মসজিদে নববী

মসজিদে নববী (আরবি: المسجد النبوي‎‎) মুহাম্মদ (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদ যা বর্তমান সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত। গুরুত্বের দিক থেকে মসজিদুল হারামের পর মসজিদে নববীর স্থান। মুহাম্মদ (সা) হিজরত করে মদিনায় আসার পর এই মসজিদ নির্মিত হয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ মসজিদ। মসজিদ দিনরাতের সবসময় খোলা থাকে।

মুহাম্মদ (সা) এর বাসগৃহের পাশে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মসজিদের নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন। সেসময় মসজিদ সম্মিলনস্থল, আদালত ও মাদ্রাসা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকরা মসজিদ সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করেছেন। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে আরব উপদ্বীপের মধ্যে এখানেই সর্বপ্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। মসজিদ খাদেমুল হারামাইন শরিফাইনের নিয়ন্ত্রণে থাকে। মসজিদ ঐতিহ্যগতভাবে মদিনার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। মসজিদে নববী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান বিধায় হজ্জের সময়ে আগত হাজিরা হজ্জের আগে বা পরে মদিনায় অবস্থান করেন।

উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের শাসনামলে সম্প্রসারণের সময় মুহাম্মদ (সা) এবং প্রথম দুই খুলাফায়ে রাশেদিন আবু বকর ও উমরের কবর মসজিদের অংশ হয়।মসজিদের দক্ষিণপূর্ব দিকে অবস্থিত সবুজ গম্বুজ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এটি আয়িশার বাড়ি ছিল। এখানে মুহাম্মদ (সা) এবং তার পরবর্তী শাসক দুইজন খলিফাকে দাফন করা হয়। ১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দে কবরের উপর একটি কাঠের গম্বুজ নির্মিত হয়। এটি পরবর্তীতে ১৫শ শতাব্দীতে কয়েকবার এবং ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে একবার পুনর্নির্মিত ও সৌন্দর্য‌বর্ধি‌ত করা হয়।বর্তমান গম্বুজটি ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ কর্তৃক নির্মিত হয়। এবং ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম সবুজ রং করা হয় ফলে এর নাম সবুজ গম্বুজ হয়েছে।

মুহাম্মদ (সা) ও রাশিদুন খিলাফত

হিজরতের পর মুহাম্মদ (সা) এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি একটি উটে চড়ে মসজিদের স্থানে আসেন। এই স্থানটি দুইজন বালকের মালিকানায় ছিল। তারা মসজিদের জন্য জায়গাটি বিনামূল্যে উপহার হিসেবে দিতে চাইলেও মুহাম্মদ (সা) জায়গাটি কিনে নেন। এরপর এখানে মসজিদ নির্মিত হয়। এর আকার ছিল৩০.৫ মিটার (১০০ ফু) × ৩৫.৬২ মিটার (১১৬.৯ ফু). খেজুর গাছের খুটি দিয়ে ছাদের কাঠামো ধরে রাখা হয়। ছাদে খেজুর পাতা ও কাদার আস্তরণ দেয়া হয়। এর উচ্চতা ছিল ৩.৬০ মিটার (১১.৮ ফু). এর তিনটি দরজা ছিল দক্ষিণে বাব-আল-রহমত, পশ্চিমদিকে বাব-আল-জিবরিল এবং পূর্বদিকে বাব-আল-নিসা।

খায়বারের যুদ্ধের পর মসজিদ সম্প্রসারণ করা হয়। এটি প্রত্যেক দিকে ৪৭.৩২ মিটার (১৫৫.২ ফু) বৃদ্ধি পায় এবং পশ্চিম দেয়ালের পাশে তিন সারি খুটি নির্মিত হয়।]প্রথম রাশিদুন খলিফা আবু বকরের শাসনামলে মসজিদের আকার অপরিবর্তিত ছিল। দ্বিতীয় খলিফা উমর মসজিদের আশেপাশে মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রীদের বাড়িগুলো ছাড়া বাকিগুলো ভেঙে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করেন। নতুন অবস্থায় মসজিদের আকার দাঁড়ায় ৫৭.৪৯ মিটার (১৮৮.৬ ফু) × ৬৬.১৪ মিটার (২১৭.০ ফু)। দেয়াল নির্মাণে মাটির ইট ব্যবহার করা হয়। মেঝেতে পাথর বিছানোর পাশাপাশি ছাদের উচ্চতা বৃদ্ধি করে ৫.৬ মিটার (১৮ ফু) করা হয়। এছাড়াও উমর আরো তিনটি দরজা সংযুক্ত করেন।

তৃতীয় খলিফা উসমান নতুন করে মসজিদ নির্মাণ করেন। এই কাজে দশ মাস সময় লাগে। নতুন মসজিদের আকার দাঁড়ায় ৮১.৪০ মিটার (২৬৭.১ ফু)  ৬২.৫৮ মিটার (২০৫.৩ ফু)। দরজার সংখ্যা ও নাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। পাথরের দেয়াল নির্মিত হয় এবং খেজুর গাছের খুটির বদলে লোহা দ্বারা সংযুক্ত পাথরের খুটি যুক্ত করা হয়। ছাদ নির্মাণের জন্য সেগুন কাঠ ব্যবহার করা হয়।

উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানীয় যুগ

৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদ মসজিদ সম্প্রসারণ করেন। এই কাজে তিন বছর সময় লেগেছিল। মসজিদের জন্য কাঁচামাল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। মসজিদের এলাকা উসমানের সময়ের ৫০৯৪ বর্গ মিটার থেকে বৃদ্ধি করে ৮৬৭২ বর্গ মিটার করা হয়। মসজিদ ও মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রীদের আবাসস্থলগুলো আলাদা করার জন্য দেয়াল নির্মিত হয়। মসজিদ ট্রাপোজয়েড আকারে নির্মিত হয় যার দৈর্ঘ্য ছিল ১০১.৭৬ মিটার (৩৩৩.৯ ফু)। মসজিদের উত্তরের একটি বারান্দা যুক্ত করা হয়। এছাড়াও এসময় চারটি মিনার নির্মিত হয়

আব্বাসীয় খলিফা আল মাহদি উত্তর দিকে মসজিদ ৫০ মিটার (১৬০ ফু) সম্প্রসারণ করেন। মসজিদের দেয়ালে তার নাম উৎকীর্ণ করা হয়। ইবনে কুতাইবার বিবরণ অনুযায়ী খলিফা আল মামুন এতে কাজ করেছেন। আল মুতাওয়াক্কিল মুহাম্মদ (সা) এর রওজার বাইরে মার্বেল ব্যবহার করেন। আল-আশরাফ কানসুহ আল-গাউরি১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রওজার উপর পাথরের গম্বুজ নির্মাণ করেন।

১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সবুজ গম্বুজ

রওজা মসজিদের দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত। এটি গম্বুজের নিজে অবস্থিত যা ১৮১৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের শাসনামলে নির্মিত হয়। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে গম্বুজে সবুজ রং করা হয় এবং এরপর থেকে এর নাম সবুজ গম্বুজ হয়।

সুলতান প্রথম আবদুল মজিদ ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদ পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। এতে মোট ১৩ বছর লেগেছিল।মূল উপকরণ হিসেবে লাল পাথরের ইট ব্যবহার করা হয়। মেঝে ১২৯৩ বর্গ মিটার বৃদ্ধি করা হয়। দেয়ালে ক্যালিগ্রাফিক শৈলীতে কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ করা হয়। মসজিদের উত্তরে কুরআন শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা নির্মিত হয়।

সৌদি যুগ

আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ মদিনা অধিকার করে নেয়ার পর অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য মদিনার বিভিন্ন সমাধিগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। তবে সবুজ গম্বুজটিকে অক্ষত রাখা হয়।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার পর মসজিদে কয়েক দফা সংস্কার করা হয়। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে ইবনে সৌদ মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে নামাজের স্থান বাড়ানোর জন্য স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার আদেশ দেন। এসময় কৌণিক আর্চযুক্ত কংক্রিটের স্তম্ভ স্থাপন করা হয়। পুরনো স্তম্ভগুলো কংক্রিট ও শীর্ষে তামা দ্বারা মজবুত করা হয়। সুলাইমানিয়া ও মাজিদিয়া মিনার দুটি মামলুক স্থাপত্যের আদলে প্রতিস্থাপন করা হয়। উত্তরপূর্ব ও উত্তরপশ্চিমে দুটি অতিরিক্ত মিনার যুক্ত করা হয়। ঐতিহাসিক মূল্যের কুরআন ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ রাখার জন্য পশ্চিম দিকে একটি লাইব্রেরী স্থাপন করা হয়।

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ মসজিদের অংশ হিসেবে ৪০,৪৪০ বর্গ মিটার যুক্ত করেন। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে মসজিদ আরো সম্প্রসারিত হয়। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ার পর মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় ১.৭ মিলিয়ন বর্গ ফুট।

৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্প্রসারণ কাজ ২০১২ এর সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করা হয়। কর্তৃক পরিবেশিত সংবাদ অনুযায়ী এই সম্প্রসারণ সমাপ্ত হওয়ার পর এতে ১.৬ মিলিয়ন মুসল্লি ধারণ করা সম্ভব হবে।পরের বছরের মার্চে সৌদি গেজেট উল্লেখ করে যে সম্প্রসারণের জন্য যেসব স্থাপনা ধ্বংস করার দরকার ছিল তার ৯৫% সম্পন্ন হয়েছে। পূর্ব দিকে দশটি হোটেলসহ কিছু বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।

মসজিদে নববীর প্রশাসন নিম্নরূপ।

হারামাইনের প্রেসিডেন্ট : শাইখ আবদুর রহমান আস-সুদাইস এবং শাইখ মুহাম্মদ বিন নাসির আল-খুজাইম

ইমাম ও খতিব

  • শাইখ আলি আল হুজাইফা
  • শাইখ আবদুল বারি আস-সুবাইতি
  • শাইখ হুসাইন আল-শাইখ
  • শাইখ আবদুল মুহসিন আল-কাসিম
  • শাইখ সালাহ আল-বুদাইর

ইমাম

  • শাইখ আবদুল্লাহ আল-বুয়াইজান
  • শাইখ আহমাদ তালিব হামিদ

মুয়াজ্জিন

  • শাইখ আবদুর রহমান
  • শাইখ ইসাম বুখারি
  • শাইখ সৌদ বুখারি
  • শাইখ ইয়াজ শুখরি
  • শাইখ সামি দিওয়ালি
  • শাইখ উমর সুনবুল
  • শাইখ মাজিদ হাকিম
  • শাইখ আশরাফ আফিফি
  • শাইখ আবদুল মজিদ আস সুরাইহি
  • শাইখ ফয়সাল নুমান
  • শাইখ ইউসুফ কামাল

অতিথি ইমাম

  • শাইখ আলি আল সুদাইস
  • শাইখ মুহাম্মদ আইয়ুব
  • শাইখ খালিদ আল মুহান্না
  • শাইখ সাদ আল গামদি
  • শাইখ খালিদ আল গামদি
  • শাইখ আবদুল্লাহ আল জুহানি
  • শাইখ মাহির আল মুয়াইকালি
  • শাইখ আবদুল ওয়াদুদ হানিফ
  • শাইখ ইমাদ জুহাইর হাফিজ

স্থাপত্য

মসজিদ দুই স্তর বিশিষ্ট এবং আয়তাকার। উসমানীয় নামাজের স্থানটি দক্ষিণমুখী। এতে সমতল ছাদ এবং বর্গাকার ভিত্তির উপর ২৭টি চলাচলসক্ষম গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের নিচের খোলা স্থানে ভেতরের স্থান আলোকিত করে। গম্বুজ সরিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া প্রাঙ্গণে থাকা স্তম্ভের সাথে যুক্ত ছাতাগুলো খুলে দিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়।  মসজিদের চারপাশের বাধানো স্থানেও নামাজ পড়া হয় যাতে ছাতাসদৃশ তাবু রয়েছে। জার্মান স্থপতি মাহমুদ বোদো রাশ্চ ও তার প্রতিষ্ঠান এই গম্বুজ ও ছাতাগুলো নির্মাণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *