মুসলিম বিজ্ঞানী মানষীর অবদান

চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য

পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নাই চিকিৎসা সম্পর্কে এমন ধারণা বা জ্ঞান বা রোগ সম্পর্কে বলা হয়েছে। একমাত্র ইসলালাম ধর্ম ছাড়া। তাই ইসলাম ধর্ম কে আবার চিকিৎসা বিজ্ঞান ধর্ম বলা যায়। পবিত্র বা পাক  অথবা পরিষ্কার থাকার কথা শুধু ইসলামেই আছে।

পবিত্র কুরআনে মানুষ শব্দটি এসেছে ৬৫ বার মানুষ = ( মাটি- ১৭ বার + বীর্য ফোটা- ১২ বার + ভ্রুন- ৬ বার + মাংসপিন্ড- ৩ বার + হার- ১৫ বার + মাংস- ১২ বার) = ৬৫। অর্থাৎ মানুষ তৈরীর বিভিন্ন উপাদানগুলো কোরআনে যতবার করে এসেছে এই রিপিটেসনের সংখ্যার যোগফল আর মানুষ শব্দটির শব্দটার রিপিটেসনের সমান। (মানুষ= মটি+বীর্যফোটা+ভ্রুন+মাংসপিন্ড+হার+মাংস) এটা কি এমনি এমনি মিলে গেছে ?

ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে অনেক থিওরি বর্ণনা করেছেন। রোগ নিরাময় ও উপশমের পদ্ধতি বলেছেন। নিজ হাতে চিকিৎসা করেছেন এবং নিজ আবিষ্কৃত পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন। হাদিসের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ বুখারি শরিফে ‘তিব্বুন নববী’ শীর্ষক অধ্যায়ে ৮০টি পরিচ্ছেদ রয়েছে। প্রতিটি পরিচ্ছেদের অধীনে হাদিস রয়েছে কয়েকটি করে। সব হাদিসই রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি, রোগ নিরাময় ও রোগ প্রতিরোধ কার্যাবলি সংবলিত। আর তিনি নিজ হাতে শিক্ষা দিয়েছেন সঙ্গীদের। Prof. Brown বলেন, ‘নবী মুহাম্মদ (সা.) চিকিৎসা বিজ্ঞানকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন।’ রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা হিসেবে মহানবী (সা.) মোটামুটি পাঁচটি পদ্ধতি ব্যবহারের উল্লেখ করেছেন—১. হাজামাত বা রক্তমোক্ষণ পদ্ধতি। ২. লোলুদ বা মুখ দিয়ে ওষুধ ব্যবহার। ৩. সা’উত বা নাক দিয়ে ওষুধ ব্যবহার। ৪. মাসী’ঈ বা পেটের বিশোধনের জন্য ওষুধ ব্যবহার। ৫. কাওয়াই বা পেটের বিশোধনের ওষুধ ব্যবহার। আর ওষুধ হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন মধু, কালিজিরা, সামুদ্রিক কুন্তা বা বুড়, খেজুর, মান্না বা ব্যাঙের ছাতার মতো এক প্রকার উদ্ভিদ, উটের দুধ প্রভৃতি। (সূত্র : বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, মুহাম্মদ রহুল আমীন, পৃষ্ঠা ৬০)

ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দুনিয়ার জগতে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর হাসপাতাল ছিল অস্থায়ী। যুদ্ধের ময়দানে অসুস্থ বা জখম হওয়া ব্যক্তিদের জন্য তাঁবু করে সেখানে তাদের রোগ নিরাময়ে ওষুধ ব্যবহার ও সেবা-যত্ন করতেন। সাহাবিদের দিয়ে অসুস্থদের সেবা করাতেন।

রাসুল (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ চিকিৎসাব্যবস্থা জানতেন। এ বিষয়ে আলী (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে পাওয়া যায়। ইসলামী খেলাফত আমলে মিসরের গভর্নর হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসাবিষয়ক উপদেষ্টা ইয়াহইয়া আন নাহবি চিকিৎসাবিষয়ক অমূল্য গ্রন্থাবলি রচনা করেন। তিনি প্রথম আরব চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি ইজিয়ান দ্বীপের কালজয়ী চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিপোক্রিটিস (৪৬০-৩৭৭ খ্রিস্টপূর্ব) এবং গ্যালেনের (২০০-১৩০ খ্রিস্টপূর্ব) গ্রন্থগুলোর ওপর গবেষণাধর্মী পুস্তকও প্রণয়ন করেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অগ্রগতির এ ধারা উমাইয়া শাসনামলেও অব্যাহত থাকে। খালিদ ইবনে ইয়াজিদ বা জ্ঞানী খালেদের উদ্যোগে চিকিৎসাবিজ্ঞানসংক্রান্ত গ্রিক গ্রন্থগুলো আরবিতে অনূদিত হয়। খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের উদ্যোগে চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থাবলিসহ প্রথম পাবলিক লাইব্রেরিটি সিরিয়ার দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই যুগে বসরার ইহুদি চিকিৎসাবিদ হারুন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে লেখেন বিখ্যাত ‘মেডিক্যাল ইনসাইক্লোপিডিয়া’। ইয়াজিদ ইবনে আহমদ ইবনে ইবরাহিম লেখেন ‘কিতাবুল উসুল আত তিব্ব’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি। খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান সর্বপ্রথম বিপুল অর্থ ব্যয় করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এক বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা আল মামুন ও মুতাসিমের আমলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)ও চিকিৎসাশাস্ত্রে রেখে যান যুগান্তকারী অবদান। তাঁর হাত ধরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পূর্ণতা ও সজীবতা আসে। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তাঁর ওপর নাজিলকৃত কোরআন চিকিৎসাশাস্ত্রের আকরগ্রন্থ। মায়ের পেটের ভেতর বাচ্চার ধরন ও ধারণের কথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে পবিত্র কোরআন। কোরআন জগতের বিস্ময়। চিকিৎসাশাস্ত্রে কোরআনের অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে জার্মান পণ্ডিত ড. কার্ল অপিতজি তাঁর ‘Die Midizin Im Koran’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ৯৭টি সুরার ৩৫৫টি আয়াত চিকিৎসাবিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট। ৩৫৫টি আয়াতে মানবদেহের সব বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধান দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমনই গৌরবময় ইতিহাস আছে মুসলমানদের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে চতুর্দশ শতকে মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ সব কিছু থেকে আধিপত্য কমতে থাকে। চুরি হয়ে যায় অনেক থিওরি। আজ যদি মুসলমানদের আবিষ্কার, থিওরি ও লিখিত গ্রন্থাদি থাকত, তাহলে বিশ্ব পেত সভ্যতার চূড়ান্ত পাঠ ও আশাতীত কিছু উদ্ভাবন।

জগতের প্রথম মানুষরা পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মে খাদ্য সংগ্রহ ও রোগ-ব্যাধি মোকাবেলায় যে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল, তা থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রের সূত্রপাত। আর তখনকার চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল তাদেরই আবিষ্কৃত ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি। রোগের সুস্থতার জন্য ঝাড়ফুঁক ছিল তাদের একমাত্র পথ্য। এরপর মানুষের হাত ধরে আসে লতা-পাতা ও গাছগাছড়ার ব্যবহার। গাছের পাতা, গাছের গোটা ও ফলে খুঁজে পায় সুস্থতার নিরাময়। আজ পর্যন্ত পৃথিবীপাড়ার অলিগলিতে বনজ বা গাছগাছালির সাহায্যে চিকিৎসা অব্যাহত আছে।

হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে চিকিৎসাশাস্ত্র একটি অবকাঠামোর রূপ পায়। ইতিহাসবিদ আল কিফতি তাঁর ‘তারিখুল হুকামাত’-এ লিখেছেন, ‘ইদ্রিস (আ.) হলেন প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানী। এ বিষয়ে তাঁর কাছে ওহি আসে।

মানুষ সৃষ্টির প্রথম থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রের সূচনা। মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজনের তাগিদে জন্ম থেকেই চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। মানুষের ভালো ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা নির্ভর করে শারীরিক সুস্থতার ওপর। মন ফুরফুরে থাকার মধ্যে। আর কেউ পীড়িত বা রোগা থাকলে মন-মেজাজে, চলনে-বলনে হয়ে ওঠে অসাড়। এমন ব্যক্তি থেকে পৃথিবী ভালো কিছু আশা করতে পারে না। সুস্থ মানুষ মানেই সুস্থ পৃথিবী। সুতরাং মানুষ ও পৃথিবীকে সুস্থ-সুন্দর রাখতে চাই সুস্থ জীবন।ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মুসলিম
চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চা শুরু করেন। সেই যুগে গ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি সবচেয়ে উন্নত ছিল এবং আস্তে আস্তে রোমানদের অবহেলার কারনে এর অবনতি হতে থাকে। মুসলমানরা গ্রিক, মিসরীয়, খৃষ্টান, ইয়াহুদি, ভারতীয়, পারসিক ও চীনা বিজ্ঞানীদের লব্ধ জ্ঞান আহরণ করেন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভুত উন্নতি সাধন করেন। নবম থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে পৃথিবীর বুকে তাদের প্রাধান্য বজায় রাখেন। সে সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার চর্চা চলে।যেমন শরীরতত্তে  ইবনে_মাসুবিয়াহ (৭৮০-৮৫৭) সর্বপ্রথম শিম্পাঞ্জী ও বানরের শবব্যবচ্ছেদ করে গ্রিকদের দেয়া তথ্য সঠিক কিনা জানতে চেষ্টা করেন। # আল_রাযী(৮৫০-৯৩২) সর্বপ্রথম কয়েকটি স্নায়ু আবিষ্কার করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানী # আলী আব্বাস সর্বপ্রথম কৈশিক রক্ত সঞ্চালনের উল্লেখ করেন। ১২শ শতাব্দীতে মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক # আবদুল লতিফ একখানি এনাটমি গ্রন্থ রচনা করে সেখানে গ্যালেনের ভুলগুলো দেখিয়ে দেন।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হলো, চোয়ালে একখানি হাড় আছে, দু’খানি নয়। আরব চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন মাথার খুলিতে ৭ টি হাড় আছে। ১৪ শতাব্দীতে # মনসুর_ফকীহ_বিন_ইলিয়াস একখানি মনোগ্রাফ বা চিত্রে এনাটমি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এটিই হচ্ছে এধরনের প্রথম গ্রন্থ। শরীরবিদ্যাতেও (ফিজিওলজি) মুসলিম বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট অবদান রেখেছন। এদের মধ্যে # আবু সহলের মতে খাদ্যের হজমক্রিয়া মুখ থেকেই প্রথম শুরু হয় এবং মুখের লালাই এই হজমের কাজ শুরু করে।#আবু জাফর আল তাবারী (৮৩৮-৯২৩)প্রথম প্রমাণ করেন যে, হজম প্রকৃত পক্ষে খাদ্যের ভাংগন। # আবু_মহল মাসিহী বলেছেন, খাদ্য ক্ষুদ্রান্ত্র থেকেই বেশী আহরিত হয়, যা এখন ও সত্য বলেআধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান স্বীকার করে। ১০৫০-১৬৫০ খৃষ্ট : পর্যন্ত # ইবনে সিনার “কানুন ফিত তিব্ব” ইউরোপের মেডিকেল ফ্যাকাল্টি কর্তৃক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে নির্ধারিত ছিল।#ইবনে সিনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে কুসংস্কার পরিহার করতে পরামর্শ দিয়েছেন। তখনকার দিনে গ্যালেন এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করে #ইবনে নাফিস প্রমাণ করেন যে, দুষিত রক্ত হ্রৎপিন্ডের ডান দিক থেকে ফুসফুসে যায়। সেখানে বাতাসের সংগে মিশ্রিত হয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে পালমুনারী শিরা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হ্রৎপিন্ডের বাঁ দিকের নিলয়ে পৌঁছে এবং সেখান থেকে ধমনীর সাহায্যে সারা শরীরে প্রবাহিত হয়। আধুনিক বিশ্বে এর স্বীকৃতি মেলে ১৯৩৬ সালে। রোগবিদ্যাতেও মুসলিম বিজ্ঞানী দের অবদান মনে রাখার মত। #ইবনে সিনা রোগ জীবাণুর আক্রমণ সম্বন্দ্বে প্রথম ঘোষণা করেন যে, শরীরের বাইরে থেকে জীবাণু শরীরের মধ্যে প্রবেশ না করলে সংক্রমণ হয় না এবং সংক্রামক রোগ হতে পারেনা। তিনিই ঘোষণাকরেন, যক্ষা একটা সংক্রামক রোগ।#আল_রাযী সর্বপ্রথম বসন্ত ও হাম রোগের বিবরণ দেন। # ইবনুল খাতিব (১৩১৩-১৩৭৮) প্লেগ কে একটা সংক্রামক রোগ বলে ঘোষণা করেন। ১১শ শতাব্দীতে # আল_জুরমানী সর্বপ্রথম গলগণ্ড ও চক্ষু বাইরের দিকে বিস্ফোরিত হওয়া সম্পর্কে ঘোষণা দেন।একই শতাব্দীতে # ইবনে_যোহার সর্বপ্রথম চুলকানির জীবাণু আবিষ্কার করেন।# বাহাউদ্দৌলা প্রথম হুপিং কাশি রোগের জীবাণু নির্ণয় করেন।

মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূচনা বলতে যা বোঝায়, তা হয়েছিল আব্বাসীয় শাসনামলে। অধ্যাপক কে আলী লেখেন—‘আরবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত উন্নতি সাধিত হয় আব্বাসীয় আমলে। রাজধানী বাগদাদসহ বড় বড় শহরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। সর্বপ্রথম আলাদা আলাদা ইউনিটে পুরুষ ও মহিলাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। যথাযথ চিকিৎসক কর্তৃক যাতে যথার্থ ওষুধ প্রয়োগ নিশ্চিত হয়, সে জন্যও চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষক নিযুক্ত করা হয়।

নবম শতাব্দীতে মুসলিম মনীষীরাই সভ্যতার প্রকৃত পতাকার বাহক ছিলেন। নবম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ছিল মুসলিম মনীষীদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের স্বর্ণযুগ। এ শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন আবু আলী আল হুসাইন ইবনে সিনা। ইসলামের অন্যতম এ চিকিৎসাবিজ্ঞানী পুরো বিশ্বে চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক বলে সুপরিচিত। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। তাঁকে একই সঙ্গে ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান ও রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা তাঁদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে দাবি করেন।

ইবনে সিনা ছাড়াও চিকিৎসাশাস্ত্রে মৌলিক গবেষণায় অভাবনীয় অবদান রাখেন প্রসিদ্ধ কয়েকজন মুসলিম মনীষী। তাঁদের মধ্যে হাসান ইবনে হাইসাম, আলবেরুনি (৯৭৩-১০৪৮), আলী ইবনে রাব্বান, হুনাইন ইবনে ইসহাক (চক্ষু বিশেষজ্ঞ), আবুল কাসেম জাহরাবি মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ), জুহান্না বিন মাসওয়াই (চক্ষুশাস্ত্রের ওপর প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রণয়ন করেন), সিনান বিন সাবিত, সাবিত ইবনে কুরা, কুস্তা বিন লুকা, জাবির ইবনে হাইয়ান, আলী আত তাবারি, আর-রাজি, ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮), আলী ইবনে আব্বাস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

ইবনে সিনা : সর্বকালের অন্যতম সেরা চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক আবু আলী হুসাইন ইবনে সিনা বর্তমানে উজবেকিস্তানের রাজধানী বুখারার কাছে (৯৮০-১০৩৭) জন্মগ্রহণ করেন। ইউরোপে আভিসিনা নামে পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল কানুন ফিত তিব’ আরবজগ থেকে আনীত সর্বাধিক প্রভাবশালী গ্রন্থ। একে চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল বলা হয়। ইবনে সিনার কানুন সম্পর্কে অধ্যাপক হিট্রি বলেন, কানুনের আরবি সংস্করণ ১৫৯৩ সালে রোমে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এটি একটি প্রারম্ভিক যুগের মুদ্রিত গ্রন্থ। আরবি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর স্থান অদ্বিতীয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর রচিত ১৬টি মৌলিক গ্রন্থের ১৫টিতে তিনি বিভিন্ন রোগের কারণ ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন।

মানবসভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর চেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ এখনো পর্যন্ত আর দ্বিতীয়টি নেই। পাঁচ খণ্ডে এবং ৮০০ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত এই চিকিৎসা বিশ্বকোষে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যেক যেন একসঙ্গে বেঁধে ফেলেছেন।

আলী আত-তাবারি : আলী আত তাবারি (৮৩৯-৯২০) ছিলেন মুসলিম খলিফা মুতাওয়াক্কিলের গৃহচিকিৎসক। তিনি খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ফেরদৌস উল হিকমা’ নামে একখানা বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে শুধু চিকিৎসাশাস্ত্রই নয়—দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা সম্পর্কেও আলোচিত হয়েছে। এটি গ্রিক, ইরানি ও ভারতীয় শাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে।

আর-রাজি
মুসলিম চিকিৎসাবিদদের মধ্যে আবু বকর মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া আর-রাজি (৮৬২-৯২৫) ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একজন চিকিৎসাবিদ। মানুষের কিডনি ও গলব্লাডারে কেন পাথর হয়, সে সম্পর্কে তিনি একটি মৌলিক তথ্যপূর্ণ বই লিখেছেন। লাশ কাটার বিষয়ে তিনি লিপিবদ্ধ করেন ‘আল জুদারি ওয়াল হাসবাহ’। এটি লাতিন ও ইউরোপের সব ভাষায় অনুবাদ করা হয়। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে ‘আল হাবি’। এতে সব ধরনের রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বইটিতে তিনি প্রতিটি রোগ সম্পর্কে প্রথমে গ্রিক, সিরীয়, আরবি, ইরানি ও ভারতীয় চিকিৎসা প্রণালীর বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তারপর নিজের মতামত ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। মুসলিম চিকিৎসাবিদদের মধ্যে আবু বকর মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া আর-রাজি (৮৬২-৯২৫) ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একজন চিকিৎসাবিদ। দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। এর অর্ধেকই ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কীয়। প্রায় প্রতিটি রোগ সম্পর্কেই তিনি ছোট ছোট বই লিখে গেছেন। মানুষের কিডনি ও গলব্লাডারে কেন পাথর হয়, সে সম্পর্কে তিনি একটি মৌলিক তথ্যপূর্ণ বই লিখেছেন। লাশ কাটার বিষয়ে তিনি লিপিবদ্ধ করেন ‘আল জুদারি ওয়াল হাসবাহ’। এটি লাতিন ও ইউরোপের সব ভাষায় অনুবাদ করা হয়। শুধু ইংরেজি ভাষায়ই চল্লিশবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় বইটি। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে ‘আল হাবি’। এতে সব ধরনের রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বইয়ে ২০টি খণ্ড আছে। আল হাবির নবম খণ্ড ইউরোপের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ষোলো শতক পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছিল। বইটিতে তিনি প্রতিটি রোগ সম্পর্কে প্রথমে গ্রিক, সিরীয়, আরবি, ইরানি ও ভারতীয় চিকিৎসা প্রণালীর বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তারপর নিজের মতামত ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।

আলী আল মাওসুলি : চক্ষু চিকিৎসায় মুসলমানদের মৌলিক আবিষ্কার রয়েছে। আলী আল মাওসুলি চোখের ছানি অপারেশনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। জর্জ সার্টনও তাঁকে জগতের সর্বপ্রথম মুসলিম চক্ষু চিকিৎসক বলে অকপটে স্বীকার করেছেন। তাঁর ‘তাজকিরাতুল কাহহালিন’ চক্ষু চিকিৎসায় সবচেয়ে দুর্লভ ও মূল্যবান গ্রন্থ। চোখের ১৩০টি রোগ ও ১৪৩টি ওষুধের বর্ণনা রয়েছে এ বইয়ে। তিনিই প্রথম চোখের রোগের সঙ্গে পেট ও মস্তিষ্কের রোগের সম্পর্কিত হওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।

আল জাহরাত্তয়ি :
সার্জারি চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অপরিসীম। আনুমানিক ১০০০ সালের দিকে বিশ্বনন্দিত সার্জারি চিকিৎসক ছিলেন আল জাহরাত্তয়ি। তিনি সার্জারির ওপর প্রায় পনেরোশ’ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনিই সর্বপ্রথম সিজার অপারেশন করেছিলেন এবং শল্য চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফরসেপ বা চিমটে জাতীয় অস্ত্র উদ্ভাবন করেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমনই গৌরবময় ইতিহাস আছে মুসলমানদের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে চতুর্দশ শতকে মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ সব কিছু থেকে আধিপত্য কমতে থাকে। চুরি হয়ে যায় অনেক থিওরি। ১৩০০ শতকে মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রগুলোতে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল সেনারা ৩০ বছর ধরে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে অসংখ্য গ্রন্থাগার ও পুস্তাকালয় বিনষ্ট হয়। আজ যদি মুসলমানদের আবিষ্কার, থিওরি ও লিখিত গ্রন্থাদি থাকত, তাহলে বিশ্ব পেত সভ্যতার চূড়ান্ত পাঠ ও আশাতীত কিছু উদ্ভাবন। পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ পেত অভূতপূর্ব আরশি।

Share on Facebook

3 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *