নাসিখ-মানসূখের হুকুম

নাসিখ কাকে বলে? নাসিখ কত প্রকার ও কি কি?

  ইসলামী জ্ঞানের জন্য নাসিখ ও মানসুখ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা।এটি শরীয়াতকে সহজভভাবে বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করে থাকে।এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে পেশ করা হলঃ

নাসিখ হল আরবী শব্দ যার অর্থ হল মিটিয়ে ফেলা,জ্বালিয়ে দেওয়া,রহিত করা,পরিবর্তন করে দেওয়া ইত্যাদি।পারিভাষিকভাবে বলা যায় যে,শরীয়াতের কোন হুকুম শল রীয়াতের হুকুম দিয়ে তুলে দেওয়াকে নাসিখ বলা হয়।জুমহুর উলামাগণ বলেন,

বিশেষ হিকমতের কারণে এক হুকুমকে অন্য হুকুম দ্বারা পরিবর্তন করা হল নসখ

মোল্লা জিউন বলেন,

নসখ হল বর্ণনার দিক থেকে এক বর্ণনা অন্য বর্ণনার বিপরীত।

মানার গ্রন্থাগার বলেন,

নাসখ হল সাধারণ হুকুমের নির্দিষ্টতার জন্য বর্ণনা যা আল্লাহর নিকট পরিচিত।

শর্ত

১। মানসূখের হুকুমটি শরীয়াত সম্পর্কিত হতে হবে।

২। নাসিখের হুকুমটি শরীয়াত সম্পর্কিত হতে হবে।

৩। মানসূখের হুকুমটি কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হবে না।

৪। হুকুম দুটি পরস্পর বিরোধী হতে হবে।

৫। নাসিখের হুকুমটি নির্দেশ বা আদেশসূচক হতে হবে।

দলীল

আল্লাহ বলেন,

এবং যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত উপস্থিত করি এবং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তিনিই সে সম্পর্কে ভাল জানেন; তখন তারা বলেঃ আপনি তো মনগড়া উক্তি করেন; বরং তাদের অধিকাংশ লোকই জানে না। [নহলঃ১০১]

আমি কোন আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান? [বাকারাঃ১০৬]

নসখের প্রকারভেদ

নাসিখ প্রধানত চার প্রকারের হয়ে থাকে।যা হলঃ

১. কুরআনের দ্বারা কুরআনের নসখ

২. কুরআনের দ্বারা হাদীসের নসখ

৩. হাদীসের দ্বারা কুরআনের নসখ

৪. হাদীসের দ্বারা হাদীসের নসখ

এই সকল প্রকারসমূহ নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলঃ

১. কুরআনের আয়াত দ্বার কুরআনের আয়াত নসখ

আল্লাহ এক জায়গায় মদ পানের ব্যাপারে বলেছেন,

মদ্যপ অবস্থায় আপনি সালাতের নিকটবর্তী হবেন না [নিসাঃ১৩৬]

এখানে সালাতরত অবস্থায় মদ পান করা হারাম ছিল এবং পরবর্তীতে তা পুরোপুরিভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়।আল্লাহ বলেন,

নিশ্চয় মদ,জুয়া,প্রতিমার পূজা ও তীরনিক্ষেপ করা ভাগ্য নির্ধারণ করা শয়তানের কাজ।তাই তোমরা তা পরিহার কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [মায়িদাঃ৯০]

আল্লাহ মুহাম্মদ (সাঃ)কে কাফিরদের উপর অত্যচার চালানোর পর ক্ষমা করতে বলেছেন।তিনি বলেন,

আপনি তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। [ইমরানঃ১৫৯]

কিন্তু যখন জিহাদের আয়াত নাযিল হয় তখন সকল ধরনের ক্ষমার আয়াত রহিত হয়ে যায়।

২. কুরআনের দ্বারা হাদীসের নসখ

এটি প্রায় সময়ে সঙ্ঘটিতে হয়ে থাকে।রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর মদীনায় গমনের পর প্রায় ১৬ মাস রাসূলুল্লাহ(সাঃ)  বায়তুল মুকাদ্দাসের অভিমুখে সুন্নাহের ভিত্তিতে সালাত আদায় করেন।কিন্তু পরবর্তীতে যখন একটি আয়াত তখন তা রহিত হয়ে যায়।

অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন বাকারাঃ১৪৪

৩. হাদীসের দ্বারা কুরআনের নসখ

এই ধরনের নসখ বৈধ।কারণ, এ ব্যাপারে বেশ কিছু প্রমাণ রয়েছে।যেমনঃ রাসূলুল্লাহ(সাঃ) যখন সপ্তম বিবাহ করেন তখন কুরআনে এই আয়াত নাযিল হয় যে,

আপনার জন্য এর বেশি আর বিবাহ করা সমীচীন নয়।

কিন্তু পরবর্তীতে এক হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে,

নবী যেকয়টি বিবাহ ইচ্ছা তা তিনি তা করতে পারবেন।

এই ধরনের নসখের ব্যাপারে কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করে থাকে। ইমাম শাফি(রঃ) এর মতে তা গ্রহণযোগ্য নয়।কারণ আল্লাহর রাসূল(সাঃ) বলেছেন,

তোমাদের কাছে কোন কুরআন গেলে তা হাদীসের উপর রাখ। আর তাতে যতটুকু মিলে যায় তা গ্রহণ কর আর বাকিটুকু বর্জন করবে।

তোমাদের নিকট ফরয করা হয়েছে, যখন তোমাদের কারও নিকট মৃত্যু আসে এ আয়াতটি রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর বাণী কোন অসীয়্যত নাই উত্তরাধিকারে জন্য দ্বারা রহিত করা হয়েছে।

কিন্তু এই ব্যাপারে ইমাম আবূ হানিফা(রঃ) এর পক্ষ থেকে উত্তর হল এই যে, এখানে এর দ্বারা কেবলমাত্র খবরে ওয়াহিদ ও মাশহুরকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা খবরে মুতাওয়াতির রহিত হয় নাই।

অন্যদিকে ইমাম আবূ হানীফা(রঃ) এর এই অভিমত যে, ওয়াহী দুই প্রকারের হয়ে থাকে। এক ধরনের ওয়াহী হল ওয়াহী মাতলু এবং আরেক ধরনের  হল ওয়াহী গায়রী মাতলু।তাই তা  একটির দ্বারা অপরটি রহিত হতে পারে।

৪. হাদীসের দ্বারা হাদীস রহিতকরণ

এ ব্যাপারে অসংখ্যা হাদীস রয়েছে যার দ্বারা এক হাদীস অপর হাদীসকে রহিত করে দিয়েছে।এটি আবার চারভাবে হয় যা হলঃ মুতাওয়াতিরের দ্বারা মুতাওতিরের রহিত,মুতাওতিরের দ্বারা খবরে ওয়াহিদের রহিত,খবরে ওয়াহিদ দ্বারা খবরে ওয়াহিদের রজিত এবং খবরে ওয়াহিদের দ্বারা মুতাওয়াতিরের রহিত।উল্লেখ্য এখানে শেষোক্ত নাসিখ গ্রহণযোগ্য নয়।

এই শ্রেণীড় উদাহরণ বলা যায়, প্রথমে এক হাদীসে শুরুতে কবর যিয়ারতের কথা নিষেধ করা হলেও পরবর্তীতে তা হালাল করা হয়। আবার এক হাদীসে বলা হয়েছে, আগুনের পোড়ানো কোন খাদ্য গ্রহণের পর তার উযু ভেঙ্গে যায়।কিন্তু অপর এক রিওয়য়াতে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ(সাঃ) উযু অবস্থায় আগুনে পোড়ানো গোশত ভক্ষণ করেছেন।অতঃপর সালাত আদায় করেছেন।

এক হাদীসে বলা হয়েছে যে,

শিংগাদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের রোযা ভংগ হয়ে গেছে।

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে,

রাসূলুল্লাহ(সাঃ) রোযা এবং ইহরাম দুই অবস্থায় শিংগা গ্রহণ করেছেন। 

নুসখের ধরন

নুসখের ধরন চার ধরনের হয়ে থাকে যা হলঃ

১. যার হুকুম ও তিলওয়াত কোনটি নেই।যেমনঃ সূরা আহযাবে আগে প্রায় ৩০০টি আয়াত ছিল কিন্তু এখন সেখানে মাত্র ৭০টি আয়াত রয়েছে।তদ্রুপ সুরাহ বাকারা, আনফাল,তওবাতে অসংখ্যা আয়াত ছিল কিন্তু তা রহিত হয়ে যায়।

২. কিছু কিছু কুরআনের আয়াতের বিধানের হুকুম এখনও জারী রয়েছে কিন্তু তার তিলওয়াত রহিত হয়ে গেছে।যেমনঃ আল্লাহ বলেন,

বৃদ্ব যিনাকারী পুরুষ কিংবা নারী যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের রজম কর।

৩. তিলওয়াত থাকলেও হুকুম রহিত হয়ে গেছে। যেমনঃ আল্লাহ বলেন,

যখন তোমরা নামাযে দাঁড়াবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল, কনুই পর্যন্ত হাত এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধুবে

আয়াতের ভিতর পা ধৌত করা ছিল সাধারণ বিধান কিন্তু মুজার উপর মাসেহ করার দ্বারা এর সাধারণ হুকুমকে রহিত করা হয়েছে।

৪. কিছু কিছু আয়াত আছে যা কেবলমাত্র নবী করিম(সাঃ) এর জন্য খাস।তা সকলের জন্য খাস নয়।যেমনঃ তাহাজ্জুদের নামায।সাওমে বিসাল ইত্যাদি।

কোরআন এর আয়াত রহিত হল কেন? জবাব

নাস্তিকের অপব্যাখ্যা ও তার জবাবঃ-

প্রশ্ন:-
যদি আল্লাহর বাণী হয় কুরআন শরীফে নাসেখ মানসুখ আয়াত কেন? অর্থাৎ আল্লাহ্‌ যেহেতু সব জানে তাহলে কোরআন এর আয়াত রহিত হল কেন?

জবাবঃ-
অনেকের অভিযোগ- আল্লাহ তায়ালা যদি জানবেনই যে, এটা রহিত হবে তাহলে তা কেন নাযিল করলেন? এ সন্দেহের অপনোদন ঘটানোর জন্যই পোষ্টটা লিখতে বসলাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللّهَ عَلَىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অর্থাৎ, আমি যে আয়াতকে ‘মানসুখ’তথা রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই,তার জায়গায় তার চাইতে ভলো অথবা কমপক্ষে ঠিক তেমনি আয়াত নিয়ে আনি। (সুরা বাকারা: ১০৬)

কোরআন সর্বযুগের সর্বকালের জন্য আলোকবর্তিকা।  নাসেখ, মানসুখ আয়াতই প্রমাণ করে এই কোরআন আল্লাহর বাণী।

কেননা আল্লাহ জানেন যে সময় কোরআন নাজিল হয়েছ(১৪০০ বছর আগে)তার পরবর্তি হাজার বছর পরের সামাজিক,আর্থিক,রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক একই রকম হবেনা।
তাই কিছু নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন সেই যুগের অবস্থা অনুযায়ী এবং কিছু নির্দেশনা এসেছে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য।

এখন যদি ১৪০০ বছর আগের সামাজিক অবস্থার জন্য নির্ধারিত আইন  অপরিবর্তিত থাকত তবে কি কোরআন এর নির্দেশনাকে সর্বযুগের বলা যেত?

নাকি নির্ধারিত গন্ডিতে আবদ্ধ হয়েযেত?

আমরা যদি আধুনিক রাস্ট্র ব্যাবস্থার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাই বিভিন্ন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জরুরি আইন জারি হয়। পরবর্তিতে অবস্থা পরিবর্তন হলে জরুরী অবস্থার জন্য নির্ধারিত নির্দেশনা বাতিল করা হয়।
এই নির্দেশনা কখনো হয় স্বল্প সময়ের জন্য আবার কখনো হয় অনিদৃষ্ট সময়ের জন্য।
উদ্দেশ্য থাকে এই যে, বিশেষ আইনের মাধ্যমে সেই বিশেষ সময়ের অবস্থার পরিবর্তন করা।
সবাই জানে যে অস্বাভাবিক অবস্থার পরিবর্তন হবে সময়ের সাথে সাথে।
এখন কেউ যদি বলে অবস্থার পরিবর্তন হবে জেনেও কেন বিশেষ আইন বহাল করা হল তাকি গ্রহণযোগ্য হবে?
নাকি লোকে সেই প্রশ্নকারীকে পাগল বলবে? পাগল বলা স্বাভাবিক নয় কি?

আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় কিছু কিছু বিধান জারি করেন শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।কেননা,অনেক সময় অবস্থার তাগিদে জরুরী ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকার নির্দেশ জারি করা লাগে।পরে সে নির্দেশটাকে আবার সরিয়ে নেয়া হয়। এ ধরনের অবস্থায় কখনো বলা হয় এ নির্দেশটা অমুক দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে আবার কখনো দিনক্ষণ মানুষের কাছ থেকে গোপণ রাখা হয়। এটা জানা থাকে কর্তৃপক্ষের। সময় শেষ হয়ে গেলে তারা এ নির্দেশকে অকার্যকর ঘোষণা করে।

উদাহরণ স্বরূপ- আল্লাহ তায়ালা চান মানুষ রোজা রাখবে। তখন বললেন: তোমরা রোজা রাখ। কতদিন রোজা রাখবে তা বলা হয়নি। কিন্তু, আল্লাহ তায়ালা চান না যে, ব্যক্তি সব সময় রোজা রাখুক। তাই, একমাস পরে বললেন: এখন রোজা বন্ধ কর।
আর যদি বলতেন: তোমরা একমাস পর্যন্ত রোজা রাখ তাহলেও যথেষ্ঠ হত।কোন সমস্যা ছিল না।আর কেউ কোন অভিযোগও করত না।

আবার যদি মদ হারাম করার প্রক্রিয়ার দিকে তাকাই তবে দেখি আল্লাহ্‌ প্রথমে বলেন নেশা/মদ অশ্লীল কার্জ।এরপরে বলেন নামাজের সময় মদ্যপ না থাকার জন্য।
সর্বশেষ নির্দেশ দেন সকল মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিত্যাগের জন্য।
অর্থাৎ একে হারাম করা হয়।
যদি এই নির্দেশনাকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখি এই পর্যায়ক্রমিক নির্দেশনা এক মহা প্রজ্ঞাবান স্রষ্টার অসাধার প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে।

আল্লাহ্‌ চাইলে প্রথমেই বলতে পারতেন “মদ,নেশা জাতীয় দ্রব্য হারাম”! কিন্তু এই নির্দেশ পালন করা বান্দার জন্য কঠিন হয়ে যেত। তাই পর্যায় ক্রমে নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তিনি তার আইন বাস্তবায়ন করেছেন বান্দার সুবিধার্থে!

এখন কেউ যদি বলে পর্যায়ক্রমে বাতিল করলেন কেন, একবারে বাতিল করলেননা কেন?
তবে কি সে  জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিবেনা?

মূলত সকল অবস্থায়ই আল্লাহ তায়ালার জানা আছে-এ বিধান অমুকদিন পর্যন্ত চলবে। প্রথম অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা প্রথমেই শেষ সময়টা জানিয়ে দেন নাই। বরং, সময় শেষ হওয়ার পর বলে দিয়েছেন যে, সময় শেষ হয়ে গেছে। এখানে আগেই মেয়াদ বলে দেয়া হয়েছে আর ওখানে সময় শেষ হওয়ার পর জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

মোটকথা,আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন জরুরী অবস্থা অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই জানিয়ে দেবেন;আগে বলবেন না। রহিত হওয়ার আগের সময়ের জন্য বিধানটা ছিল টেম্পরারী বা সাময়িক। পরবর্তী সময়ের জন্য তা উপযুক্ত নয়।

মূলত এগুলোকে রহিত আয়াত বলা যায়না, এসব আয়াত অবস্থার প্রেক্ষিতে পর্যায়ক্রমে নাজিল হয়েছে কিন্তু এসব নিয়েই নাস্তিকদের যত মিথ্যাচার।

আশাকরি উত্তরটি পেয়েছেন।
আল্লাহ্‌ আমাদেরকে ইবলিসের অনুসারীদের সকল মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা থেকে হেফাজত করুন,আমিন!

 নাসেখ এবং মানসূখ আয়াতসমূহ

আপনি নাসেখ মানসূখকে অস্বীকার করতে পারবেন না। কারণ আপনি যদি মদ হারাম হওয়ার তিন আয়াত ও বিধবাদের স্বামীর ঘরে অবস্থানের দুই আয়াত পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করে দেখেন তবে বিষয়টি পানির মত পরিষ্কার হয়ে ভেসে উঠবে, পূর্ববর্তি আয়াত পরবর্তি আয়াত দ্বারা রদ করা হয়েছে।

তাই কি? দেখি কি লেখা আছে আয়াতগুলোতে :

মদের ৩ আয়াত -মদ সম্পর্কে প্রথমে বলা হলো-

২১৯।সুরা বাকারা। তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, ‘এগুলির মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু লাভ। কিন্তু লাভ অপেক্ষা পাপ অনেক বেশী।’

২য় ধাপে বলা হলো-

৪৩। সুরা নিসা। হে মুমিনগণ ! নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা [সালাতের সময়ে] যা বল তা [অর্থ] বুঝতে পার। [আবার] অপবিত্র অবস্থায় [সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না], যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা গোসল কর, তবে পথচারী এ ব্যবস্থার ব্যতিক্রম।

৩য় ধাপে নিষিদ্ধ করা হলো-

৯০।সুরা মায়েদা। হে মুমিনগণ ! [সকল] মাদকদ্রব্য [নেশা জাতীয় দ্রব্য], জুয়া, মূর্তি পূজার পাথর [যার উপরে উৎসর্গ করা হয়], তীরের সাহায্যে ভাগ্য গণনা জঘন্য কাজ [যা] শয়তানের সৃষ্টিকর্ম। সুতরাং তোমরা উহা বর্জন কর, যেনো তোমরা [আধ্যাত্মিক] সফলতা লাভ করতে পার।

কোরানে একি বিষয়ের উপরে একাধিক আয়াতের আরো নজীর আছে। যেমন কেয়ামতের উপরে , সৃষ্টির বর্ননার উপরে ইত্যাদি। এর অর্থ এই নয় যে পরবর্তী আয়াত পূর্ববর্তী আয়াতকে রদ করেছে। রদ করা বলতে বুঝায় নুতন কোন আয়াতের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে পূর্ববর্তী কোন আয়াতের নির্দেশ কে অকেজো করে দেয়া। আমরা যদি মদ বা নেশা জাতীয় দ্রব্যের ব্যাপারে নাযিলকৃত আয়াত ৩টি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই , আয়াত ৩টি পরস্পর বিরোধী নয় এবং আয়াতগুলোতে মদের ভালো ও মন্দ দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াত ৩টিই উপদেশ মূলক এবং ৩টি আয়াতেই নেশা জাতীয় দ্রব্যের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিকের বর্ননা দিয়ে মূলত নেশা জাতীয় দ্রব্য বর্জন করতেই উৎসাহিত করা হয়েছে। বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই কাফি। ১ম দুটো আয়াত বুদ্ধিমানের জন্য। মদ মহাপাপ জানার পরে এবং নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজ হবে না জানার পরে ও কি কোন সত্যিকারের মুসলমান নেশা জাতীয় দ্রব্য বর্জন না করে পার পাওয়ার কথা ভাবতে পারে? বর্জন করতে বলার এই আয়াতে কি আগের দুটো আয়াত রহিত করার কোন কথা বলা আছে? নেই।

আলেমদের দাবী অনুযায়ী যদি আগের দুটো আয়াত রহিত হয়ে যায় , তাহলে কি ৩য় আয়াত নাযিল হওয়ার পর থেকে , মদ খেলে আর মহাপাপ হবে না নাকি নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হওয়া যাবে? মদ আগেও যেমন মহাপাপ ছিল , এখনো তেমনিই মহাপাপ আছে এবং আগেও যেমন নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হওয়া যেতনা , এখনো তেমনি নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হওয়া যায়না। তাহলে আগের দুটো আয়াত রহিত হলো কেমনে? কেউ কি আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন।

এখন দেখা যাক বিধবাদের নিয়ে আয়াতদুটোত কি বলা হয়েছে –

২৩৪। সুরা বাকারা। তোমাদের মধ্য যারা বিধবা রেখে মৃত্যুবরণ কর, তাদের স্ত্রীরা চারিমাস দশদিন অপেক্ষা করবে । যখন ইদ্দত কাল পূর্ণ করবে, তখন নিয়ম অনুযায়ী তারা নিজেদের জন্য যা করবে তাতে তোমাদের কোন অপরাধ নাই। তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

২৪০। সুরা বাকারা। তোমাদের মধ্যে যারা বিধবা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তারা যেনো তাদের বিধবাদের জন্য এক বছরের থাকা ও খাওয়ার বন্দোবস্ত করে যায় । কিন্তু যদি তারা [গৃহ] ত্যাগ করে যায় এই শর্তে যে তারা নিজেদের জন্য যা করবে তা ন্যায়সঙ্গত, তাহলে তোমাদের কোন অপরাধ নাই। আল্লাহ্‌ অসীম ক্ষমতাধর, প্রজ্ঞাময়।

এখানে আয়াত দুটিতে দুটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করা হয়েছে। ১মটিতে বিধবা বিবাহ নিয়ে ও ২য়টিতে বিধবা ভরনপোষন নিয়ে। ফলে আয়াতদুটি পরস্পর বিরোধী তো নয়ই এবং শেষের আয়াত দিয়ে প্রথম আয়াত রদ করা সম্ভব নয়। তালাকের মতৈ বিধবাদের পুনর্বিবাহের আগে ৪মাস ১০দিন অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে এটা জানার জন্য , যে তারা অন্তসত্বা কিনা। এই দায়িত্ব বিধবার । ২৪০ নং আয়াতে মৃতস্বামীকে মরার আগে তাদের বিধবাদের জন্য ১ বছরের ভরনপোষনের ব্যবস্থা করে রেখে যেতে বলা হয়েছে। এই দায়িত্ব মৃত স্বামীর। এই ভরনপোষন বিধবা মৃত স্বামীর সম্পত্তির যে অংশ পাবে তার অতিরিক্ত। দেখুন আয়াত ৪:১২। সুতরাং বোঝাই যায় , ২৪০ নং আয়াতে , বিধবা যদি ১ বছরের আগে নিজে থেকেই চলে যায় তাহলে মৃত স্বামীর উত্তরাধীকারদের বিধবার ভরনপোষনের দায় থেকেই শুধূ মুক্তি দেয়া হয়েছে কিন্ত বিধবাদের ইদ্দত কালীন দায় দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়া হয় নি বা বিধবাকে মৃত স্বামীর সম্পত্তির অংশিদারীত্ব থেকেও বঞ্চিত করা হয়নি। বলা যায় ইসলামে বিধবাদের জন্য উদার ও পর্যাপ্ত সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নাসেখ ও মানসুখ – আরো কিছু আয়াত

আয়াত [২ : ১১৫] এ বলা হয়েছে যে –

‘পূর্ব পশ্চিম সর্বত্রই আল্লাহ্‌ বিদ্যমান; এবং যে দিকেই তোমরা মুখ ফিরাও না কেন সে দিকেই আল্লাহ্‌র উপস্থিতি বিদ্যমান। আল্লাহ্‌ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ।’

এবং আয়াত [২:১৪৪] তে বলা হয়েছে – …. তোমাকে এমন কিবলার দিকে ফিরাইয়া দিতেছি যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে। অতএব তুমি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও। তোমরা যেখানেই থাক না কেন উহার দিকে মুখ ফিরাও ….’।

দাবী করা হয় যে , ২:১৪৪ আয়াত নাযিল হওয়ার পরে ২:১১৫ আয়াত মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে এবং কিছু নাস্তিকেরো দাবী আয়াতদুটি সাংঘর্ষিক। এই দাবীর পিছনে যুক্তি হলো , ২:১১৫ অনুযায়ী আল্লাহ যে কোন দিকে ফিরে নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং এই আয়াত রহিত হয়ে যায় যখন আল্লাহ ২:১৪৪ আয়াত নাযিলের মাধ্যমে কিবলা মসজিদুল হারামের দিকে ফিরে নামাজ পড়তে বলেন।

প্রথমত – কখনৈ যে কোন দিকে ফিরে নামাজ পড়ার অনুমতি ছিল না। কোরানে বলা হয়েছে , কিবলা পরিবর্তন করা হয়েছে কিন্তু কোন কিবলা ছিল না , একথা কোরানের কোথাও বলা হয় নি। ২:১৪৪ এ বলা হয়েছে , আগে যে কিবলা ছিল তা রসূলের পছন্দ না হওয়াতে , আল্লাহ রসূলের পছন্দনীয় নুতন কিবলা নির্ধারন করেন।

আমাদের আলেমরা (?) ভুল যেটা করছেন তা হলো , ২:১৪৪ আয়াতে নামাজের দিগনির্দেশক কিবলার কথা বলা হলেও ২:১১৫ তে নামাজ বা কিবলা কোনটার কথাই বলা হয়নি। ২:১১৫ আয়াতে এই সত্যটাই বলা হয়েছে যে আল্লাহ সর্বব্যাপী (“Omnipresent” ) , অর্থাৎ যেদিকেই তাকাই না কেনো বা যেদিকেই যাইনা কেনো , সবসময়ই আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে থাকি। ২:১১৫ আয়াতে দেখুন বলাই হয়েছে আল্লাহ সর্বব্যাপী এবং এর থেকে এটাই প্রমান হয় যে , এই আয়াতের বিষয়বস্তু আল্লাহর উপস্থিতি , নামাজ বা কিবলা নয়। সুতরাং ২:১১৫ আয়াত রহিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা এবং আয়াতদুটি সাংঘর্ষিক ও না।

৬২।সুরা বাকারা। যারা ঈমান আনে [এই কুর-আনে], এবং যারা ইহুদীদের [ধর্মগ্রন্থ] অনুসরণ করে, এবং খৃশ্চিয়ান, এবং সাবীয়ান, যারাই ঈমান আনে আল্লাহ্‌র [একত্বে] শেষ [বিচার] দিবসে এবং সৎ কাজ করে, তাদের জন্য পুরষ্কার আছে তাদের প্রভুর নিকট। তাদের কোন ভয় নাই তারা দুঃখিতও হবে না।
৬৯। সুরা মায়দা। যারা বিশ্বাস স্থাপন করবে [আল কোরআনে], যারা অনুসরণ করবে ইহুদী [ধর্মগ্রন্থ], এবং সাবীয়ান ও খৃষ্টানগণ [এদের মাঝে] যারা বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহ্‌র একত্বের প্রতি; এবং শেষ বিচারের দিনে, এবং সৎ কাজ করবে তাদের কোন ভয় নাই, এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
৮৫। সুরা আল ইমরান।কেহ ইসলাম ব্যতীত [আল্লাহ্‌র ইচ্ছার নিকট আত্মসমর্পণকারী] অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে, তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। পরলোকে সে হবে [আধ্যাত্মিকভাবে] ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত।

দাবী করা হচ্ছে যে , ২:৬২ ও ৫:৬৯ আয়াতে কিছু সংখ্যক ইহুদি ও খৃষ্টানের পরকালে পুরষ্কৃত হওয়ার কথা যা বলা হয়েছে , তা ৩:৮৫ আয়াত নাযিল হওয়ার পরে রহিত হয়ে গেছে , কারন ৩:৮৫ আয়াতে মুসলমান ছাড়া আর সকলেই ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।

এই ভুল দাবীর মূলে ইসলাম শব্দের ভুল ব্যাখ্যা। যদিও কোরানের একাধিক আয়াতে সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা হয়েছে , ইসলাম নবী ইব্রাহিমের ধর্ম এবং উনিই ছিলেন প্রথম মুসলমান (দেখুন ২:১২৮ , ২:১৩১ , ২:১৩৩) , তদাপি আজকের মুসলমানদের দাবী তারাই একমাত্র ইসলামের ধারক ও বাহক এবং একমাত্র কোরানের অনুসারীরাই মুসলমান।

এটা যে একটা ভুল প্রচার তার প্রমান পাওয়া যায় ৩:৬৭ আয়াতে , যেখানে আল্লাহ বলছেন , “ইব্রাহীম ইহুদী ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না, কিক্তু তিনি ছিলেন ‘হানীফ’ (حَنِيفًا مُّسْلِمًا ) অর্থাৎ, সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ এবং আত্নসমর্পণকারী, এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না।” আল্লাহ ৫:১১১ আয়াতে বলছেন যে , যীশু ও তার অনুসারীরা মুসলমান ছিলেন। ২৭:৪৪ আয়াত দেখুন , যেখানে বলা হয়েছে সোলায়মান ও বিলকিস (রানী শেবা) ও আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করেছেন অর্থাৎ মুসলমান এবং ৫:৪৪ আয়াতে বলা হয়েছে তওরাতের অনুসারি সকল নবী ও তাদের অনুসারীরা মুসলমান।

এই সকল আয়াত পড়ে একটাই উপসংহারে আসা যায় , তা হলো তওরাত ও ইন্জিলের (বাইবেল) অনুসারীরাও মুসলমান , যাদের কোরান সম্পর্কে কোন ধারনাই নেই। এই মুসলমানরা দোজাহানের মালিক আল্লাহর নিকটেই আত্মসমর্পন করেছেন। ইব্রাহিম যে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা তা কোরানেও যেমন পাওয়া যায় , তেমনি তাওরাতেও পাওয়া যায়। কোরান থেকে আমরা এই শিক্ষাই পাই যে , সত্যিকারের মুসলমান সেই , যে এক আল্লাহর কাছে নিজেকে আত্মসমর্পন করে এবং এক আল্লাহর আইন মেনে চলে এবং তারা শুধু কোরান অনুসারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এখনকার খৃষ্টানদের মধ্যে যারা ‘God’ এর একত্বে বিশ্বাস করে ও যীশুর পূজা করে না , তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মুসলমান। ২:৬২ ও ৫:৬৯ আয়াত অনুযায়ী যেকোন ধর্মালম্বি যদি এক সৃষ্টিকর্তায় (আল্লাহ , ইয়াহয়ে , ‘God’ যে নামেই ডাকুন না কেনো) বিশ্বাস করে , আখেরাতে বিশ্বাস করে ও আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে , সে আল্লাহর দৃষ্টিতে মুসলমান। এবং এরা সকলেই তাদের ভালো কাজ অনুযায়ী পুরষ্কৃত হবে। এরা হলো কোরানিক মুসলিম বা ইহুদি মুসলিম বা খৃষ্টান মুসলিম বা হিন্দু মুসলিম …….।

সুতরাং ২:৬২ ও ৫:৬৯ আয়াতদ্বয় রহিত ও হয় নি বা ৩:৮৫ আয়াতের সাথে কোন কন্ট্রাডিকশন ও নেই।

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *