সালাহ উদ্দীন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব রাঃ

সালাহউদ্দীন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব (কুর্দি: سەلاحەدینی ئەییووبی/Selahedînê Eyûbî; আরবি: لاح الدين يوسف بن أيوب‎‎) (১১৩৭/১১৩৮ – ৪ মার্চ ১৯৩) ছিলেন মিশর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পাশ্চাত্যে তিনি সালাদিন বলে পরিচিত। তিনি কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর লোক ছিলেন। লেভান্টেইউরোপীয় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তিনি মুসলিম প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে তার সালতানাতে মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১১৬৩ সালে তার জেনগি বংশীয় ঊর্ধ্বতন নূরউদ্দিন জেনগি তাকে ফাতেমীয় মিশরে প্রেরণ করেন। ক্রুসেডারদের আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যের মাধ্যমে সালাহউদ্দীন ফাতেমীয় সরকারের উচ্চপদে পৌছান। ফাতেমীয় খলিফা আল আদিদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১১৬৯ সালে তার চাচা শেরেকোহ মৃত্যুবরণ করলে আল আদিদ সালাহউদ্দীনকে তার উজির নিয়োগ দেন। শিয়া নেতৃত্বাধীন খিলাফতে সুন্নী মুসলিমদের এমন পদ দেয়া বিরল ঘটনা ছিল। উজির থাকাকালে তিনি ফাতেমীয় শাসনের প্রতি বিরূপ ছিলেন। আল আদিদের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য ঘোষণা করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি ফিলিস্তিনে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান, ইয়েমেনে সফল বিজয় অভিযানের আদেশ দেন এবং উচ্চ মিশরে ফাতেমীয়পন্থি বিদ্রোহ উৎখাত করেন।

১১৭৪ সালে নূরউদ্দিনের মৃত্যুর অল্পকাল পরে সালাহউদ্দীন সিরিয়া বিজয়ে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেন। দামেস্কের শাসকের অনুরোধে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শহরে প্রবেশ করেন। ১১৭৫ সালের মধ্যভাগে তিনি হামা ও হিমস জয় করেন। জেনগি নেতারা তার বিরোধী হয়ে পড়ে। সরকারিভাবে তারা সিরিয়ার শাসক ছিল। এরপর শীঘ্রই তিনি জেনগি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন এবং আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতাদি কর্তৃক মিশর ও সিরিয়ার সুলতান ঘোষিত হন। উত্তর সিরিয়া ও জাজিরায় তিনি আরও অভিযান চালান। এসময় হাশিশীনদের দুটি হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি বেঁচে যান। ১১৭৭ সালে তিনি মিশরে ফিরে আসেন। ১১৮২ সালে আলেপ্পো জয়ের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন সিরিয়া জয় সমাপ্ত করেন। তবে জেনগিদের মসুলের শক্তঘাটি দখলে সমর্থ হননি।

সালাহউদ্দীনের ব্যক্তিগত নেতৃত্বে আইয়ুবী সেনারা ১১৮৭ সালে হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে। এর ফলে মুসলিমদের জন্য ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ফিলিস্তিনজয় করা সহজ হয়ে যায়। এর ৮৮ বছর আগে ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। ক্রুসেডার ফিলিস্তিন রাজ্য এরপর কিছুকাল বজায় থাকলেও হাত্তিনের পরাজয় এই অঞ্চলে মুসলিমদের সাথে ক্রুসেডার সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সালাহউদ্দীন ছিলেন মুসলিম, আরব, তুর্কি ও কুর্দি সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।[ ১১৯৩ সালে তিনি দামেস্কে মৃত্যুবরণ করেন। তার অধিকাংশ সম্পদ তিনি তার প্রজাদের দান করে যান। উমাইয়া মসজিদের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সেখানে তার মাজার অবস্থিত।

প্রথম জীবন

সালাহউদ্দিন আইয়ুবী মেসোপটেমিয়ার তিকরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ব্যক্তিগত নাম ইউসুফ, সালাহউদ্দিন হল লকব যার অর্থ “বিশ্বাসের ন্যায়পরায়ণ”।তার পরিবার কুর্দি বংশোদ্ভূতএবং মধ্যযুগীয় আর্মেনিয়ার ডিভিনশহর থেকে আগত। নুরউদ্দিন জেনগি ছিলেন তার নানা। এসময় তার নিজ রাওয়াদিদ গোত্র আরবিভাষী বিশ্বের অংশ হয়ে যায়। ১১৩২ সালে মসুলের শাসক ইমাদউদ্দিন জেনগির পরাজিত সেনাবাহিনী পিছু হটার সময় টাইগ্রিসের দিকে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এসময় সালাহউদ্দিনের পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব এখানকার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি সেনাদের জন্য ফেরির ব্যবস্থা করেন এবং তাদের তিকরিতে আশ্রয় দেন। মুজাহিদউদ্দিন বিহরুজ নামক একজন প্রাক্তন গ্রিক দাস এসময় উত্তর মেসোপটেমিয়ায় সেলজুক পক্ষের সামরিক গভর্নর ছিলেন। তিনি জেনগিদের সাহায্য করার জন্য আইয়ুবের বিরোধী হন। ১১৩৭ সালে আইয়ুবের ভাই আসাদউদ্দিন শিরকুহ বিহরুজের এক বন্ধুকে সম্মান রক্ষার লড়াইয়ে হত্যা করার পর তাকে তিকরিত থেকে বিতাড়িত করেন। বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদের মতে যে রাতে সালাহউদ্দিনের পরিবার তিকরিত ত্যাগ করে সে রাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১১৩৯ সালে আইয়ুব ও তার পরিবার মসুলে চলে আসেন। এখনে ইমাদউদ্দিন জেনগি তাদের পূর্ব অবদান স্বীকার করে আইয়ুবকে বালবিকের দুর্গের কমান্ডার নিয়োগ দেন। ১১৪৬ সালে ইমাদউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র নুরউদ্দিন জেনগিআলেপ্পোর অভিভাবক এবং জেনগি রাজবংশের নেতা হন।

এসময় সালাহউদ্দিন দামেস্কে বসবাস করছিলেন। বলা হয় যে তিনি এই শহরের প্রতি দুর্বল ছিলেন। তবে তার অল্প বয়সের তথ্য বেশি পাওয়া যায় না। শিক্ষা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “বড়রা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছেন সেভাবে শিশুদের গড়ে তোলা হয়”। তার একজন জীবনীকার আল ওয়াহরানির মতে সালাহউদ্দিন ইউক্লিডআলমাজেস্ট, পাটিগণিত ও আইন সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন।] কিছু সূত্র মতে ছাত্রাবস্থায় তিনি সামরিক বাহিনীর চেয়ে ধর্মীয় বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন।ধর্মীয় বিষয়ে তার আগ্রহে প্রভাব ফেলা আরেকটি বিষয় হল প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিষ্টানদের কর্তৃক জেরুজালেম অধিকার। ইসলাম ছাড়াও বংশবৃত্তান্ত, জীবনী এবং আরবের ইতিহাস ও পাশাপাশি আরব ঘোড়ার রক্তধারা সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল। আবু তামামের রচিত হামাশ তার সম্পূর্ণ জানা ছিল। তিনি কুর্দি এবং তুর্কি ভাষায় কথা বলতে পারতেন।

প্রাথমিক অভিযান

চাচা আসাদউদ্দিন শিরকুহর তত্ত্বাবধানে সালাহউদ্দিনের সামরিক কর্মজীবন শুরু হয়। শিরকুহ এসময় দামেস্ক ও আলেপ্পোর আমির নুরউদ্দিন জেনগির একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ১১৬৩ সালে ফাতেমীয় খলিফাআল আদিদের উজির শাওয়ার শক্তিশালী বনু রুজাইক গোত্রের দিরগাম নামক ব্যক্তি দ্বারা মিশর থেকে বিতাড়িত হন। তিনি নুরউদ্দিনের কাছে সামরিক সহযোগিতা চাইলে নুরউদ্দিন তা প্রদান করেন। তিনি ১১৬৪ সালে দিরগামের বিরুদ্ধে শাওয়ারের অভিযানে সহায়তার জন্য শিরকুহকে পাঠান। ২৬ বছরের সালাহউদ্দিন এসময় তার সাথে যান। শাওয়ার পুনরায় উজির হওয়ার পর তিনি শিরকুহকে মিশর থেকে তার সেনা সরিয়ে নিতে বলেন। কিন্তু শিরকুহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন যে নুরউদ্দিনের ইচ্ছা যে তারা মিশরে অবস্থান করবেন। এ অভিযানে সালাহউদ্দিনের ভূমিকা অল্প ছিল।

বিলবাইসের পর ক্রুসেডার-মিশরীয় বাহিনী এবং শিরকুহর বাহিনী গাজার পশ্চিমে নীল নদের সন্নিকটে মরু সীমান্তে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। সালাহউদ্দিন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে তিনি জেনগি সেনাবাহিনীর দক্ষিণভাগের নেতৃত্ব দেন। কুর্দিদের একটি দল এসময় বাম পাশের দায়িত্বে ছিল। শিরকুহ ছিলেন মধ্য ভাগের অবস্থানে। প্রথমদিকে ক্রুসেডাররা সাফল্য লাভ করলেও অঞ্চলটি তাদের ঘোড়ার জন্য উপযুক্ত ছিল না। কায়সারিয়ার কমান্ডার হিউ সালাহউদ্দিনের দলকে আক্রমণের সময় গ্রেপ্তার হন। মূল অবস্থানের দক্ষিণ প্রান্তের ছোট উপত্যকায় লড়াইয়ের পর জেনগিদের কেন্দ্রীয় শক্তি আগ্রাসী অবস্থানে চলে আসে। সালাহউদ্দিন পিছন থেকে তাদের সাথে যুক্ত হন।

এ যুদ্ধে জেনগিরা বিজয়ী হয়। ইবনে আল আসিরের মতে সালাহউদ্দিন শিরকুহকে লিখিত ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় বিজয়ে সাহায্য করেন। তবে এতে শিরকুহর অধিকাংশ লোক মারা যায় এবং কিছু সূত্র মতে এই যুদ্ধ সামগ্রিক জয় ছিল না। সালাহউদ্দিন ও শিরকুহ আলেক্সান্দ্রিয়ার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তাদের অভ্যর্থনা জানান হয় এবং অর্থ, অস্ত্র প্রদান ও শিবির স্থাপন করতে দেয়া হয়। শহর অধিকার করতে এগিয়ে আসা একটি শক্তিশালী ক্রুসেডার-মিশরীয় দলকে প্রতিহত করার জন্য শিরকুহ তার সেনাবাহিনীকে বিভক্ত করেন। তিনি ও তার অধীন সেনারা আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে অন্যত্র যাত্রা করেন এবং সালাহউদ্দিন ও তার অধীনস্থ সেনারা শহর রক্ষার জন্য থেকে যান।

মিশরে সালাহউদ্দিন[

মিশরের আমির

মিশরে সালাহউদ্দিনের যুদ্ধ

শিরকুহ মিশরে শাওয়ার ও প্রথম আমালরিকের সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। এতে শাওয়ার আমালরিকের সহায়তা চান। বলা হয় যে ১১৬৯ সালে শাওয়ার সালাহউদ্দিন কর্তৃক নিহত হন। এরপরের বছর শিরকুহ মৃত্যুবরণ করেন। নুরউদ্দিন শিরকুহর জন্য উত্তরাধিকারী বাছাই করেন। কিন্তু আল আদিদ সালাহউদ্দিনকে শাওয়ারের স্থলে উজির নিয়োগ দেন।

শিয়া খলিফার অধীনে একজন সুন্নিকে উজির মনোনীত করার কারণ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ইবনে আল আসিরের দাবি করেছেন যে খলিফার উপদেষ্টারা “সালাহউদ্দিনের চেয়ে ছোট বা দুর্বল কেউ নেই” এবং “একজন আমিরও তার আনুগত্য বা তার অধীনতা মানে না” এমন পরামর্শ দেয়ার কারণে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। এ মতানুযায়ী কিছু মতবিরোধের পর অধিকাংশ আমির তাকে মেনে নেন। আল আদিদের উপদেষ্টারা সিরিয়া ভিত্তিক জেনগি ধারাকে ভেঙে দেয়ার উদ্দেশ্য পোষণ করছিলেন। আল ওয়াহরানি লিখেছেন যে সালাহউদ্দিনের পরিবারের সুনাম ও তার সামরিক দক্ষতার জন্য তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। ইমাদউদ্দিন আল ইসফাহানির লিখেছেন যে শিরকুহর জন্য সংক্ষিপ্তকালের শোকের পর জেনগি আমিররা সালাহউদ্দিনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন এবং তাকে উজির হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য খলিফাকে চাপ দেন। যদিও বিদ্রোহী মুসলিম নেতাদের কারণে অবস্থা জটিল ছিল, বেশ কিছু সিরিয়ান শাসক মিশরীয় অভিযানে অবদানের জন্য সালাহউদ্দিনকে সমর্থন করেন।

আমির হওয়ার পর তিনি প্রভুত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা অর্জন করলেও পূর্বের চেয়েও বেশি পরিমাণে আল আদিদ ও নুরউদ্দিনের মধ্যে আনুগত্যের প্রশ্নের সম্মুখীণ হয়। সে বছরের পরবর্তীকালে মিশরীয় সেনাদের একটি দল ও তার আমিররা সালাহউদ্দিনকে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার প্রধান গোয়েন্দা আলি বিন সাফওয়ানের গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়ে যায়। ষড়যন্ত্রকারী নাজি, ফাতেমীয় প্রাসাদের বেসামরিক নিয়ন্ত্রণকর্তা মুতামিন আল খিলাফাকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করা হয়। এরপরের দিন ফাতেমীয় সেনাবাহিনীর রেজিমেন্টের ৫০,০০০ কালো আফ্রিকান সেনা সালাহউদ্দিনের শাসনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু মিশরীয় আমিরের সাথে বিরোধীতা করে এবন বিদ্রোহে করে। ২৩ আগস্ট সালাহউদ্দিন এই উত্থান বিনাশ করেন এবং এরপর কায়রো থেকে কোনো সামরিক হুমকি আসেনি।

১১৬৯ সালের শেষের দিকে নুরউদ্দিনের পাঠানো সাহায্যের মাধ্যমে দামিয়াতের কাছে বৃহৎ ক্রুসেডার-বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। এরপর ১১৭০ সালের বসন্তে নুরউদ্দিন সালাহউদ্দিনের পিতাকে সালাহউদ্দিনের অনুরোধে এবং বাগদাদের খলিফা আল মুসতানজিদের অনুপ্রেরণায় মিশরে পাঠান। আল মুসতানজিদ প্রতিপক্ষ খলিফা আল আদিদকে উৎখাত করতে মনস্থির করেন। সালাহউদ্দিন মিশরে তার অবস্থান শক্ত করেন এবং সমর্থন ঘাঁটি বিস্তৃত করেন। তিনি এই অঞ্চলে তার পরিবারের সদস্যদের উচ্চপদ প্রদান করেন। মালিকি মাজহাবের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে তিনি আদেশ দেন। সেসাথে শাফি মাজহাবের জন্যও প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়।

মিশরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর সালাহউদ্দিন ১১৭০ সালে দারুম অবরোধের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। আমালরিক গাজা থেকে তার টেম্পলার গেরিসন সরিয়ে নেন যাতে দারুম রক্ষা করতে সহায়তা পাওয়া যায়। কিন্তু সালাহউদ্দিন তার সেনাদের সরিয়ে নেন এবং গাজায় এগিয়ে আসেন। শহরের দুর্গের বাইরের অঞ্চল ধ্বংস করে দেয়া হয়। দুর্গে প্রবেশ করতে না চাওয়ায় অধিবাসীদের অধিকাংশকে হত্যা করা হয়।সে বছরের ঠিক কবে এলিয়াতের ক্রুসেডার দুর্গ তিনি কবে আক্রমণ ও অধিকার করেন তা স্পষ্ট নয়। এটি আকাবা উপসাগরের একটি দ্বীপের উপর অবস্থিত ছিল। এটি মুসলিম নৌবাহিনীর যাতায়াতে হুমকি ছিল না। কিন্তু ক্ষুদ্র মুসলিম নৌবহরকে তা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে ফলে সালাহউদ্দিন এটি দখল করেন।

মিশরের সুলতান

দিরহাম মুদ্রায় উৎকীর্ণ সালাহউদিন, আনুমানিক ১১৯০ সাল

ইমাদউদ্দিনের মতে ১১৭১ সালের জুন মাসে নুরউদ্দিন সালাহউদ্দিনকে মিশরে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলে চিঠি লেখেন। দুই মাস পর শাফি ফকিহ নাজমুদ্দিন আল খাবুশানির উৎসাহে সালাহউদ্দিন তা সম্পন্ন করেন। ফকিহ নাজমুদ্দিন শিয়া শাসনের বিরোধী ছিলেন। কয়েকজন মিশরীয় আমির এর ফলে নিহত হন। আল আদিদকে বলা হয় যে তাদেরকে বিদ্রোহের কারণে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একটি সূত্র মতে তাকে বিষপ্রয়োগ করা হয়। অসুস্থ অবস্থায় তিনি তার সাথে দেখা করার জন্য সালাহউদ্দিনকে জানান যাতে তার সন্তানদের দেখাশোনার অনুরোধ করতে পারেন। সালাহউদ্দিন তা প্রত্যাখ্যান করেন এই আশঙ্কায় যে এটি আব্বাসীয়দের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। কিন্তু আল আদিদ কী চাইছিলেন তা জানার পর তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।পাঁচ দিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর আল আদিদ মৃত্যুবরণ করেন। কায়রো ও ফুসতাতে আব্বাসীয় খলিফার নামে খুতবা পাঠ করা হয় এবং আল মুসতাদিকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

২৫ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন জেরুজালেম রাজ্যের মরু দুর্গ কেরাক ও মন্ট্রিয়ালের উদ্দেশ্যে কায়রো ত্যাগ করেন। সিরিয়ার দিক থেকে এসময় নুরউদ্দিনের আক্রমণ করার কথা ছিল। তার অনুপস্থিতিতে মিশরের ভেতরে ক্রুসেডার নেতারা ভেতর থেকে আক্রমণ করার জন্য বিশ্বাসঘাতকদের মধ্যে সমর্থন বৃদ্ধি করছে এবং বিশেষত ফাতেমীয়রা তার ক্ষমতা খর্ব করে পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় এমন সংবাদ পাওয়ার পর মন্ট্রিয়াল পৌছার পূর্বে সালাহউদ্দিন কায়রোতে ফিরে আসেন। এর ফলে নুরউদ্দিন একা হয়ে পড়েন।

১১৭৩ সালের গ্রীষ্মে একটি নুবিয়ান সেনাবাহিনী আসওয়ান অবরোধের জন্য আর্মেনীয় উদ্বাস্তুসহ এগিয়ে আসে। শহরটির আমির সালাহউদ্দিনের সহায়তা চান এবং সালাহউদ্দিনের ভাই তুরান শাহর অধীনে তাদের সাহায্য পাঠানো হয়। এরপর নুবিয়ানরা চলে যায় কিন্তু ১১৭৩ সালে আবার ফিরে আসে তবে আবার তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। এসময় মিশরীয় সেনারা আসওয়ান থেকে অগ্রসর হয় এবং নুবিয়ার শহর ইবরিম অধিকার করে। সালাহউদ্দিন তার শিক্ষক ও বন্ধু নুরউদ্দিনকে ৬০,০০০ দিনার, চমৎকার প্রণ্য, কিছু রত্ন, উৎকৃষ্ট জাতের গাধা এবং একটি হাতি উপহার হিসেবে পাঠান। এসব দামেস্কে পাঠানর সময় সালাহউদ্দিন ক্রুসেডার এলাকা আক্রমণের সুযোগ পান। তিনি মরুভূমির দুর্গের উপর আক্রমণ চালাননি। কিন্তু ক্রুসেডার অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিম বেদুইনদের সেখান থেকে সরিয়ে আনেন যাতে ফ্রাঙ্করা গাইড থেকে বঞ্চিত হয়।

১১৭৩ সালের ৩১ জুলাই সালাহউদ্দিনের পিতা একটি ঘোড়া দুর্ঘটনায় আহত হন। ৯ আগস্ট তিনি মারা যান।১১৭৪ সালে সালাহউদ্দিন তুরান শাহকে ইয়েমেন জয় ও এর এডেন বন্দর আইয়ুবী শাসনের অন্তর্গত করার জন্য পাঠান।

সিরিয়া অধিকার

দামেস্ক জয়

১১৭৪ সালের মার্চে নুরউদ্দিন একটি ভূমিকম্পের পর বাগদাদে ফিরে আসেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প। নুরউদ্দিন শাসক হিসেবে বিপর্যয়ের খবর শোনার পর ফিরে আসেন। তার কিছু শত্রু তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিতে থাকে যার তার ফিরে আসায় প্রভাব ফেলেছে। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে তার সমস্ত মনোযোগ জনগণের উপর ছিল যার ফলে তিনি বিশ্বাসঘাতক ও হাসান সাহাবর দল যাদেরকে ক্রুসেডাররা সমর্থন করত তাদের কাছ থেকে তার প্রতি হুমকির কথা উপেক্ষা করেন। ১১৭৪ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে বিষপ্রয়োগের ফলে গলায় ব্যথা অনুভব করার পর থেকে সমস্যার প্রথম সূত্র পাওয়া যায়। তার চিকিৎসকদের অনেক প্রচেষ্টার পর নুরউদ্দিন ১১৭৪ সালের ১৫ মে মৃত্যুবরণ করেন। কিছু শক্তিশালী অভিজাত ব্যক্তির দল নুরউদ্দিনের ক্ষমতা তার এগারো বছর বয়সী পুত্র আস সালিহ ইসমাইল আল মালিকের উপর অর্পণ করেন। তার মৃত্যুর ফলে সালাহউদ্দিন ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তার শক্তিশালী মিত্র হারিয়ে ফেলেন। সালিহর কাছে লেখা চিঠিতে তিনি জানান যে তিনি তার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন এমনকি তারা যদি মুসলিম দাবিও করে যদিনা তিনি ও তার সমর্থকরা নুরউদ্দিনের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে ক্রুসেডারদের সাথে মিত্রতা থেকে বিরত থাকেন।

নুরউদ্দিনের মৃত্যুর পর সালাহউদ্দিন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। তিনি মিশর থেকে ক্রুসেডারদের উপর আক্রমণ করতে পারতেন অথবা সিরিয়ায় সালিহর কাছ থেকে আমন্ত্রণ লাভ করার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন। এছাড়াও বিদ্রোহীদের হাতে পড়ার আগেই তিনি সিরিয়াকে তার শাসনের অংশে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু ইতিপূর্বে তার প্রভুর অধীন ছিল অঞ্চলে হামলা করলে তা তার অনুসৃত ইসলামি বিধানের লঙ্ঘন হতে পারে এবং এই ঘটনা তাকে একজন প্রতারক হিসেবে তুলে ধরতে পারে যা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধা তৈরি করবে এমন আশঙ্কা করেন। তিনি দেখতে পান যে সিরিয়া অধিকার করার জন্য তাকে হয় সালিহর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেতে হবে বা তাকে সাবধান করতে হবে যে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্য ক্রুসেডারদের তরফ থেকে হামলার আশঙ্কা তৈরী করবে।[

সালিহ যখন আগস্টে আলেপ্পোতে চলে যান তখন শহরের আমির ও নুরউদ্দিনের দক্ষ সেনাদের প্রধান গুমুশতিগিন তার উপর অভিভাবকত্ব দাবি করেন। তিনি দামেস্ক থেকে শুরু করে সিরিয়া ও জাজিরাতে তার সকল বিরোধীকে পদচ্যুত করার প্রস্তুতি নেন। এই জরুরি অবস্থায় দামেস্কের আমির মসুলের দ্বিতীয় সাইফউদ্দিন গাজিকে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে সালাহউদ্দিনের কাছে সাহায্য চাওয়া হয় এবং তিনি তা প্রদান করেন।সালাহউদ্দিন ৭০০ বর্শাধারী ঘোড়সওয়ার নিয়ে যাত্রা করেন। কেরাক পার হয়ে তিনি বুসরা পৌছান। তার বর্ণনা অনুযায়ী “এখানে আমির, সৈনিক ও বেদুইনরা তার সাথে যোগ দেয় এবং তাদের অন্তরের অনুভূতি তাদের চেহারায় ফুটে উঠে।“ ২৩ নভেম্বর তিনি দামেস্কে ফিরে আসেন। দামেস্কের দুর্গে প্রবেশের আগ পর্যন্ত তিনি তার পিতার পুরনো বাসগৃহে অবস্থান নেন। চারদিন পর দুর্গ উন্মুক্ত হয়। তিনি এরপর দুর্গে অবস্থান নেন এবং নাগরিক আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।

পরবর্তী অভিযান

ভাই তুগতিগিনকে দামেস্কের গভর্নর হিসেবে রেখে সালাহউদ্দিন পূর্বে নুরউদ্দিনের অধিকারে থাকা আংশিক স্বাধীন শহরসমূহের দিকে রওনা দেন। তার সেনাবাহিনী হামা সহজে দখল করে নেয়। তবে তারা দুর্গের ক্ষমতার জন্য হিমসআক্রমণ এড়িয়ে যান।সালাহউদ্দিন উত্তরে আলেপ্পোর দিকে যাত্রা করেন। গুমুশতিগিন ক্ষমতাত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে ৩০ ডিসেম্বর তা অবরোধ করা হয়।সালাহউদ্দিনের কাছে বন্দী হতে পারে ভেবে সালিহ প্রাসাদের বাইরে এসে অধিবাসীদের কাছে আবেদন জানায় যাতে তারা আত্মসমর্পণ না করে। সালাহউদ্দিনের একজন বর্ণনা লেখকের মতানুযায়ী “জনতা তার কথার জাদুতে চলে আসে।”

সেসময় সিরিয়ায় হাশাশিনদের প্রধান ছিলেন রশিদউদ্দিন সিনান ফাতেমীয় খিলাফত উচ্ছেদ করার কারণে সালাহউদ্দিনের প্রতি বিরূপ ছিলেন। গুমুশতিগিন তাকে অনুরোধ করেন যাতে সালাহউদ্দিনকে তার ক্যাম্পে হত্যা করা হয়।১১৭৫ সালের ১১ মে তেরজন হাশাশিনের একটি দল সালাহউদ্দিনের ক্যাম্পে সহজে প্রবেশ করে কিন্তু আবু কুবাইসের নসিহউদ্দিন খুমারতেকিন কর্তৃক চিহ্নিত হয়ে পড়ে। সালাহউদ্দিনের একজন সেনাপতির হাতে একজনের মৃত্যু হয় এবং অন্যান্যদের পালানোর সময় হত্যা করা হয়। সালাহউদ্দিনের অগ্রগতি প্রতিহত করার জন্য তৃতীয় রেমন্ড নহরুল কবিরের কাছে তার সেনাদের সমবেত করেন। মুসলিম অঞ্চল আক্রমণের জন্য এটি তাদের কাছে উপযুক্ত ছিল। সালাহউদ্দিনের এরপর হোমসের দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু শহরের দিকে সাইফউদ্দিনের কাছ থেকে একটি সাহায্যকারী বাহিনী পাঠানো হয়েছে শুনে ফিরে আসেন।

ইতিমধ্যে সিরিয়া ও জাজিরায় সালাহউদ্দিনের প্রতিপক্ষরা তার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা যুদ্ধ শুরু করেন। তারা দাবি করতে থাকে সালাহউদ্দিন তার নিজের অবস্থা (নুরউদ্দিনের অধীনস্থ) ভুলে গেছেন এবং সাবেক প্রভুর সন্তানকে অবরোধ করে তার প্রতি কোনো সম্মান দেখাচ্ছেন না। সালাহউদ্দিন অবরোধ তুলে নিয়ে প্রপাগান্ডা শেষ করার লক্ষ্য স্থির করেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ইসলামকে রক্ষা করছেন। তার সেনারা হামা ফিরে এসে সেখানকার ক্রুসেডার সেনাদের মুখোমুখি হয়। ক্রুসেডাররা এখান থেকে ফিরে যায়। সালাহউদ্দিন ঘোষণা করেন যে এটি “মানুষের অন্তরের দরজা উন্মুক্তকারী বিজয়”। এরপর শীঘ্রই ১১৭৫ সালের মার্চে তিনি হিমস প্রবেশ করেন এবং এর দুর্গ অধিকার করেন।

সালাহউদ্দিনের সাফল্য সাইফউদ্দিনকে সতর্ক করে তোলে। জেনগিদের প্রধান হিসেবে তিনি সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়াকে তার পরিবারের বলে বিবেচনা করতেন এবং সালাহউদ্দিন কর্তৃক তার বংশের অধিকৃত স্থান দখল করায় রাগান্বিত হয়ে পড়েন। সাইফউদ্দিন একটি বড় আকারের সেনাদল গঠন করে আলেপ্পোর দিকে পাঠান। আলেপ্পোর প্রতিরোধকারীরা এর আশঙ্কায় ছিল। মসুল ও আলেপ্পোর যৌথ বাহিনী হামায় সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। প্রথমে সালাহউদ্দিন দামেস্ক প্রদেশের উত্তর দিকের সমস্ত বিজিত এলাকা ত্যাগ করার মাধ্যমে জেনগিদের সন্ধি করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে মিশর ফিরে যেতে বলা হয়। সংঘর্ষ অনিবার্য দেখতে পেয়ে সালাহউদ্দিন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের বাহিনী বিজয়ী হয়। এ বিজয়ের ফলে সালিহর উপদেষ্টারা সালাহউদ্দিনকে দামেস্ক, হিমস ও হামা এবং আলেপ্পোর বাইরের কিছু শহরে সালাহউদ্দিনের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে বাধ্য হয়। 

জেনগিদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন। সালিহর নাম জুমার খুতবা ও মুদ্রা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা সালাহউদ্দিনের ক্ষমতাপ্রাপ্তিকে স্বাগত জানান এবং তাকে মিশর ও সিরিয়ার সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। আইয়ুবী ও জেনগিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই হামার যুদ্ধের পর শেষ হয়ে যায়নি। সাইফউদ্দিন ক্ষুদ্র রাজ্য দিয়ারবাকির ও জাজিরা থেকে সেনা সংগ্রহ করার সময় সালাহউদ্দিন মিশর থেকে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করেন।তিনি আলেপ্পো থেকে ২৫ কিমি দূরে তিল সুলতানে পৌছান এবং সেখানে সাইফউদ্দিনের সেনাদের সাথে লড়াই হয়। জেনগিরা সালাহউদ্দিনের বাহিনির বাম অংশকে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়। এসময় সালাহউদ্দিন জেনগিদের প্রধান অংশকে আক্রমণ করেন। জেনগি সেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সাইফউদ্দিনের অধিকাংশ অফিসাররা নিহত বা বন্দী হয়। সাইফউদ্দিন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। জেনগি সেনা ক্যাম্প, ঘোড়া, মালামাল, তাবু ইত্যাদি আইয়ুবীদের হস্তগত হয়। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সেনাদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। তবে সালাহউদ্দিন নিজের জন্য কিছু রাখেননি।

তিনি আল্লেপোর দিএক এগিয়ে যান। যাত্রাপথে তার সেনারা বুজা ও এরপর মানবিজ অধিকার করে। এখান থেকে তারা পশ্চিমে আজাজ দুর্গ অবরোধের জন্য এগিয়ে যায়। কয়েকদিন পর সালাহউদ্দিন তার এক সেনাপতির তাবুতে বিশ্রাম নেয়ার সময় এক হাশাশিন তাকে ছুরি দিয়ে মাথায় আক্রমণ করেন। তার শিরস্ত্রাণের ফলে হামলা সফল হয়নি। তিনি হামলাকারীকে ধরে ফেলেন। আততায়ীকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার জন্য তিনি গুমুশতিগিনকে দায়ী করেন এবং অবরোধে শক্তিবৃদ্ধি করেন।

২১ জুন আজাজ অধিকৃত হয়। গুমুশতিগিনকে মোকাবেলা করার জন্য সালাহউদ্দদিন তার সেনাদেরকে আলেপ্পোর দিকে পাঠান। তার হামলা এবারও প্রতিহত করা হয়। তিনি একটি সন্ধি ও আলেপ্পোর সাথে পারস্পরিক মিত্রতা স্থাপন করা হয়। এতে গুমুশতিগিন ও সালিহকে শহরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হয় এবং বিনিময়ে তারা সালাহউদ্দিনকে তার অধিকৃত সকল এলাকায় সার্বভৌম হিসেবে মেনে নেয়। মারদিন ও কাইফার আমিররা সালাহউদ্দিনকে সিরিয়ার রাজা হিসেবে মেনে নেয়।

জেরুজালেম বিজয়

সালাহউদ্দিন প্রায় সব ক্রুসেডার শহর জয় করেছিলেন। ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর শুক্রবার তার সেনাবাহিনী অবরোধের পর জেরুজালেম জয় করে। অবরোধের শুরুতে তিনি জেরুজালেমে বসবাসরত ফ্রাঙ্কিশদের কোনো নিরাপত্তা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ কারণে বেলিয়ান অব ইবেলিন প্রায় ৫,০০০ মুসলিম বন্দীকে হত্যা ও ইসলামের পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদ ও কুব্বাত আস সাখরা ধ্বংস করে ফেলার হুমকি দেন। সালাহউদ্দিন তার উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শক্রমে এবং শর্তে রাজি হন। জেরুজালেমের রাস্তায় চুক্তি পরে শোনানো হয় যাতে সবাই চল্লিশ দিনের মধ্যে প্রস্তুত হতে পারে এবং সালাহউদ্দিনকে মুক্তিপণ দিতে পারে।  শহরের প্রত্যেক ফ্রাঙ্ক নারী, পুরুষ বা শিশুর জন্য সেসময়ের মূল্য অনেক কম মুক্তিপণ ধার্য করা হয় (আধুনিক হিসাবে ৫০ ডলার)। তবে তার কোষাধ্যক্ষের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে অনেক পরিবার যারা মুক্তিপণ দিতে সক্ষম ছিল না তাদের মুক্তি দেন।জেরুজালেমের পেট্রিয়ার্ক হেরাক্লিয়াস বেশ পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন যার মাধ্যমে ১৮,০০০ গরিব নাগরিকের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। বাকি ১৫,০০০ জনের জন্য কিছু ছিল না বিধায় বন্দীত্ব বরণ করতে হত। সালাহউদ্দিনের ভাই আল আদিল তাদের মধ্য থেকে ১,০০০ জনকে তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য রাখতে চান এবং বাকিদের মুক্তি দেয়া হয়। অধিকাংশ পদাতিক সৈনিককে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।জেরুজালেম বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন ইহুদিদের শহরে পুনরায় বসবাসের অনুমতি দেন।   আসকালনের ইহুদি সম্প্রদায় এই ডাকে সাড়া দেয়।

আধুনিক লেবাননের উপকূলে টায়ার ছিল ক্রুসেডারদের শেষ গুরুত্বপূর্ণ শহর। কৌশলগতভাবে এটি প্রথমে জয় করা বেশি কার্যকরী ছিল। কিন্তু জেরুজালেম ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শহর বিধায় সালাহউদ্দিন প্রথম জেরুজালেম জয় করার সিদ্ধান্ত নেন। টায়ারের নেতৃত্বে ছিলেন কনরাড অব মন্টিফেরাট। তিনি এর শক্তিবৃদ্ধি করেন এবং সালাহউদ্দিনের দুইটি অবরোধ ব্যর্থ করতে সক্ষম ছিলেন। ১১৮৮ সালে টরটসায় সালাহউদ্দিন গাই অব লুসিগনানকে মুক্তি দেন এবং তাকে তার স্ত্রী রাণী সিবিলা অব জেরুজালেমের কাছে পাঠিয়ে দেন। তারা প্রথমে ত্রিপলি ও এরপর এন্টিওক যান। ১১৮৯ সালে তারা টায়ারের শাসন দাবি করলে কনরাড তাদের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি গাই অব লুসিগনানকে রাজা হিসেবে মানতেন না। এরপর গাই এক্রে অবরোধ করেন।

সালাহউদ্দিনের সাথে জর্জিয়ার রাণী তামারের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ছিল। সালাহউদ্দিনের জীবনীকার বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ উল্লেখ করেছেন যে সালাহউদ্দিন জেরুজালেম জয় করার পর জর্জিয়ান রাণী জেরুজালেমের জর্জিয়ান মঠের সম্পদগুলো ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। সালাহউদ্দিনের পদক্ষেপ লিপিবদ্ধ করা হয়নি। তবে রাণীর প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল বলে মনে করা হয় কারণ আক্রের বিশপ জ্যাকুস ডা ভিটরি উল্লেখ করেছেন যে জর্জিয়ানরা অন্যান্য খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের মত না হয়ে বরং বিনা বাধা তাদের পতাকা নিয়ে শহরে চলাচল করতে পারত। ইবনে শাদ্দাদ দাবি করেন যে রাণী তামার বাইজেন্টাইন সম্রাটকে ট্রু ক্রস ফিরিয়ে আনায় তার প্রচেষ্টা নিয়ে সালাহউদ্দিনকে ২,০০,০০০ স্বর্ণখন্ড প্রদানের অতিরঞ্জিত দাবি করেন।

তৃতীয় ক্রুসেড

ব্রিটিশ জাদুঘরে রক্ষিত টাইলসে চিত্রিত রিচার্ড‌ দ্য লায়নহার্ট‌ ও সালাহউদ্দিন। আনুমানিক ১২৫০-৬০ সাল, চার্ট‌সি, ইংল্যান্ড।

It is equally true that his generosity, his piety, devoid of fanaticism, that flower of liberality and courtesy which had been the model of our old chroniclers, won him no less popularity in Frankish Syria than in the lands of Islam.

René Grousset (writer)

হাত্তিনের যুদ্ধ ও জেরুজালেমের পতন তৃতীয় ক্রুসেডকে উদ্বুদ্ধ করে। ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড‌ দ্য লায়নহার্ট‌ গাই অব লুসিগনানের এক্রে অবরোধে নেতৃত্ব দেন। তারা শহর জয় করেন এবং নারী ও শিশুসহ প্রায় ৩,০০০ মুসলিম বন্দীকে হত্যা করেন।[৯৮] বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ লিখেছেন:

হত্যার অভিপ্রায় কয়েকপ্রকারে বলা হয়; কারো মতে মুসলিমরা যেসব খ্রিস্টানদের হত্যা করে তাদের বদলা হিসেবে বন্দীদের হত্যা করা হয়। অন্যান্যরা বলে যে ইংল্যান্ডের রাজা আসকালন জয়ের চেষ্টার আগে এত সংখ্যক বন্দী রাখাকে অনর্থক মনে করেন। আসল কারণ শুধু আল্লাহই জানেন।

২৮ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বন্দী ক্রুসেডারদের হত্যার মাধ্যমে এর প্রতিশোধ নেয়া হয়। ১১৯১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আরসুফের যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের সেনাবাহিনীর সাথে রিচার্ডে‌র সেনাবাহিনীর লড়াই হয়। এতে সালাহউদ্দিনের বাহিনী বেশ হতাহত হয় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। আরসুফের যুদ্ধের পর রিচার্ড‌ তার বাহিনি নিয়ে আসকালনের দিলে অগ্রসর হন। রিচার্ডে‌র পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে পেরে সালাহউদ্দিন শহর খালি করে দেন এবং শহর থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে অবস্থান নেন। রিচার্ড‌ শহরে উপস্থিত হলে এটি পরিত্যক্ত দেখে অবাক হন। পরের দিন তিনি জাফায় পিছু হটার প্রস্তুতি নেয়ার সময় সালাহউদ্দিন আক্রমণ করেন। মারাত্মক লড়াইয়ের পর রিচার্ডে‌র পিছু হটতে সক্ষম হম। এই দুই বাহিনীর মধ্যে এটি সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ লড়াই ছিল। জেরুজালেম জয়ের জন্য রিচার্ডে‌র সকল সামরিক পদক্ষেপ ও যুদ্ধ ব্যর্থ হয়। যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তার মাত্র ২,০০০ পদাতিক সৈন্য ও ৫০ জন পদাতিক নাইট ছিল। শহরের খুব কাছে পৌছালেও এত কম সেনা নিয়ে তা জয় করা সম্ভব ছিল না। সামরিক প্রতিপক্ষ হওয়ার পরও সালাহউদ্দিন ও রিচার্ডে‌র সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রার ছিল। আরসুফে রিচার্ড‌ তার ঘোড়া হারিয়ে ফেললে সালাহউদ্দিন তাকে দুইটি ঘোড়া পাঠান। রিচার্ড‌ সালাহউদ্দিনের ভাইকে বিয়ে করার তার বোন জোয়ানকে প্রস্তাব করেন এবং জেরুজালেম বিয়ের উপহার করার কথা বলেন।তবে সালাহউদ্দিন ও রিচার্ডে‌র মুখোমুখি সাক্ষাত হয়নি। চিঠি বা বার্তাবাহকের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ হত। ১১৯২ সালে তারা রামলার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে ঠিক করা হয় যে জেরুজালেম মুসলিমদের হাতে থাকবে কিন্তু তা খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হবে। এই চুক্তি ল্যাটিন রাজ্যকে টায়ার থেকে জাফাপর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দেয়।

সালাহউদ্দিনের সমাধি, দামেস্কসিরিয়া

উমাইয়া মসজিদের উত্তর পশ্চিম কোণে সালাহউদ্দিনের মাজার

রাজা রিচার্ডে‌র ফিরে যাওয়ার অল্পকাল পর ১১৯৩ সালের ৪ মার্চ সালাহউদ্দিন দামেস্কে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তার ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে এক টুকরো স্বর্ণ ও চল্লিশ টুকরো রূপা ছিল।  তিনি তার অধিকাংশ গরিব প্রজাদের দান করে যান।দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের বাইরে তাকে দাফন করা হয়। সাত শতাব্দী পর জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম মাজারে একটি মার্বেলের শবাধার দান করেন। মূল কবরে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। এর পরিবর্তে তা পাশে রাখা হয়।

পরিবার

ইমাদউদ্দিনের বর্ণনা অনুযায়ী ১১৭৪ সালে মিশর ত্যাগের পূর্বে সালাহউদ্দিনের পাঁচ জন পুত্র ছিল। সালাহউদ্দিনের জ্যেষ্ঠ সন্তান আল আফদাল ইবনে সালাহউদ্দিন ১১৭০ সালে এবং আল আজিজ উসমান ১১৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয়জন সিরিয়ায় সালাহউদ্দিনের সাথে ছিলেন। তার তৃতীয় পুত্র ছিলেন আজ জহির গাজি। ইনি পরে আলেপ্পোর শাসক হন।১১৭৭ সালে আল আফদানের মায়ের গর্ভে সালাহউদ্দিনের আরেক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। কালকাশান্দি কর্তৃক রক্ষিত চিঠিতে ১১৭৮ সালের মে মাসে তার বারোতম পুত্রের জন্মের সংবাদ পাওয়া যায়। তবে ইমাদউদ্দিনের তালিকা অনুযায়ী তা সালাহউদ্দিনের সপ্তম সন্তান। পুত্র মাসুদ ১১৭৫ সালে ও ইয়াকুব ১১৭৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

স্বীকৃতি ও কিংবদন্তী

পাশ্চাত্য বিশ্ব

ক্রুসেডারদের সাথে সাহসী লড়াইয়ের জন্য সালাহউদ্দিন ইউরোপে বেশ সুনাম অর্জন করেন। মধ্যযুগের পর তার আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর গোথহল্ড এফরাইম লেসিংসের নাটক নাথান দ্য ওয়াইজ ও স্যার ওয়াল্টার স্কটের উপন্যাস দ্য তালিসমান এ তাকে চিত্রিত করা হয়। তাকে নিয়ে সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ এসকল রচনা থেকে উঠে আসে। জোনাথন রিলে স্মিথের মতে স্কটের সালাহউদ্দিন চিত্রায়ণ হল “আধুনিক (১৯ শতক) সময়ের একজন উদাহ ইউরোপীয় ভদ্রলোক যার পাশে মধ্যযুগের পাশ্চাত্য ব্যক্তিদের সর্বদা নিচু অবস্থায় দেখা যায়।”১০৯৯ সালে জেরুজালেম দখলের পর ক্রুসেডারদের গণহত্যার পরও সালাহউদ্দিন সব সাধারণ খ্রিষ্টান ও এমনকি খ্রিষ্টান সেনাদেরও ক্ষমা করেন ও নিরাপদে যেতে দেন। গ্রীক অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের তুলনামূলক ভালো আচরণ করা হয় কারণ তারা পশ্চিমা ক্রুসেডারদের বিরোধীতা করত। তারিক আলির উপন্যাস দ্য বুক অব সালাহউদ্দিনে সালাহউদ্দিন ও তার সময়কার পৃথিবী নিয়ে বর্ণনা রয়েছে।

বিশ্বাসের পার্থক্য সত্ত্বেও সালাহউদ্দিনকে খ্রিষ্টান নেতারা, বিশেষত রিচার্ড‌ সম্মান করতেন। রিচার্ড‌ একবার সালাহউদ্দিনকে মহান রাজা বলে প্রশংসা করেন এবং বলেন যে কোনো সন্দেহ ছাড়াই তিনি ইসলামি বিশ্বের সবচেয়ে মহান ও শক্তিশালী নেতা।সালাহউদ্দিনও রিচার্ড‌কে খ্রিষ্টান নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত বলে উল্লেখ করেন। সন্ধির পর সালাহউদ্দিন ও রিচার্ড‌ সম্মানের নিদর্শন হিসেবে পরস্পরকে অনেক উপহার পাঠান। ১১৯১ সালের এপ্রিল এক ফ্রাঙ্কিশ নারীর তিন মাস বয়সী শিশু ক্যাম্প থেকে হারিয়ে যায় ও তাকে বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়। ফ্রাঙ্করা তাকে সালাহউদ্দিনের কাছে সাহায্যের জন্য যেতে বলে। বাহাউদ্দিনের বর্ণনা অনুযায়ী সুলতান তার নিজের অর্থে সন্তানটিকে কিনে নিয়ে মহিলাটিকে ফেরত দেন এবং ক্যাম্পে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

দামেস্ক শহরে সালাহউদ্দিনের ভাস্কর্য; 

নুরুদ্দীনের অধীনের একজন মিলিটারি কমান্ডার ছিলেন আসাদ আল দীন। তিনিই সালাহউদ্দিনের সামরিক ক্যারিয়ার শুরু করিয়ে দেন। তার প্রথম সামরিক অভিযান ছিল ২৬ বছর বয়সে। নুরুদ্দীন আসাদকে পাঠান ফাতিমী খলিফা আল-আদিদ এর উজির শাওয়ারকে সাহায্য করবার জন্য যিনি ছিলেন মিসর থেকে বিতাড়িত। সে অভিযানে সঙ্গে করে নিয়ে যান আসাদ সালাহউদ্দিনকে। মিশনটি সার্থক হয়েছিল।

ঠিক এরপরই যুদ্ধ লেগে যায় ক্রুসেডার-মিসরীয় যুক্তবাহিনীর সাথে। যুদ্ধের জায়গাটা ছিল গিজার পশ্চিমে, নীল নদের পাড়ে। সে যুদ্ধে সালাহউদ্দিন নুরুদ্দীনের বাহিনীর ডান পাশের নেতৃত্ব দেন। বলা হয়, সালাহউদ্দিনের বুদ্ধিতে প্রথমে বাহিনী হেরে যাবার ভান করে প্রস্থান করে এবং এরপর অতর্কিতে আক্রমণ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। এ বিজয়কে ইবনে আল-আছিরের মতে ‘ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজয়’ বলা হয়। এরপর সালাহউদ্দিন তার বাহিনীর অংশ নিয়ে আলেক্সান্দ্রিয়া শহরে চলে যান, এবং সে শহরের পাহারা দিতে থাকেন।

একটু আগে বলা ফাতিমী খলিফা আল-আদিদের উজির শাওয়ারের সাথে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল আসাদের, ওদিকে জেরুজালেম রাজ্যের অ্যামালরিক দ্য ফার্স্টের সাথেও। শাওয়ার সাহায্য চাইলেন অ্যামালরিকের। কিন্তু ১১৬৯ সালে শাওয়ার নিহত হন গুপ্তঘাতকের হাতে, বলা হয় সেটি সালাহউদ্দিনের কাজই ছিল। সে বছর আসাদও মারা যান। তখন নুরুদ্দীন আসাদের একজন স্থলাভিষিক্তকে বাছাই করলেও, উজির হিসেবে খলিফা আল-আদিদ সালাহউদ্দিনকেই নিয়োগ দিলেন ২৬ মার্চ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আল আদিদ একজন শিয়া খলিফা ছিলেন, তাই উজির হিসেবে সুন্নি সালাহউদ্দিনকে বাছাই করাটা অবাক করা ছিল।

তবে আনুগত্য খলিফা আল-আদিদের দিকে দেবেন বেশি নাকি নুরুদ্দীনের দিকে, সেটা নিয়ে মনঃদ্বন্দ্বে ছিলেন তিনি। সে বছর, একদল মিসরীয় সেনা আর আমিরের ষড়যন্ত্রে গুপ্তহত্যার মুখে পড়েন সালাহউদ্দিন, কিন্তু গোপন সূত্রে তিনি আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিলেন। হোতা ছিল ফাতিমী প্রাসাদের সিভিলিয়ান কন্ট্রোলার। তাকে গ্রেফতার করে হত্যা করেন সালাহউদ্দিন। পরদিন ফাতিমী বাহিনীর পঞ্চাশ হাজার কৃষ্ণবর্ণী সেনা বিরোধিতা করে সালাহউদ্দিনের। এ বিদ্রোহ দমন করতে করতে ২৩ আগস্ট চলে আসে। এরপর থেকে আর কখনো কায়রোর বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি সালাহউদ্দিনকে।

১১৬৯ সালে নুরুদ্দীনের সহায়তায় বিশাল এক ক্রুসেডার আর্মিকে পরাজিত করেন সালাহউদ্দিন। ততদিনে কিন্তু আব্বাসীয় সুন্নি খলিফা আল মুস্তানজিদের সাথে ফাতিমী শিয়া খলিফা আল-আদিদের দ্বৈরথ তুঙ্গে। সালাহউদ্দিন তখন মিসরে নিজের ঘাঁটি শক্ত করছেন। নিজের আত্মীয়দের উচ্চপদ দিলেন তিনি। মালিকি ও নিজের শাফিই মাজহাবের জন্য কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন সালাহউদ্দিন তার শহরে।

মিসরে পাকাপোক্ত হবার পর ১১৭০ সালে দারুম অধিকার করে নিয়ে ক্রুসেডারদের পরাজিত করেন সালাহউদ্দিন সেখানে। গাজা থেকে তখন জেরুজালেমের শাসক অ্যামালরিক নাইটস টেম্পলারদের গ্যারিসন বের করে আনেন ও দারুমের পতন রোধ করতে আসেন। কিন্তু সালাহউদ্দিন তাদের উপেক্ষা করে গাজায় গিয়ে শহরটি অধিকার করে নেন তখন।১১৭১ সালে নুরুদ্দীনের চিঠি পেলেন সালাহউদ্দিন, তিনি যেন মিসরে আব্বাসীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। শহরের শাফিঈ মাজহাবের আলেম নাজমুদ্দিন আল খাবুশানি প্রচণ্ড শিয়া বিরোধী ছিলেন, তিনিও সায় দিলেন। মিসরের কয়েকজন আমিরকে হত্যা করা হলো, তবে শিয়া খলিফা আল-আদিদকে বলা হয়েছিল যে, তাদের হত্যা করবার কারণ আসলে খলিফার বিরোধিতা করা। এরপর আল-আদিদ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাকে বিষ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু কে দিয়েছিল তা জানা যায় না। অসুস্থ আল-আদিদ সালাহউদ্দিনকে অনুরোধ করেন তার শিশুদের যেন দেখে রাখেন। কিন্তু সালাহউদ্দিন না করে দেন, পাছে আব্বাসীয়রা তাকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য দায়ী করে। কিন্তু পরে তিনি তার নিজের এ কথার জন্য অনুতপ্ত হয়েছিলেন। ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যান আল-আদিদ, পাঁচ দিন পর আব্বাসীয় খুতবা ঘোষিত হলো কায়রোতে, খলিফা হলেন আল-মুস্তাদি (حسن المستضی بن یوسف المستنجد)। তিনি ছিলেন সুন্নি আব্বাসীয় খলিফা।লোহিত সাগরের তীরে আকাবার মন্ট্রিল দুর্গ আর কারাক শহর আক্রমণের জন্য সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্যে সে বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর মিসর ত্যাগ করলেন; সিরিয়া থেকে যোগ দিলেন নুরুদ্দীন। কিন্তু ফাতিমী ও ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্র নিয়ে খবর শুনতেই সালাহউদ্দিন ফিরে এলেন কায়রোতে। নুরুদ্দীন একাই গেলেন।সালাহউদ্দিনের সবগুলো অভিযান বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব না এ সংক্ষিপ্ত লেখায়, তাই মূল ঘটনাগুলোই উল্লেখ করা হবে। ১১৭৪ সালের গ্রীষ্মে, নুরুদ্দীন বিশাল এক বাহিনী যোগাড় করছিলেন। কোনো এক কারণে (হয়ত নুরুদ্দীনের ক্রমঃক্রমঃ অর্থ ও সাপ্লাই চাওয়ার প্রতিউত্তর না দেয়ায়), আইয়ুবীরা ভাবতে লাগলো এ বাহিনী কি তবে কায়রো আক্রমণের জন্য? সালাহউদ্দিনকে কি হুমকি ভাবছেন নুরুদ্দীন? কিন্তু ১৫ মে, নুরুদ্দীন অসুস্থ অবস্থায় মারা যান হঠাৎ। ক্ষমতা চলে যায় তার পুত্র সালিহ ইসমাইল (as-Salih Ismail al-Malik) এর কাছে, বয়স তার মাত্র ১১।সালাহউদ্দিনের সামনে তখন কয়েকটি অপশন। তিনি নিজেই কি ক্রুসেডারদের আক্রমণ করে বসবেন? নাকি ১১ বছরের বালকের কথার আশায় বসে থাকবেন? আচ্ছা, তিনি কি নিজেই সিরিয়া অধিকার করে নিতে পারেন না, এ বালক তো কিছু করবে না, দুনিয়ার হালহাকিকত বুঝে উঠবার বয়সই হয়নি তার এখনো- না এটা করলে মানুষ তাকে মুনাফিক ভাববে, নিজের আগের প্রভুর রাজত্ব আক্রমণ কেউ ভালো চোখে দেখবে না। ক্রুসেডের নেতৃত্ব দেবার অধিকার তখন হারাবেন সালাহউদ্দিন।

আগস্টে সালিহ ইসমাইলের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন আলেপ্পোর আমির ও ক্যাপ্টেন গুমুশ্তিগিন। তিনি তখন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরানোর অঙ্গীকার নিলেন, শুরুটা হবে দামেস্ক (সিরিয়ার রাজধানী বর্তমানে) দিয়ে। দামেস্কের আমির তখন আলেপ্পোর বিরুদ্ধে সাহায্য চাইলেন মসুলের সাইফ আল-দীনের কাছে, যিনি কিনা গুমুশ্তিগিনের আত্মীয়। কিন্তু সাইফ না করে দিলেন। তখন সিরিয়ানরা সালাহউদ্দিনের সাহায্য চাইলো। ব্যাপক সাহায্য নিয়ে সালাহউদ্দিন হাজির হলেন প্রিয় শহর দামেস্কে। বাবার পুরনো বাড়িতে বিশ্রাম নিলেন। চার দিন বাদে দামেস্কের সিটাডেলের দরজা খুলে দেয়া হলো। সালাহউদ্দিন তখন সিটাডেল অধিকার করে নিলেন এবং বাসিন্দাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করলেন।এরপর নিজের ভাইকে দামেস্কের শাসক করে আলেপ্পোর দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। সালিহ প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে মানুষকে বললেন যেন তাকে কেউ সালাহউদ্দিনের হাতে তুলে না দেয়, কেউ যেন আত্মসমর্পণ না করে। তার অভিভাবক গুমুশ্তিগিন তখন সাহায্য চাইলেন সালাহউদ্দিনের শত্রু অ্যাসাসিনদের গ্র্যান্ডমাস্টার মাসায়েফের রাশিদ আদ্দিন সিনানের। ১১৭৫ সালের ১১ মে, ১৩ জন গুপ্তঘাতক প্রেরণ করা হলো সালাহউদ্দিনকে মারতে। কিন্তু সকলেই নিহত হয়।

অ্যাসাসিনদের হেডকোয়ার্টার সেই মাসায়েফ দুর্গ;  

আবার ত্রিপলির রেইমন্ডও মুসলিম এলাকায় আক্রমণ শুরু করেন। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তখন সালাহউদ্দিন পশ্চিম সিরিয়ার হমসে চলে যান, এবং অধিকার করে নেন সে শহর যুদ্ধ শেষে। এভাবে করে ১১৭৭ সালে সালাহউদ্দিনের বাহিনী এত শক্তিশালী হয়ে গেল যে ক্রুসেডারদের ত্রাস হয়ে গেলেন তিনি। ১১৮৭সাল পর্যন্ত  তিনি ক্রুসেডারদের পাশাপাশি নিজের সাম্রাজ্যও বিস্তার করতে থাকেন। তার পতাকার নিচে এলো আলেপ্পো, দামেস্ক, মসুল ও আরো নানা শহর। মিসর, সিরিয়া ও ইয়েমেন জুড়ে প্রতিষ্ঠা হলো আইয়ুবী সাম্রাজ্য। সাম্রাজ্য বিস্তার করার সময় তিনি ক্রুসেডারদের সাথে বিভিন্ন চুক্তিতে ছিলেন যেন তার বাহিনী অন্যত্র ব্যস্ত থাকতে পারে। কিন্তু শাতিলনের রেজিনাল্ড এ চুক্তি ভঙ্গ করে বসেন।

ক্রুসেডাররা জেরুজালেম অধিকার করে ছিল বহু বছর। অন্যান্য ক্রুসেডার শহরগুলো অধিকার করার পর নজর দিলেন সালাহউদ্দিন জেরুজালেমের দিকে। তিনি চাইলেন বিনা রক্তপাতে শহরটি অধিকার করবার, কিন্তু ভেতরের বাসিন্দারা জানালো, দরকার হলে এ পবিত্র শহর ধ্বংস করে দেবে তবুও মুসলিমদের কাছে হস্তান্তর করবে না। জেরুজালেমের বালিয়ান অফ ইবেলিন হুমকি দিলেন, যদি জেরুজালেমের খ্রিস্টান অধিবাসীদের মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তির শর্ত মেনে না নেয়া হয় তবে ভেতরের জিম্মি পাঁচ হাজার মুসলিমদের এক এক করে হত্যা করা হবে, এবং মুসলিমদের পবিত্র মসজিদুল আকসা ও ডোম অফ দ্য রক ধ্বংস করা হবে। সালাহউদ্দিন মেনে নিলেন। খ্রিস্টানদের যে মুক্তিপণ তিনি ধার্য করলেন সেটা আজকের হিসেবে চার হাজার টাকা।

জেরুজালেমের খ্রিস্টান যাজক হেরাক্লিয়াস দান করে দিলেন অর্থ যার দ্বারা আঠারো হাজার গরিব খ্রিস্টানের মুক্তিপণের টাকা উঠল। বাকি রইল পনেরো হাজার, তাদের দাসত্ব বরণ করতে হবে।

১১৮৭ সালের সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ শুরু হওয়া সালাহউদ্দিনের হাত্তিন যুদ্ধফেরত ২০,০০০ সেনা কর্তৃক করা জেরুজালেম অবরোধ শেষ হয় অক্টোবরের ২ তারিখ। সেদিন আত্মসমর্পণ করে জেরুজালেম। শেষ হয়ে গেল কিংডম অফ জেরুজালেম।

জেরুজালেম জয় করে নিলেন সালাহউদ্দিন;  

এর আগে যখন মুসলিমদের হারিয়ে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করেছিল সেদিন মুসলিমদের কচুকাটা করে হাঁটু পর্যন্ত রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছিল তারা। তাই তারা আশংকা করছিল সালাহউদ্দিন এমনটা করবেন কিনা চুক্তিভঙ্গ করে। না, তিনি করেননি। তিনি যারা ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল তাদের তো যেতে দিলেনই, যারা দিতে পারেনি তাদেরও বিনা মুক্তিপণে চলে যেতে দিলেন।

জেরুজালেম বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন প্রাক্তন ইহুদী বাসিন্দাদের বললেন, তারা শহরে ইচ্ছেমত  আবার বসবাস করতে পারে।

হয়ত ভাবছেন কাহিনী এখানেই শেষ। কিন্তু না, জেরুজালেম জয় করতে গিয়ে সালাহউদ্দিন একটা বিশাল ভুল করেছিলেন, সেটি হলো, তিনি খ্রিস্টানদের টায়ার (Tyre) শহর জয় না করেই এদিকে এসেছিলেন। ইসলামে বেশি গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম জয়ের জন্য তার তর সইছিল না।

জেরুজালেমের পতনের পর ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের উদ্যোগে ও অর্থায়নে শুরু হয় থার্ড ক্রুসেড(১১৮৯-১১৯১)। টায়ার শহর থেকে খ্রিস্টানরা যোগ দিল তার সাথে। আক্রা (Acre) শহরে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে রিচার্ডের বাহিনী। নারী ও শিশুসহ প্রায় তিন হাজার বন্দী মুসলিমকে হত্যা করেন রিচার্ড। এরপর ১১৯১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আরসুফ যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের বাহিনীর মুখোমুখি হন রিচার্ড। সে যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হন সালাহউদ্দিন, যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন বাহিনীসহ। রিচার্ড জাফফা শহর দখল করে নেন।

সেই আক্রা দুর্গ; 

ওদিকে সালাহউদ্দিন মিসর ও ফিলিস্তিনের মাঝের আস্কালন শহরের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেন, যেন ক্রুসেডারদের হাতে এর পতন না হয়। তারা দুজন শান্তিচুক্তির পথ খুঁজতে লাগলেন। রিচার্ড প্রস্তাব দিলেন, রিচার্ডের বোন সিসিলির রানী জোয়ানকে সালাহউদ্দিনের ভাই বিয়ে করুক, আর বিয়ের উপহার হিসেবে জেরুজালেম দিয়ে দেয়া হোক। সালাহউদ্দিন এ প্রস্তাব উড়িয়ে দিলে রিচার্ড বললেন সালাহউদ্দিনের ভাই যেন খ্রিস্টান হয়ে যান।

১১৯২ সালে রিচার্ড জেরুজালেম থেকে ১২ মাইল দূরে থেকেও জেরুজালেম আক্রমণ করলেন না, বরং আস্কালনের দিকে গেলেন। ওদিকে সালাহউদ্দিন গেলেন জাফফা পুনরুদ্ধার করতে, প্রায় করেই ফেলেছিলেন, কিন্তু আস্কালান থেকে ছুটে এলেন কিং রিচার্ড এবং সালাহউদ্দিনকে পরাজিত করলেন শহরের বাইরের এক যুদ্ধে। এটাই ছিল থার্ড ক্রুসেডের শেষ যুদ্ধ। সালাহউদ্দিনকে মেনে নিতে হলো রিচার্ডের শর্তগুলো, টায়ার থেকে জাফফা পর্যন্ত ক্রুসেডারদের অধীনেই থাকবে। মেনে নিলেন যে, খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীরা বিনা অস্ত্রে জেরুজালেম ভ্রমণ করে আসতে পারবে। তিন বছর পর্যন্ত কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না।

কিন্তু তিন বছর আর বাঁচেননি সালাহউদ্দিন। কিং রিচার্ড চলে যাবার পর এক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দামেস্কে মারা গেলেন তিনি, ১১৯৩ সালের ৪ মার্চ। মৃত্যুর আগে তিনি সম্পত্তি দান করে গিয়েছিলেন গরীব দুঃখীদের। মাত্র এক স্বর্ণমুদ্রা আর চল্লিশ রৌপ্যমুদ্রা ছাড়া আর কিছুই ছিল না তার বাকি। তার জানাজা-দাফন-কাফনের টাকাটাও হচ্ছিল না। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের বাহিরের বাগানে তাকে দাফন করা হয়। সাত শতাব্দী পর জার্মানির রাজা দ্বিতীয় উইলহেম সালাদিনের কবরের জন্য একটি মার্বেলের শবাধার দান করেন। এখন আপনি সেখানে জিয়ারত করতে গেলে দেখতে পাবেন কবরের ওপরে দুটো শবাধার, একটি পুরনো ও আসল কাঠের, আর আরেকটি এই মার্বেলের।তিনি পাঁচ কিংবা বারোজন পুত্র রেখে গিয়েছিলেন। তার অসংখ্য প্রজা হজ্ব করবার সৌভাগ্য ও নিরাপত্তা সালাহউদ্দিনের কল্যাণে পেলেও, সালাহউদ্দিন হজ্ব করবার সৌভাগ্য পাননি, যদিও তার পরিকল্পনা ছিল।

সালাহউদ্দিনের কবর; 

ইউরোপজুড়ে সালাহউদ্দিনের নানা ঘটনা প্রচলিত ছিল, এখনো আছে। চুক্তির পর রিচার্ড আর সালাদিন একে অন্যকে অনেক উপহার দিয়েছিলেন। একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল, এক খ্রিস্টান মহিলার তিন মাসের বাচ্চা চুরি হয়ে যায়, এবং সেই বাচ্চাকে বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়। খ্রিস্টানরা তাকে বলল সুলতান সালাহউদ্দিনের কাছে যেতে। মহিলাটির কষ্ট জানবার পর সালাহউদ্দিন নিজের টাকায় বাচ্চাটি কিনে নেন আবার, এবং মহিলাটিকে ফিরিয়ে দেন। সালাহউদ্দিনের দরবারে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে মহিলার চোখ থেকে। সালাহউদ্দিন একটি ঘোড়ায় করে তাকে নিজের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন।

মাইকেল হ্যামিল্টনের লস্ট হিস্টোরি বইতে আমরা জানতে পারি, ১১৯২ সালে আক্রা আক্রমণের সময় রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন সালাহউদ্দিন শত্রু রিচার্ডের চিকিৎসার জন্য নিজের ব্যক্তিগত ডাক্তারদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য পাঠান বরফ, তাছাড়া ফলফলাদিও পাঠান। আরেকটি ঘটনা আমরা জানতে পারি, যখন রিচার্ড নিজের ঘোড়া হারিয়ে বিশাল মুসলিম বাহিনীর সামনে একা দাঁড়িয়ে থাকেন ময়দানে, তখন মুসলিমরা তাকে আক্রমণ করেনি। বরং, সুলতান সালাহউদ্দিন তার জন্য দুটো ঘোড়া পাঠিয়ে দেন যেন সমানে সমানে যুদ্ধ হতে পারে।

ইতিহাসের পাতা আমাদের বলে না যে, রিচার্ড কোনোদিন সালাহউদ্দিনের সাথে সামনা সামনি দেখা করেছেন, সবই হয়েছিল দূতের মাধ্যমে। কিন্তু তিনি প্রচণ্ড রকমের সম্মান করতেন সালাহউদ্দিনকে, তার সাহস ও বীর্যের তিনি খুব প্রশংসা করতেন। সালাহউদ্দিনও সম্মান করতেন রিচার্ডকে। সে যুগে একজন মুসলিমের নাম ইউরোপে সম্মানের সাথে নেয়া হচ্ছে সেটাই ছিল অবাক ব্যাপার। সালাদিন নামখানা আজও উজ্জ্বল ইতিহাসের তাম্রলিপিতে।

 “আমরা এই যুগেও মসজিদুল আকসায় সেই আজানের সুর আবার উচ্চকিত করতে চাই। নব্বই বছরের মত সময় ধরে এই মসজিদ আজানের প্রতীক্ষায় কোন মুয়াজ্জিনের পথ পানে চেয়ে আছে। তোমরা মনে রেখো মসজিদুল আকসার আজান বিশ্বের সমস্ত প্রান্তরে আবার ও ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলবে।”
সব যুগেই বাতিল তাঁর ভঙ্গুর পিরামিড এর চূড়ায় উঠতে সবচেয়ে বেশী প্রতিবন্ধক মনে করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি মুসলিম মিল্লাতকে। তারা সূক্ষ্ম কৌশল হিসেবে আঘাত হানে এই মিল্লাতের নৈতিকতা, চারিত্রিক পবিত্রতা আর সাংস্কৃতিক ইতিহাস-ঐতিহ্যের উপর। আর বাতিলের এই ফাঁদে পা দেয়া জাতিকে পুনর্গঠন করে সঠিক মর্যাদায় ফিরিয়ে দিতে আবির্ভূত হয় ইসলামী আন্দোলনের অনেক প্রাণশক্তি। সালাহউদ্দীন আইয়ুবী এমনই এক দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য, দুঃসাহসী প্রাণশক্তি। কিংবদন্তি এই সুলতান রক্ত গলিত পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক রাষ্ট্র জয় করে ফিরিয়ে এনেছেন মুসলমানদের হারানো অতীত ইতিহাসকে। শুধু যুদ্ধ জয়ই নয়, বীরত্ব আর মহানুভবতায় শত্রুর চোখেও তিনি ছিলেন “দি গ্রেট সালাহউদ্দিন”।
আলোর পথিকৃৎ : সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ৫৩২ হিজরির (১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) মেসোপটেমিয়ার তিকরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুবী। সালাহউদ্দিন হচ্ছে লকব, যার অর্থ “বিশ্বাসের ন্যায়পরায়ণ”। তিনি কুর্দি বংশোদ্ভুত এবং মিসর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান। সালাউদ্দিন আইয়ুবী বিভিন্ন বিষয়ে অনেক পারদর্শী ছিলেন। ইউক্লিড, পাটিগণিত, আইন এবং ধর্মীয় বিষয়ে খুব ভাল জানতেন। তাছাড়া আরবের ইতিহাস ও আরব ঘোড়ার রক্তধারা সম্পর্কেও তাঁর অনেক জ্ঞান ছিল। তিনি কুর্দি ও তুর্কি ভাষায় কথা বলতে পারতেন।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ছোট থেকেই বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্বপ্ন দেখতেন। ইসলামি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলকে (বায়তুল মুকাদ্দাস) ক্রুসেডারদের হাত থেকে প্রায় ৯০ বছর পর রক্ষা করে মুসলমানদের ইসলামি রাষ্ট্রের ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করেন।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ছোটবেলায় গভর্নর নিজামুল মূলক-এর মাদ্রাসায় পড়াশুনা ও যুদ্ধ বিদ্যার জ্ঞান লাভ করেন। পড়াশুনার পাশাপাশি যুদ্ধ কৌশল শেখার প্রতি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বেশ ঝোঁক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই বিষয়ে আগ্রহের জন্য তার চাচা তাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তিনি এ বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ৫৪৯ হিজরিতে সালাহউদ্দিন ও তার পিতা দামেস্কের রাজ দরবারে চাকরি গ্রহণ করেন।
দ্বাদশ শতাব্দীর আগ থেকেই ইউরোপ, ফ্রান্স ও জার্মান ইসলামি রাষ্ট্র গুলো ভেঙ্গে ফেলে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন দিক থেকে চক্রান্তে মেতে উঠে। সাথে সাথে তারা চালাতে থাকে নৃশংস আক্রমণ। মুসলিম আমির, গভর্নরদেরকে তাদের মূল লক্ষ্য- উদ্দেশ্য থেকে ঘুরিয়ে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠে তারা। তারই ফলাফলে মুসলিম জাতির কাছ থেকে খৃষ্টান সম্প্রদায় ছিনিয়ে নেয় তাদের প্রাণের স্পন্দন প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস।
১১৬৩ সালে ক্রুসেডারদের আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্য লাভের জন্য আইয়ুবীকে মিসরের রাজ দরবারের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা করা হয়। তখন মিসরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আল-আদিত। আল-আদিত এর মৃত্যুর পর ১১৬৯ সালের ২৩শে মার্চ সব জুলুম অত্যাচার থেকে মুসলিম জাতিকে হেফাজতের জন্য আর ক্রুসেডারদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার জন্য তাকে মিশরের গভর্নর ও সেনা প্রধান করা হয়।
ষড়যন্ত্র ও বিরোধীদের কৌশল : এরপরই ক্রুসেডাররা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা দুনিয়ার বুক থেকে ইসলামের নাম নিশানা চিরতরে মুছে ফেলার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করত। সবচেয়ে বেশি আঘাত হানত নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে। এর জন্য-
প্রথমত: তাদের কন্যাদেরকে মুসলিমদের চরিত্র হননের প্রশিক্ষণ দিত। আর মেয়েদেরকে এটা বলেই বুঝ দিত যে ক্রুশের জন্য এটা সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগ। তাই আমীরদের কাছে তারা সুন্দরী মেয়ে আর মদ পাঠিয়ে দিত। তারা জানত মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তাদের ঈমানের শক্তি, এই শক্তির বলেই সংখ্যায় স্বল্প, আর স্বল্প রসদ নিয়েও প্রতিবারেই বিজয়ী হয় মুসলমানরা। তাই অনৈতিকতার এই বিষবাস্প দিয়েই মুসলমানদের ঘায়েল করতে চাইত তারা।
দ্বিতীয়ত : মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর ফাটল তৈরি করে নিজেদের চলার পথকে সুগম করাই ছিল ক্রুসেডারদের একমাত্র কাজ। এ জন্য তারা মুসলমানদের পরস্পরের ভেতর অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরী করে দিতো, যার ফলশ্রুতিতে দিনের পর দিন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে অনেক মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে ফেলত মুসলমানরা।
তৃতীয়ত : বাতিল শক্তিকে আপাতত বিচ্ছিন্ন মনে হলেও তার ধর্ম হচ্ছে, সত্যের কোন একক শক্তি যখন আওয়াজ তুলতে শুরু করে বাতিল তখন তার সমস্ত শক্তিকে এক করে সত্যের আওয়াজকে স্তব্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সেই ধারাবাহিকতায় সুলতান আইয়ুবীর ফিলিস্তিনের শোবক ও কার্ক দূর্গ পরাজয়ের প্রতিশোধ স্বরূপ ক্রুসেডাররা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণকালে স্পেনের নৌ-বহরও তাদের সাথে যুক্ত হয়, যুক্ত হয় ফ্রান্স, জার্মানী ও বেলজিয়াম। সাথে আরো যোগ হয় গ্রিস ও সিসিলির নৌ-বহর। আবার জেরুজালেম হাত ছাড়া হওয়ার পরও পোপ দ্বিতীয় আরবানুসের আহ্বানে সুলতান আইয়ুবীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল সমগ্র খৃষ্টান বিশ্ব।
চতুর্থত : সুলতান আইয়ুবী যেখানে মুসলমানদের আক্রমণ করে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো উদ্ধার করে মুসলমানদের মুক্ত করবেন সেখানে ক্রুসেডাররা তাদের গোয়েন্দা বিভাগ দিয়ে মিশরে বিভিন্ন সমস্যা তৈরী করত যাতে আইয়ুবীর মিশর ঠিক করতে করতেই সময় পার হয়ে যায়। বায়তুল মুকাদ্দাস আর রক্ষা করার সুযোগ না পান।
রক্ত ঝরা দিন : সালাহউদ্দিন আইয়ুবী মুসলিম মিল্লাতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য কিশোর বয়স থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়েছেন। দুর্গম পাহাড়, গভীর জংগল, কঠিন মরুভূমি সর্বত্র একের পর এক যুদ্ধ করে রক্ত ঝরিয়ে ছিনিয়ে এনেছিলেন মুসলিমদের হারানো গৌরব। মানুষের চোখ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় এমন রক্ত আগে কখনো দেখা যায়নি। কৈশোরের তিনি মসজিদুল আকসার মিম্বর ধরে শপথ করেছিলেন…“আমি বেঁচে থাকতে কখনো বায়তুল মুকাদ্দাস হতে ইসলামী পতাকা সরাতে দিবো না”
এ শপথের কথা স্মরণে রেখেই তিনি সারা জীবন নিজেদের জন্য বিশ্রামকে হারাম করে ছুটেছেন এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তে।
আইয়ুবী মিসরের গভর্নর হওয়ার পর পরই সর্বপ্রথম সেখান থেকে খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দেয়া আমিরদেরকে কৌশলে সরিয়ে দেন। আর সেজন্য ক্রুসেডের দালালেরা তাকে মেরে ফেলার ফন্দি আঁটে। সুন্দরী নারী দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন কিছুতে তারা সফল হতে না পেরে বেছে নেয় ভিন্ন পথ। সেনাবাহিনীতে থাকা সুদানি সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে। আইয়ুবী কৌশলে এ বিদ্রোহও দমন করেন।
যুদ্ধ কৌশল : আইয়ুবী ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। এই যোদ্ধার রণকৌশল ছিলো অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত। প্রখর দূরদৃষ্টি নিয়ে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। সবচেয়ে ভয়ানক কৌশল ছিল“গেরিলা হামলা”। গেরিলা বাহিনী শত্রু সেনাদের পেছনের অংশে আঘাত করেই মুহূর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে যেত।
মূলত সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এমন একদল যোগ্য ও দক্ষ  সৈনিক তৈরী করেছিলেন, যাদের কাছে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে রাত আর দিন পুরোটাই ছিল সমান। যারা সুলতানের একটা নির্দেশেই জীবন বিসর্জন দিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে যেত। আর এর জন্য সব রকম ক্ষতি মেনে নিতে দ্বিধা করত না।
তাইতো আকসা আক্রমণের সময় শত্রু বাহিনীর কাছে নিজেদের সম্মান না হারিয়ে জাহাজের কমান্ডার এভাবেই বললেন“আল্লাহর কসম! আমরা সম্মানের সাথেই মরবো। শত্রুরা এ জাহাজ দখল করতে ছুটে আসছে। তোমরা হাতিয়ার ফেলে হাতে কুড়াল নাও। জাহাজ ডুবিয়ে দাও।”
যেসব সৈনিকরা জীবিত ছিল তারা পাটাতনের নিচে গিয়ে জাহাজ ভাঙ্গা শুরু করল। জাহাজে পানি ঢুকছে, অথচ কোন সৈনিক সাঁতরিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেনি সকলেই জাহাজের সাথে সমুদ্র তলে ডুবে গেলো।
নেতার আনুগত্যে জীবন দেয়ার মতো এমন নজরানা পেশ করার সাহস যদি এই আন্দোলনের সৈনিকদের না থাকত তাহলে বিজয়ী হওয়াটা হয়তো তাদের জন্য এত সহজ হতো না।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী সর্বপ্রথম ফিলিস্তিনের শোবক দূর্গ অবরোধ করে সেটা জয় করেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গীর সহায়তায় ক্রাক দুর্গও জয় করেন।
দুর্গগুলো জয়ের প্রতিশোধ স্বরূপ ক্রুসেডাররা পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয় এবং তারা মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আইয়ুবী তার গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে এ খবর পেয়ে যান। খবর পেয়ে তিনি ওখানকার সব অধিবাসীদের অন্যত্রে সরিয়ে দেন আর সৈন্যদের সাধারণ জনগণের ঘরে লুুকিয়ে থাকতে বলেন। এদিকে ক্রুসেডাররা আক্রমণ করতে এসে কোন সৈন্য না পেয়ে খুশি হয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করে। ঠিক এসময়েই লুকিয়ে থাকা সৈন্যরা বের হয়ে ক্রুসেডারদের উপর আক্রমণ করে তাদেরকে নিঃশেষ করে দেয়। এভাবে আলেকজান্দ্রিয়া মুসলমানদের দখলে থেকে যায়।
এদিকে ১১৭৪ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তার প্রাণপ্রিয় চাচা নুরুদ্দীন জঙ্গীকে হারান; যিনি এ পর্যন্ত সব যুদ্ধেই সুলতানকে শক্তি সাহস ও পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে এসেছিলেন। সুযোগ পেয়ে ক্রুসেডাররা আনন্দে আত্মহারা হয়ে তৈরী করে এক গভীর চক্রান্ত। তারা নুরুদ্দীনের রেখে যাওয়া মাত্র ১১ বছর বয়সের ছেলেকে ক্ষমতায় বসায়। যাতে নাবালক ছেলেটার কাছ থেকে ফায়দা লাভ করা যায়। কিন্তু আইয়ুবী তা হতে দেননি। তিনি মাত্র ৭০০ জন সৈন্য নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সিরিয়ায় আক্রমণ করেন। সিরিয়াকে আবার নিজ দখলে নিয়ে আসেন। অতঃপর তিনি সিরিয়া ও মিসর কে এক করে দেন। সেখানে থেকেই তিনি “সুলতান” উপাধি লাভ করেন।
শুরু থেকে এ পর্যন্ত যেসব আমীররা ক্রুসেডারদের সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চাইত, তাদের সাথে যুদ্ধ করতে সুলতানের অনেকগুলো বছর কেটে গেলো। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও সুলতান আল-আকসার বিজয়কে মন থেকে সরাতে পারেননি। একটার পর একটা অঞ্চল দখল করছেন আর আল-আকসা তার অন্তরে আরও ব্যাকুলতা তৈরী করেছে। এজন্য অনেক যুদ্ধ ও কষ্টের পর সুলতান হালব, হাররান ও মসুল দখল করে নেন। এগুলো দখল করতে বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে আর কোন বাধা ছিলনা।
তবে এ অভিযান ছিল খুবই বিপদসংকুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বই কেবল বেশি ছিলো না, পারিপার্শ্বিক অবস্থার দিক থেকেও তারা ছিল খুবই সুবিধাজনক স্থানে। তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল মজবুত ও সংহত। অপরদিকে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল খুবই নগন্য। প্রয়োজনীয় রসদও ছিল খুবই সামান্য। কিন্তু আল্লাহর পথের এ সৈনিকদের ঈমানী আবেগ ছিলো অত্যন্ত টগবগে।
এ অবস্থায় সুলতান তার সৈনিকদের বলেলেন “বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে আমাদের ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সমস্ত নৌযানগুলো আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলার মতো সাহস ও হিম্মত রাখতে হবে। পিছু হটার সব পথ বন্ধ না করলে বিজয় আমাদের পদচুম্বন করবে না। সুতরাং এই অনুভূতি নিয়ে আমাদের ময়দানে পা বাড়াতে হবে যে, এটাই আমার জীবনের শেষ যাত্রা, আর কোনদিন আমরা কেউ স্বদেশ ও স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে নাও পারি।”
সুলতান এবার আক্রা আক্রমণ করলেন। ২-৩ দিন অবরোধ এর পর আক্রাও মুসলমানদের হাতে চলে আসল। তারপর সুলতান মাহমুদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ “আসকালীন” অবরোধ করেন। প্রায় ৩৪ বছর পর এই অঞ্চলটি মুসলমানদের মাধ্যমে আবারও স্বাধীন হল। আসকালীন থেকে মাত্র ৪০ কিঃমিঃ দুরে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস।
প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস উদ্ধার : ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই মুসলমান আমিরদের সহায়তায় তৎকালীন ক্রুসেডাররা মুসলমানদের প্রথম কিবলা “বায়তুল মুকাদ্দাস” দখল করে। তারা নগরীতে প্রবেশ করে মুসলিমদের গণহারে হত্যা করা শুরু করে। নারীদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন করে, শিশুদের মাথা কেটে নেয়। নিরুপায় মুসলিমরা সেই দিন মসজিদকে পবিত্র স্থান মনে করে আল আকসাসহ বেশ কিছু মসজিদে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও তারা চালাতে থাকে ইতিহাসের নির্মম রক্ত খেলা। যাকে পাচ্ছিল তাকেই হত্যা করছিল। মুসলমানদের রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে মসজিদের বাহিরে পড়ছিলো, খৃষ্টানদের ঘোড়ার পা রক্তে ডুবে যাচ্ছিল আর অদ্ভুত এক আনন্দে ভাসছিল তারা। মেয়েদের মসজিদ থেকে জোর পূর্বক বাহিরে টেনে এনে উলঙ্গ করে সতীত্ব হরণ করছিল এই ক্রুসেডাররা। যে ভারী কাজগুলো ছিলো পুরুষদের জন্য সেই কাজ নারীদের দিয়ে করানো হচ্ছিল। এভাবে করতে করতে যখন বুঝতো এদের দিয়ে আর কোন কাজ হবে না তখন জবেহ করে তার গোশত রান্না করে খেত।
মহান আল্লাহ নিজেও যেন এই জুলুম আর সহ্য করলেন না। ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সুলতান আইয়ুবী বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। অপরপক্ষে খৃষ্টানরাও তাদের পবিত্র ভূমি ছাড়তে নারাজ। এবার আইয়ুবী তাঁর সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন“শহীদদের যে জাতি ভুলে যায় সে জাতিকে আল্লাহও ভুলে যান। তাদের ভাগ্যে সিলমারা হয়ে যায়। লওহে মাহফুজে চির অভিশাপে পড়ে যায় তারা। এখন তোমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তোমরা কিয়ামতের দিন অভিশপ্ত জাতি হয়ে উঠবে নাকি সেই জাতির মত উঠবে, যে জাতির জন্য আল্লাহর রাসূল (স:) আল্লাহকে বলবেন-হে আল্লাহ এই সে জাতি যাদের কোরবানী ও আত্মত্যাগের সামনে কাফেরদের ঝঞ্ঝা-তুফান প্রতিহত হয়েছিল আর তোমার সত্য দ্বীনের সম্মান ও গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছিল।”
এমন আবেগময়ী ভাষণে উজ্জীবিত হয়ে শুরু হল প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দু’পক্ষেই হল অনেক হতাহত। শেষ পর্যন্ত অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ৫৮৩ হিজরির ২৭ রজব শুক্রবার সম্মানিত বায়তুল মুকাদ্দাসে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করলেন সুলতান আইয়ুবী। কিংবদন্তী এই সুলতান থরথর কাপা শরীর নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। বাঁধভাঙা জোয়ারের ন্যায় অশ্রুসজল হয়ে বিনীত মস্তকে নত হয়ে যান তার প্রভুর শানে।
মূলত বায়তুল মুকাদ্দাসের বিজয় ইসলামের ইতিহাসে এক স্বর্ণকমল সফলতা। ইসলামী রাষ্ট্রগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, মুসলমানদের যুলুম, অত্যাচার থেকে বাঁচানো আর প্রথম কিবলাকে রক্ষা করাই ছিল সুলতানের উদ্দেশ্য। মুসলিমরা ক্রুসেডের এই যুদ্ধে বিজয়ী হওয়াতে প্রচন্ড এক ধাক্কা খেল ইউরোপ মহাদেশ।
সংগ্রামী সালাহউদ্দিন : এই সময়ে খৃষ্টান বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো চিন্তা করল আইয়ুবীর বিরুদ্ধে এখনো যদি কোন শক্তি গড়ে তোলা না যায় তাহলে সমস্ত ফিলিস্তিনও মুসলিমদের দখলে চলে যাবে। তাই সমস্ত খৃষ্টান রাষ্ট্র মিলে এক ঐক্য জোট তৈরী করল। ৫২০টি যুদ্ধ জাহাজ আর ৬০০০০০ সৈন্য নিয়ে আবারও হামলা চালাতে চাইল বায়তুল মুকাদ্দাসে। প্রখ্যাত রণকৌশলী সুলতান সুকৌশলে তাদের আকসার দিকে নিয়ে এসে এখানেই ব্যস্ত রাখতে চাইলেন যাতে এই শক্তিকে এখানেই শেষ করে দিয়ে আল্লাহর পবিত্র ঘর বায়তুল মুকাদ্দাসকে রক্ষা করা যায়। আকসা আক্রমণ করে ক্রুসেডাররা নারী শিশু সহ ৩০০০ মুসলিমের হাত-পা বেঁধে তাঁদের হত্যা করে ফেলে।
অপরদিকে মুসলমান সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১০০০০। এই দশ হাজার সৈন্য প্রাণপণ লড়াই করে তিন লাখ সৈন্যকে ধরাশয়ী করে ফেলে।
সুলতান বুঝলেন বায়তুল মুকাদ্দাসকে পাওয়ার জন্য শত্রুপক্ষ আশেপাশের অঞ্চলগুলোও দখল করতে চাইবে। তাই সুলতান নিজেই কাছাকাছি সব অঞ্চলগুলো তছনছ করে দিলেন। ফলে সম্রাট রিচার্ড যতই সামনে এগোতে লাগলেন শুধু ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। রিচার্ড মুসলমান সৈনিকদের নির্ভীকতা দেখে বুঝতে পারলেন বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করা এত সহজ হবেনা। আসলেই যে জাতি নিজ ধর্মের জন্য এতো কোরবানী দিতে পারে তাদেরকে দুনিয়া থেকে উৎখাত করার দু:সাহস কে করতে পারে? এদিকে রিচার্ড গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলেন। মানবতার এই রাষ্ট্রনায়ক সুলতান আইয়ুবী দেখতে গেলেন রিচার্ডকে। নির্বাক হয়ে রিচার্ড বললে “সত্যিই আপনি মহান! সালাহউদ্দিন। সত্যিই আপনি এক অনন্য যোদ্ধা।”
১১৯২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রিচার্ড সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে একটি সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করলেন এবং তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে ইংল্যান্ডে যাত্রা করলেন।১১৯৩ সালের ৪ মার্চ এই মহান নেতা চলে যান তার প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে।
যুগসন্ধিক্ষণ : প্রয়োজন এক জন আইয়ুবীর : সভ্যতার পালা বদলে দীর্ঘ আটশত বছর পরে মুসলমানদের ভেতর পারস্পারিক অনৈক্যের কবলে পড়ে পবিত্র আল আকসায় আবার উড়ল ইহুদীদের পতাকা। সেই একই কৌশল। অনৈতিকতার বিষাক্ত ছোবল গ্রাস করে নিল মুসলিম সভ্যতা, সংস্কৃতি। মুসলমানদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে অট্টউল্লাসে নৃত্য করছে বাতিল শক্তি। শুধু ফিলিস্তিন নয় একের পর এক দখল করছে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো। চালানো হচ্ছে মানবিকতার উপর এক ভয়াল নির্যাতন। পারলে মুসলমানদের কলিজা চিবিয়ে আনন্দ করছে বর্বর হায়েনারা। এই পরাশক্তিগুলো দমনে আজ প্রয়োজন এক “গ্রেট সালাহউদ্দিনের”, যার দুঃসাহসিকতা দেখে বৈরী হাওয়া মুছে দিবে সব নীচতা, হীনতা আর অমানবিকতার সব আস্ফালন। প্রস্ফুটিত হবে এক নতুন সূর্যোদয়ের

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Instagram