নামায এর বিধি বিধান

ভুমিকা:

পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতীর,মহান ও সর্ব উত্তম বিয়াম হল নামায।

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-

قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ، الَّذِیْنَ هُمْ فِیْ صَلَاتِهِمْ خٰشِعُوْنَ.

সফলকাম সেসকল মুমিন, যারা সালাতে খুশূ-খুযূ অবলম্বন করে। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১-২

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের পরিচয় দিতে গিয়ে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-

سِیْمَاهُمْ فِیْ وُجُوْهِهِمْ مِّنْ اَثَرِ السُّجُوْدِ.

তাদের লক্ষণ তাদের মুখম-লে সিজদার প্রভাব পরিস্ফুট থাকবে। -সূরা ফাত্হ (৪৮) : ২৯

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত মুজাহিদ রাহ. থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-

ليس بهذا الأثر الذي في الوجه ولكنها الخشوع.

এখানে কপালে সেজদার দাগ উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য হল, ‘খুশূ’। -ওয়াকী ইবনুল র্যারাহ, আয্যুহদ ২/৫৯৮, হাদীস ৩২৭; তাফসীরে সুফিয়ান ছাওরী পৃ. ২৭৮; ইবনুল মুবারক, আয্যুহদ পৃ. ৮৯

আল্লামা আলূসী রাহ. বলেন-

الخشوع التذلل مع خوف وسكون للجوارح.

‘খুশূ’ হল, অন্তরের ভয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থিরতার সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয় প্রকাশ করা। -রূহুল মাআনী ৯/২৭৫

প্রখ্যাত মুফাসসীর হাফেয ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, সালাতে খুশূ-খুযূর দৌলত তাঁরই হাছিল হয়, যে নিজের অন্তরকে সবকিছু থেকে ফিরিয়ে শুধু সালাতের মধ্যেই নিবিষ্ট রাখে। -তাফসীরে ইবনে কাছীর ৩/২৯৫

যখন কেউ এমন খুশূ-এর সাথে সালাত আদায় করে তখনই সালাত তার চক্ষু শীতল করে, অন্তরের প্রশান্তির কারণ হয়। যেমনটি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে ইরশাদ করেছেন-

جُعِلَتْ قُرّةُ عَيْنِي فِي الصّلَاةِ.

সালাতেই দান করা হয়েছে আমার চক্ষুর শীতলতা। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২২৯৩; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৩৪০

অন্য হাদীসে বেলাল রা.-কে সম্বোধন করে বলেছেন,

يَا بِلَالُ! أَقِمِ الصّلَاةَ، وَأَرِحْنَا بِهَا.

সালাতের ব্যবস্থা করে আমাকে শান্তি দাও, হে বেলাল!। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৮৫

এটাই তো সালাত সম্পর্কে একজন মুমিনের অনুভূতি হওয়া উচিত। সালাত তার জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল, অন্তরের প্রশান্তি, শান্তির আধার। পক্ষান্তরে মুনাফিক এবং যারা সালাতে খুশূ-খুযূ অবলম্বন করে না তাদের জন্য সালাত মহা কঠিন কাজ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَ اِنَّهَا لَكَبِیْرَةٌ اِلَّا عَلَی الْخٰشِعِیْنَ.

সালাতকে অবশ্যই কঠিন মনে হয়। তবে খুশূ-খুযূ (অর্থাৎ ধ্যান ও বিনয়) অবলম্বনকারীদের জন্য নয়। -সূরা বাকারা (২) : ৪৫

আরেক আয়াতে মুনাফিকদের চরিত্র সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

وَ اِذَا قَامُوْۤا اِلَی الصَّلٰوةِ قَامُوْا كُسَالٰی  یُرَآءُوْنَ النَّاسَ وَ لَا یَذْكُرُوْنَ اللهَ اِلَّا قَلِیْلاً.

(নিশ্চয়ই মুনাফিকরা) যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়। তারা মানুষকে দেখায় আর আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। -সূরা নিসা (৪) : ১৪২

তো নামাযে খুশূ-খুযূ মুমিনের গুণ। পক্ষান্তরে খুশূ-খুযূ বিহীন অলসতার সাথে নামায মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য। আর খুশূ-খুযূ ওয়ালা নামাযই নামাযীকে সকল অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে।

আসলে মুমিনের নামায খুশূ-খুযূ বিহীন হতেই পারে না; কারণ সে তো মহান প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কি দেহ-মন বিনীত না হয়ে পারে? আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কি মুমিন আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দিকে মনোনিবেশ করতে পারে? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী অপূর্ব শৈলিতে এ কথায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন-

إِنّ أَحَدَكُمْ إِذَا قَامَ يُصَلِّي إِنّمَا يَقُومُ يُنَاجِي رَبّهُ فَلْيَنْظُرْ كَيْفَ يُنَاجِيهِ.

তোমাদের কেউ যখন নামাযে দণ্ডায়মান হয় তখন সে তার রবের সাথে একান্তে আলাপ করে। সুতরাং তার উচিত সে কিভাবে আলাপ করছে সেদিকে যথাযথভাবে লক্ষ রাখা। -মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৮৬১; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৪৭৪

হযরত সা‘দ বিন উমারাহ রা. এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন-

صَلِّ صَلَاةَ مُوَدِّعٍ.

যখন তুমি সালাত আদায় কর, তো এমনভাবে আদায় কর যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ সালাত। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, বর্ণনা ৫৪৫৯; আলইছাবা, ইবনে হাজার ৩/৭০; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হায়ছামী ১০/২৩৬, বর্ণনা ১৭৭৩৯

প্রসিদ্ধ হাদীস ‘হাদীসে জিবরীল’-এ সকল ইবাদতের একটি মূলনীতি বর্ণনা করা হয়েছে। তাতে ফুটে উঠেছে খুশূ-খুযূর চূড়ান্ত রূপ-

أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنّهُ يَرَاكَ.

ইহসান হচ্ছে, আল্লাহর ইবাদত  এমনভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর তুমি তাঁকে না দেখলেও তিনি তো (অবশ্যই) তোমাকে দেখছেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০

এই হাদীসের মূল কথাও ‘খুশূ’। সুতরাং কথা এটাই যে, সালাতের চূড়ান্ত সুফল অর্জন করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই সালাতে খুশূ-খুযূ অবলম্বন করতে হবে। খুশূ-খুযূ ওয়ালা নামাযই মুমিনকে সকল অন্যায়-অনাচার, অপকর্ম-অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে।

নামায/ নামাজ / সালাত (ফার্সি: نَماز‎‎) বা সালাত হল ইসলাম ধর্মের প্রধান উপাসনাকর্ম।ফারসি শব্দ, আরবিতে সালাত যার অর্থ ধর্মীয় প্রার্থনা। নামায ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয়। সালাত সকালে, মধ্যাহ্নে, দ্বিপ্রহরের পর, বিকেলে, সন্ধ্যায় ও রাতে পাঁচবার আদায় করতে হয় ( আল-কুরআন, ১১:১১৪, ২০:১৩০, ২৪:৫৮, ৩০:১৭-১৮)। দিনে পাঁচবার নামায পড়া বাধ্যতামূলক। নামাযে আরবি ভাষা ব্যবহূত হয়। মক্কা শরীফের মসজিদুল হারামে অবস্থিত পবিত্র কাবার দিকে মুখ করে একা অথবা সমবেতভাবে জামাআতে নামায আদায় করা যায়।  জামাআতে নামায পড়ায় সওয়াব বেশি। বাংলাদেশে মহিলারা সাধারণত ঘরেই নামায আদায় করেন। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত (নির্দিষ্ট নামাযের নির্দিষ্ট সময়) নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বা ফরজ। ফরজ (আরবিতে: فَرْضُ) সাধারণত দুই প্রকার। যথা: ১.ফরজে আইন (আরবিতে: فَرْضُ عَيْنٍ )  ২.ফরজে কিফায়া (আরবিতে: فَرْضُ كِفَايَةٍ)। তন্মধ্যে সালাত (আরবিতে: صَلَاةُ) ফরজে আইন (আরবিতে: فَرْضُ عَيْنٍ )- এর অন্তর্ভুক্ত। নামায ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। ঈমান বা বিশ্বাসের পর নামাযই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।  

নামায শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভূত (ফার্সি: نماز‎‎) এবং বাংলা ভাষায় পরিগৃহীত একটি শব্দ যা আরবি ভাষার সালাত শব্দের (আরবি: صلاة‎‎, কুরআনিক আরবি:صلاة,) প্রতিশব্দ। বাংলা ভাষায় ‘সালাত’-এর পরিবর্তে সচরাচর ‘নামাজ’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, তুর্কী এবং বাংলা ভাষায় একে নামায (ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভূত) বলা হয়। কিন্তু এর মূল আরবি নাম সালাত (একবচন) বা সালাওয়াত (বহুবচন)। আর বাংলা অর্থ “স্মরণ করা” “মনে কর” বা “খেয়াল করা”।

“সালাত” -এর আভিধানিক অর্থ দোয়া, রহমত, ক্ষমা প্রার্থনা করা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থ: ‘শরী‘আত নির্দেশিত ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে বান্দার ক্ষমা ভিক্ষা ও প্রার্থনা নিবেদনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদতকে ‘সালাত’ বলা হয়, যা তাকবিরে তাহরিমা দ্বারা শুরু হয় ও সালাম ফিরানো দ্বারা শেষ হয়’।

ইতিহাস  

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী মুহাম্মাদ (সা.) ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন এবং অব্যবহিত পরে সূরা মু’মিন-এর ৫৫ নম্বর আয়াত স্রষ্টার পক্ষ থেকে সকাল ও সন্ধ্যায় দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ মুসলিমদের জন্য ফরজ (আবশ্যিক) হওয়ার নির্দেশনা লাভ করেন। তিনি ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে সকাল, সন্ধ্যা ও দুপুরে দৈনিক তিন ওয়াক্ত নামাজের আদেশ লাভ করেন। ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে রজব তারিখে মিরাজের সময় পাঁচওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, এ সময় যুহর, আসর ও ইশা ২ রাকায়াত পড়ার বিধান ছিল। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহর তরফ থেকে ২ রাকায়াত বিশিষ্ট যুহর, আসর ও ইশাকে ৪ রাকায়াতে উন্নীত করার আদেশ দেয়া হয়। 

শর্ত 

নামাযের জন্য নামাযীদের পোশাক ও দেহ পবিত্র থাকা প্রয়োজন। নামাযের জায়গাটিও পবিত্র হওয়া জরুরী। নামাযের জন্য সাধারণত জায়নামায বা মাদুর ব্যবহার করা হয়। নামায আদায় করার সময় মাথায় টুপি পরা সুন্নাত এবং জুতা খুলে রাখাই প্রচলিত বিধান। নামাযের জন্য  উযু করতে হয়।

কারো উপর নামাজ ফর‌জ হওয়ার জন্য শর্তগুলো হলো:–

  • মুসলিম হওয়া;
  • সাবালক হওয়া
  • সুস্থ মস্তিষ্কের (মানুষ) হওয়া।
  • নামাযে সাধারণত দাঁড়ানো অপরিহার্য হলেও বিশেষ অবস্থায়, যেমন অসুস্থতা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বসে কিংবা বিছানায় শুয়েও নামায আদায় করা যায়। তখন রুকূ ও সিজদার জন্য নির্ধারিত অঙ্গসঞ্চালনের পরিবর্তে আঙ্গুল ও মাথার সঞ্চালনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়।

নামাজের শর্তাবলী 

নামাযের সময় হলে প্রতিটি মসজিদ থেকে মুয়াযযিন আযানের ঘোষণা দেন। নামাযীরা হাত দুদিকে ঝুলিয়ে প্রথমত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। তারপর নিঃশব্দে নামাযের নিয়্যাত করা হয়। নিয়্যাতে আদায়কৃত নামাযের নাম ও রাকাতের সংখ্যা উল্লেখ করতে হয়। এরপর দুহাত কাঁধ বরাবর তুলে আল্লাহু আকবর বলে তকবীর বলতে হয়। এর পরের পর্ব কিয়াম (দাঁড়ানো) যাতে দাঁড়িয়ে হাতদুটি সামনের দিকে ভাঁজ করে শরীরের সহিত রাখা হয় এবং আরবিতে সুরা পাঠ করা হয়। কিয়ামের পর রুকূ। এ সময় নামাযীরা দুই হাত হাঁটুর ওপর রেখে মাথা নত করে। অতঃপর হাঁটু ভাঁজ করে বসে কপাল ও নাক মাটিতে রাখে। এর নাম সিজদা। সিজদা দুটি। এ ক’টি কাজ সম্পন্ন হলে এক রাকাত পূর্ণ হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাকাত শেষ করার পর ডান ও বাম দিকে মাথা ঘুরিয়ে সালামের মধ্য দিয়ে নামায শেষ হয়। সালামের পরে সাধারণত আরবি অথবা মাতৃভাষায় মোনাজাত করা হয়। নিম্নের পাঁচটি কারণ সংঘটিত হলে নামাজ বৈধ হয়। 

  • নামাজের ওয়াক্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হলে। অনিশ্চিত হলে নামাজ হবে না, যদি তা ঠিক ওয়াক্তেও হয়।
  • কাবামুখী হয়ে দাঁড়ানো। তবে অসুস্থ এবং অপারগ ব্যক্তির জন্য এই শর্ত শিথিলযোগ্য।
  • সতর ঢাকা থাকতে হবে। পুরুষের সতর হল নাভির উপর থেকে হাঁটুর নিচ (টাখনুর উপরে) পর্যন্ত, আর নারীর সতর হল মুখমণ্ডল, দুই হাতের কব্জি ও দুই পায়ের পাতা ব্যতীত সারা শরীর। 
  • পরিধেয় কাপড়, শরীর ও নামাজের স্থান পরিষ্কার বা পাক-পবিত্র হতে হবে।
  • অযু, গোসল বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।

নামাজের ফরজ 

নামাজের ফরজ মোট ১৪টি। আহকাম ৭ টি। আরকান ৭ টি। নামাজের বাহিরের কাজগুলিকে আহকাম বলে। আর নামাজের ভিতরের কাজগুলোকে আরকান বলে।

আহকাম 

  • শরীর পবিত্র হওয়া।
  • কাপড় বা বস্ত্র পবিত্র হওয়া।
  • নামাজের জায়গা পবিত্র হওয়া।
  • সতর ঢেকে রাখা।
  • কিবলামুখী হওয়া।
  • ওয়াক্তমত নামাজ আদায় করা
  • নামাজের নিয়্যত করা।

আরকান 

  • তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলে নামাজ শুরু করা।
  • দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া।
  • সুরা ফাতিহার সাথে কুরআন পড়া।
  • রুকু করা।
  • দু্ই সিজদা করা।
  • শেষ বৈঠক করা।

     বিভিন্ন নামায

    নামাযের ভিন্নতা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক রাকাতের সংখ্যাও ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। ফজরের নামাযে ফরজ রাকাতের সংখ্যা দুই, মাগরিবের তিন এবং জোহর, আছর ও ইশার প্রত্যেকটিতে চার। যদি কোন কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কোন নামায আদায় করা না যায় তাহলে পরবর্তী সময়ে তা ক’াযা হিসেবে অবশ্যই পড়তে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাযের অতিরিক্ত আরও চারটি ঐচ্ছিক নামায রয়েছে। সেগুলি হলো: ইশরাক, জুহা (চাশত), আওওয়াবীন এবং তাহাজ্জুদ। ইশরাক নামায আদায় করা হয় সূর্যোদয়ের পরে, জুহা সকাল ৯টার পরে ও জোহরের আগে, আওওয়াবীন মাগরিবের পরে এবং তাহাজ্জুদ দুপুর রাতের পরে।

    প্রাত্যহিক নামাযের অতিরিক্ত আরও কতগুলি বিশেষ নামায পড়ার ব্যবস্থা আছে। যেমন সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার জুম‘আর নামায (যা ফরজ), রমজানের সময় বিশ রাকাতের তারাবিহ নামায (যা সুন্নাত), দুই রাকাত ঈদের নামায (যা ওয়াজিব), এবং কারও মৃত্যু হলে তার জানাজার নামায (যা ফরজ কিফায়া)। নামাযের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাযাহাবে নগণ্য কিছু পার্থক্য থাকলেও নামাযের মূল বৈশিষ্ট্য একই রকম।

    প্রশ্ন : কসর নামাজ সম্পর্কে আমাকে জানাবেন? স্থায়ী ঠিকানা যেমন— বাবার বাড়ি বা শ্বশুরবাড়িতে অল্প কিছুদিনের জন্য গেলে কি কসর পড়তে হবে? আমার শ্বশুরবাড়ি ঢাকার বাইরে।

    উত্তর : যদি কোনো ব্যক্তি সফর অবস্থায় থাকেন, তার জন্য ইসলামের বিধান হচ্ছে তিনি সালাত কসর করবেন। এর অর্থ হচ্ছে তিনি চার রাকাত বিশিষ্ট যে সালাতগুলো আছে, সেগুলোর দুই রাকাত আদায় করবেন। শুধু কসর চার রাকাত বিশিষ্ট সালাতের মধ্যে। দুই রাকাত অথবা তিন রাকাত বিশিষ্ট যে সালাতগুলো আছে, যেমন সালাতুল মাগরিব, সালাতুল ফজর, এর কোনো কসর নেই। অর্থাৎ এটাকে অর্ধেক করার কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং শুধু আসর, এশা এবং জোহরের ওয়াক্তে আপনি কসর করবেন। তবে আপনাকে সফররত থাকতে হবে।

    সফররত অবস্থা দুটি— একটি হচ্ছে আপনি গাড়িতে সফর করে আছেন। তখন আপনি মুসাফির। যেখানেই আপনি যান না কেন, তখন আপনি কসর করবেন। দ্বিতীয় হচ্ছে আপনি এমন দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, যে দূরত্ব অতিক্রম করলে স্বাভাবিকভাবেই সফর বলা হয়ে থাকে। যেমন— এক জেলা থেকে আরেক জেলা বা এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় আপনি গেছেন। তাহলে সেটা আপনার জন্য সফর। তখন আপনি কসর করবেন।

    আর আপনি যদি নিজের ব্যক্তিগত বাড়িতে যান, সেখানে আপনার আত্মীয়স্বজন সবাই আছে, বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা আছে, খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, তাহলে সেখানে গেলে আপনি মুসাফির হবেন না। বাড়িতে গলে মুকিমই। একামতের নিয়ত করবেন। সেখানে আপনি সালাত পরিপূর্ণরূপে আদায় করবেন, যেহেতু আপনি নিজের বাড়িতে গেছেন। সুতরাং সেখানে আপনাকে কসর করতে হবে না।

    তেমনিভাবে কেউ যদি নিজের শ্বশুরবাড়িতে যায়, আর যদি সেখানে সব কিছুর ব্যবস্থাপনা থাকে, তাহলে তিনি কসর করবেন না। কারণ হলো তিনি নিজের পরিবারের কাছে গেছেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে, শ্বশুরবাড়িতে গেছেন, সেখানে তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা নেই, থাকার ব্যবস্থা নেই, পরিবারের কেউ নেই, সবাই সেখানে বাইরের অথবা নিজেই গেছেন সেখানে মুসাফিরের মতো, যদি এমনটি হয়ে যায় তাহলে তিনি মুসাফির। কারণ সেখানে যদি কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকে পরিবার বা আত্মীয় বলতে কেউ না থাকে, তাহলে সেখানে তিনি মুসাফিরই। তাহলে সেখানে তিনি কসর করবেন।

    আর এক জেলা থেকে আরেক জেলার দূরত্ব সফরের জন্য, ওলামায়ে কেরাম এ নিয়ে যথেষ্ট এখতেলাফ বা মতবিরোধ করেছেন। কেউ তিন মাইলের কথা উল্লেখ করেছেন, কেউ ১৬ মাইলের কথা উল্লেখ করেছেন, কেউ ৪৮ মাইলের কথা উল্লেখ করেছেন। আবার কেউ ৫৪ মাইলের কথা উল্লেখ করেছেন। অনেক বক্তব্য ওলামায়ে কেরামের আছে। প্রত্যেকটি বক্তব্যই মূলত ইজতেহাদ নির্ভর। কিন্তু মোদ্দা কথা হচ্ছে, যেটাকে সফর বোঝায়, এক জেলা থেকে আরেক জেলায় স্বাভাবিকভাবে যখন কোনো ব্যক্তি সফর হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, সেই সফর যদি কেউ করে থাকে, তাহলে তিনি মুসাফির। তখন তিনি কসরের নিয়তে সালাত আদায় করবেন। এটাই তার জন্য ইসলামী শরিয়তের বিধান।

    এমনকি নিজ বাড়িতে গেলেও যদি কোনো ধরনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেখানেও তিনি যাবেন মুসাফির হিসেবে। সেখানেও তিনি কসর আদায় করবেন।

    শীতের সকালে ফজরের নামায

    কনকনে শীত। ঘন কুয়াশায় দুই হাত আগে কিছু দেখা যায় না। টিনের ঢেউয়ের সারিগুলো থেকে যেভাবে টপটপ করে পানি ঝরছে মনে হচ্ছে যেন বৃষ্টি হচ্ছে। সন্ধ্যা নামতেই খেঁকশিয়ালগুলো জোটবেঁধে হুক্কাহুয়া শুরু করে দেয়।

    আঁধার নেমে আসতে না আসতে দু লোকমা মুখে পুরে জামিল সেই যে লেপের নীচে ঢোকে সূর্য ওঠার আগে আর তার বের হতে মন চায় না। মাদরাসা খোলা থাকলে নামায-কালাম, পড়া-শোনা সবই ঠিকমত হত। কিন্তু শীতের এ বিরতিতে ফজরের সময় লেপের মুড়িটা সরানোই তার জন্য বড় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ওযুর কথা মনে হলেই যেন লোমগুলো কাঁটা দিয়ে ওঠে।

    ঠিকমত নামায আদায় করবেন। নামাযী ব্যক্তির ব্যাপারে বড় খোশখবরী রয়েছে। আর বিশেষ করে ফজরের নামাযের প্রতি যতœবান হবেন। নবীজী বলেছেন-

    مَنْ صَلّى البَرْدَيْنِ دَخَلَ الجَنّة.

    যে ব্যক্তি বারদাইন (দুই ঠা-ার সময়ের নামায অর্থাৎ এশা ও ফজরের নামায) আদায় করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৪

    কিন্তু এত শীতের মধ্যে সে নামাযের জন্য ওযু করবে কীভাবে? ঠা-া পানি দিয়ে ওযু করা কি চাট্টিখানি কথা! কিন্তু না, তাকে নামাযে যেতেই হবে। হুযুর না বলেছিলেন-  ওযুর পানির সাথে বান্দার সগীরা গুনাহগুলো ধুয়ে মুছে পাক ছাফ হয়ে যায়। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৪৪) তাহলে ওযু করতে ভয় কীসের!

    বিশেষ করে শীতকালে এবং অন্য যেকোনো কষ্টকর মুহূর্তে ওযু-নামাযের প্রতি যতœবান হওয়ার জন্য নাকি রয়েছে অনেক ফযীলত, অনেক বড় পুরস্কার। হুযুর বলেছিলেন, নবীজী বলেছেন-

    أَلَا أَدُلّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللهُ بِهِ الْخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدّرَجَاتِ؟ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ: إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ…

    আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেবেন (অর্থাৎ তোমাদেরকে মাফ করে দেবেন) এবং (আল্লাহ্র নিকট) তোমাদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করে দেবেন? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নবীজী বললেন, (শীত বা অন্য যে কোনো) কষ্টকর মুহূর্তে ভালোভাবে ওযু করা।… -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫১

    কিন্তু শয়তানের শয়তানী হল, সে আমাদেরকে নামায থেকে দূরে রাখতে ষড়যন্ত্র করে। বিশেষ করে ফজরের সময় সে আরো ঘুম পাড়াতে থাকে। এজন্য শয়তানকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

    তার আরো মনে পড়ল মুনাজাতে আল্লাহ তাআলার দরবারে ওয়াদা করার কথা। এসব মনে পড়তেই এক ঝটকায় গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল জামিল। দাদার সাথে ফজরের নামায পড়তে গেল।

    একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত মিসওয়াক

    নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি সুন্নত ও শিক্ষাই আমাদের কাছে এই দাবি রাখে যে, আমরা যেন তা গুরুত্বের সাথে অনুসরণ করি। আর সেটা যদি হয় ‘সুন্নাতে মুআক্কাদা’ তাকিদপূর্ণ সুন্নাত তাহলে তা অনুসরণ করা আরো গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবনে তা চর্চা না করা আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ।

    দৈনন্দিন জীবনে বহু সুন্নত এমন রয়েছে, যার উপর আমল করা আমাদের পক্ষে কঠিন কিছু নয়। একটু  সচেতন হলে খুব সহজেই আমরা সেগুলো পালন করতে পারি।

    অনেক সুন্নত আছে, যা অন্য কোনো ফরয বিধানের পরিপূরক হিসেবে অথবা তার আগে পরে আদায় করতে হয়। তাই অতি সহজে আমরা এ সুন্নতগুলো উক্ত ফরযের সাথে আদায় করে নিতে পারি।

    যেমন : পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের আগে-পরের সুন্নত নামায, নামাযের ভিতরের সুন্নতসমূহ, অযুর সুন্নতসমূহ ইত্যাদি। যেগুলো আমরা ফরযের সাথে সাথেই আদায় করে থাকি। ফলে এ সুন্নতগুলো আদায় করা আমাদের কাছে খুব ভারী মনে হয় না।

    তবে এর মধ্যেই কিছু সুন্নত এমন রয়েছে, অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে যেগুলো আমাদের থেকে ছুটে যায়। এরকম একটি সুন্নত হচ্ছে মিসওয়াক।

    মিসওয়াক একটি সুন্নত এবং দ্বীনের অংশ। তা শুধুই দাঁতের ময়লা ও মুখের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য নয়; বরং তার আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। হাঁ, দুর্গন্ধ ও ময়লা দূর হওয়াও এর একটি উদ্দেশ্য। ইসলামের প্রতিটি বিধানই ইহকালীন ও পরকালীন উভয় প্রকার কল্যাণে পরিপূর্ণ।

    পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং সুন্দর ও উত্তমরূপে চলা ইসলামের সর্বব্যাপী শিক্ষা। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচ্ছন্ন থাকা এবং উত্তম বেশ-ভূষা ধারন করাকে একজন মুসলিমের একটি বিশেষ প্রতিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যার মাধ্যমে চেনা যাবে যে, সে একজন মুসলমান।

    এক সফরে তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে বললেন- যারা নিজেদের ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন-

    إِنّكُمْ قَادِمُونَ عَلَى إِخْوَانِكُمْ، فَأَصْلِحُوا رِحَالَكُمْ، وَأَصْلِحُوا لِبَاسَكُمْ، حَتّى تَكُونُوا كَأَنّكُمْ شَامَةٌ فِي النّاسِ.

    তোমরা তোমাদের ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছ। তাই নিজেদের বাহন ও আসবাবপত্র ঠিকঠাক ও পরিপাটি করে নাও এবং সুন্দর ও  উত্তম বেশ-ভূষা ধারন কর; যেন মানুষদের মাঝে তোমাদেরকে তিলকের মত মনে হয়। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪০৮৯; মুসতাদরাকে হাকেম ৪/২০৩

    আম্মাজান আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, একবার কিছু সাহাবী ঘরের দরজায় রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। নবীজী  তাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করলেন। তখন আমি লক্ষ করলাম, ঘরের একটি বালতিতে রাখা পানিতে তিনি চেহারা দেখছেন এবং নিজের চুল ও দাড়ি পরিপাটি করে নিচ্ছেন। এ দেখে আমি বললাম, হে আল্লাহর প্রিয় রাসূল! আপনিও এমনটি করেন? জবাবে তিনি বললেন, অবশ্যই করি। প্রত্যেক ব্যক্তিরই উচিত, যখন  সে তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা করে তখন নিজেকে প্রস্তুত ও পরিপাটি করে নেওয়া। কেননা, আল্লাহ পাক সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকেই ভালোবাসেন। -ই‘তিলালুল কুলূব, খারাইতী, পৃ. ১৬৬; আমালুল ইয়াওমি ওয়াললায়লাহ, ইবনুস সুন্নী, হাদীস ১৭৩

    যে সকল বিষয়ে বিশেষভাবে পরিচ্ছন্নতা কাম্য, এগুলোর মধ্যে আছে, বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, আসবাব-পত্র, লেবাস-পোশাক, শরীর, মাথা, চেহারা ইত্যাদি। এগুলোর প্রত্যেকটির পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আর মুখের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে পঞ্চাশ বা এরও অধিক সাহাবী হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

    আল্লামা ইবনুল মুলাক্কিন রাহ. তাঁর সংকলিত ‘আলবাদরুল মুনীর গ্রন্থে মিসওয়াক সম্পর্কে একশ’র  বেশি হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন, মিসওয়াকের বিষয়ে হাদীসের এই ভা-ার একটি বিশাল ব্যাপার। হায় আফসোস!! একটি সুন্নত, যার ব্যাপারে এত অধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে আজ বহু মানুষ সে সুন্নত পালনে উদাসীন। -আলবাদরুল মুনীর ২/৬৮

    মিসওয়াকের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই যত্নবান ছিলেন। যা ইসলামী শরীয়তে মিসওয়াকের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ।

    হাদীস শরীফে এসেছে, তিনি যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর, বারবার ঠাণ্ডা পানিতে হাত ভিজিয়ে চেহারায় মুছছিলেন, আর বলছিলেন, إن للموت سكرات ‘নিশ্চয়ই মৃত্যুর রয়েছে অনেক যন্ত্রণা।’

    তিনি মিসওয়াকের কথা ভোলেননি। এমনকি অন্যের কাছ থেকে মিসওয়াক চেয়ে নিয়ে মিসওয়াক করেছেন।

    মৃত্যুযন্ত্রণায় তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি নিজে মিসওয়াক চিবুতে পারছিলেন না। আম্মাজান আয়েশা রা. তা চিবিয়ে দিয়েছেন। এরপর তিনি তা দিয়ে মিসওয়াক করেছেন। মিসওয়াকের ব্যাপারে ছিল এত যত্ন, এত আগ্রহ। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৯০, ৪৪৪৯, ৫৬১০

    শুধু নিজে আমল করেই নয়, অনেক বাণীর মাধ্যমেও তিনি এই সুন্নতটির প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।

    এক হাদীসে ইরশাদ করেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কঠিন না হত, তাহলে প্রতি নামাযের সময় মিসওয়াক করাকে আমি অপরিহার্য করে দিতাম।’ -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫২

    অন্য রেওয়ায়েতে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ‘কঠিন না হলে, প্রতি অযূর সময়ই আমি মিসওয়াকের নির্দেশ দিতাম।’ -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৫৩১; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১৪০

    মুসলিম শরীফের এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, ‘দ্বীন ইসলামের স্বভাবজাত দাবি দশটি, যার অন্যতম প্রধান হল, মিসওয়াক করা।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬১

    আরেক হাদীসে এসেছে, ‘তোমরা মিসওয়াক কর। কেননা, তা মুখের পবিত্রতার উপায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম। -ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১০৭০

    ওযু-নামায ছাড়াও যে সময়গুলোতে মিসওয়াকের প্রতি যত্নবান থাকা একজন মুমিনের কর্তব্য তা হচ্ছে, নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে। নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়ার পর। কুরআন তিলাওয়াতের সময়। জুমা-ঈদ এবং কারো সাথে সাক্ষাতের সময়।

    তেমনি এমন কিছু পানাহারের পর, যা মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। যেমন, পেয়াজ-রশুন। বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর। বাড়ি থেকে কোথাও বের হওয়ার সময়। দাঁতে ক্লেদ বা ময়লা জমলে। দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকা বা ক্ষুধার কারণে মুখে দুর্গন্ধ হলে।

    উল্লেখিত সবগুলো সময়ের ব্যাপারেই হাদীসে নির্দেশনা পাওয়া যায়।

    এক হাদীসে এসেছে-

    كَانَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ إِذَا قَامَ مِنَ اللّيْلِ، يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ.

    নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে ঘুম থেকে ওঠার পর, মিসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৫

    অন্য বর্ণনায় এসেছে-

    أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ لَا يَرْقُدُ مِنْ لَيْلٍ وَلَا نَهَارٍ، فَيَسْتَيْقِظُ إِلّا تَسَوّكَ قَبْلَ أَنْ يَتَوَضّأَ.

    নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত-দিনের যখনই ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন ওযুর পূর্বে মিসওয়াক করে নিতেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫৭

    উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন,

    أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ إِذَا دَخَلَ بَيْتَهُ بَدَأَ بِالسِّوَاكِ.

    নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশের পর সর্ব প্রথম মিসওয়াক করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৩

    এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, ঘরে পরিবার-পরিজনের কাছে যাওয়ার পর প্রথমে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া উচিত।

    যায়েদ বিন খালেদ রা. বলেন-

    مَا كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَخْرُجُ مِنْ بَيْتِه (شيء) لِشَيْءٍ مِنَ الصّلَوَاتِ حَتّى يَسْتَاكَ.

    নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মিসওয়াক করে নিতেন। -আল মুজামুল কাবীর, তবারানী,  হাদীস ৫২৬১; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ২৫৬৯

    হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরই উচিত, জুমার দিন গোসল করা, মিসওয়াক করা এবং সাধ্যানুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৮০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৪৬

    এক বর্ণনায় এসেছে-

    طَيِّبُوا أَفْوَاهَكُمْ بِالسِّوَاكِ؛ فَإِنّهَا طُرُقُ الْقُرْآنِ.

    তোমরা মিসওয়াক করার মাধ্যমে মুখ পরিষ্কার ও সুন্দর রাখো। কেননা মুখ কুরআন (উচ্চারিত হওয়ার) মাধ্যম। – শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১৯৪০

    হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার দুজন লোক নবীজীর কাছে এল। তাদের উভয়ের প্রয়োজন ছিল অভিন্ন। একজন নবীজীর সাথে কথপোকথন শুরু করল। তখন নবীজী তার মুখ থেকে দুর্গন্ধ পেলেন। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি মিসওয়াক কর? সে বলল করি, তবে তিন দিন যাবৎ আমি অনাহারে (তাই এ দুর্গন্ধ)। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে (তার প্রয়োজন পুরা করার) নির্দেশ দিলেন। তিনি ঐ ব্যক্তির মেহমানদারি করলেন এবং তার প্রয়োজন পূর্ণ করলেন। -আলমুজামুল কাবীর, তবরানী,  হাদীস ১২৬১১; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ১৬৮

    আরো বহু হাদীসে মিসওয়াকের ব্যাপারে তাকিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের আমল করার তাওফীক দান করুন- আমীন।

    নিশ্চয়ই সালাত অন্যায় ও অশোভন কাজ থেকে বিরত রাখে

    ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল সালাত। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

    أَوّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَلَاتُهُ.

    কিয়ামত দিবসে বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে সালাতের মাধ্যমে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬৯৪৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৮৬৬

    হযরত উমর রা.-এর প্রসিদ্ধ বাণী-

    إِنّ أَهَمّ أَمْرِكُمْ عِنْدِي الصّلَاةُ. فَمَنْ حَفِظَهَا وَحَافَظَ عَلَيْهَا، حَفِظَ دِينَهُ. وَمَنْ ضَيّعَهَا فَهُوَ لِمَا سِوَاهَا أَضْيَعُ.

    নিশ্চয়ই আমার কাছে তোমাদের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সালাত। যে ব্যক্তি সালাতের হেফাযত করল, যত্ন সহকারে তা আদায় করল, সে তার দ্বীনকে হেফাযত করল। আর যে তাতে অবহেলা করল, (দ্বীনের) অন্যান্য বিষয়ে সে আরো বেশি অবহেলা করবে। -মুয়াত্তা মালেক, বর্ণনা ৬; মুসান্নাফে আবদুর রযযাক, বর্ণনা ২০৩৮

    সালাত মূলত খোদাপ্রদত্ত এক মহান নিআমত। রাব্বুল আলামীনের এক বিশেষ উপহার, যা বান্দাকে সকল প্রকার অশ্লীলতা, পাপাচার, প্রবৃত্তিপূজা, ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের অন্ধ মোহ থেকে মুক্ত করে পূত-পবিত্র ও উন্নত এক আদর্শ জীবনের অধিকারী বানিয়ে দেয়। বিকশিত করে তোলে তার ভেতরের সকল সুকুমারবৃত্তি। তার জন্য  খুলে দেয় চিরস্থায়ী জান্নাতের সুপ্রশস্ত দুয়ার।

    সালাত হচ্ছে হিকমাহপূর্ণ এক অলৌকিক তরবিয়ত-ব্যবস্থা। সালাতের মাধ্যমেই ইখলাস, আত্মশুদ্ধি ও আত্মবিলোপের মহৎ গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে, যা বান্দাকে পৌঁছে দেয় আল্লাহর সান্নিধ্যের স্বর্ণশিখরে।

    সালাত এমন এক নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পূর্ণ যে, খাঁটি মুসল্লি নামাযের বাইরের পরিবেশেও এমন কোনো কাজ করতে পারে না, যা মানুষের দৃষ্টিতে সালাতের ভাব-মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। অদৃশ্য থেকে মূলত সালাতই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তার রাত-দিনের সকল গতিবিধি। শয়তানের ধোঁকায় যদি মুসল্লি কখনো কোনো অন্যায় বা অশোভনীয় কাজে লিপ্ত হতে চায় তখন নামাযের তরবিয়তে দীক্ষিত বিবেক তাকে বলে, তুমিই বল, একটু পরে যখন তুমি সালাতে তোমার মহান প্রভুর সামনে দাঁড়াবে তখন কি তোমার এই ভেবে লজ্জাবোধ হবে না যে, কেমন কালো মুখ ও কলুষিত হৃদয় নিয়ে তুমি আপন মালিকের সামনে দাঁড়াচ্ছ? যিনি অন্তর্যামী, তোমার গোপন-প্রকাশ্য সকল বিষয়ে সম্যক অবগত। যিনি ছাড়া তোমার আর কোনো ইলাহ নেই। যিনি তোমার একমাত্র আশ্রয়দাতা, যাঁর সামনে তোমাকে বার বার দাঁড়াতে হবে। যার কাছে তোমার সকল চাওয়া-পাওয়া। প্রতিটি মুহূর্তে তুমি যাঁর মুখাপেক্ষী। এগুলো জানার পরও কি তুমি তাঁর নাফরমানিতে লিপ্ত হবে? সালাত এভাবে মুসল্লিকে উপদেশ দিতে থাকে এবং পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে বাধা দেয়। আল্লাহ তাআলার ঘোষণা-

    اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰی عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْكَرِ.

    নিশ্চয়ই সালাত অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। -সূরা আনকাবূত (২৯) : ৪৫

    ইমাম তবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী, আলূসীসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরকারের মত অনুসারে আয়াতের মর্ম হল, তাকবীর, তাসবীহ, কেরাত, আল্লাহর সামনে কিয়াম ও রুকু-সিজদাহসহ অনেক আমলের সমষ্টি হচ্ছে সালাত। এ কারণে সালাত যেন মুসল্লিকে বলে, তুমি কোনো অশ্লীল বা অন্যায় কাজ করো না। তুমি এমন প্রভুর নাফরমানী করো না, যিনি তোমার কৃত ইবাদতসমূহের প্রকৃত হকদার। তুমি এখন কীভাবে তাঁর অবাধ্য হবে, অথচ তুমি এমন আমল করেছ, যা তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ত্বকে প্রকাশ করে। এরপরও যদি তাঁর অবাধ্য হও তবে এর মাধ্যমে তুমি স্ববিরোধী কাজে লিপ্ত  হলে। (আর স্ববিরোধী কাজের মাধ্যমে ব্যক্তি কোন্ স্তরে নেমে আসে সেটা তোমার ভালোই জানা আছে।) -রুহুল মাআনী, ১০/৪৮২

    প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত নামাযে প্রতি রাকাতে বান্দাহ বলতে থাকে-

    مٰلِكِ یَوْمِ الدِّیْنِ.

    [(তুমি) কর্মফল-দিবসের মালিক।] আর তার স্মরণ হতে থাকে, তাকে কাল কর্মফল দিবসে মালিকের সামনে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং তাঁর নাফরমানী থেকে, তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচতে হবে। কোনো গুনাহ যদি নামাযের আগে হয় তাহলে তার গুনাহের কথা স্মরণ হয় ও লজ্জাবোধ হয়; বান্দা অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে গুনাহ না করার সংকল্প করে। তেমনি যদি কোনো গুনাহের নিয়ত থাকে তখন বান্দার মনে হয়, আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো; কাল কিয়ামতের দিনও তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে। তাহলে কীভাবে আমি নামাযের পর অমুক গুনাহ করার কথা ভাবতে পারি! এভাবে নামায বান্দাকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখে, কৃত গুনাহ থেকে পবিত্র করে।

    তেমনিভাবে আমরা নামাযের শুরুতে যে ছানা পড়ি-

    سُبْحَانَكَ اللّهُمّ وَبِحَمْدِكَ…

    এখানে পড়ার আরেকটি দুআও রয়েছে, যে দুআর মধ্যে বান্দা গুনাহ থেকে দূরে থাকার তাওফীক প্রার্থনা করে-

    اللّهُمّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ، كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ المَشْرِقِ وَالمَغْرِبِ…

    (হে আল্লাহ! পূর্ব-পশ্চিমের যেমন দূরত্ব; আমার মাঝে আর গুনাহের মাঝে তুমি তেমন দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও।)

    তো বান্দা যখন নামাযে দাঁড়িয়ে এ কথা বলে, তখন অবচেতনেই সে গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে এবং আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন এবং তাকে গুনাহ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করেন। এভাবে সালাত বান্দাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে।

    দিনের শেষে বিত্র নামাযে আমরা দুআ কুনূত পড়ি। সে দুআতে এমন অনেক বাক্য রয়েছে, যাতে বান্দা নিজ গুনাহের কথা স্মরণ করে, মাফ চায়, গুনাহ না করার সংকল্প করে। যেমন দুআর শুরুতেই আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে বান্দা বলে-

    اللّهُمّ إِنّا نَسْتَعِينُكَ، وَنَسْتَغْفِرُكَ.

    (ইয়া আল্লাহ! আমরা তোমারই সাহায্য চাই। তোমারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।)

    দিন শেষে বান্দা যখন গাফূরুর রাহীমের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তো বান্দার সারাদিনের সকল পাপের কথা স্মরণ হয়ে যায়। সাথে ভবিষ্যতে পাপ না করার সংকল্প ব্যক্ত করে। কারণ, কৃত গুনাহ মাফ হওয়ার জন্য প্রধান শর্তই হল, ভবিষ্যতে এ গুনাহ আর না করার সংকল্প।

    একপর্যায়ে বান্দা বলে-

    نَشْكُرُكَ وَلَا نَكْفُرُكَ.

    (আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি; অকৃতজ্ঞ হই না।)

    রবের নাফরমানীর চাইতে বড় অকৃজ্ঞতা আর কী হতে পারে!

    সালাত বান্দাকে শুধু রবের নাফরমানী থেকেই বিরত রাখে না; বরং নাফরমান থেকেও দূরে রাখে। দুআ কুনূতে বান্দা বলে-

    وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يّفْجُرُكَ.

    (যে তোমার নাফরমানী করে আমরা তাকে ত্যাগ করি, বর্জন করি।)

    সবশেষে বান্দা সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সংকল্প ব্যক্ত করে বলে-

    وَنَخْشٰى عَذَابَكَ.

    (আমরা তোমার আযাবকে ভয় করি।)

    এ সংকল্প সারাদিন বান্দাকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। কৃত গুনাহ থেকে তওবা করার তাকিদ দেয়। এভাবেই গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা, গোনাহগার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার সংকল্প আর আল্লাহর আযাবের স্মরণ বান্দাকে সকল প্রকার অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে।

    এ তো গেল দিনের শেষে বান্দার গুনাহের স্মরণ ও ক্ষমা প্রার্থনার কথা; এ ছাড়াও প্রতি নামাযের শেষেই তো বান্দা বলে-

    اللّهُمّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلَا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِي إِنّكَ أَنْتَ الغَفُورُ الرّحِيمُ.

    ইয়া আল্লাহ! আমি (তোমার নাফরমানীর মাধ্যমে) নিজের উপর অনেক যুলুম করেছি। আর আপনি ছাড়া গুনাহ মাফকারী আর কেউ নেই। আপনি নিজ অনুগ্রহে আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি রহম করুন। নিঃসন্দেহে আপনিই ক্ষমাকারী, করুণাময়।

    যে বান্দা রবের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ‘যালামতু নাফসী’-‘নিজের উপর যুলুম করেছি’ বলে স্বীকারোক্তি দেয় এবং হৃদয়ে তা ধারণ করে সে কি সালাতের বাইরে এ স্বীকারোক্তির বিপরীত করতে পারে? রাব্বে কারীমের, গাফূরুর রাহীমের নাফরমানী করতে পারে?

    এভাবেই সালাত বিরত রাখে বান্দাকে সকল অন্যায়-অনাচার থেকে।

    সবচেয়ে বড় কথা হল, দিনের পাঁচটি সময়ে পাঁচবার মহান প্রভুর সামনে দাঁড়ানোই তো বান্দাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট। দিবস-রজনীর বিভিন্ন মুহূর্তে সে যত গুনাহ করে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই তার গুনাহের কথা স্মরণ হয়ে যায়, সে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। কারণ সে তো দাঁড়িয়েছে ‘আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতি’র সামনে, যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব জানেন। সে তো দাঁড়িয়েছে ‘আলীমুম বিযা-তিস সুদূর’-এর সামনে, যিনি অন্তরের সংকল্পও জানেন।

    এর দ্বারা যেমন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার পাথেয় অর্জন হয়, সংকল্প করার তাওফীক হয় তেমনি এ কারণে গুনাহও মাফ হয়। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

    الصّلَوَاتُ الْمَكْتُوبَاتُ كَفّارَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنّ.

    পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায তার মাঝের গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩১

    হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে অভিযোগ করল, অমুক ব্যক্তি রাতে সালাত আদায় করে আর দিনের বেলায় চুরি করে। নবীজী বললেন-

    سَيَنْهَاهُ مَا تَقُولُ.

    তুমি যা বলছ (অর্থাৎ তার নামায) তা শীঘ্রই তাকে (এ অন্যায় থেকে) বিরত রাখবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৯৭৭৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২৫৬০

    এক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে সালাত আদায় করত। যখন তার সম্পর্কে হযরত ইবনে মাসউদ রা.-কে বলা হল, তিনি বললেন, সালাত তার জন্যই ফলদায়ক হয়, যে সালাতের আনুগত্য করে। অতপর তিনি আয়াত পাঠ করলেন-

    اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰی عَنِ الْفَحْشَآءِ وَ الْمُنْكَرِ.

    নিশ্চয়ই সালাত অশোভন ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। [সূরা আনকাবূত (২৯) : ৪৫] -মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদীস ৩৫৬৯৬; তাফসীরে তবারী, ১৮/৪০৮; তাফসীরে ইবনে আবি হাতেম, ৯/৩০৬৬

    হযরত শুআইব আ.-এর ঘটনা থেকেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝে আসে- সালাত অন্যায় থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর নবী হযরত শুআইব আ. যখন তাঁর জাতিকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন এবং মাপে কম দেয়াসহ সকল প্রকার অনাচার পরিহার করে পূত-পবিত্র জীবন যাপনের আহ্বান জানালেন তখন তাঁর অবাধ্য সম্প্রদায় তার প্রতি আপত্তি জানিয়ে বলল-

    اَصَلٰوتُكَ تَاْمُرُكَ اَنْ نَّتْرُكَ مَا یَعْبُدُ اٰبَآؤُنَاۤ اَوْ اَنْ نَّفْعَلَ فِیْۤ اَمْوَالِنَا مَا نَشٰٓؤُا  اِنَّكَ لَاَنْتَ الْحَلِیْمُ الرَّشِیْدُ.

    তোমার ‘সালাত’ কি তোমাকে এই  নির্দেশই দেয় যে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্য বস্তুকে ত্যাগ করব কিংবা আমরা বিরত থাকব আমাদের ধন-সম্পদ নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা থেকে? তুমি তো বেশ বুদ্ধিমান ও ধার্মিক লোক! [সূরা হূদ (১১) : ৮৭]

    এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই সালাত (ভালো কাজের) আদেশ এবং (মন্দ কাজ থেকে) নিষেধ করে। -তাফসীরে তবারী ১৮/৪০৯

    সালাত কখন অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে?

    প্রকৃত অর্থেই সালাত মুসল্লিকে অন্যায় ও অশোভন কাজ থেকে বিরত রাখে। কিন্তু তা কখন? এ ঘোষণার চূড়ান্ত ফল লাভ করার জন্য কোনো শর্ত রয়েছে কি না? এক্ষেত্রে মুসল্লিরও কিছু করণীয় ও বর্জনীয় আছে কি না? এটা অবশ্যই যথার্থ ও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। অনেক আয়াত ও হাদীস থেকেই এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। এখানে শুধু একটি আয়াত ও একটি হাদীস উল্লেখ করা হচ্ছে। আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন-

    فَوَیْلٌ لِّلْمُصَلِّیْنَ، الَّذِیْنَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُوْنَ،  الَّذِیْنَ هُمْ یُرَآءُوْنَ.

    দুর্ভোগ ঐসকল মুসল্লির, যারা তাদের সালাত থেকে উদাসীন। যারা শুধু (মানুষদেরকে) দেখানোর জন্য সালাত আদায় করে। -সূরা মাউন (১০৭) : ৪-৫

    অতএব স্পষ্ট যে, মুল্লি মাত্রই সালাতের এই মহা সুফল লাভ করবে, বিষয়টি এমন নয়। সালাতের মধ্যে উদাসীনতা মুসল্লির জন্য সুফল নয়; বরং কুফল বয়ে আনে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

    خَمْسُ صَلَوَاتٍ افْتَرَضَهُنَّ اللهُ عَلَى عِبَادِهِ مَنْ أَحْسَنَ وُضُوءَهُنَّ وَصَلَّاهُنَّ لِوَقْتِهِنَّ، فَأَتَمَّ رُكُوعَهُنَّ وَسُجُودَهُنَّ وَخُشُوعَهُنَّ كَانَ لَهُ عِنْدَ اللهِ عَهْدٌ أَنْ يَغْفِرَ لَهُ، وَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ فَلَيْسَ لَهُ عِنْدَ اللهِ عَهْدٌ إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ، وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ.

    আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে ওযু করবে এবং যথাসময়ে সালাত আদায় করবে- এভাবে যে, রুকু-সিজদা ও খুশূ পূর্ণরূপে সম্পাদন করবে, তার জন্য আল্লাহ পাক ক্ষমার (অন্য বর্ণনায়, জান্নাতের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যে ব্যক্তি (এসব) করবে না তার জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ইচ্ছা হলে মাফ করবেন নতুবা শাস্তি দিবেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৭০৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫

    নবীজীর এই পবিত্র ইরশাদ থেকে বোঝা যায়, সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে একটি ‘আহ্দ’ বা চুক্তি সম্পাদিত হয়। আর সে চুক্তিটি একটু বিস্তর। এর জন্য কিছু অপরিহার্য শর্ত রয়েছে, যার অন্যতম হল, সালাতে খুশূ-খুযূ অবলম্বন করা এবং রুকু-সিজদা ধীরস্থির ও যথাযথভাবে সম্পাদন করা।

    মূলত সালাতের গুণগত মান হিসাবেই তা মুসল্লিকে পাপাচার ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

    إِنّ الْعَبْدَ لَيُصَلِّي الصّلَاةَ مَا يُكْتَبُ لَهُ مِنْهَا إِلّا عُشْرُهَا، تُسُعُهَا، ثُمُنُهَا، سُبُعُهَا، سُدُسُهَا، خُمُسُهَا، رُبُعُهَا، ثُلُثُهَا نِصْفُهَا.

    নিশ্চয়ই বান্দা সালাত সম্পন্ন করে আর তার জন্য লেখা হয় সালাতের দশ ভাগের এক ভাগ (প্রতিদান) অথবা নয় ভাগের এক ভাগ অথবা আট ভাগের এক ভাগ, সাত ভাগের এক ভাগ, ছয় ভাগের এক ভাগ, পাঁচ ভাগের এক ভাগ, চার ভাগের এক ভাগ, তিন ভাগের এক ভাগ অথবা সে পায় সালাতের অর্ধেক (প্রতিদান)। এক বর্ণনায় এসেছে অথবা সে পায় সালাতের পূর্ণ প্রতিদান ও সুফল। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৮৮৯৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৭৯৬

    অর্থাৎ যদি সালাতটি আদায় করা হয় পূর্ণ খুশূ-খুযূর (হৃদয়ের একাগ্রতা ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের স্থিরতার) সাথে এবং তিলাওয়াত ও তাসবীহসমূহও পাঠ করা হয় যথাযথভাবে। ফরয, ওয়াজিব, সুন্নত ও আদবসমূহও সম্পাদন করা হয় উত্তমরূপে। তবে সেই মুসল্লিকে আখেরাতে পূর্ণ প্রতিদান ও সওয়াব দান করা হবে এবং দুনিয়াতে তা মুসল্লিকে মন্দ ও অশোভন কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। পক্ষান্তরে যে সালাত হয় অন্তঃসারশূন্য আনুষ্ঠানিকতা, যা সীমাবদ্ধ থাকে নিছক অঙ্গ-প্রতঙ্গ সঞ্চালনের মধ্যে, যাতে রুকু-সিজদা, কিরাত-কিয়াম যথাযথভাবে সম্পাদন করা হয় না সেই সালাত কীভাবে মুসল্লিকে অন্যায় ও অশোভন কাজ থেকে বাঁচাবে? তার সালাত তো তাকে সালাতরত অবস্থাতেই অশোভন কাজ ও চিন্তা থেকে ফিরাতে পারছে না।

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *