোহরাওয়ার্দীকেআর হিন্দুস্থানেরদায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো।তারপর বেরিয়ে পরলেন বাতেনী ইলমঅর্জনের উদ্দেশ্যে।হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে, ”জ্ঞান দুইপ্রকার।জবানী ইলম ও বাতেনীইলম।” (মেশকাত শরীফ)।ইমাম মালিক (রঃ)বলেছেন-”যে ব্যক্তিবাতেনী জ্ঞান অর্জন করলো কিন্তু ইলমেশরীয়ত শরীয়ত গ্রহন করলো না সেনিশ্চিত কাফের ,আর যে ব্যক্তি শুধু ইলমেশরীয়ত গ্রহন করল কিন্তুবাতেনী ইলম গ্রহন করলো না সে নিশ্চয়ফাছেক”।আর জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটিমোসলমানের উপর যেহেতু ফরয তাই বাতেনীএলেম অর্জন করাওফরয।এই বাতেনী জ্ঞান অর্জনের জন্যআবার খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) বের হয়েগেলেন বাতেনী জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষকঅন্যেশনের উদ্দেশ্য।৫৫০ হিজরি সাল।বাগদাদে এসে সাক্ষাৎপেলেন হজরত বড় পীর আব্দুল কাদেরজিলানী (রঃ) এর।কয়েক মাস উনার সাথেঅবস্হানেরপর আবার নুতন শিক্ষকের সন্ধানে বেরহলেন।বিদায়ের সময় বড়পীর(রঃ) বললেন,’হেমইনুদ্দিন ।তুমি যখন হিন্দুস্হানে সফরকরবে ,তখন পথে পরবে ভাতীসা রমন্ত নামেএক স্হান।সে স্হানে আছে সিংহতুল্য একমর্দে মুমিন।তার কথা মনে রেখ তুমি।’শুরু হল নুতন শয়েখের সন্ধান।পথে বিভিন্নঅলির সাথে সাক্ষাতের পর এসে উপস্হিতহলেন খোরাসান এবং ইরাকের মধ্যবর্তীনিশাপুর অন্চলের হারুন নগরে। এই শহরেইবসবাস করেন আউলিয়া সম্প্রদায়েরমস্তকের মুকুট হজরত ওসমান হারুনী(রঃ)।উনারনিকট বায়াত হবার দরখাস্ত পেশ করলেমন্জুর হল।উনার সাথে বিশ বৎসরের অধিকসময় অতিবাহিত করে কামালিয়াতেরসর্বোচ্চ স্তরে পৌছলেন।এবার দাওয়াতের পালা।অলী আল্লাহগনহলেন নবী রাসুলদের প্রকৃত উত্তরসুরী।সেই দায়িত্বের ভার এসে পড়ল খাজামইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) এর উপর।ইতিমধ্যেনুতন এক ছাত্র এসে হাজির হয়েছে খাজারদরবারে।খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) ছাত্র জনাবকুতুবুদ্দিন বখতিকে সাথে নিয়ে হজ্বপালনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন মক্কায়।হজ্ব পর্ব শেষ করে মদীনা শরীফ এসেহজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তী (রঃ) রসুলেপাক(সাঃ) এর কাছ থেকে এক অবিস্মরনীয়সুসমাচার।হযরত রসুলে পাক(সাঃ)জ্যোতির্ময় চেহারায় আবির্ভুত হয়েজানালেন,”প্রিয় মইনুদ্দিন।তুমি আমারধর্মের মইন(সাহায্যকারী)।আমি তোমাকেহিন্দুস্হানের বেলায়েত প্রদান করলাম।হিন্দুস্হান বুৎপরোস্তির অন্দ্ধকারেনিমজ্জিত।তুমি আজমীরে যও।সেখানেতোমর মধ্যমে পবিত্র ইসলামের ব্যাপকপ্রসার ঘটবে।

তার তরিকার খেলাফত প্রাপ্ত খলীফাঃ মঈনুদ্দীন চিশতী মাধ্যমেই উপমহাদেশে প্রথম এই ধারা প্রবর্তিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে তাঁর অনুসারীরা যেমন, বখতিয়ার কাকী, ফরিদ, নাজিমদ্দিন আউলিয়াসহ আরো অনেকে ভারতের ইতিহাসে সুফি ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তবে এদের মধ্যে তিনি কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকীকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পন করে সিলসিলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন

কেরামত

খাজা বাবার প্রত্যেকটি কার্যক্রম ছিল অলৌকিকতায় ভরপুর। খাজা গরীবে নেওয়াজ (রঃ) এর জীবদ্দশায় আজমিরবাসীগণ হজ্জ সমাপনান্তে প্রত্যাবর্তন করে প্রায়শঃ বলতো “হুজুর, কা’বা শরীফ হতে কখন আজমিরে আগমন করেছেন?” উপস্থিত লোকজন প্রত্যুত্তরে বলতো “তিনি এ বছর হজ্জে গমন করেননি।” হজ্জ হতে প্রত্যাবর্তনকারীগণ বলতো, “তাকে আমরা অক্ষ খাজা বাবাকে কা’বা শরীফ তাওয়াফ করতে দেখেছি। উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি রাতে সশরীরে খানায়ে কা’বা প্রদক্ষিণ করতেন এবং ভোরে আজমিরে উপস্থিত হয়ে বা জামায়াতে ফজরের নামাজ আদায় করতেন।
একদিন গরীবে নেওয়াজ (রহঃ) সফররত অবস্থায় সাতজন অগ্নি উপাসকের একটি দলকে অগ্নিকুন্ডের পাশে পুজারত অবস্থায় দেখেন, সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। অগ্নি উপাসকগণ হযরতের নূরাণী চেহারা দেখামাত্র তার পায়ে জড়িয়ে ধরেন। খাজা সাহেব তাদের অগ্নিপুজার উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, “হুজুর আমরা নরকের আগুন হতে রক্ষা পাবার জন্য, এর পুজা করে আসছি।” তাদের জবাব শুনে খাজা বাবা (রহঃ) বলেন, “ওহে বোকার দল। খোদার আদেশ ব্যতীত আগুনের কোনরূপ কর্মশক্তি নাই। যে প্রভূর আদেশে আগুন কর্মক্ষম, তার উপাসনা না করে কেন তার সৃষ্টির উপাসনায় মত্ত রয়েছ?” আগুনের পূজারিগণ খাজা বাবা (রঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, তাহলে আগুন কি আপনার ক্ষতি সাধন করতে পারে না? উত্তরে খাজা সাহেব বললেন, “মঈনুদ্দীনের কথা রাখ, খোদার হুকুম ব্যতীত তার পায়ের জুতারও কোনরূপ ক্ষতিসাধন করতে পারবে না।” এ কথা বলার সাথে সাথে খাজা বাবা নিজের জুতা জোড়া অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিলেন। কিছুক্ষণ পর সবাই দেখল যে খাজা সাহেবের জুতা জোড়া বহাল রয়েছে আগুনে স্পর্শ করেনি। উক্ত আগুনের পূজারিগণ খাজা সাহেবের অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে গভীর আস্থার সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বহুদিন পর্যন্ত তারা খাজা সাহেবের কাছে অবস্থান করেন।
একবার এক বৃদ্ধ লোক খাজা সাহেবের দরবারে এসে নগরীর হাকিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলল, “হুজুর নগরীর হাকিম অন্যায়ভাবে আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাকে পুত্রহারা করেছে। তার বিয়োগ ব্যথা আমি সহ্য করতে না পেরে আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করুন। খাজা (রঃ) তখন ওজুরত অবস্থায় ছিলেন। বৃদ্ধের এ কথা শুনে তার দয়ার সাগর উথলিয়ে উঠল। নিজের লাঠিখানা হাতে নিয়ে বৃদ্ধের বাসগৃহে যান। মৃত যুবকের কাছে উপস্থিত হয়ে তিনি কিছুক্ষণ মৌণভাব অবলম্বন করেন। উপস্থিত জনগণ, সাথী খাদেমগণ এবং বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ পরবর্তী ঘটনা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। অল্পক্ষণ পরে খাজা সাহেব মৌণতা ভঙ্গ করে খন্ডিত মস্তক শরীরের সাথে যুক্ত করে যুবককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে যুবক! তুমি যদি সত্যিই নিরপরাধ হও, তবে খোদার হুকুমে জিন্দা হও।” উপরোক্ত বাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে নিহত যুবক কালেমা শরীফ পাঠ করতে করতে দাঁড়িয়ে গেল। পিতার হাতে পুনরুজ্জীবিত ছেলেকে অর্পন করে তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে স্বীয় আস্তানায় ফিরে আসেন।

যাদুকর রামেদেও ইসলাম গ্রহণ

হজরত মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ:) ৫৮৬ সালে মাত্র ৪০জন সফর সঙ্গীকে নিয়ে হিন্দুস্থানে আসেন। এরপর বিরতিহীনভাবে বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি আরব হতে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান হয়ে প্রথমে লাহরে পরে দিল্লি হয়ে আজমিরে আগমন করেন। আজমিরে পৌঁছালে সেই সময়ের হিন্দু রাজা পৃথ্বি রাজের প্রতিরোধের মুখে পড়েন। পৃথ্বিরাজ খাজা মঈনুদ্দীনকে উৎখাত করার জন্য বিখ্যাত যাদুকর রামেদেওকে পাঠান, কিন্তু যাদুকর রামেদেও খাজার অত্যাধিক শক্তির কাছে নতস্বীকার হয়ে মুসলান হয়ে নাম রাখেন মোহাম্মদ সাতাফি।
হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ:) ছিলেন দরদি মনের মানুষ এবং চরিত্র ও তার আখলাক ছিল মহাশক্তি এবং অমোঘ অস্ত্র যেই কারণেই জাতী ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই তার সংশ্রবে এসে আকৃষ্ট হয়ে পড়ত এবং তাকে আন্তরিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা করত।

ইন্তেকাল

মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরীর ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সূর্যোদয়ের সময় ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। বড় ছেলে ফখরুদ্দীন চিশতী তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। ভারতের আজমীরে তাকর দাফন করা হয় এবং এ আজমিরে হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এর মাজার অবস্থিত মোগল সম্রাট আকবর তার মাজার শরিফ বেষ্টনী করে একটি সুরম্য সমাধিসৌধ নির্মাণ করে দেন। ৯৭৮ হিজরীতে বাদশাহ আকবর খাজা সাহেবের মাজার সংলগ্ন স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি সাদা ও লাল মর্মর পাথরে নির্মিত। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমিরে তার সমাধিস্থলে ওরছ অনুষ্ঠিত হয়। আজমীর শরীফ কালক্রমে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের দর্শণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। হিন্দুমুসলিমশিখবৌদ্ধখৃষ্টান সকলে এখানে আসে দর্শক হিসাবে। 

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *