যৌতুকবিরোধী আন্দোলন – আল্লামা আবুল কাশেম নূরী

নিজস্ব সংবাদদাতা ♦
যৌতুকবিরোধী আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে- আল্লামা আবুল কাশেম নূরী”

আন্তর্জাতিক মুফাসসিরে কুরআন ও পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরীর (মজিআ) আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ ৯ মার্চ শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত যৌতুক ও মাদকবিরোধী মহাসমাবেশে লাখো যুবক যৌতুকমুক্ত বিয়ের শপথ করেছে। সেই সঙ্গে তারা সমস্বরে মাদককে ‘না’ বলে মাদকমুক্ত সুন্দর পরিচ্ছন্ন জীবন গড়ার শপথ নিয়েছে। আনজুমানে রজভীয়া নূরীয়া বাংলাদেশ এর আয়োজনে এবং আল্লামা আবুল কাশেম নূরীর আহ্বানে যৌতুক ও মাদকবিরোধী দশম মহাসমাবেশে আজ বক্তারা বলেছেন, যৌতুক দেয়া-নেয়া দুটোই ঘৃণ্য নিকৃষ্ট পন্থা। যৌতুকের অভিশাপ গøানি থেকে লাখো গরিব অসহায় পরিবারগুলোকে বাঁচাতে যৌতুক দেয়া নেয়ার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ঘরে ঘরে এই সামাজিক দুষ্টক্ষতের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ ও গণঘৃণাবোধ জাগ্রত করতে হবে। বক্তারা যৌতুক, নারী নিপীড়ন, শিশু নির্যাতন, অ্যাসিড সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও মাদকমুক্ত দেশ ও সমাজ গড়তে সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহŸান জানান।

বক্তারা দল মত শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে এসব দুষ্টক্ষেত নির্মূল করার ওপর গুরুত্বরোপ করেন। আনজুমানে রজভীয়া নূরীয়া বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যৌতুক ও মাদকবিরোধী মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আলহাজ্ব আ.জ.ম নাছির উদ্দীন। উদ্বোধক ছিলেন সীতাকুন্ড আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুহাম্মদ দিদারুল আলম। মুখ্য আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মহাসচিব মাওলানা এম এ মতিন। প্রধান অতিথি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বলেন, যৌতুক ও মাদক আজ জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে যৌতুক ও মাদকবিরোধী মহাসমাবেশে মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন।

এসব সামাজিক কুসংস্কার ও অবক্ষয় প্রবণতা থেকে বাঁচতে হলে জাতীয় জাগরণ ও সম্মিলিত সচেতনতা জরুরি। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে যৌতুক ও মাদকের গøানি থেকে নিস্কৃতি মিলবে বলে আশা করা যায়। আল্লামা নূরী এ ধরণের গণমুখী উদ্যোগ নেয়ায় মেয়র তাঁকে ধন্যবাদ জানান এবং সবরকম সহযোগিতায় আশ্বাস দেন।

উদ্বোধক সংসদ সদস্য দিদারুল আলম বলেন, শুধু সরকার একার পক্ষে যৌতুক ও মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বিত প্রয়াস। আলেম সমাজ সোচ্চার হলে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে এসব সামাজিক অভিশাপ থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি। মূখ্য আলোচক মাওলানা এম এ মতিন বলেন, আলেম সমাজের অহংকার আল্লামা নূরীর দ্বীনি দায়িত্ববোধ ও মানবিক মমত্ববোধ দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। তাঁর মতো উলামা মাশায়েখরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে, নিজ নিজ দরবার ও খানকাহ থেকে এ ধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে গেলে যৌতুক-মাদকসহ সব ধরনের অপরাধ প্রবণতা থেকে আমরা রেহাই পেতাম। তিনি যৌতুক ও মাদকবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন।

বিশেষ অতিথি ড. মাসুম চৌধুরী বলেন, যৌতুক বিরোধী আইন থাকলেও আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই। ফলে এই সামাজিক কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। তিনি আল্লামা নূরীর এ ধরনের গণমুখী কাজে সকলের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন। সভাপতির বক্তব্যে যৌতুক ও মাদকবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা আল্লামা আবুল কাশেম নূরী বলেন, দ্বীনি দায়িত্ব, বিবেকের তাড়না ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমি যৌতুক ও মাদকবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছি চট্টগ্রাম থেকে। পর্যায়ক্রমে এ আন্দোলন সারা দেশ ছড়িয়ে দেয়া হবে ইনশাল্লাহ। তিনি তাঁর সূচিত এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ও সহযোগিতাকারী সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব মাস্টার মুহাম্মদ আবুল হোসাইন এবং শায়ের মুহাম্মদ মাছুমুর রশিদ কাদেরীর এর যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক আলহাজ¦ মুহাম্মদ নুরুল হক। মহাসমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন পীরজাদা গোলামুর রহমান আশরফ শাহ্, আন্জুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারী আব্দুর রশিদ দৌলতী, হাজ্বী সৈয়দ মুহাম্মদ সেলিম, মাওলানা সোলাইমান খান রাব্বানী, মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদী, আল্লামা ইউনুচ রজভী, মাওলানা যুন নুরাইন, মুহাম্মদ এনামুল হক ছিদ্দিকী, আল্লামা আবুল হাসান ওমাইর রজভী, আবু ছালেহ আঙ্গুর, মুহাম্মদ মিয়া জুনায়েদ, মাওলানা জাহাঙ্গীর রজভী, মাওলানা আব্দুল কাদেও রজভী, মাওলানা এনাম রেযা, মাওলানা দেলওয়ার হোসেন জালালী, পীরজাদা সৈয়দ আরিফ বিল্লাহ রাব্বানী, মাওলানা আবু বকর আনসারী, নাছির উদ্দিন মাহমুদ, মওলানা ইয়াছিন হায়দারী, ছাত্রনেতা নিজামুল করিম সুজন, ছাত্রনেতা ফরিদুল ইসলাম, আলহাজ্ব জহির সওদাগর, মুহাম্মদ হাসান, মুহাম্মদ তারেক আজিজ, মুহাম্মদ জাহিদুল হাসান রুবায়েত, মাওলানা সিরাজুল মোস্তাফা, মুহাম্মদ জাকারিয়া, মুহাম্মদ শফি, মাওলানা সোহাইল উদ্দিন আনসারী, মুহাম্মদ আব্দুল করিম সেলিম, মুহাম্মদ ফরিদুল আলম, হাবিবুল মোস্তাফা সিদ্দিকী, মুহিব্বুল্লাহ সিদ্দিকী, মাওলানা নেয়ামত উল্লাহ, মুহাম্মদ ইদ্রিচ, শায়ের এনামুল হক, মুহাম্মদ ওমর ফারুক, মুহাম্মদ খোরশেদ, মুহাম্মদ ওসমান, শায়ের মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, শায়ের ছালামত রেযা, মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, মিনহাজ উদ্দিন সিদ্দিকী, আবদুল্লাহ আল রোমান,মুহাম্মদ মাহফুজ, মুহাম্মদ আরাফাত প্রমূখ। সালাত সালাম শেষে দেশ-জাতির সমৃদ্ধি, কল্যাণ এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের শান্তি কামনায় মুনাজাত করা হয়। অন্ধকারকে তাড়াতে হলে লাঠিপেটা করে তাড়ানো যায় না, আলো দিয়ে তাড়াতে হয়। আসলে অন্ধকার বলতে কিছুই নেই আছে আলোর অনুপস্থিতি। আলোকে সামনে রাখলে অন্ধকার পিছনে পড়ে। আলোকিত মানুষ আল্লামা আবুল কাশেম নুরী আলোকে সামনে নিয়ে সামাজিক অন্ধকার দূরীভূত করতে আন্দোলন করছেন তাতে মুসলমান হিসেবে সাড়া দেওয়া সকলের ঈমানি দায়িত্ব।
মনীষীরা বলেছেন, ‘ঐ যুদ্ধই প্রকৃত যুদ্ধ যে যুদ্ধে কেই পরাজিত হয় না’। অশিক্ষার বিরুদ্ধে শিক্ষার যুদ্ধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধ, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর যুদ্ধ, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুস্থ সংস্কৃতির যুদ্ধে কেউ পরাজিত হয় না। তিনি যৌতুক নামক এক সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে ইসলামের সুস্থ সংস্কৃতি দ্বারা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন আন্দোলন, সেমিনার, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, দেশে যৌতুকের কারণে অসহায় পিতা তার সামান্য শেষ সম্বল বাড়ি-ভিটে, এক খন্ড জমি হালের গরু বিক্রি করে ভিক্ষুকে পরিণত হচ্ছে। একটি বিয়ে, ইসলামের একটি বিধানকে কেন্দ্র করে একটি পুরো পরিবার বিপন্ন হচ্ছে, ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিচ্ছে। যে কুপ্রথা মানুষকে ভিক্ষুক বানায়, সে প্রথা ইসলামের বিধান হতে পারে না।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামী’। সুদ ও ঘুষকে যেরূপ হাদিয়া হিসেবে গণ্য করা যায় না, তদ্রুপ যৌতুককে উপহার হিসেবে গণ্য করা যায় না। যারা যৌতুককে সুদ ও ঘুষের ন্যায় হারাম মনে করে না, তাদের জানা উচিৎ সুদ ও ঘুষকে হাদিয়া বা উপহার হিসেবে গণ্য না করার যে কারণ রয়েছে যৌতুকের বেলায় একই কারণ বিদ্যমান।

মাদক ও যৌতুক

মাদক ও যৌতুক প্রথা বিরোধী আন্দোলন এবং আঞ্জুমানে রজভীয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আল্লামা আবুল কাসেম নুরী (মঃ জিঃ আঃ) বলেছেন, মাদক ও যৌতুক ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক হারাম ও নিষিদ্ধ তেমনিভাবে বাংলাদেশের আইনে অপরাধ।

তাই সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদক ও যৌতুকপ্রথা বন্ধ করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। ২ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির শিল্পনগরী মোচ্ছাফ্ফার ডায়মন্ড রেস্টুরেন্ট হলে তাকে দেয়া সংবর্ধনা ও মিলাদ মাহফিলে বক্তব্যে এসব কথা বলেন। আমিরাতের আল নুর ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান নু আ ম বদরুদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাওলানা নুরুল আমিন ও মাওলানা জয়নুল আবেদীন আল কাদেরী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ আকতার সুপার মার্কেট গ্রুপের কর্ণধার আলহাজ মোহাম্মদ আকতার সিআইপি, আলহাজ মোহাম্মদ শাহ আলম, আলহাজ মোহাম্মদ ইউনুস সওদাগর প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের সংবর্ধিত অতিথি ও প্রধান অতিথি আল্লামা আবুল কাসেম নুরী (মঃ জিঃ আঃ) যৌতুক ও মাদকের কুফল, সামাজিক অবক্ষয় ও এসব হতে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে কুরআন হাদিসের আলোকে বিশদ আলোচনা করেন। জনাকীর্ণ এ অনুষ্ঠান আমিরাতের বিভিন্ন প্রান্ত হতে যৌতুকহীন অর্থাৎ যৌতুক ছাড়া বিয়ে করেছেন এমন অনেক প্রবাসী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ভবিষ্যতে যৌতুক ছাড়া বিয়ে করবেন এমন অনেক তরুণ প্রবাসী হাত তুলে তাঁর সঙ্গে ওয়াদা করেন। তিনি মোটা অংকের বিয়ের কাবিন ও দেনমোহর পরিহার করার বিষয় নিয়েও নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেন এবং সকলকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি কুরবানির ঈদে নববিবাহিত বর কনে পক্ষের গরু ছাগল দেয়া নেয়ার প্রথা থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মুসলমানরা মহানবী (সাঃ) এর জীবনাদর্শ ও তার নির্দেশিত বিধান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ফলে সারাবিশ্বে মুসলমানরা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষে আলহাজ মোহাম্মদ ওসমান তালুকদার অনুষ্ঠানে আগত সকল প্রবাসীদের ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানে মাওলানা নুরুল আবছার আল্লামা নুরী সাহেবকে নিয়ে লেখা তার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শুনান। পরিশেষে মিলাদ কিয়াম শেষে মোনাজাতে দেশ, জাতি, প্রবাসীদের কল্যাণে ও আমিরাতের শাসকদের জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়


আজ সমাজে যৌতুকের দাবি মোহরানা হতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যৌতুক মোহরানার মত নির্ধারিত হয়। নির্ধারিত যৌতুক ও ওয়াজিবের মত আদায় করতে হয় কিন্তু মোহরানা কর্তব্য হলেও আদায় করা হয না। আমরা নিষিদ্ধ বস্তুকে কর্তব্য করে নিয়েছি। অথচ এটি জাহান্নামের কাজ।
‘কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা’ কথাটি আইয়্যামে জাহেলিয়াতের। সে সমাজে কন্যাকে দায় বা অভিশাপ মনে করা হতো। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির সেরা উন্নতির যুগে দাঁড়িয়ে মুসলমানগণ জাহেলিয়াতের ধারণা পোষণ করবে কেন ? দায় মনে করছি বলেই নারী সমাজকে পণ্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই অপসংস্কৃতি হতে বের হয়ে ইসলামের নারীর মর্যাদা আত্মস্থ করতে না পারলে কখনো নারী মুক্তি আসবে না মনে করেন আল্লামা আবুল কাশেম নুরী (মা.জি.আ.)।
তিনি মনে করেন, মুসলমান একে অপরের ভাই বা বোন। এখানে বর্ণবাদ নেই। ভ্রাতৃত্বের আবেদন হলো পরস্পরকে দায়মুক্ত রাখা। তাই অসহায় কন্যার পিতার পাশে দাঁড়ানো মুসলমান হিসেবে আমার কর্তব্য। মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী জাতিকে বড় সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। আমরা যৌতুকের কারণে নারী জাতিকে অপমান করছি। সম্মানিত নারী সমাজকে অসম্মান করা বস্তুত ইসলামকে অসম্মান করার নামান্তর।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘কন্যা সন্তান লালন-পালন করলে জান্নাতে পাবে। আমরা তো সবাই অনেক কষ্ট করে জান্নাত খুঁজি। তিনি ইরশাদ করেছেন, সে জান্নাত একজন ‘মা’ নামক মহিলার পদতলে। নবী (দ.) কোন সম্পত্তির মালিক নন, তাঁর ওপর যাকাতও ফরজ নয়, কিন্তু নারীর অর্থনেতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর স্ত্রীর মোহরানা ফরজ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে নবী! আমি তোমাদের জন্য বৈধ করেছি তোমাদের স্ত্রীদেরকে যাদের মোহরানা তুমি প্রদান করেছো’। (৩৩ : ৫০)
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল স্ত্রীকে মোহরানা প্রদান করে বিয়ে করেছেন। হাদিসে পাকে বর্ণিত আছে, উম্মুল মোমেনিন খাদিজাতুল কোবরা (রা.)’র মোহরানা ছিল ৫০০ দিরহাম। উম্মুল মোমেনিন হযরত সাওদা (রা.)’র মোহরানা ছিল ৪০০ দিরহাম। উম্মুল মোমেনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)’র মোহরানা ছিল ৫০০ দিরহাম। উম্মুল মোমেনিন হযরত জয়নব বিনতে খুযায়মা (রা.) কে মোহরানা প্রদান করেছিলেন ১২ উকিয়া ও একটি চাদর। উম্মুল মোমেনিন উম্মে হাবিবা (রা.)’র মোহরানা ছিল ৪০০ দিনার যা হাবশার বাদশার নামাশী পরিশোধ করে দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি সব স্ত্রীকে মোহরানা প্রদানের মাধ্যমে শাদীয়ে মোবারক করেছিলেন।
ইসলামের সোনালী যুগে মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের শাসনকালে একটি ঘটনাও পাওয়া যাবে না যেখানে কন্যাকে মোহরানা না দিয়ে বর পক্ষের চাহিদা অনুযায়ী কনে পক্ষ কোন ধরনের অর্থ সম্পদ যৌতুক হিসেবে প্রদান করেছেন।
বড় বেশি বিস্ময়ক ব্যাপার এই যে, এখনো বাংলাদেশের ৯০ ভাগ বিয়ে যৌতুক যুক্ত। অথচ এদেশের ৯০ ভাগ মুসলমান বসবাস করেন। ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে কন্যাই লাভবান হওয়ার কথা। বর পক্ষ লাভবান হওয়ায় কোন ধরনের সুযোগ নেই। অথচ দেশের ৯০ ভাগ আজ কন্যা পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত। যৌতুক গ্রহণ করে কারো অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। বরং দাম্পত্য জীবন অসুখিই হয়েছে। কারণ বিবাহ একটি পণ্যময় ইবাদত। যা পবিত্র বাক্য দিয়ে সম্পাদিত হয়। এই পবিত্র বিয়ে অপবিত্রতার মাধ্যমে সম্পাদিত হওয়ার পর যৌতুককে কেন্দ্র করে পরিবারে কলহ লেগেই থাকে। যৌতুক দিয়েও এসব পরিবারের সমস্যার সমাধান হয় না। কম ছিল কেন, ভালো পণ্য ছিল না কেন, প্রতিযোগিতায় অন্যদের চেয়ে কম কেন, বছরব্যাপী নানা উৎসব উপলক্ষে বেশি করে উপহার ছিল না কেন, এসব নিয়ে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে। পরিবারে শান্তি আর ফিরে আসে না। কারণ যৌতুক নামের নৌকার মাঝি শয়তান।
ইসলাম অর্থ শান্তি। পৃথিবীর কোন ধর্মমতের নাম শান্তি নেই। মুসলিম অর্থ শান্তিকামী, আল্লাহর একটি নাম ‘সালাম’ অর্থাৎ শান্তি। যে মদিনার পবিত্র মাটিতে প্রিয়নবী সরকারে দোআলম মাহবুবে খোদা হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুয়ে আছেন, সে মদিনার একটি নাম ‘দারুস সালাম’ বা শান্তির গৃহ। ইসলাম শান্তির ধর্ম। এই ধর্মের নামে যৌতুকের নামে অশান্তির অমানবিক কর্ম কখনো ইসলাম অনুমোদন করে না। সকল রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনে চট্টগ্রাম ছিল অগ্রবর্তী ভূমিকায়। নানা সংকটে-দুর্দশায় দেশবাসীকে পথ দেখিয়েছেন চট্টগ্রামের বরেণ্য ব্যক্তিত্বগণ। ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম থেকে সূচিত যৌতুক ও নারী নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন আজ সবার নজর কেড়েছে। দেশ, সমাজ, মানুষ তথা নারীজাতির প্রতি দরদ, মমত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা থেকে ২০০৮ সনে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সর্বপ্রথম যৌতুক ও নারী নিপীড়নবিরোধী মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যা পরবর্তীতে চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ মার্চ শনিবার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠেয় যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ এবারসহ ৯ম বছরে পদার্পণ করছে। এর আগে ফটিকছড়ি ও পটিয়ায় যৌতুকবিরোধী সমাবেশ বেশ সাড়া জাগায়।
নারী নিপীড়ন বন্ধ করা, যৌতুক দেয়া-নেয়া বন্ধ, বরযাত্রী ভোজন নয়-ওয়ালিমা প্রথা চালু, যুবক-যুবতীদের জন্য ম্যারেজ ফান্ড গঠন, বিবাহিত যুবকদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা, যৌতুকমুক্ত বিয়ে সামাজিকভাবে চালু করা, কন্যাসন্তানের প্রতি অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণ বন্ধ করা এবং নারীদের সুুশিক্ষিত করে আদর্শ সুনাগরিক গড়ার পথ তৈরি করাসহ নানা দাবিতে যৌতুক বিরোধী এই মহাসমাবেশ আয়োজিত হচ্ছে প্রতি বছর। যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশের পাশাপাশি প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলও আয়োজন করে আসছেন আল্লামা নূরী (মজিআ)। কুরআন মজিদের অপব্যাখ্যা রোধ এবং সঠিক দর্শন তুলে ধরাই তাফসিরুল কুরআন মাহফিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার বিকাশে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আল্লামা নূরী প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রায় ১৬টি মাদ্‌রাসা, এতিমখানা ও হেফজাখানা।
সমাজের নেতৃস্থানীয় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হলেন আলেম সমাজ। আলেম সমাজ মাঠে ময়দানে, মসজিদে-ওয়াজ মাহফিলে ও গণমাধ্যমে কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে জনমত তৈরি করতে চাইলে তাতে সুফল মিলবে শতভাগ-এতে কারো সংশয় নেই। বরেণ্য আলেমে দ্বীন আন্তর্জাতিক বক্তা মুফাস্‌সিরে কুরআন পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরী (মজিআ) সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নারী সমাজের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকেই যৌতুকের অভিশাপ থেকে তাদেরকে মুক্ত করতে যৌতুকবিরোধী আন্দোলন আজ শাণিত করে তুলেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট। গন্তব্য নির্ধারিত।
গণমুখী কাজে তিনি নিজেকে উৎসর্গিত রেখেছেন। নারী সমাজের মতো মাতৃস্থানীয় মর্যাদাতুল্য একটি বিশেষ শ্রেণিকে সামাজিক কুপ্রথা, যৌতুকের গ্লানি থেকে উদ্ধারে জাতীয় জাগরণ গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ-এই হচ্ছে যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ আয়োজনের বড় লক্ষ্য। যৌতুকের কারণে ঘরে ঘরে চলা গরিব পরিবারগুলোর নীরব কান্না ও আহাজারি থামাতেই এ আন্দোলন ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।
ইসলামের কল্যাণমুখী দর্শন দেশে-বিদেশে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে তিনি বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরছেন, তেমনি সমাজের দুষ্টক্ষত নারী নিপীড়ন ও যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে বরাবরই তিনি সোচ্চার থেকেছেন। গত দুই বছর আগে চট্টগ্রামের পটিয়ায় অনুষ্ঠিত যৌতুকবিেেরাধী সমাবেশে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী। যৌতুকবিরোধী এ সফল গণআন্দোলন সারাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এই সাংসদ আল্লামা নূরীর প্রশংসা করে বলেন, যে দায়িত্ব সরকারের পালন করার কথা, সেই দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিলেন বরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আবুল কাশেম নূরী।
১৮ মার্চ শনিবার চট্টগ্রাম লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠেয় যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ সফল হোক এবং এতে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে যৌতুকবিরোধী জনমত গড়ায় এগিয়ে আসুক – এই আমাদের কামনা। যৌতুকের অভিশাপ থেকে নারীসমাজ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারগুলোকে বাঁচাতে চাই সামাজিক সচেতনতা ও গণজাগরণ। সেই সাথে দরকার রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ। যৌতুকবিরোধী আইন দেশে রয়েছে। যৌতুক দেয়া-নেয়ার জন্য আইনগত শাস্তির বিধানও রয়েছে।
যৌতুকজনিত কারণে নারী নির্যাতন ও হত্যা করা হলে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে গত ৩০ জানুয়ারি আরেকটি আইন সংসদে পাস হয়েছে। আমরা মনে করি, যৌতুকবিরোধী আন্দোলনের ফসল হলো এ আইন। এজন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। যৌতুকবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ দুষ্টক্ষত থেকে নারীসমাজ তথা সমাজের রেহাই মিলবে না। শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই। সবাই সচেতন হলে এবং আল্লামা নূরী সাহেবের মতো নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই দায়িত্ব পালন করলে যৌতুকমুক্ত স্বদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে নিঃসন্দেহে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Instagram