তারিক বিন জিয়াদ

তারিক বিন জিয়াদ (আরবি: طارق بن زياد‎‎, জন্ম: ৬৭০- মৃত্যু: ৭২০) ৭১১ থেকে ৭১৮ সাল পর্যন্ত ভিসিগথ শাসিত হিস্পানিয়ায় মুসলিম বিজয় অভিযানের একজন সেনানায়ক। ইবেরিয়ান ইতিহাসে তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনা কমান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের আদেশে তিনি একটি বিরাট বাহিনীকে মরক্কোর উত্তর উপকূল থেকে নেতৃত্ব দেন। জিব্রাল্টারে তিনি তার সৈন্যসমাবেশ করেন। জিব্রাল্টার নামটি আরবি জাবাল তারিকথেকে উৎপন্ন হয়েছে। এর অর্থ “তারিকের পাহাড়”।, তারিক বিন জিয়াদের নামে এটির নামকরণ হয়।

মধ্যযুগের অধিকাংশ ইতিহাসবিদ তারিকের বংশ সম্পর্কে খুব অল্প তথ্য দিয়েছেন। ইবনে আবদুল হাকাম, ইবনে আল আসির, আল তাবারি, ইবনে খালদুন তার সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করেননি। আধুনিককালের এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলা ও ক্যামব্রিজ হিস্টরি অব ইসলাম এও এ বিষয়ে তথ্য নেই। কিছু আরব ইতিহাস অনুযায়ী তার ব্যাপারে তিনটি ভিন্ন তথ্য আছে। এগুলো তারিকের প্রায় ৪০০ ও ৫০০ বছর পর লেখা হয়েছে। এগুলো হল:

  • তারিক হামাদানের একজন পারস্য বংশোদ্ভূত লোক।
  • তিনি কিন্দাহ গোত্রের একজন মুক্ত আরব সদস্য
  • তিনি উত্তর আফ্রিকার বার্বার বংশোদ্ভূত লোক। তবে এগুলোতে বেশ কিছু ভিন্ন রকম তথ্য আছে। আধুনিক গবেষক যারা তার বার্বার উৎসকে গ্রহণ করেন তারাও এক তথ্য থেকে অন্য তথ্যে চলে যান।  জেনাটা, অয়ালহাস, অয়ারফাজুমা ও নাফজা থেকে উতসরিত বার্বার গোত্রগুলো তারিকের সময় ত্রিপোলিতানিয়ায় বসবাস করত।
    • প্রাচীন উদ্ধৃতি পাওয়া যায় ১২ শতকের ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসির লেখায়। তিনি তারিককে প্রথাগত কায়দায় ‘’বিন জিয়াদ’’ না বলে ‘’তারিক বিন আবদুল্ললাহ বিন ওয়ানামু আল-জানাতি’’ বলে উল্লেখ করেছেন।
    • ১৪ শতকের ইতিহাসবিদ বনে ইজারি তারিকের বংশ দুভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন তারিক বিন জিয়াদ বিন আবদুল্লাহ বিন ওয়ালাগু বিন ওয়ারফাজুম বিন নাবারগাসান বিন ওয়ালহাস বিন ইয়াতুফাত বিন নাফজাও (আরবি: طارق بن زياد بن عبد الله بن ولغو بن ورفجوم بن نبرغاسن بن ولهاص بن يطوفت بن نفزاو‎‎) এবং তারিক বিন জিয়াদ বিন আবদুল্লাহ বিন রাফহু বিন ওয়ারফাজুম বিন ইয়ানযগাসান বিন ওয়ালহাস বিন ইয়াতুফাত বিন নাফযাও (আরবি: طارق بن زياد بن عبد الله بن رفهو بن ورفجوم بن ينزغاسن بن ولهاص بن يطوفت بن نفزاو‎‎)। তবে এটি মুদ্রণত্রুটি হতে পারে।

অধিকাংশ আরব ও স্পেনিশ ইতিহাসবিদ এ বিষয়ে প্রায় একমত যে তিনি ইফ্রিকিয়ার আমির মুসা বিন নুসাইরের একজন দাস ছিলেন।  পরে তিনি তাকে মুক্ত করে দেন ও নিজের সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু তার বংশধররা শতবর্ষ পর তারিকের দাস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে।

৭৫৪ সালে ল্যাটিনে লিখিত মোজারাব ক্রনিকলে তাকে ভুলক্রমে তারিক আবুজারা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি স্পেন বিজয়ের একটি লিখিত দলিল

তারিকের নাম প্রায় উম্ম হাকিম নামে একজন তরুণ দাসীর সাথে সম্পর্কিত করা হয়। তিনিও তারিকের সাথে স্পেন আসেন। কিন্তু তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অস্পষ্ট রয়ে গেছে

মুরিশ দুর্গের একটি টাওয়ার, এই দুর্গটি জিব্রাল্টারে মুসলিম শাসনের একটি প্রতীক।

মূসা বিন নুসাইর ৭১০-৭১১ সালে তানজিয়ার জয়ের পর তারিককে এর গভর্নর নিয়োগ দেন। কিন্তু সিউটায় একটি ভিসিগথ চৌকি জয় করা যায়নি। এটি জুলিয়ান নামক এক সম্রান্ত ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

ডেরি স্পেনের ক্ষমতায় এলে জুলিয়ান তার কন্যাকে প্রথা অনুযায়ী শিক্ষা অর্জনের জন্য গিসিগথিক রাজার দরবারে পাঠান। কথিত আছে যে রডেরিক তাকে ধর্ষন করেন এর ফলে জুলিয়ান অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে আরবদেরকে গিসিগথ রাজ্যে আসতে আমন্ত্রণ জানান। সে সাথে মুসলিমদেরকে জিব্রাল্টার প্রণালী গোপনে পার করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি তারিকের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হন। জুলিয়ানের কাছে বেশ কিছু বাণিজ্য জাহাজ ও স্পেনিশ মূলভূমিতে নিজস্ব দুর্গ ছিল।

৭১১ সালের ২৯ এপ্রিল নতুন ধর্মান্তরিত মুসলিমদের নিয়ে গঠিত তারিকের সেনাবাহিনী জিব্রাল্টারে অবতরণ করে।  জিব্রাল্টার নামটি আরবি নাম জাবাল আত তারিক বা তারিকের পাহাড় নাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

তারিকের সেনাবাহিনীতে মোট ৭০০০ জন লোক ছিল। বলা হয় যে মূসা ইবনে নুসাইর আরো ৫০০০ সৈনিক পাঠিয়েছিলেন।  ডেরিক হামলা মোকাবেলার জন্য ১,০০,০০০ জন সৈনিক সমাবেশ করেন। ১৯ জুলাই গুয়াডালেটের যুদ্ধে রডেরিক পরাজিত ও নিহত হন। ফলে ভিসিগথ রাজ্যের বিরুদ্ধে তারিক বিন জিয়াদ চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন।

গথ বাহিনীর সাথে মুসলিমদের লড়াইয়ে গথদের পিছু হটা।

জুলিয়ানের মতানুসারে তারিক বিন জিয়াদ তার সেনাদলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কর্ডোবা, গ্রানাডা ও অন্যান্য অঞ্চল জয় করতে পাঠান। এসময় তিনি মূল সেনাদলের সাথে অবস্থান করেন। তারা লেডো ও গুয়াদালাজারা জয় করে। পরের বছর মুসা বিন নুসাইরের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তারিক হিস্পানিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তারিক ও মূসা দুজনেই ৭১৪ সালে উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদে আদেশে দামেস্কে ফিরে আসেন। এখানে তারা তাদের বাকি জীবন অতিবাহিত করেন।

তারিক ও মূসা

স্পেন বিজয় নিয়ে লেখা অনেক আরব ইতিহাসে তারিক ও মুসা বিন নুসাইরের সম্পর্কের ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। তিনি তার মুক্ত দাসের একটি দেশ জয় নিয়ে ঈর্ষান্বিত ছিলেন এই বলে কেউ কেউ মূসার ব্যাপারে নেতিবাচক মত প্রকাশ করেন। অন্যান্যরা এ ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করেননি।

তার ব্যাপারে প্রথমদিককার আরব ইতিহাসে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তার মধ্যে নবম শতকের ইবনে আল হাকামের তথ্য সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর। তিনি লিখেছেন যে মূসা তারিকের উপর এতটাই রাগান্বিত ছিলেন যে তিনি তাকে বন্দী করেন ও হত্যা করতে চাইছিলেন। তবে মুগিস আর-রুমির হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হয়নি। তিনি খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের একজন মুক্ত করা ব্যক্তি ছিলেন। খলিফা তারিক ও মূসা দুজনকেই ডেকে পাঠান।  একাদশ শতকের ‘’আখবার মাজমুয়া’’ অনুযায়ী মূসা স্পেনে আসার পর তারিক সম্মানের চিহ্নরূপে ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন। কিন্তু মূসা তাকে ঘোড়ার চাবুক দিয়ে আঘাত করেন।

অন্যদিকে আরেকজন প্রাচীন ইতিহাসবিদ ল বালাজুরির মতে মূসা তারিককে কড়া ভাষায় চিঠি লেখেন ও পরবর্তীকালে দুজন একত্রীত হন।

সোলায়মানের টেবিল

তারিক ও মূসার মধ্যকার দ্বন্দ্বের ব্যাপারে একটি গল্প প্রচলিত আছে। বহুল প্রচলিত গল্পটিতে একটি প্রকান্ড আসবাবপত্রের উল্লেখ করা হয়। এটি নবী সুলায়মান (আঃ) এর বলে কথিত ছিল। বলা হয় যে এটি স্বর্ণনির্মিত ও মণিমুক্তা দ্বারা আবৃত ছিল এবং ইসলামপূর্ব যুগেও এটি স্পেনিশ ভিসিগথদের দখলে ছিল বলে প্রচলিত ধারণা ছিল।

রডেরিকের এক ভাতিজার আত্মসমর্পণের পর তারিক এটি দখলে নিয়ে নেন। অধিকাংশ কাহিনী মতে মূসার নিকট থেকে প্রতারণার আশঙ্কায় তিনি এর একটি পা খুলে ফেলেন ও এর স্থলে একটি কমমূল্যের পা স্থাপন করেন। টেবিলটি এরপর মূসার বিজিত মালামাল রূপে দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়।

যখন দুজনই খলিফার সামনে আসেন, মূসা বলেন যে তিনি এই টেবিলটি দখলকারীদের একজন। তারিক এসময় কম দামি পায়াটির দিকে খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ ব্যাপারে মূসার ব্যাখ্যা ছিল যে তিনি টেবিলটি এ অবস্থায় পেয়েছিলেন। এরপর তারিক আসল পায়াটি বের করেন। ফলে মূসা তার উপর অসন্তুষ্ট হন।

তবে আল বালাজুরির লেখায় খলিফার সামনে এধরনের টেবিল উপস্থাপন করা হয়েছিল বলে কোনো তথ্য নেই।

নতুন পদবী আল আন্দালুসের গভর্ন
৭১১–৭১২
উত্তরসূরী
মুসা বিন নুসাইর

৭১১ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়া উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) ইসলাম পৌঁছায়। সেখানকার রাজা রডারিক এর অত্যাচারী শাসনের ইতি ঘটাতে আইবেরিয়ার নির্যাতিত-নিপীড়িত খ্রিস্টানদের থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া মুসলিম বাহিনী তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মরক্কো ও স্পেনের মধ্যবর্তী জিব্রাল্টা প্রণালী অতিক্রম করে এরপর সাত বছরের মধ্যেই আইবেরিয়া উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চলই মুসলিম নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আর এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশ পরবর্তী ৭০০ বছর ধরে মুসলিম নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

১০ম শতকের মাঝামাঝিতে আল-আন্দালুসের ইসলাম স্বর্ণযুগে পৌঁছায়। প্রায় ৫০ লক্ষ মুসলিমের আবাসস্থল হয় আল-আন্দালুস, যা সেখানকার মোট জনসংখ্যার ৮০% এরও বেশী। এক শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ উমাইয়া খিলাফত এই অঞ্চল শাসন করছিল। আর আল-আন্দালুস (বা আন্দালুসিয়া) হয়ে উঠেছিল ইউরোপের সবচেয়ে অগ্রগামী এবং স্থিতিশীল অঞ্চল। আল-আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোবা কর্ষণ করছিল গোটা মুসলিম বিশ্বের এবং ইউরোপের জ্ঞানপিপাসুদের। যাই হোক, এই স্বর্ণযুগ আজীবন স্থায়ী ছিলনা। ১১শ শতকের দিকে খিলাফত ভেঙ্গে যায় এবং অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে যেগুলোকে বলা হতো ‘তাইফা। মুসলিম তাইফাগুলো বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সাথে সাথে আল-আন্দালুসের উত্তর দিকের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো থেকে আক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। পরবর্তী ২০০ বছরে তাইফাগুলো এক এক করে খ্রিস্টান “রিকনকুইস্তা”-র কাছে ধরাশায়ী হতে থাকে। ১২৪০-এর দশকে এসে আল-আন্দালুসের একমাত্র মুসলিম তাইফা বাকি থাকে, সেটা হচ্ছে গ্রানাদা। এই প্রবন্ধে আমরা আইবেরিয়া উপদ্বীপের এই শেষ মুসলিম রাজ্যের পতনের উপর আলোকপাত করব।রিকনকুইস্তা (Reconquista) হচ্ছে একটি স্পেনীয় ও পর্তুগীজ শব্দ যার ইংরেজি হচ্ছে Reconquest (অর্থঃ পুনর্দখল)। ঐতিহাসিকরা ৭১৮ বা ৭২২ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৭৭০ বছরের সময়কালকে “রিকনকুইস্তা” হিসেবে অভিহিত করে থাকেন, যা মূলত খ্রিস্টানদের স্পেন পুনর্বিজয়ের আন্দোলনকে বুঝানো হয়। গ্রানাডা আমিরাতরিকনকুইস্তার সময় আল-আন্দালুসের উত্তরদিক থেকে আসা হানাদার খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর হাতে একের পর এক মুসলিম রাজ্যগুলোর পতন হতে থাকে। কর্ডোবা, সেভিয়া এবং টলেডোর মতো বড় বড় শহরগুলোর পতন হয় ১১শ থেকে ১৩শ শতকের মধ্যে। যদিও উত্তর আফ্রিকার মুরাবিতুন এবং মুওয়াহিদুন আন্দোলনগুলো খ্রিস্টানদের আক্রমণের এই স্রোতকে মন্থর করতে সাহায্য করেছিল, তবে মুসলিমদের মাঝে চরম অনৈক্য শেষ পর্যন্ত তাদের রাজ্যহীন ও ভূমিহীনে পরিণত হওয়ার দিকেই ধাবিত করে।গ্রানাদা আমিরাতের সীলমোহর, যাতে লেখা রয়েছে “আল্লাহ ছাড়া কোন বিজয়ী নেই”

একটিমাত্র মুসলিম প্রদেশ — গ্রানাডা – ১৩শ শতকে খ্রিস্টানদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবার পতনের পর গ্রানাদা আমিরাতের শাসকগণ শক্তিশালী খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের সাথে এক বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করে। অর্থাৎ তারা “গ্রানাদা আমিরাত” হিসেবে স্বাধীন থাকার অনুমতি পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তাদেরকে চড়া মূল্যে ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের কাছে কর প্রদান করতে হয়েছিল। এই কর প্রদান করতে হতো প্রতি বছর স্বর্ণমুদ্রা হিসেবে। এটি গ্রানাদার মুসলিমদের আরো দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দেয় যেহেতু তারা নিজেরাই নিজেদের শত্রুদের কাছে কর প্রদানের মাধ্যমে শত্রুদের ধীরে ধীরে আরো শক্তিশালী করে তুলছিল।

এছাড়াও গ্রানাডা আমিরাতের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকার পেছনে অন্যান্য আরো কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এর ভৌগলিক অবস্থান। গ্রানাদা দক্ষিণ স্পেনের সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার মধ্যে অনেক উঁচু স্থানে অবস্থিত যা আক্রমণকারী বহিঃশক্তির বিরুদ্ধে একটা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতো। একারণে খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের চেয়ে সামরিক শক্তির দিক দিয়ে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এই পর্বতমালা গ্রানাদাকে দিয়েছিল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে বিশাল এক সুবিধা।

গ্রানাডার যুদ্ধ এবং অস্তিত্বের লড়াই
প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশী সময় ধরে গ্রানাদা টিকে ছিল শক্তিশালী খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যকে কর প্রদান করে যাওয়ার মাধ্যমে। শত্রুভাবাপন্ন খ্রিস্টান রাজ্যবেষ্টিত হওয়ায় গ্রানাদা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ছিল। ১৫শ শতকের শুরুর দিকে আল-আন্দালুসের সর্বশেষ এই রাজ্য নিয়ে এক মুসলিম স্কলার লিখেছিলেনঃ

“গ্রানাডা কি এক উত্তাল সমুদ্র এবং ভয়ানক অস্ত্রশস্ত্র-সজ্জিত হিংস্র এক শত্রু দ্বারা বেষ্টিত নয়, যারা উভয়ই রাতদিন গ্রানাদার জনগণের উপর ভীতির সঞ্চার করে?”

খ্রিস্টানদের গ্রানাডা বিজয়ের মূল চালিকাশক্তিটি আসে ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে, যখন অ্যারাগন রাজ্যের রাজা ফার্দিনান্দ এবং ক্যাস্টিলে রাজ্যের রাণী ইসাবেলা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এর মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয় আইবেরীয়া উপদ্বীপের সবচেয়ে শক্তিশালী দু’টি খ্রিস্টান রাজ্য। একজোট হয়েই তারা তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গ্রানাডার দিকে, উপদ্বীপের সর্বশেষ এই মুসলিম রাজ্যকে সমূলে উৎপাটন করাই হয়ে পড়ে তাদের লক্ষ্য।

রাজা ফার্দিনান্দ এবং রাণী ইসাবেলা আল-আন্দালুসের সর্বশেষ মুসলিম আমিরাত ধ্বংসের জন্য উঠেপড়ে লাগেন

১৪৮২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের এই নতুন খ্রিস্টান রাজ্যের সাথে গ্রানাডা আমিরাতের যুদ্ধ শুরু হয়। শক্তিমত্তার দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও গ্রানাডার মুসলিমরা নির্ভীক হয়ে বীরের মতো যুদ্ধ করে। এক স্পেনীয় খ্রিস্টান গল্পকার মুসলিম সৈন্যদের বীরত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, “মুসলিমরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে এবং হৃদয় উজাড় করে যুদ্ধ করেছে ঠিক যেমনটা একজন সাহসী ও নির্ভীক ব্যক্তি তাঁর নিজের, নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন রক্ষা করতে করে থাকে।” এই যুদ্ধে মুসলিম জনসাধারণ এবং গ্রানাডা আমিরাত সেনাবাহিনীর সৈন্যগণ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করেছে, আল-আন্দালুসের ইসলামকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছে। অন্যদিকে মুসলিম শাসকদের ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো, তারা তেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিতে পারেননি।যুদ্ধের গোটা সময়জুড়ে খ্রিস্টানরা ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং নিজেদের মধ্যে কোন রকমের দ্বন্দ্ব-বিবাদ কিংবা দলাদলিতে জড়িত হয়ে পড়েনি। যদিও অতীতে এমন ঘটনা খ্রিস্টানদের মাঝে অহরহ ঘটতো। এমন ঘটনা ছিল খ্রিস্টানদের মাঝে খুবই স্বাভাভিক এক ব্যাপার। অন্যদিকে মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ দলাদলির কারণে গ্রানাডা বড় এক রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। মুসলিম নেতা ও গভর্ণরেরা একে অপরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছিল এবং একে অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ফন্দি আঁটতে ব্যস্ত ছিল। এদের বেশিরভাগই আবার অর্থ-সম্পদ, ভূমি এবং ক্ষমতার বিনিময়ে গোপনে বিভিন্ন খ্রিস্টান রাজ্যের যোগসাজশে কাজ করে যাচ্ছিল। আর এতো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটি ছিল গ্রানাডা আমিরাতের সুলতানের ছেলে মুহাম্মাদের বিদ্রোহের ঘটনা। ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর পরে মুহাম্মাদ তার পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে গ্রানাডায় তুমুল এক গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। আর একই সময়ে খ্রিস্টান স্প্যানীয় বাহিনীও বাহির থেকে গ্রানাদায় আক্রমণ করা শুরু করে।

রাজা ফার্দিনান্দ এই গৃহযুদ্ধকে নিজের সুবিধার্থে কাজে লাগায়। গ্রানাডা আমিরাতকে সামগ্রিকভাবে দুর্বল এবং মেরুদণ্ডহীন করে দেয়ার জন্য সে মুহাম্মাদকে তার পিতার বিরুদ্ধে (এবং পরবর্তীতে মুহাম্মাদের চাচাকেও) বিদ্রোহে সহায়তা করে। মুহাম্মাদকে নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে ফার্দিনান্দ অস্ত্র ও যোদ্ধা দিয়ে সহায়তা করে এবং শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ সফলও হয়। গোটা বিদ্রোহের সময়জুড়ে খ্রিস্টান বাহিনী ধীরে ধীরে গ্রানাদা আমিরাতের সীমান্তে চাপ প্রয়োগ করতে করতে আমিরাতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করতে থাকে এবং দখল করতে থাকে। ফলে ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ যখন বিদ্রোহে জয়ী হয়ে ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে, ততদিনে শুধুমাত্র গ্রানাদা শহরটিই তার শাসনাধীন অঞ্চল হিসেবে থাকে এবং গ্রাম অঞ্চলের সমগ্র অংশ খ্রিস্টানদের হাতে চলে যায়।

গ্রানাডার সর্বশেষ প্রতিরোধ
গ্রানাডায় মুহাম্মাদের ক্ষমতা ও শাসন পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তার কাছে রাজা ফার্দিনান্দ একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে রাজা ফার্দিনান্দ মুহাম্মাদকে চিঠি পাওয়া মাত্রই আত্মসমর্পণ করার ও গ্রানাডাকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়। ফার্দিনান্দের এই দাবিতে মুহাম্মাদ খুবই বিস্মিত ও হত-বিহ্বল হয়ে পড়ে কারণ ফার্দিনান্দ ইতিপূর্বে তাকে বুঝিয়েছিল যে সে তাকে গ্রানাডা শাসন করার অনুমতি দিবে। পরিষ্কারভাবে, বহু দেরীতে হলেও মুহাম্মাদ বুঝতে পারে যে আসলে গ্রানাডা দুর্বল করার জন্য ফার্দিনান্দ তাকে দাবাখেলার এক গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছে মাত্র।খ্রিস্টানদেরকে সামরিকভাবে প্রতিরোধ করতে মুহাম্মাদ উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন মুসলিম সাম্রাজ্যের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। কিন্তু কেউই তার এই ডাকে সাড়া দেয়নি, শুধুমাত্র ওসমানী সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর এক ছোট্ট অংশ স্পেনীয় উপকূলে হানা দিয়েছিল তবে তাও তেমন কোন কাজে আসেনি। ১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার সেনাবাহিনী গ্রানাদা শহর চতুর্দিক দিয়ে ঘেরাও করে ফেলে। মুহাম্মাদ তার আলহাম্বরা প্রাসাদের মিনার থেকে দেখতে পায় যে খ্রিস্টান বাহিনী গ্রানাডা শহর বিজয়ের জন্য জড়ো হচ্ছে এবং আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মুহাম্মাদ সবকিছু অন্ধকার দেখতে পায় এবং শেষমেশ কোন উপায়ান্তর না দেখে ১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে খ্রিস্টানদের সাথে একটি চুক্তি করে যা খ্রিস্টানদেরকে গ্রানাডা শহরের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দেয়।২ জানুয়ারী ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে আলহাম্বরা প্রাসাদে খ্রিস্টান সাম্রাজ্যসমূহের পতাকা এবং ক্রস বা ক্রুশচিহ্ন লাগিয়ে দেয়া হয়

২ জানুয়ারী ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে এই চুক্তি কার্যকর হয় এবং স্পেনীয় বাহিনী গ্রানাডায় প্রবেশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে আল-আন্দালুসের সর্বশেষ মুসলিম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়। খ্রিস্টান সৈন্যরা সকাল বেলা ঐতিহাসিক আলহাম্বরা প্রাসাদে প্রবেশ করে এবং তাদের বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন স্পেনীয় খ্রিস্টান রাজবংশ, রাজা-রাণীদের পতাকা ও নিশান লাগাতে থাকে। প্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু মিনারের উপরে সৈন্যরা রূপার তৈরী বিশাল এক ক্রুশ্চচিহ্ন বা ক্রস খাড়াভাবে স্থাপন করে এবং এর মাধ্যমে গ্রানাডার ভীত সন্ত্রস্ত মুসলিম অধিবাসীদের জানিয়ে দেয় যে খ্রিস্টান-বিশ্ব মুসলিমদের আল-আন্দালুসের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। শহরের মুসলিম অধিবাসীরা ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছিলনা এবং শহরের রাস্তাগুলো জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে।

সুলতান মুহাম্মাদকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। গ্রানাডা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় পথে সুলতান এক পর্বতমালার গিরিপথে থেমে গ্রানাদার দিকে ফিরে তাকায় এবং কাঁদতে আরম্ভ করে। তার এই আকস্মিক অনুশোচনা ও আক্ষেপে তার মা কোনরূপ প্রভাবিত না হয়ে বরং তাকে তিরস্কার করে বলেনঃ

“যে জিনিষ তুমি একজন পুরুষ হয়ে রক্ষা করতে পারোনি সে জিনিষের জন্য নারীদের মতো কান্নাকাটি করোনা।”

যদিও বিজয়ী খ্রিস্টানরা গ্রানাডার অধিবাসীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বেশকিছু সুবিধাজনক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তবে শীঘ্রই সকল প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ করা হয়। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, ফলে শত-সহস্র মুসলিম অধিবাসী উত্তর আফ্রিকায় হিজরত করতে কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস গোপন করতে বাধ্য হয়। ১৭শ শতকের শুরুর দিকে এসে গোটা স্পেনে আর একজন মুসলিমের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়না।

১১শ শতকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি থেকে ১৫শ শতকের শেষদিকে এসে শক্তিহীন এক রাজ্যে পরিণত হয়ে খ্রিস্টানদের অধীনে চলে যাওয়া— আন্দালুসিয়ার পতনের এই গল্প ইসলামের ইতিহাসে অদ্বিতীয়। মুসলিমদের নিজেদের মাঝে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব-বিবাদ, অন্যান্য মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর সমর্থন ও সাহায্যের অভাব এবং ইসলামী ঐক্যের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেয়া এসবকিছুই আল-আন্দালুসকে পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে গ্রানাদা পতনের মাধ্যমে, এই গল্পেরও ইতি ঘটে।

তারিক বিন জিয়াদ : ইউরোপ বিজয়ী প্রথম মুসলিম সেনাপতি

ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত দেশ স্পেন, যে দেশের বেশিরভাগ(৬৮%) মানুষ রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। মুসলিম প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ কজন জানে এ দেশটি একসময় মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল! এ দেশটিকে ঘিরে রয়েছে মুসলিমদের গৌরবের ইতিহাস! এ ইতিহাস দু’এক বছরের নয়, কয়েক শত বছরের ইতিহাস এটি। স্পেনে কয়েক’শ বছর ধরে কায়েম ছিল মুসলিম শাসন।

আর স্পেনে এ মুসলিম শাসনের সূচনা করেছিলেন তারিক বিন জিয়াদ নামের এক সেনাপতি। তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন ইউরোপ বিজয়ী প্রথম মুসলিম বীর সেনাপতি। কিন্তু তিনি কোথা থেকে এসেছিলেন বা কোন বংশোদ্ভূত ছিলেন- সেসব সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে প্রায় কিছুই জানা যায় না।

কোন কোন ইতিহাসবিদের মতে, তারিক বিন জিয়াদ ছিলেন হামাদানের একজন পারস্য বংশোদ্ভূত লোক। আবার কেউ মনে করেন, তিনি কিন্দাহ গোত্রের একজন মুক্ত আরব অধিবাসী ছিলেন। অনেকের ধারণা, তিনি উত্তর আফ্রিকার বার্বার বংশোদ্ভূত লোক ছিলেন। তবে অধিকাংশ আরব ও স্পানিশ ইতিহাসবিদ এ বিষয়ে প্রায় একমত যে তারিক বিন জিয়াদ ইফ্রিকিয়ার( বর্তমান তিউনিশিয়া, পশ্চিম লিবিয়া ও পূর্ব আলজেরিয়া নিয়ে গঠিত ছিল রোমান সাম্রাজ্যের আফ্রিকা প্রদেশ। এ প্রদেশকে ইফ্রিকিয়া বলা হতো) আমির মুসা বিন নুসাইরের একজন দাস ছিলেন। পরে তিনি তাকে মুক্ত করে দেন ও নিজের সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত করেন। অবশ্য তারিকের বংশধররা পরে তার দাস হওয়ার বিষয়টা অস্বীকার করেছিল বলে জানা যায়।

৭১০-৭১১ সালে মরক্কোর তানজিয়ার জয় করলে মূসা বিন নুসাইর তারিক বিন জিয়াদকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তানজিয়ারের পাশেই অবস্থিত ছিল স্পানিশ শহর সিউটা। মুসা বিন নুসাইর চেয়েছিলেন সিউটা দখল করতে। কিন্তু তানজিয়ার জয় করলেও সিউটা মুসলিমদের কাছে সে সময় পর্যন্ত অজেয়ই থেকে যায়। সিউটা শহরটি সেসময় ভিসিগথ গোত্রের জুলিয়ান নামক একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল।

৭১০ সালের দিকে স্পেনের ক্ষমতায় আসেন হিসপানিয়ার(আইবেরিয়ান উপদ্বীপ) ভিসিগথিক শাসনকর্তা রডেরিক। রডেরিক ক্ষমতায় আসলে সিউটার শাসনকর্তা জুলিয়ান, প্রথানুযায়ী, তার কিশোরী কন্যাকে শিক্ষার্জনের জন্য ভিসিগথিক রাজার দরবারে পাঠান। কিন্তু সেটিই হয় জুলিয়ানের জীবনের সবথেকে বড় ভুলের একটি। রডেরিক জুলিয়ানের কন্যাকে ধর্ষণ করেন। সেই অত্যাচারের বিচার না পেয়ে জ্বলে ওঠেন জুলিয়ান। প্রতিশোধের নেশায় তিনি হাত মেলান মুসলিমদের সাথে। তিনি তার এলাকায় আমন্ত্রণ জানান তারিক বিন জিয়াদকে। মুসলিমদেরকে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে অবস্থিত জিব্রাল্টার প্রণালী গোপনে পার করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি তারিকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন।

এর ফলে, জুলিয়ানের সহায়তায়, নতুন ধর্মান্তরিত মুসলিম ও নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে গঠিত তারিকের বাহিনী ৭১১ সালের ২৯ এপ্রিল স্পেনের সীমানায় একটি পাহাড়ের নিকটে অবতরণ করেন। যা বর্তমানে জিব্রাল্টার নামে পরিচিত। জিব্রাল্টার নামটি আসলে আরবি ‘জাবাল আত তারিক’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ’তারিকের পাহাড়’। অর্থাৎ তারিকের নামানুসারেই জিব্রাল্টারের নামকরণ করা হয়।

জিব্রাল্টারে পৌঁছেই তারিক বিন জিয়াদ তার এবং তার সৈন্যদের বহনকারী সব নৌযান পুড়িয়ে দেন। এটি দেখে তার একজন সৈন্য যখন হতবুদ্ধি হয়ে তার কাছে জানতে চান, কেন তিনি এমন করলেন? তারা এখন ফিরবে কেমন করে? তারিক তখন শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন, ‘ফিরে যাবার জন্য তো আমরা আসিনি। হয় বিজয় হবে নতুবা মৃত্যু’। যুদ্ধে জয়লাভের ব্যাপারে এমনই বদ্ধপরিকর ছিলেন তারিক বিন জিয়াদ।তারিকের সেনাবাহিনীতে মাত্র ৭০০০জন সৈন্য ছিল। তার সাথে মুসা বিন নুসাইর আরও ৫০০০সৈন্য পাঠিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। স্পেনের সম্রাট রডেরিক তারিকের এই স্বল্প সংখ্যক সৈন্যবাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য এক লক্ষাধিক সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন বলে জানা যায়। তবু তারিকের অসাধারণ নেতৃত্ব, তার সৈন্যবাহীনির অসীম সাহসীকতা ও বীরত্বের কাছে হার মানতে হয়েছিল রডেরিককে।

রডেরিকের বিশাল সৈন্যবাহীনিকে মোকাবিলা করতে হবে শুনে প্রথমে তো তারিকের সৈন্যরা ভয় পেয়ে যায়। তারা সংখ্যায় এত কম ছিল যে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের ছিল অসীম সাহসী আর প্রেরণাদায়ী এক নেতা, তারিক বিন জিয়াদ। জানা যায়, যুদ্ধের পূর্বে তার সৈন্যবাহীনিকে সামনে রেখে তারিক বিন জিয়াদ এক যুগান্তরী ভাষণ দিয়েছিলেন। তারিক বিন জিয়াদ সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,” হে আমার সৈন্যগণ, কোথায় পালাবে তোমরা? তোমাদের পেছনে সাগর, আর সামনে শত্রু। তোমাদের কাছে আছে কেবল দৃঢ়তা এবং সাহস। মনে রেখো, এদেশে তোমরা সেই এতিমদের চেয়েও দূর্ভাগা যাদের অর্থলোভী মালিকরা তাদের বিক্রি করে দেয়। তোমাদের সামনে শত্রু, যাদের সংখ্যা অগণিত। কিন্তু তোমাদের শুধু তলোয়ার ব্যতীত কিছুই নেই। তোমরা বেঁচে থাকতে পারবে কেবলমাত্র যদি শত্রুর হাত থেকে নিজেদের জীবন ছিনিয়ে আনতে পারো। তোমাদের সামনে আছে শত্রুকে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে আনার সুবর্ণ সুযোগ। যদি তোমরা মৃত্যুকে তুচ্ছ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারো তবে জয় নিশ্চিত। ভেবোনা আমি তোমাদের বিপদের মুখে ফেলে পালিয়ে যাব, আমিই সবার সামনে থাকব এবং আমার বাঁচার সম্ভাবনাই সবচেয়ে ক্ষীণ।”কাজ হয়েছিল তারিকের এই বক্তৃতায়। উদ্দীপিত হয়েছিল সৈন্যরা। তিনি তার সৈন্যবাহিনীকে সাথে নিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, সৃষ্টিকর্তা চা্ইলে কোন বাধাই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। রডেরিকের ১,০০,০০০ সৈন্যও তাই তারিকের মাত্র ১২০০০সৈন্যকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। রডেরিকের ১ লক্ষ সৈন্যও তারিকের মাত্র ১২ হাজার সৈন্যকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিল (প্রতীকী ছবি)

যুদ্ধের সময় তারিক বিন জিয়াদ তার সৈ্ন্যদলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কর্ডোভা, গ্রানাডা ও অন্যান্য অঞ্চল জয় করতে পাঠান। এসময় তিনি মূল সেনাদলের সাথে অবস্থান করেন। তারা টলেডো ও গুয়াদালজার জয় করে। ৭১১ সালের ১৯জুলাই হিস্পানিয়ার (স্পেন) গুয়াডালেট নামক স্থানে মুসলিমদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ভিসিগথিক রাজা রডেরিক পরাজিত ও নিহত হন। এর ফলে ভিসিগথ রাজ্যে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিমরা চূড়ান্তভাবে বিজয় লাভ করে।স্পেনে মুসলিমদের এই বিশাল জয়ের খবর শুনে তড়িঘড়ি করে স্পেনে আসেন মুসা বিন নুসাইর। এরপর তারিক বিন জিয়াদ এবং মুসা বিন নুসাইর দুই বীর সেনাপতি মিলে আইবেরিয়ান উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল জয় করেন চরম সাহসিকতা আর বীরত্বের সাথে। এ বিজয়ের পর প্রায় সাড়ে সাতশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্পেন মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। আর এ বিজয়গুলো এত কম সময়ের মধ্যে, আর এত সফলভাবে এসেছিল যে তারিক বিন জিয়াদের নাম মধ্যযুগের মুসলিম শাসনের ইতিহাসে খুব মর্যাদার সাথে উচ্চারিত হয় আজও।মুসলিম সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ স্পেন বিজয় করেছিলেন। ইউরোপের মাটিতে প্রথম ইসলামের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশে অগ্রবর্তী দল হিসেবে তারিক বিন জিয়াদ স্পেনে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি ছিলেন উমাইয়া খেলাফতের আফ্রিকান কমান্ডের একজন সেনাপতি।এ কমান্ডের মূল দায়িত্বে ছিলেন মুসা বিন নুসাইর। যাকে আফ্রিকা বিজয়ীও বলা হয়। তারিক বিন জিয়াদ প্রাথমিক সাফল্য লাভের পর উমাইয়া খলিফা মূল সেনাদল প্রেরণ করেন।


মানচিত্রে জিব্রালটার।  এখানেই অবতরণ করেছিলেন তারিক বিন জিয়াদ।

তারিক বিন জিয়াদ ২৭ এপ্রিল ৭১১ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের মাটিতে পা রাখেন। তিনি মরক্কো থেকে জাহাজে স্পেনে পৌঁছান এবং জাবালে তারিকে এসে নোঙ্গর করেন। যার বর্তমান নাম জিব্রালটার। জাবালে তারিকের স্পেনিশ উচ্চারণ জিব্রালটার।পাথুরে পাহাড়ে গড়া জিব্রালটারের পাদদেশে জাহাজ নোঙ্গর করে মুসলিম এ সেনাপতি সৈনিকদের উজ্জীবিত করতে জাহাজগুলো পুড়িয়ে দেন এবং ঐতিহাসিক এক ভাষণ প্রদান করেন। যাতে তিনি বলেন, তোমাদের সামনে মৃত্যু আর পেছনে সাগর অপেক্ষা করছে। মৃত্যুকে জয় করতে না পারলে সাগরে ডুবে মরতে হবে আমাদের।জিব্রালটারে স্পেনের তৎকালীন শাসক রাজা রডারিকের সঙ্গে তার তুমুল যুদ্ধ হয়। রাজা রডারিকের ১ লাখ সৈনিকের বিরুদ্ধে তিনি মাত্র ৭ হাজার সৈনিক নিয়ে বিস্ময়কর এক বিজয় লাভ করেন। তার নামানুসারে যুদ্ধক্ষেত্রের নাম রাখা হয় জাবালে তারিক বা তারিক পাহাড়।
মদিনায়ে ফাতহ-এর রাজপ্রসাদে এখন উড়ে ব্রিটিশ পতাকা

স্পেনের সীমান্তে সংযুক্ত জিব্রালটারের সৃষ্টি (বিজ্ঞানীদের ধারণা মতে) খ্রিস্টপূর্ব ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে। কিন্তু মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ তা বিজয় করার পূর্বে সেখানে কোনো মানব বসতি ছিলো না। তিনি সেখানে মানব বসতি গড়ে তোলেন। তার হাতে কিছু শহুরে স্থাপনাও স্থাপিত হয় সেখানে। স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান হলে তার স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়।


জিব্রালটারের পাউন্ডে তারিক বিন জিয়াদ

স্পেনে মুসলিম শাসনের ৮০০ বছরের ৭৫০ বছরই জিব্রালটার মুসলমানের শাসনাধীন ছিলো। মুসলিম শাসনের কেন্দ্র গ্রানাডা হওয়ায় জিব্রালটারে উল্লেখযোগ্য কোনো মুসলিম স্থাপনা গড়ে ওঠে নি। খ্রিস্টীয় এগার শতকের শেষভাগে স্পেনের কিছু অংশ উত্তর আফ্রিকার ফাতেমি খলিফাদের অধীনে চলে যায়। মূলত তারা এসেছিলেন স্পেনের মুসলিম শাসন রক্ষার জন্য।বিশেষত ইউসুফ বিন তাসফিন ইউরোপীয় খ্রিস্টান রাজাদের বিরুদ্ধে উমাইয়া খলিফাদের উদারভাবে সাহায্য করেন।


 মুসলমানদের স্থাপিত কামানটি এখনো জিব্রালটার পাহারা দেয়।

ফাতেমি খলিফা আবদুল মুমিন ১৯ মার্চ ১১৬০ খ্রিস্টাব্দে জিব্রালটারকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। তিনি সেখানে মদিনায়ে ফাতহ বা বিজয়ের শহর গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। শহরের কাজ পরিপুরি শেষ হয় নি বলেই ঐতিহাসিকদের ধারণা।তার সময়ে স্থাপিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় একটি দৃষ্টিনন্দন গেট (বাবে ফাতহ), মসজিদ, রাজপ্রাসাদ ও পানির ঝর্ণাসমূহ। শহরের নিরাপত্তার জন্য ১৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি সীমান প্রাচীরও গড়ে তোলা হয়।


এক নজরে মদিনায়ে ফাতহ

খলিফা আবদুল মুমিনের মৃত্যুর পর তার ছেলে আবু ইয়াকুব ইউসুফ তার রাজধানী সিভেইলকে রাজধানী ঘোষণা করে। ফলে জিব্রালটারে আধুনিক যে শহর গড়ে উঠছিলো তা থেমে যায়।১৩০৯ খ্রিস্টাব্দে জিব্রালটার মুসলিমদের হাত ছাড়া হয়। ১৭০৪ সালে দ্বীপটি ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তা ব্রিটেনের অধীনে রয়েছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জিব্রালটারের অধিবাসীগণ নামমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করে। এখন তারা ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।


রাজপ্রাসাদের গোসলখানা

মুসলিম শাসন অবসানের পর স্পেনের অন্যান্য স্থানের মতো জিব্রালটারকেও সম্পূর্ণ মুসলিমমুক্ত করা হয়। সেখানে আবারও মুসলিম বসবাস শুরু হয়েছে বর্তমানে জিব্রালটারের ৩০ হাজার অধিবাসীর ৮৬ ভাগ অধিবাসী খ্রিস্টান, ৭ ভাগ মুসলিম, ২ ভাগ খ্রিস্টান ও ২.৪ ভাগ ইহুদি।জিব্রালটারের মুসলিমদের অধিকাংশ মরক্কোর বংশোদ্ভূত। বাকিরা আরব। কিছু সংখ্যক এশিয়ান মুসলিম সেখানে রয়েছে।


ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর বাব-ই-ফাতহ

সৌদি আরবের মরহুম বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ জিব্রালটারকে পৃথিবীর কাছে নতুন করে পরিচিত করার উদ্যোগ নেন। তিনি জিব্রালটার সফর করেন এবং এখানে বৃহৎ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

ইবরাহিম আল ইবরাহিম মসজিদটি ৮ আগস্ট ১৯৯৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়। তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে মসজিদে ফাহাদ বিন আবদুল আজিজও বলা হয়।৯৮৫ স্কয়ার ফিটের এ মসজিদটি নির্মাণে বাদশাহ ফাহাদ ৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেন। ধারণা হয়, ইউরোপের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এ মসজিদে অমুসলিম দেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ।এটিই জিব্রালটারের একমাত্র জুমার মসজিদ। মসজিদটিকে মূলত একটি কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। যাতে রয়েছে ৪৮০ স্কয়ার ফিটের একটি মূল প্রার্থনা কক্ষ। যাতে ৪ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারবে। মহিলাদের নামাজ আদায়ের জন্য রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা।


মসজিদে ফাহাদের ভেতরের অংশ

এছাড়াও ৬টি ক্লাস রুম, ১টি লাইব্রেরি, ১টি লাশধোয়ার রুম, ১ হলঘর, কর্মকর্তা কর্মচারিদের আবাসিক ব্যবস্থা ও পরিচালনা অফিস।ইবরাহিম আল ইবরাহিম মসজিদকে জিব্রালটারের অন্যতম পর্যটন স্পট মনে করা হয়। মুসলিম ও অমুসলিম সব দর্শনার্থী এ মসজিদে প্রবেশের অধিকার রাখেন।

জিব্রালটারে মসজিদটি নির্মাণের পর মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মসজিদ কেন্দ্র করে তারা যেমন ইসলামি শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছে। তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে পারস্পারিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্য। যা জিব্রালটারে ইসলাম প্রসারে ভূমিকা রাখছে।

স্পেন বিজয়ের প্রাক্কালে তারিক ইবনে জায়াদের ঐতিহাসিক ভাষন এবং এযুগের মুসলিমদের ইতিহাস নিয়ে হীণমন্যতা

সেনাপতি তারিক ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে রডারিকের ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্যর মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। সৈন্য সংখ্যার ব্যবধান তাকে মোটেও ভাবিয়ে তোলেনি কারণ তিনি জানতেন তাদের আসল শক্তি লোকবল নয় বরং ঈমানের অফুরন্ত শক্তি। ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে, স্পেনের মাটিতে পা রেখেই সমস্ত সৈন্যদের নামিয়ে আনলেন তারিক। জ্বালিয়ে দিলেন তাদেরকে বয়ে আনা জাহাজগুলো। তারপর সৈন্যদের লক্ষ্য করে বললেন- প্রিয় বন্ধুগন, এখন তোমাদের সামনে স্পেন, রডারিকের সেনাবাহিনী আর পিছনে ভূ-মধ্য সাগরের উত্তাল জলরাশি। তোমাদের সামনে দুটোপথ। হয় লড়তে লড়তে জয়ী হওয়া, শাহাদাতের মর্যাদাসিক্ত হওয়া কিংবা সাগরের উত্তাল তরঙ্গের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাপুরুষের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। তার বক্তব্যে অনুপ্রাণিত সৈন্যগণ বিপুল বিক্রমে লড়াই করে সেদিন বিজয়ী হয় এবং রডারিক ওয়াডালেট নদীতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে

সামহয়্যার ইনে একটা পুরানো পোস্ট খুঁজতে যেয়ে উপরের পোস্টাটাতে চলে যাই। তারেক বিন যায়াদের কাহিনী জানা ছিলো, তার ঐতিহাসিক ভাষনাটাও পড়া ছিলো। তারিকের সৈন্যদের ইমানী শক্তি যে পুরাপুরি ছিলো সেই বিষয়ে কোন সন্দেহঃ নাই। তবে সেই ইমানী শক্তির মূলে কি ছিলো সেটা লেখককে জানানোর জন্যই ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম তারিকের ভাষনটার খোঁজে। পেলাম । উইকিপিডিয়াতে ভাষনটা পেয়ে মনে মনে খুশিই হলাম খুব বেশী কষ্টকরতে হলো না বলে। তারিকের মূল ভাষনটা খুব একটা বড় না, ছোট ছোট তিনটা মাত্র প্যারাগ্রাফ। কিন্তু উইকির ভাষনটা পড়েই বুঝলাম গড়বড় আছে কোথাও। মনে হচ্ছে কিছু একটা মিসিং। কিন্তু সেটা কি চট করে মনে করতে পারছিলাম না। আরেকটু খুঁজতেই পুরো ভাষনটা পেয়ে গেলাম। উইকির ভাষনটায় মূল ভাষণের দাড়ি-কমা সহ সবই দেয়া আছে শুধু দ্বিতীয় প্যারার চারটা লাইন মিসিং। কি আছে সেই চার লাইনে? পাঠকদের জন্য দ্বিতীয় প্যারাটাকে ভেঙ্গে লাইন তিনটিকে মাঝখানে আলাদা করে বোল্ড করে দিলাম। ভাষনের প্রথম এবং তৃতীয় প্যারাগ্রাফ দুটো উইকির লিঙ্কে পাবেন।

Remember that if you suffer a few moments in patience, you will afterward enjoy supreme delight. Do not imagine that your fate can be separated from mine, and rest assured that if you fall, I shall perish with you, or avenge you.

You have heard that in this country there are a large number of ravishingly beautiful Greek maidens, their graceful forms are draped in sumptuous gowns on which gleam pearls, coral, and purest gold, and they live in the palaces of royal kings.

The Commander of True Believers, Alwalid, son of Abdalmelik, has chosen you for this attack from among all his Arab warriors; and he promises that you shall become his comrades and shall hold the rank of kings in this country. Such is his confidence in your intrepidity. The one fruit which he desires to obtain from your bravery is that the word of God shall be exalted in this country, and that the true religion shall be established here. The spoils will belong to yourselves.

সূত্র: Medieval Sourcebook: Al Maggari: Tarik’s Address to His Soldiers, 711 CE, from The Breath of Perfumes

ভাষন পড়লেই বোঝা যায় তারিকের মূল বক্তব্য কি! কি সেই মূলা যা সেই সব নও মুসলিমদের জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। আর তাছাড়া তাদের পিছনে হটার রাস্তাও তো বন্ধ! যাই হোক, তারিকের মূল কথা ছিলো যুদ্ধ করো, জেতো, সম্পদ লুন্ঠন করো, প্রাসাদ বন্দিনীদের রেপ করো….. আর বিনিময়ে মুসলিম জাহানের নেতা আল ওয়ালিদ কি চায়? সে চায় আল্লাহর নাম আন্দালুসের (স্পেনের) সবার মুখে মুখে থাকবে এবং একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলাম আন্দালুসে (স্পেন) প্রতিষ্ঠিত হবে। তরবারী দিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার সবচাইতে উৎকৃষ্ট প্রমাণ বোধহয় তারিকের ভাষনটা। পাঠক মনে রাখবেন খৃষ্ঠান ধর্মও সে যুগে তরবারীর মাধ্যমেই সবচাইতে বেশি প্রতিস্ঠিত হয়েছে।

এখানে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তারিকের ভাষণে গ্রীক রমনীদের কথা বলা হয়েছে তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে অষ্টম শতাব্দীতে স্পেন ছিলো বাইজেন্টাইন (রোম) সাম্রাজ্যের অধীনে যার রাজধানী ছিলো কনস্টানটিনোপলে। তখনকার বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সরকারী ভাষা ছিলো গ্রীক। আর সেই সময়কার আরবদের কাছে শত্রু মানেই গ্রীক। কিন্তু সবকিছু বিবেচনায় করলে স্পেনের প্রাসাদের মেয়েরা ভিসিগথ (জার্মান) ছিলো বলেই মনে হয়। তারা কি আসলেই গ্রীক ভাষায় কথা বলত, সেটা জানার কোন উপায় এখন আর নাই। আর রাজা রড্রিক কি আসলেই নদীতে ডুবে মরেছিলো? উত্তর হলো না, সে তারিক বাহিনীর হাতেই নিহত হয়েছিলো।

According to a ninth-century chronicle, a tombstone with the inscription Hic requiescit Rodericus, rex Gothorum (here rests Roderic, king of the Goths) was found at Egitania (modern Idanha-a-Velha, Portugal).

আর যুদ্ধে লুন্ঠনকৃত সম্পদের পরিমান কেমন ছিলো?

“He took up the pearls, the armour, the gold, the silver, and the vases which he had with him, and found that quantity of spoils, the like of which one had not seen. … he wrote to Musa Ibn Nossevr informing him of the conquest of Andalus, and of the spoils which he had found… Afterwards Musa Ibn Nosseyr set out for Andalus…Tarik then met him, and tried to satisfv him, saving: “I am merely thy slave, this conquest is thine.” Musa collected of the monev a sum, which exceeded all description. Tarik delivered to him all that he had plundered.”

সূত্র: History of the Conquest of Spain by the Moorsby Ibn Abd-el-Hakem 860 A.D.

কিন্তু কেন আলোচ্য ওই তিনটি লাইন উইকিপিডিয়ায় চেপে যাওয়ার প্রয়াস? তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে উইকি তথ্যসূত্র হিসাবে খুব একটা নির্ভর যোগ্য না হলেও বহু সংখ্যক মানুষ ইদানীং উইকির উপর নির্ভরশীল হয়ে পরছে খুব সহজেই তথ্য খুঁজে পেতে। ইতিহাস ইতিহাসই। সেখানে ইচ্ছাকৃত ভাবে লাইন গুলো চেপে যেয়ে তারিক ইবনে যায়াদ কিংবা তার যোদ্দাদের মহামানব বানাবার এই প্রচেষ্টা কেন? এমনতো না যে তখনকার দিনের ইউরোপের সব রাজ-রাজড়ারা এর থেকে ভালো কিছু ছিলো। বরং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এর চেয়ে আরো খারাপ ছিলো। তবে তারা যদি সেগুলোকে স্বীকার করে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে তবে মুসলিমদের এই হীনমন্যতা কেন? মুসলিমরা কেন পারেনা ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে বর্তমান নিয়ে ভাবতে?

গত কয়েকদিনে ব্লগে হুমায়ুন আহমেদের “ঘেটু পুত্র কমলা” সিনেমা নিয়ে একশ্রেনীর ব্লগার বেশ হৈ চৈ করলেন। এদের কজন বলছেন, “আমার জানা মতে বাংলাদেশে ঘেটুপুত্রের প্রচলন কখনোই ছিলো না। পশ্চিমবঙ্গে প্রচলন থাকতে পারে কিন্তু মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে কখনোই ছিল না। বাংলাদেশে সমকামীতা প্রসঙ্গটি হনুমান হুমায়ন আহমেদের কল্পনাপ্রসূত; ঐতিহাসিক কোন ঘটনার অবলম্বনে নয়।”

ইতিহাসকে অস্বীকার করার কি নির্লজ্ব প্রয়াস!! উনি জানেন না তাই হতে পারে না। আর হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে থাকতে পারে কিন্তু মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে থাকতে পারে না। কি দারণ কথা… মুসলিমরা এরকমটা করতেই পারে না। কয়েকদিন আগে আফগানিস্হানে এই একবিংশ শতাব্দীতেও ঘেটু পু্ত্রদের মতই প্রচলিত “বাচ্চা বাজি” নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। সেখানে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী একশ্রণীর মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই কিভাবে বর্তমান সময়েও ছোট ছোট বাচ্চাদের মানসিক, শারিরীক এবং যৌন নির্যাতন করে থাকে।

  বাচ্চা বাজি (bacha bazi) : আফগানিস্হানে প্রচলিত বিকৃত শিশু (যৌন) নির্যাতনের সংস্কৃতি

প্রায়ই দেখা যায় কোরানের কোন আয়াত কিংবা সহী হাদীস গ্রন্হের কোন হাদীসের সমালোচনা করলে বিশ্বাসীরা সবচাইতে সহজ রাস্তাটা বেছে নেয়। কোরানের আয়াতের ব্যাখ্য বা হাদীসটিকে ভুল বলে চালিয়ে দেয়া। ভুলকে ভুল কিংবা অসত্যকে অসত্য বলে মেনে না নিয়ে কোনদিন কোন জাতি উন্নতি করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়না। আর সেকারনেই হয়ত বিশ্বে মুসলিমরা আজও সব কিছুতে পশ্চাদপদ।আশা করি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে আমরা সবাই ইতিহাসকে ইতিহাস হিসাবেই মেনে নিতে শিখব। আর ইতিহাসের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের মানুষের জন্য একটা সুন্দর সুস্হ আবাসযোগ্য পরিবেশের পৃথিবী গড়ে তুলতে সাহায্য করব।

ইউরোপের সর্ব পশ্চিম উপদ্বীপ আইবেরিয়া, যা স্পেন ও পর্তুগাল দ্বারা গঠিত। এই উপদ্বীপের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত “জিব্রাল্টার”। এই নামের সাথেই জড়িত রহিয়াছে ইউরোপে মুসলিমদের আগমন ও ইতিহাস। “জিব্রাল্টার” নামটি আসে মুসলিম বীর সেনাপতি তারেক বিন জায়েদ-এর নাম থেকে। মুসলিম এই বীর সেনাপতির হাত ধরেই হয় মুসলমানদের ইউরোপ বিজয়ের সূচনা।
সাল ৭১১ খ্রিস্টাব্দে, মাত্র ৭ হাজারের এক ছোট বাহিনী ৪ জাহাজ নিয়ে স্পেন অভিযানে বের হন। বীর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ স্পেনের সমুদ্র তীরে অবতরণ করেই তার সব জাহাজ পুড়িয়ে ফেলেন। তখন তিনি তার সাথীদের বললেন, এখন আমাদের পশ্চাতে উত্তাল সমুদ্র আর সম্মুখে শত্রুরাজ। শত্রুরাজ জয় করে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া এবং শত্রু সৈন্যদের পিছু হটিয়ে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কোন পথ নেই। এ কাজ আমরা যত দ্রুত, সাহসিকতার সাথে করবো ততই উত্তম। অলসতা, ভিরুতা ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই আনে না। স্পেনের অবতরণের পরপরই স্পেনের রাজা রডরিকের এক সেনাপতির মোকাবিলা করতে হয়। তারিক তাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে পালাতে বাধ্য করে। পরাজয়ের সংবাদ রাজা রডরিককে জাননো হলে বিপুল প্রস্তুতি নিয়ে তারিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।
রাজা রডারকের শাসনামল ছিল স্পেনের জন্যে এক দুঃস্বপ্নের কাল। জনগণ ছিল রডারিক ও গথ সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের অসহায় শিকার। মরণের আগে স্বাধীনতা ভোগের কোনো আশা তাদের ছিল না। তারেকের অভিযানের ফলে মুক্তির পথ বেরুবে, এই ছিল সাধারণ মানুষের ভাবনা। তারা তারেক বিন জিয়াদকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করল ৩০ এপ্রিল, ৭১১ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার। রডারক পলায়নের সময় নিমজ্জিত হয়ে মারা যায় গুয়াডেল কুইভারের পানিতে। এরপর জনগণের সহযোগিতায় মুসলমানরা একে একে অধিকার করলেন মালাগা, গ্রানাডা, কর্ডোভা। অল্পদিনেই অধিকৃত হলো থিয়োডমির শাসিত সমগ্র আলজিরিয়াস। এদিকে আরেক সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর পূর্বদিকের সমুদ্র পথ ধরে ৭১২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে আবিষ্কার করেন সেভিল ও মেরিজ। তিনিও স্পেনের বিভিন্ন শহর অধিকার করে টলেডোতে গিয়ে মিলিত হলেন তারিকের সঙ্গে। তারপর তারা এগিয়ে যান আরাগনের দিকে। জয় করেন সারাগোসা, টারাগোনা, বার্সেলোনা এবং পিরেনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত গোটা স্পেন।
তারপর মুসা বিন নুসাইর পিরিনিজ পর্বতে দাঁড়িয়ে সমগ্র ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন আঁকছিলেন আর স্পেন থেকে বিতাড়িত গথ সম্প্রদায়ের নেতারা পিরিনিজের ওপারে স্পেন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ইউরোপের খ্রিস্টান নেতারা। মুসলমানরা পিরেনিজ অতিক্রম করে ফ্রান্সের অনেক এলাকা জয় করেন। কিন্তু অ্যাকুইটেনের রাজধানী টুলুর যুদ্ধে ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়ে তারা বুঝতে পারলেন যে, অসির পরিবর্তে মসির যুদ্ধের মাধ্যমেই ইউরোপ জয় করা সহজতর। এরপর মুসলমানদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও বিস্তারে। তারা সেই যুদ্ধে সফল হন এবং প্রণিধানযোগ্য ইতিহাস তাদের বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। অপরদিকে খ্রিস্টীয় শক্তি পুরনো পথ ধরেই হাঁটতে থাকে। ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মে মাসারার যুদ্ধের পর থেকে স্পেনের ওপর তাদের নানামুখী আগ্রাসন ও সন্ত্রাস চলতে থাকে। ফলে স্পেনের নিরাপত্তা হয়ে পড়ে হুমকির সম্মুখীন। কিন্তু স্পেনের ভেতরে পচন ধরার প্রাথমিক সূত্রগুলো তৈরি হচ্ছিল ধীরে ধীরে। সমাজের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বোধ ও সচেতনতা ধীরে ধীরে হারাতে শুরু করছিল। রাজনৈতিক নেতৃবর্গ রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র বিভাজনের কাণ্ডজ্ঞান থেকে সরে আসছিল দূরে। এদিকে ইউরোপের আকাশে ক্রুসেডের গর্জন শোনা যাচ্ছে। স্পেনের বিরুদ্ধে যে আক্রোশ কাজ করছিল সেটাই তিনশ’ বছরে পরিপুষ্ট হয়ে ১০৯৭ সালে গোটা ইসলামী দুনিয়ার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে ভয়াবহ তুফানের মতো। ১০৯৮-এর জুনে এন্টিয়ক দখলের সাফল্যজনক কিন্তু নৃশংস ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠা এ তুফান ১২৫০ সালে অষ্টম ক্রুসেডের পরিসমাপ্তির পর স্পেনের দিকে মোড় ঘোরায়। স্পেনে তখন সামাজিক সংহতি ভঙ্গুর। খ্রিস্টান গোয়েন্দারা ইসলাম ধর্ম শিখে আলেম লেবাসে বিভিন্ন মসজিদে ইমামতিও করছে। তাদের কাজ ছিলো স্পেনের সমাজ জীবনকে অস্থিতিশীল ও শতচ্ছিন্ন করে তোলা।
১৪৬৯ সালে ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা স্পেনে মুসলিম সভ্যতার অস্তিত্বকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য পরস্পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৪৮৩ সালে ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী পাঠান মালাগা প্রদেশে। যাদের প্রতি হুকুম ছিল শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়া, জলপাই ও দ্রাক্ষা গাছ কেটে ফেলা, সমৃদ্ধিশালী গ্রাম ধ্বংস করা, গবাদিপশু তুলে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। সেই সময় মৃত্যু ঘটে স্পেনের শাসক আবুল হাসান আলীর। শাসক হন আজজাগাল। এক পর্যায়ে প্রাণরক্ষা ও নিরাপত্তার অঙ্গীকারের ওপর নগরীর লোকেরা আত্মসমর্পণ করলেও নগরী জয় করেই ফার্ডিনান্ড চালান গণহত্যা। দাস বানিয়ে ফেলেন জীবিত অধিবাসীদের। এরপর ফার্ডিনান্ড নতুন কোনো এলাকা বিজিত হলে বোয়াবদিলকে এর শাসক বানাবে বলে অঙ্গীকার করে। ৪ ডিসেম্বর ১৪৮৯। আক্রান্ত হয় বেজার নগরী। আজজাগাল দৃঢ়ভাবে শত্রুদের প্রতিহত করলেন। কিন্তু ফার্ডিনান্ডের কৌশলে খাদ্যাভাব ঘটে শহরে। ফলে শহরের অধিবাসী নিরাপত্তা ও প্রাণরক্ষার শর্তে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু তাদের ওপর চলে নৃশংস নির্মমতা। আজজাগাল রুখে দাঁড়ালে তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং পরে করা হয় আফ্রিকায় নির্বাসিত।
ডিসেম্বর ১৪৯১-এ গ্রানাডার আত্মসমর্পণের শর্ত নির্ধারিত হলো। বলা হলো : ‘ছোট-বড় সব মুসলমানের জীবনের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে। তাদের মুক্তভাবে ধর্ম-কর্ম করতে দেয়া হবে। তাদের মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অক্ষত থাকবে। তাদের আদবকায়দা, আচার-ব্যবহার, রাজনীতি, ভাষা ও পোশাক-পরিচ্ছদ অব্যাহত থাকবে। তাদের নিজেদের আইনকানুন অনুযায়ী তাদের প্রশাসকরা তাদের শাসন করবেন …।’ আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেন মুসা বিন আকিল। তিনি বললেন, গ্রানাডাবাসী! এটা একটা প্রতারণা। আমাদের অঙ্গারে পরিণত করার জ্বালানি কাঠ হচ্ছে এ অঙ্গীকার। সুতরাং প্রতিরোধ! প্রতিরোধ!! কিন্তু গ্রানাডার দিন শেষ হয়ে আসছিল। ১৪৯২ সালে গ্রানাডাবাসী আত্মসমর্পণ করলো। 
রানী ইসাবেলা ও ফার্ডিনান্ডের মধ্যে শুরু হলো চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা। চারদিকে চলছিল ভয়াবহ নির্যাতন। পাইকারি হারে হত্যা বর্বরতার নির্মম শিকার হতে থাকলেন অসংখ্য মুসলমান। স্পেনের গ্রাম ও উপত্যকাগুলো পরিণত হয় মানুষের কসাইখানায়। যেসব মানুষ পর্বতগুহায় আশ্রয় নিয়েছিল, তাদেরও মেরে ফেলা হলো আগুনের ধোঁয়া দিয়ে। পহেলা এপ্রিল, ১৪৯২। ফার্ডিনান্ড ঘোষণা করলেন, যেসব মুসলমান গ্রানাডার মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ। লাখ লাখ মুসলমান আশ্রয় নিলেন মসজিদগুলোতে। ফার্ডিনান্ডের লোকেরা সবগুলো মসজিদে আগুন লাগিয়ে দিলো। তিনদিন পর্যন্ত চললো হত্যার উৎসব। ফার্ডিনান্ড লাশ পোড়া গন্ধে অভিভূত হয়ে হাসলেন। বললেন, হায় মুসলমান! তোমরা হলে এপ্রিলের বোকা (এপ্রিল ফুল)।
এই গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, তাদের ফার্ডিনান্ডের ছেলে তৃতীয় ফিলিপ সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করেন। তাদের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখেরও বেশি। ইতিহাস বলে, তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোকই জীবিত ছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহিন অতলে হারিয়ে যান চিরদিনের জন্য। এভাবেই মুসলিম আন্দালুসিয়া আধুনিক স্পেনের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের দুঃখ হয়ে বেঁচে আছে। সেই বেঁচে থাকা বোয়াবদিলদের বিরুদ্ধে ধিক্কাররূপে ফার্ডিনান্ডের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদরূপে।
দুনিয়ার ইতিহাস কী আর কোনো আন্দালুসিয়ার নির্মম ট্র্যাজেডির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল? সম্ভবত হয়নি এবং হতে চায় না কখনও। স্পেন হয়ে আছে মুসলিম উম্মাহর শোকের স্মারক। পহেলা এপ্রিল আসে সেই শোকের মাতম বুকে নিয়ে। শোকের এই হৃদয়ভাঙা প্রেক্ষাপটে মুসলিম জাহানের জনপদে জনপদে আন্দালুসিয়ার নির্মমতার কালো মেঘ আবারও ছায়া ফেলছে। এশিয়া-আফ্রিকাসহ সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে মুসলিম নামধারী একশ্রেণির বিশ্বাসঘাতক বোয়াবদিল এবং ক্রসেডীয় উন্মত্ততার প্রতিভূ ফার্ডিনান্ডদের যোগসাজশ। আন্দালুসিয়ার মুসলমানদের করুণ পরিণতি যেন ধেয়ে আসতে চায় এই মানচিত্রের আকাশেও। এ জন্য পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিপর্যয়ের প্রলয়বাদ্য চলছে।

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসে ‘এপ্রিল ফুল’ –এর ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসে এপ্রিল ফুল বলতে কিছু নেই এবং পহেলা এপ্রিলেরও কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অধুনা আমরা যে ‘এপ্রিল ফুল’ বলে বেদনাহত হই সেটাও নিতান্ত আবেগী অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের উপমহাদেশের মুসলিমরাও খুব ঘটা করে এপ্রিল ফুলের বেদনাবহ স্মরণদিবস পালন করেন। ইসলামি ঘরানার ম্যাগাজিন, পত্র-পত্রিকা, প্রতিষ্ঠান তো বটেই আমাদের অনেক জাতীয় দৈনিকও দিবসটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের হামদর্দি প্রকাশ করে কলাম বা আবেগী লেখা ছাপে। ইদানীং ফেসবুক, ব্লগ, টুইটারসহ অনলাইনের হেন কোনো মাধ্যম নেই যেখানে এপ্রিল ফুল নিয়ে অতি আবেগী মুসলমানরা হামদর্দিতে আহা-উহু করেন না। কী কারণে? কারণ, এপ্রিলের ১ লা তারিখে মুসলমানদের করতল থেকে সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে স্পেনের তৎকালীন রাজধানী গ্রানাডা দখল করে নেন পার্শ্ববর্তী অ্যারাগোন রাজ্যের রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং ক্যাস্টিলের রানি ইসাবেলা।কিন্তু এটা ইতিহাসের কত খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিলো? সেটা কি এপ্রিল মাসে হয়েছিলো নাকি অন্য কোনো মাসে? এখানেই আসল রহস্য। চলুন আমরা আলোচনার গভীরে প্রবেশ করি এবং জানতে চেষ্ঠা করি একটি ইতিহাস বদলের ইতিহাসকে… ৩০ এপ্রিল ৭১১ খ্রিস্টাব্দ মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ জাবালুত্তারিক (জিব্রাল্টার) বন্দরে অবতরণ করেন এবং ক্রমান্বয়ে স্পেন দখল করেন। এরপর ৭১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ৭৮০ বছর পর্যন্ত মুসলিমরা স্পেন শাসন করে। কিন্তু শেষদিকে অর্থাৎ ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে মুসলিম শাসকদের নৈতিক অধঃপতন শুরু হলে স্পেনের ভাগ্যাকাশেও দেখা দেয় দুর্যোগের ঘনঘটা। আশপাশের খ্রিস্টান রাজারা ক্রমাগত আক্রমণ করতে থাকে স্পেনের মুসলিম রাজ্যসমূহে। ফলশ্রুতিতে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ২ রা জানুয়ারি গ্রানাডার তৎকালীন মুসলিম শাসক আবু আব্দুল্লাহ (পাশ্চাত্যে তাকে ববডিল নামে ডাকা হয়) রাজা ফার্ডিন্যান্ড এবং রানি ইসাবেলার সঙ্গে এক চুক্তির মাধ্যমে পরাজয় স্বীকার করে নেন। গ্রানাডার সর্বশেষ মুরিস শাসক (Moorsih king) ছিলেন নাসরিদ বংশীয় আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ (Abu Abdullah Muhammad XII)। বিলাস-ব্যসনে মত্ত ও উচ্ছন্নে যাওয়া আবু আব্দুল্লাহ ছিলেন গ্রানাডার তাইফার সুলতান আবুল হাসানের ছেলে। ছেলের ষড়যন্ত্র ও কুচক্রের কারণে অনেকটা সিরাজুদ্দৌলার মতোই বাবা আবুল হাসান পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। মির জাফরের মতো আবু আব্দুল্লাহকে বানানো হয় নামকাওয়াস্তে সুলতান। এই পুতুল সুলতানের কাছেও ১৪৮৯ সালে ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার কাছ থেকে চূড়ান্তরূপে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণের নির্দেশনা আসে এবং স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় অস্বীকারের ভয়াবহ পরিণতির কথাও। বিভিন্ন এনসাইক্লোপিডিয়ার ইতিহাস অনুযায়ী আবু আব্দুল্লাহ উপায়ান্তর না দেখে গ্রানাডা সম্পূর্ণভাবে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন ১৪৯২ সালের ২ রা জানুয়ারিতে। একটি উদাহরণ পাওয়া যেতে পারে এম বি সিঞ্জ (M B Synge) তার দ্যা বাল্ডউইন্স প্রজেক্ট (The Baldwins Project) প্রকাশিত ‘সাহসী মানুষদের সাহসী কাজ’ (Brave Men and Brave Deeds)’ নামক আর্টিকেলে। তিনি লিখেছেন, December had nearly passed away. The famine became extreme, and Boabdil determined to surrender the city on the second of January. “ডিসেম্বর শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। আর ববডিল (আবু আব্দুল্লাহ) গ্রানাডা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলেন ২ রা জানুয়ারি।” এখানে উল্লেখ্য যে, খ্রিস্টান বাহিনী কয়েক মাস ধরে গ্রানাডার চারপাশে অবস্থান নিয়ে এ নগরীকে অবরোধ করে রেখেছিলো। ফলে সেখানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। স্পেন থেকে মুসলমানদেরকে ১৪৯২ সালেই বের করে দেয়া হয়নি। শাসক আবু আব্দুল্লাহর সাথে ইসাবেলা আর ফার্ডিন্যান্ডের যে চুক্তি হয়েছিলো তাতে গ্রানাডার মুসলমানদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীকালে মুসলমানদের হয় ক্যাথলিক নয়তো স্পেন ছাড়ার পছন্দ দেয়া হয়েছিলো। যারা স্পেন ছাড়েনি তারা ক্যাথলিক ছদ্মবেশে মুসলিমই থেকে যান। খ্রিস্টানরাও জানতো তারা মুসলমান। আর এদেরকেই তারা মরিস্কো উপাধি দেয়। মরিস্কোদের পুরোপুরি স্পেন থেকে বহিষ্কার করা হয় ১৬০৯ থেকে ১৬১৪ সালের মধ্যে। এটাও করা হয়েছিলো; রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হারানো মরিস্কোদের অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্রোহ করার পর। এই হলো স্পেনে মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আমার এই আলোচনায় ১৪৯২ সালের ২ রা জানুয়ারি তারিখটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে যে, মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি করার নামে খ্রিস্টান বাহিনী ষড়যন্ত্র করে রাতের আঁধারে গ্রানাডায় ঢুকে পড়ে এবং শহরবাসীকে নিরাপত্তার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মসজিদে ঢুকিয়ে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পুড়িয়ে মারা হয় হাজার হাজার মুসলিম শহরবাসীকে। আর এই তারিখটি ছিলো এপ্রিলের ১ লা তারিখ। যেহেতু মুসলমানদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বোকা বানিয়ে অগ্নিদগ্ধ করে মারা হয় তাই খ্রিস্টানরা বলতে থাকে ওরা এপ্রিলের বোকা- ‘এপ্রিল ফুলস’ (April Fools)। সেখান থেকেই এপ্রিল ফুল বিষয়টি এসেছে এবং মুসলমানদের মাঝে তা আবেগতাড়িত বেদনায় পালিত হয়। আসল ঘটনা এই এপ্রিল ফুলকে নিয়েই আসল ঘটনা এই এপ্রিল ফুলকে নিয়েই। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানদের পরাজয়ের দিনটি ছিলো ১৪৯২ সালের ২ রা জানুয়ারি। এপ্রিলের ১ তারিখ বা এপ্রিল মাসেও নয়। তদুপরি এটা কতো সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা সে বিষয়েও কেউ সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেন না। এটা যদি ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ১ লা এপ্রিল হয়ে থাকে তবে সম্পূর্ণই মিথ্যা একটি রটনা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা ইতিহাসের সমস্ত দলিল-প্রমাণে খুব স্পষ্ট করেই লেখা রয়েছে যে, স্পেনে মুসলিমদের পরাজয়ের দিনটি ছিলো ২ রা জানুয়ারি ১৪৯২ এবং এর আগে ‘ট্রিটি অব গ্রানাডা’ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যে চুক্তিনামায় খ্রিস্টানদের হাতে গ্রানাডার কর্তৃত্ব তুলে দেয়া সংক্রান্ত শর্তাদি লেখা ছিলো। তাহলে এপ্রিল ফুলের বিষয়টি এলো কোথা থেকে? যেখানে পরাজয় ঘটেছে জানুয়ারি মাসের ২ তারিখে সেখানে এপ্রিলের ১ লা তারিখ কেনো আসবে তা কিছুতেই বোধগম্য নয়। নারকীয় হত্যাকাণ্ড যদি ঘটে থাকে তবে তাতো শহরে ঢোকার দিনই ঘটার কথা এবং আমাদের মাঝে প্রচলিত ইতিহাসও তাই বলে। কিন্তু আমরা সব ইতিহাসের দলিল-প্রমাণে দেখতে পাচ্ছি সেটি জানুয়ারির ২ তারিখ। তাহলে ১ লা এপ্রিলের বিষয়টি কোত্থেকে এলো? যা হোক, এ ব্যাপারে আমরা কয়েকটি প্রামাণ্য দলিল পেশ করতে পারি। তাহলে হয়তো আমরা আমাদের এতোদিনকার বোকামিটা ধরতে পারবো। প্রামাণ্য দলিল-১ স্পেনে মুসলমানদের পরাজয়ের ঘটনার কয়েক দশক পরে আলজেরিয়ায় জন্ম নেয়া বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে মোহাম্মদ আল মাকারি (১৫৭৮-১৬৩২) স্পেনে মুসলমানদের আগমন, শাসন এবং পতন নিয়ে রচনা করেন The history of the Mohammedan Dynasties in Spain (extracted from the Nafhu-t-Tib Min Ghosni-l-Andalusi-r-Rattib. Volume 2) (মূল আরবি বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ) ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য মোহাম্মাদান ডাইনেস্টি ইন স্পেন’। এ গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ধারাবাহিক বর্ণনায় স্পেনে মুসলমানদের পরাজয়ের বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু কোথাও তিনি এপ্রিল ফুল জাতীয় কোনো ঘটনার কথা উল্লেখ করেননি। উল্লিখিত গ্রন্থের ৪৪ নং পৃষ্ঠায় তিনি The End of Islamic Garnata ‘ইসলামি গ্রানাডার সমাপ্তি’ শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদে পরাজয়ের ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন এবং পরাজয় পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিস্টান শাসকরা কেমন আচরণ করেছেন সে বিষয়েও আলোকপাত করেছেন। ঘটনার এতো নিকটবর্তী সময়ের একজন সমসাময়িক মুসলিম ঐতিহাসিক এমন বীভৎস ঘটনা ঘটে থাকলে তা উল্লেখ করবেন না- এমনটি ভাবা মূর্খতা। তার ওপর তার পূর্বপুরুষরাও ছিলেন স্পেনীয়। তিনিও বাস করতেন স্পেনের পার্শ্ববর্তী রাজ্যে। সুতরাং তার ইতিহাসগ্রন্থে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ যাবে- তা হতে পারে না। তিনি তার গ্রন্থের ৪৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন- After a series of negotiations and assurances that the Christians would safeguard the agreement that was about to be signed, the Garnata Capitulations were signed in 1491, (otherwise known as The Treaty of Garnata), and in 1492 the Christian forces took over the city, and thus Islamic rule of Andalus ended after almost 780 years of continuous rule. Albeit this did not mean that 1492 marked the end of the Muslim presence in Andalus… পুরো অনুচ্ছেদে মুসলমানদের মসজিদে ঢুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারার কোনো তথ্যই নেই বা এই জাতীয় কোনো ঘটনার কথাও বলা হয়নি। তাহলে বিশ্বাসযোগ্য সত্যটি আসলে কী? সে বিষয়ে আমরা একটু পরেই আলোকপাত করবো। তবে কেউ পুরো বইটি পড়তে চাইলে এই ওয়েবঠিকানায়

[www.islamguiden.com]

ঢুঁ মেরে দেখতে পারেন। এছাড়াও বিশিষ্ট মুসলিম ইতিহাসবিদ এস. এম. ইমামুদ্দিন রচিত A political history of Muslim Spain গ্রন্থেও আলোচিত এপ্রিল ফুল জাতীয় কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। প্রামাণ্য দলিল-২ ১৪৯২ সালের ২ রা জানুয়ারি, আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারক পর্তুগিজ নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস সেদিন উপস্থিত ছিলেন সেই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। তিনি পর্তুগালের লোক ছিলেন এবং সমুদ্রযাত্রা করার জন্য গ্রানাডা অবস্থান করছিলেন। তিনিও অত্যন্ত বেদনাহত ভাষায় মুসলমানদের পরাজয়ের ব্যাপারটি বর্ণনা করেছেন। তিনি তার ডায়েরিতে সেদিনের সে ঘটনাটি খুব নিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন-… This present year of 1492, after Your Highnesses had brought to an end the war with the Moors who ruled in Europe and had concluded the war in the very great city of Granada, where this present year on the second day of the month of January I saw the Royal Standards of Your Highnesses placed by force of arms on the towers of the Alhambra, which is the fortress of the said city; and I saw the Moorish King come out to the gates of the city and kiss the Royal Hands of Your Highnesses and of the Prince my Lord;(E. G. Bourne, ed., The Northmen, Columbus and Cabot (New York, 1906) কলম্বাস বলছেন, ‘১৪৯২ সালে মহামান্য রানি গ্রানাডা শহর দখলের মাধ্যমে ‘মুর’দের হাত থেকে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনেন বিজয়। মহামান্য রানি কর্তৃক মুরদের কাছ থেকে গ্রানাডা দখলের পর আমি শহরের দুর্গ আলহামরার চূড়ায় রাজকীয় পতাকা উড়তে দেখেছি। …এবং আমি দেখলাম মুরদের রাজা (আবু আব্দুল্লাহ) শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রানি এবং রাজকুমারের হাতে চুমু খেলেন…।’ কলম্বাসের ডায়েরিতেও পরাজয়ের দিন মসজিদে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারার কোনো তথ্য নেই। পরবর্তী কয়েকমাসের দিনপঞ্জিও পাওয়া গেছে তবে সেগুলোর মধ্যেও এধরনের কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। এ বছরের অক্টোবর মাসেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারত উপমহাদেশ আবিস্কারের উদ্দেশে সমুদ্রযাত্রা শুরু করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যদিও তিনি ভারত আবিস্কার না করে আবিস্কার করেন আমেরিকা মহাদেশ। সুতরাং এ বছরটি ইতিহাসে খুবই গুরুত্ব বহন করে। তাই স্বভাবতই যেকোনো ইতিহাসবিদ কলম্বাসের প্রথম সমুদ্রযাত্রার পূর্বাপর পরিস্থিতি এবং সময়ক্রম বর্ণনা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কলম্বাসের জীবনীর কোথাও ১ এপ্রিলের কোনো ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। অথচ পহেলা এপ্রিল তিনি গ্রানাডায় উপস্থিত ছিলেন। সে সময় উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটলে তার মতো একজন সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তি তা এড়িয়ে যাবেন বলে মনে করাটা বোকামি।অনেকেই বলতে পারেন, খ্রিস্টানদের দ্বারা লিখিত ইতিহাস মেনে নেয়া যায় না। তাদের জন্য আল-মাকারির উদ্ধৃতি এবং সে সময়কার অন্যান্য মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচনা পড়ার পরামর্শ থাকবে। সেগুলোর কোনোটিতেই এপ্রিল ফুল বা এপ্রিলের ১ লা তারিখের কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। যা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। হ্যাঁ, একথা সত্য যে, পরবর্তী সময়ে স্পেনের খ্রিস্টান শাসকরা মুসলমানদের ওপর বহুবিধ নির্যাতন চালিয়েছে। এমনকি গ্রানাডায় মুসলমানদের পরাজয়ের কয়েক বছর পর যেসব মুসলমান তখনও স্পেনে ছিলো তাদের স্পেন থেকে বিতাড়িত করার জন্য খ্রিস্টানরা অমানবিক নির্যাতন চালানো শুরু করে। সেখানকার মসজিদগুলো গির্জায় রূপান্তরিত করা হয়, বাজেয়াপ্ত করা হয় মুসলমানদের সম্পত্তি, অনেককে তাড়িয়ে দেয়া হয় দেশ থেকে। এছাড়াও মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করা হয় চরমভাবে। নতুন ইতিহাস এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খ্রিস্টানদের এই নির্যাতনের আওতায় কেবল মুসলমানরাই ছিলো না বরং গ্রানাডার অধিবাসী প্রায় তিন লাখ ইহুদিকেও এই একই ভাগ্যবরণ করতে হয়। উপরন্তু ইহুদিদের ওপর খ্রিস্টানরা মুসলমানদের চেয়ে বেশি নির্যাতন চালায় এবং ১৪৯২ সালের ৩১ মার্চ [এই তারিখটি স্মরণ রাখা প্রয়োজন] রানি ইসাবেলা ও রাজা ফার্ডিন্যান্ড ইহুদিদের দমনে ‘আল-হামরা ডিক্রি’ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করেন। সেখানে ইহুদিদের দুটি প্রধানশর্ত দেয়া হয়। এক. যদি স্পেনে থাকতে চাও তবে খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করতে হবে; দুই. অন্যথায় এ দেশ থেকে চলে যেতে হবে। ষড়যন্ত্রপ্রিয় এবং দাঙ্গাপ্রিয় ইহুদিদেরকে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে স্পেন থেকে তাড়ানো হয়। ১৪৯২ সালের মার্চে যদিও স্পেনের ইহুদিদের ৩ মাসের সময় দিয়ে আল-হামরা ডিক্রি জারি করা হয় কিন্তু এ ডিক্রির আওতায় মুসলমানরা ছিলো না। কেননা ২ রা জানুয়ারি ১৪৯২ সালে যে ‘ট্রিটি অব গ্রানাডা’ স্বাক্ষরিত হয় সেখানে মুসলমানদের সঙ্গে এ ধরনের কোনো আচরণ করা হবে না বলে শর্তারোপ করা ছিলো। তাই খ্রিস্টান শাসকরা কার্যত তখনো মুসলমানদের ওপর প্রত্যক্ষ কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারেনি।কিন্তু এর কিছুদিন পর থেকেই ক্রমান্বয়ে খ্রিস্টানরা গ্রানাডাচুক্তির শর্তগুলো ভাঙতে শুরু করে এবং ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে তারা তাদের স্বরূপে আবির্ভূত হয়। ইহুদিদের মতো মুসলমানদেরকেও একই শর্ত দিয়ে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়; হয় তোমাদের খ্রিস্টান হতে হবে নয়তো ছাড়তে হবে স্পেন। এর পরের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাবহ এবং করুণ। প্রাণের ভয়ে হাজার হাজার মুসলমান খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে, নিজেদের মুসলিম পরিচয় বিসর্জন দিয়ে গ্রহণ করে ক্যাথলিকিজম। যাদের সামর্থ্য ছিলো তারা মাতৃভূমি ছেড়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেয় আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে। আর এভাবেই একসময় সমগ্র স্পেন হয়ে পড়ে মুসলিমশূন্য এক খ্রিস্টান দেশ। অনেকেই মনে করতে পারেন যে, এই দেশত্যাগ এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার সময়ে হয়তো এপ্রিল ফুল ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, আল-মাকারি বা অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ মুসলমানদের স্পেনত্যাগের যে বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন সেখানে এমন কোনো তথ্য পরিবেশিত হয়নি।নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওয়েবসাইট উইকিপিডিয়াতে মুসলমানদের স্পেনত্যাগের বিষয়টি অত্যন্ত নিরাবেগভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে- সূত্র: http://en.wikipedia.org/wiki/Morisco#Genetic_legacy_of_Moriscos _in_Spain এ বিষয়টি নিয়ে ২০০৯ সালের ৪ সেপ্টেম্ব বিবিসি Muslim Spain (711-1492) নামে একটি ডকুমেন্টারি আর্টিকেল প্রকাশ করে। আর্টিকেলটির একদম শেষদিকে বলা হয়- The Muslims finally lost all power in Spain in 1492. By 1502 the Christian rulers issued an order requiring all Muslims to convert to Christianity, and when this didn’t work, they imposed brutal restrictions on the remaining Spanish Muslims. “মুসলিমরা চূড়ান্তভাবে তাদের ক্ষমতা হারায় ১৪৯২ সালে। ১৫০২ সালে খ্রিস্টান সরকার এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে সমস্ত মুসলমানকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আদেশ দেয়; সবাই সেটি মান্য না করায় তাদের ওপর নেমে আসে পাশবিক নির্যাতন।” সূত্র : http://www.bbc.co.uk/religion/religions/islam/history/spain_1.shtml আমার এতোক্ষণের আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছি যে, স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসে এপ্রিল ফুল বলতে কিছু নেই এবং পহেলা এপ্রিলেরও কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অধুনা আমরা যে ‘এপ্রিল ফুল’ বলে বেদনাহত হই সেটাও নিতান্ত আবেগী অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে এপ্রিল ফুল বিষয়টি এলো কোথা থেকে? কেনোই বা এটি আমাদের সংস্কৃতিতে সংযোজিত হলো? সে বিষয়টিও অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। তাহলে এপ্রিল ফুল আসলে কী? প্রথমেই কিছু দরকারি কথা জানা থাকা দরকার। অনেকেই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমি কেনো শুধু শুধু এমন প্রচলিত বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছি? তাদের জানা প্রয়োজন, মিথ্যা দিয়ে কখনো সত্যকে বেগবান করা যায় না। ইতিহাসের যেটা সত্য আমরা সেটাকেই আমাদের ধর্মীয় মানসে লালন করবো। একটি অযাচিত আবেগী মিথ্যা দিয়ে কেনো আমরা কলঙ্কিত করবো আমাদের রক্ষিত ইতিহাসকে? স্পেনে মুসলমানদের পরাজয় এবং সেখান থেকে বিতাড়নের ইতিহাস অবশ্যই আমাদের জন্য বেদনার উপলক্ষ। আমাদের সোনালি ইতিহাসে একটি জ্বলজ্বলে ক্ষত। গ্রানাডা, কর্ডোভা (কুরতুব; আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা পাশ্চাত্যের কর্ডোভার আরবি নাম আসলে কুরতুব। বিখ্যাত তাফসিরকারক ইমাম কুরতুবির জন্ম হয়েছিলো এখানে, আলহামরা, আন্দালুস- এসব নাম আমাদের মুসলিম মানসে চিরায়তভাবেই মিশে গেছে। আমাদের চোখের শার্শী বন্ধ করলে এখনো আমরা যেনো আন্দালুসের সেই সটান দাঁড়িয়ে থাকা মিনার চূঁড়াগুলো দেখতে পাই। দেখতে পাই গ্রানাডা থেকে মুসলমানদের বিতাড়নের নারকীয় দৃশ্যাবলি। এগুলো আমাদের অনেক পুরনো বেদনার অনুষঙ্গ, আমাদের জাগরুক চেতনার অগ্নিশিখা। কিন্তু তাই বলে একটি মিথ্যা দিয়ে তো আমরা আমাদের সেই জাগরুক চেতনাকে কলঙ্কিত করতে পারি না। হোক আমাদের বেদনার ইতিহাস, হোক তা শোকের; একটি নির্জলা মিথ্যাকে কেনো আমরা আমাদের ধর্মীয় আবেগের অন্দরবাড়িতে জায়গা দেবো? সত্য ধর্মের জন্য সত্য ইতিহাস আমাদের জানতেই হবে। যাই হোক, এবার আমরা দেখতে চাই যে, এপ্রিল ফুল জিনিসটি আসলে কী চিজ। প্রথমেই আমরা সাহায্য নিচ্ছি পৃথিবীর সবচে বৃহৎ দালিলিকগ্রন্থ এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকার। এপ্রিল ফুল নিয়ে সেখানে লেখা আছে- April Fools’ Day, also called All Fools’ Day, in most countries the first day of April…. ব্রিটানিকা বলছে, ‘এপ্রিল ফুল দিবসকে অনেক দেশে ‘অল ফুলস ডে’ নামেও ডাকা হয়। এটি গ্রহণ করা হয়েছে মূলত এপ্রিলের প্রথম তারিখে হাস্য-কৌতুকের দিবস হিসেবে।… এটি কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। এ দিবসকে প্রাচীন রোমের হিলারিয়া উৎসবের মতো উদযাপন করা হতো মার্চের ২৫ তারিখে,…তবে নতুনভাবে দিবসটি পালন করা হয় সম্ভবত ফ্রান্সের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গৃহীত হওয়ার পর থেকে, যা পূর্ববর্তী নতুন বছর শুরুর দিন ২৫ মার্চ থেকে জানুয়ারি ১ লা তারিখে পরিবর্তন করা হয় ১৫৮২ সালে।’ এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, অনেক আগে থেকেই পহেলা এপ্রিল বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে উদযাপিত হতো। তবে কিভাবে যে এপ্রিল ফুলের সূচনা হয় তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। প্রাচীনকালে জনপ্রিয় উৎসবসমূহ পালিত হতো বসন্তকালীন বিষুব সময়ে (vernal equinox), অর্থাৎ যে সময়ে দিনরাত মোটামুটি সমান থাকে। সময়টি হলো ২১ মার্চ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ঋতু পরিবর্তনের প্রান্তিক সময় ২৫ মার্চ থেকে ২ রা এপ্রিল (অর্থাৎ শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে) পুরাতন জুলিয়ান (Julian) ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোটা ইউরোপে সপ্তাহব্যাপী উৎসব উদযাপন চলতো। আঠার শতকে এপ্রিল ফুল বর্তমান অবয়ব ধারন করার আগ পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনে সাধারণ মানুষদের ঐতিহ্যবাহী মেলা বসতো প্রতিবছরের পহেলা এপ্রিলে। স্কটল্যান্ডে এই দিনটিকে বলা হতো ‘কোকিল শিকারের দিন (hunting the gowk or cuckoo)’। এপ্রিল ফুল নতুনরূপে জন্মলাভের পর এর নামকরণ করা হয় এপ্রিল-কোকিল (April-gowks)। ইউরোপে সম্ভবত এপ্রিল ফুলের বিস্তৃতি ঘটে প্রথমে ফরাসিদের মধ্যে। ফ্রান্সই হলো প্রথম দেশ যে দেশে সরকারিভাবে নবম চার্লস (Charles IX) ১৫৬৪ সালে এক ফরমানের মাধ্যমে ১ লা জানুয়ারিকে নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন । তিনি এটি করেন ১৫৮২ সালে ইতালিয়ান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি (Pope Gregory XII) প্রবর্তিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার (যেটিকে আমরা বর্তমানে ভুল করে ইংলিশ ক্যালেন্ডার বলি) হিসেবে প্রচলন হওয়ারও আগে। এরই সাথে ১ লা এপ্রিলে বন্ধু-বান্ধবদের উপহার দেয়া নেয়ার প্রথাটি বদল হয়ে চলে যায় ১ জানুয়ারি বা নিউ ইয়ার উদযাপনের প্রাক্কালে। কারণ তখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউ ইয়ার পালিত হতো ১ লা এপ্রিলে। অনেকেই এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পেরে এদিনই অর্থাৎ ১ লা এপ্রিলেই তাদের পুরোনো প্রথাসমূহ চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বিপরীত ১ জানুয়ারির পক্ষের লোকজন এদেরকে ফাঁকি দিতে ১ লা এপ্রিলে ভূয়া উপহার পাঠানোর কালচারটি চালু করে। এখান থেকেই মূলত চালু হয় ‘এপ্রিল ফুল ডে’ অর্থাৎ এপ্রিলের বোকা দিবস। কেননা সেসময় যারা নতুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে বিদায় দিয়েছিলো তারা বিদ্রুপ করে অন্যান্য যারা তখনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বর্ষগনণা করতো তাদেরকে বোকা বানাতে ১ লা এপ্রিলে নববর্ষের উপহার পাঠাতো। এতে প্রাচীনপন্থীরা বোকা বনে যেতো এবং নতুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারধারীরা উপহার পাঠিয়ে তাদেরকে পশ্চাদপদ বলে উপহাস করতো। ডাচরা পহেলা এপ্রিল পালন করে অন্য কারণে। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ১৫৭২ সালে নেদারল্যান্ড শাসন করতেন। যারা তার শাসন অমান্য করেছিলো তারা নিজেদেরকে গুইযেন (ডাচে Geuzen ও ফরাসিতে gueux বলা হয়, যার অর্থ ভিখারী) বলে পরিচয় দিতো। ১৫৭২ সালের এপ্রিলের ১ তারিখে গুইযেন বা বিদ্রোহীরা উপকূলীয় ছোটো শহর ডেন ব্রিয়েল (Den Briel) করায়ত্ব করে ফেলে। তাদের এই সফলতায় বিদ্রোহের দাবানল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। শেষমেষ স্প্যানিশ সেনাপ্রধান দ্যা ডিউক অব অ্যালবা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন। ‘ব্রিয়েল’ হলো ডাচ শব্দ, যার অর্থ কাঁচ। ১৯৭২ সালের ১ লা এপ্রিল স্মরণে ডাচরা বিদ্রুপ করে স্প্যানিশদের ‘অ্যালবা কাঁচ হারিয়েছে (Alba lost glasses)’ বলে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে থাকে। উল্লেখ্য, অ্যালবা ছিলো স্পেনের একটি শহরের নাম, যেখানে দ্যা ডিউক অব অ্যালবার সদর দপ্তর ছিলো। এপ্রিল ফুলের আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর জোসেফ বসকিন (Joseph Boskin)। তিনি বলেছেন, এই প্রথাটির শুরু হয় রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের (২৮৮-৩৩৭ খ্রিস্টাব্দ) শাসনামলে। হাসি-ঠাট্টা নিয়ে মেতে থাকে এমন একদল বোকা গোপালভাঁড়েরা সম্রাটকে কৌতুক করে বলে, তারা রাজার চেয়ে ভালোভাবে দেশ চালাতে পারবে। রাজা মহোদয় বেশ পুলকিত হলেন। রাজা গোপালভাঁড়দের সর্দার কুগেলকে একদিনের জন্য বাদশাহ বানিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। আর কুগেল সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যময় আইন জারি করে দিলো, প্রতিবছরের এইদিনে সবাই মিলে তামাশা করবে। আর সে দিনটি ছিলো এপ্রিলের ১ লা তারিখ। ১৯৮৩ সালে বার্তা সংস্থা এপি পরিবেশিত বসকিনের এই ব্যাখ্যাটি অনেক কাগজে নিবন্ধাকারে প্রকাশিত হয়। বসকিন মূলত আগের সব ব্যাখ্যাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। আর্টিকেলটি ছাপানোর আগে এপি দুই সপ্তাহ ধরে ভেবেছে তারা নিজেরাই এপ্রিল ফুলের বোকামির শিকার হচ্ছে না তো! অন্যান্য দিবসের মত এই দিবসটির উৎপত্তি প্রাশ্চাত্যে শুরু হলেও এর বিস্তৃতি এখন দেশে দেশে। শুধুমাত্র বাংলাদেশে (বৃহৎ অর্থে, উপমহাদেশে) কিছু মুসলমানদের মধ্যে এপ্রিল ফুলের ব্যাখ্যায় নতুন মাত্রা লাভ করেছে। এই এপ্রিল ফুল বিষয়টি কিন্তু কেবল আমাদের উপমহাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে যোগ হয়েছে, আরব বা অন্যান্য মুসলিম দেশে এপ্রিল ফুলের নাম নিয়ে কোনো ধরনের মর্সিয়া ক্রন্দন করা হয় না। আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, আমাদের পূর্ববর্তী কোনো ইমাম, আকাবির, গ্রন্থপ্রণেতা কিন্তু স্পেনে এপ্রিল ফুল টাইপের কোনো ইতিহাস বর্ণনা করেননি। হ্যাঁ, গ্রানাডা চুক্তির পর তাদের ওপর নির্যাতনের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায় তবে সেগুলো নির্দিষ্ট করে এপ্রিলের ১ লা তারিখের কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। বিগত ছয়শো বছরের কোনো আকাবিরই (ইসলামি স্কলার) এমন কোনো আলোচনা করে যাননি অথবা তারা এ ইতিহাস জানতেন না- এমন ভাবনা বোকারাও ভাববে না নিশ্চয়ই । প্রতিবছর ১ লা এপ্রিল আসলেই ফেসবুকে, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা আর কিছু মানুষের মুখে শোনা যায়, এদিনে মুসলিমদের বোকা হওয়ার ইতিহাস, খ্রিস্টানদের অপরাধের ইতিহাস আর মুসলিমদের এদিন পালন না করার উপদেশ। বস্তুত আমরা কখনো ইতিহাস না জেনে, পড়াশোনা না করে কেবল অন্যের আবেগী কথায় কান দিয়ে এমন ভুল ইতিহাস পালন করছি। ধর্মকে পুঁজি করে এ ধরনের অপপ্রচার শুধুমাত্র আমাদের দীনতা এবং অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে। আমাদেরকে ঈমানদার মুসলিম বা হামদর্দি মুসলিম করে না। এপ্রিল ফুল নিয়ে আলোচনার শেষদিকে আমরা এ বিষয়েরই ভিন্ন একটি দিকে আলোকপাত করতে চাই। এ আলোচনার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে এপ্রিল ফুলকে মুসলমানদের বেদনার দিবস বানালো কে? এটি একটি কঠিন প্রশ্ন। অন্তত আমাদের জন্য। কেননা আমরা এখনো জানতে পারিনি ঠিক কবে থেকে কোথায় প্রথম এই এপ্রিল ফুল বিষয়টি মুসলমানদের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। কারাই বা এগুলো মুসলিম সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে- সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে আমরা কিছু সম্ভাবনার ভিত্তিতে কয়েকটি কারণ নির্ণয় করতে পারি, যেগুলো তথ্যনির্ভর না হলেও সত্যের অনেক কাছাকাছি হবে বলেই আশা করি। সন্দেহের অব্যর্থ তীর ইহুদিদের দিকে ‘ইসরাইলি রেওয়ায়েত’ বলে আরবি শিক্ষিতদের মাঝে একটি নির্দিষ্ট পরিভাষা প্রচলিত আছে। কোরান এবং হাদিসের ব্যাখ্যায় যে সব তথ্য মিথ্যা কিংবা প্রায়মিথ্যা বলে প্রতীয়মান হয় সেগুলোকে সাধারণত ইসরাইলি রেওয়ায়েত-(ইসরাইলি বর্ণনা) বলা হয়। কোরানের তাফসির বা হাদিসের ব্যাখ্যায় এসব বর্ণনার ওপর আস্থা রাখা হয় না। লোকসমাজে ব্যাপক প্রচলিত হওয়ার কারণে এগুলোকে সত্য হিসেবে যেমন গ্রহণ করা হয় না তেমনি মিথ্যা বলেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর এই ইসরাইলি রেওয়ায়েতগুলো উৎপাদিত হয় সাধারণত ইহুদিসমাজ থেকে। ইসরাইল মানেই ইহুদি। সেমতে আমরা বলতে পারি, এপ্রিল ফুলের বিষয়টিও একটি ‘ইসরাইলি রেওয়ায়েত’ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ মতের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। আসুন, কারণগুলো নিয়ে আমরা একটু আলোচনা করি। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, খ্রিস্টানরা গ্রানাডা দখল করার পর সর্বপ্রথম স্পেন থেকে বিতাড়িত করে অভিশপ্ত ইহুদিদের। বর্তমান সময়ে ইহুদিরা খ্রিস্টানদের মিত্র হলেও ঐতিহাসিকভাবে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের সম্পর্ক দা-কুমড়ো। ইউরোপের ইতিহাসে বহুবার তাদেরকে বিভিন্ন খ্রিস্টান দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এদের নির্দিষ্ট কোনো দেশ ছিলো না। যাযাবরদের মতো বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াতো আর ষড়যন্ত্র করে গন্ডগোল বাধাতো রাষ্ট্রের ভেতর। বর্তমানে ইহুদি-খ্রিস্টান মিত্রতা দেখা গেলেও এটা কেবল বাহ্যিক মিত্রতা, ইহুদিরা নিজেদের স্বজাতি ছাড়া কাউকেই তাদের বন্ধু মনে করে না। যাহোক, আমরা বলছিলাম গ্রানাডা থেকে ইহুদিদের বিতাড়নের প্রসঙ্গে। দেখুন ইতিহাসের কি চমৎকার মিল এবং মুসলমানদের কেমন অজ্ঞতা; ফার্ডিন্যান্ড এবং ইসাবেলার পক্ষে গ্রানাডা থেকে ইহুদিদের খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ নয়তো স্পেন থেকে বিতাড়নের অধ্যাদেশ জারি করা হয় ১৪৯২ সালের ৩১ মার্চ। অর্থাৎ ১ লা এপ্রিলের আগের দিন। খুব ভালো করে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, এদিন গ্রানাডা থেকে ইহুদিদের বের হয়ে যাওয়ার আদেশ দেয়া হয়, মুসলমানদের নয়। আরো স্মরণ রাখুন, দিনটি ছিলো পহেলা এপ্রিলের আগের দিন, ৩১ মার্চ ১৪৯২। আশা করি বিষয়টি এবার ক্লিয়ার হওয়া শুরু করেছে। দেখুন এ ব্যাপারে উইকিপিডিয়া কী বলছে- Several months after the fall of Granada an Edict of Expulsion was issued against the Jews of Spain by Ferdinand and Isabella (March 31, 1492). It ordered all Jews of whatever age to leave the kingdom by the last day of July (one day before Tisha B’Av). সূত্র : http://en.wikipedia.org/wiki/History_of_the_Jews_in_Spain#1391.E2.80.931492 ‘গ্রানাডা পতনের কয়েক মাস পর ফার্ডিন্যান্ড এবং ইসাবেলা ৩১ মার্চ ১৪৯২-এ ইহুদিদের বিরুদ্ধে দেশান্তরের আদেশ জারি করেন। …’ উইকিপিডিয়ার আরেকটি সূত্র দেখুন- The punishment for any Jew who did not convert or leave by the deadline was death without trial the punishment for a non-Jew who sheltered or hid Jews was the confiscation of all belongings and hereditary privileges. সূত্র : http://en.wikipedia.org/wiki/Alhambra_decree ‘যেসব ইহুদি ধর্মান্তরিত কিংবা দেশান্তর হবে না তাদেরকে বিনা বিচারে হত্যা করা হবে।…’ আশা করি এতোক্ষণে আমাদের এপ্রিল ফুলবিষয়ক চিন্তা-ভাবনা স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে। ১৪৯২ সালের ৩১ মার্চ যেহেতু ইহুদিদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তর বা স্পেন থেকে বিতাড়নের ডিক্রি জারি করা হয় সেহেতু পরের দিনটি অর্থাৎ এপ্রিলের ১ তারিখটি তাদের জন্য নিশ্চয়ই বেদনাবহ হওয়ার কথা। হয়েছেও তাই। এদিনটি ইহুদিদের জন্য অত্যন্ত নারকীয় যন্ত্রণার। এদিনটিকে তারা ভুলতে পারেনি শত শত বছর পরেও। আজো তারা ইতিহাসের এ দিনটিকে বেদনার সঙ্গে স্মরণ করে। যেহেতু তারা ইহুদি তাই একটা সময় তারা কুটিল সিদ্ধান্ত নেয় যে, এদিনটি কেবল আমরাই স্মরণ করবো না, কৌশলে আমাদের সঙ্গে মুসলমানদেরও কান্নাকাটি করাবো। নিজেদের অজান্তে তারাও আমাদের ব্যথায় সমব্যথী হবে। কোনো মুসলিম দেশে ইহুদিরা সমাদৃত না হতে পারে তাই বলে ইহুদিদের ইতিহাস তো অপাঙক্তেয় নয়। সেগুলো মুসলিম দেশগুলোতে তারা ঢুকাতে হবে। তবে সাপ্লাই প্রক্রিয়াটা হতে হবে আবেগী এবং ধর্মীয় হামদর্দির সাথে। কেননা ধর্ম মানেই তো স্পর্শকাতর বিষয়। ভুল-চুক হলেও যদি তার ভেতর যথেষ্ট পরিমাণ আবেগ থাকে তবে তা সমাদরে সমাদৃত হয় মুসলমানদের কাছে। কার ঠ্যাকা পড়েছে ইতিহাস ঘাটার! স্পেনে মুসলমানদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে- এটাই সাফকথা। এই সুযোগে ইহুদিরা ঢুকিয়ে দিয়েছে তাদের ইতিহাস। বাইরে মলাট লাগিয়ে দিয়েছে- ১ লা এপ্রিল : স্পেনে মুসলমানদের বোকা বানিয়ে অগ্নিদগ্ধ করে মারার দিন। ইহুদিরা এখানে আরেকটি সুবিধা পেয়েছে, যেহেতু স্পেনে মুসলমানদের পরাজয়, ধর্মান্তর এবং দেশান্তরও প্রায় সমসাময়িক তাই এ বিষয়টিকে খুব সহজেই কাজে লাগিয়েছে তারা। অর্ধশিক্ষিত উপমহাদেশের মানুষ তো আর এতো ইতিহাস ঘাটতে যায় না, তাদেরকে কেবল ধর্মের কথা বলে একটু নাড়া দিলেই হয়, তারা ঝড়ের মতো নড়তে থাকে। কেননা এদেশে ধর্মের কল খুব অল্প বাতাসেই নড়ে। ফলে চতুর ইহুদিরা তাদের বেদনার ইতিহাসকে মুসলমানদের বেদনার ইতিহাস বানিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে মুসলিমসমাজে। কারণ এদেশে ধর্মের লেবাস পরে ইহুদিদের টাকা খাওয়া পাবলিকের অভাব নেই। সুতরাং এইতো সুযোগ! দাও, মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগে ঢুকিয়ে দাও ইহুদি কান্না। মুসলমানদের চোখ দিয়ে ঝরবে ছয়শো বছয় আগের বিতাড়িত ইহুদিদের জন্য শোকাশ্রু। ইহুদিদের জন্য এর চেয়ে পরম চাওয়া আর কী হতে পারে! প্রতি পহেলা এপ্রিলে মুসলমানদের বড়ো বড়ো ধর্মীয় নেতা, আলেম, যুবক-যুবতীরা ইহুদিদের বেদনায় কান্নাকাটি করে। ইতিহাস বিকৃতির এমন নজির আর কয়টা পাওয়া যায়? আর কয়জনই বা পারে সত্য না জেনে কেবল আবেগের যুক্তিহীন বাণে নিজেদের ধর্মকে মিথ্যার কাছে বিকিয়ে দিতে? ভাগ্য ভালো যে ইসরাইলকে বাংলাদেশ স্বীকৃতি দেয়নি, নইলে হয়তো অনেক আগেই বাংলাদেশের অনেক আলেম-ওলামা আর ইসলামপন্থীরা ইহুদি ইতিহাস তোষণ করার বদৌলতে ঢাকা টু তেলআবিবের বিমান টিকেট পেয়ে যেতেন। আমরা সঠিকভাবে জানি না ঠিক কবে কীভাবে ইহুদিদের এই বিতাড়নের ইতিহাস আমাদের মুসলিমসমাজে প্রচলন করা হয়েছে, তবে এর প্রচলন যে খুব বেশিদিনের নয় তা অনুমান করা যায়। কেননা বিগত একশো বছরে মুসলমানদের বাংলা সাহিত্যে এপ্রিল ফুলবিষয়ক কোনো রচনা চোখে পড়ে না। পড়ার কথাও না। এর কারণ হলো, ইহুদিদের সর্বপ্রথম নিজস্ব ভূখন্ড ইজরাইল প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে এবং এর পর থেকেই তারা মূলত বিশ্বব্যাপী তাদের নানামুখী ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম শুরু করে। এরই আওতায় সম্ভবত তারা মুসলমানদের ইতিহাস বিকৃতির কাজটিও সুচারুরূপে সম্পন্ন করে। সুতরাং অনুমান করা যায় যে, ইতিহাস বিকৃতির এই কুকর্মটি বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের পরে ঘটেছে। ইজরাইল প্রতিষ্ঠার আগে ইহুদিরা ইউরোপব্যাপী দৌঁড়ানির ওপর ছিলো। তখন তাদের দ্বারা ইতিহাস নিয়ে এতো বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিলো না বলেই মনে হয়। তবে এমনও হতে পারে, ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টিকে ইহুদি ঐতিহাসিকরা আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছিলো এবং ইজরাইল প্রতিষ্ঠার পর সেগুলো বিভিন্ন মুসলিম দেশে সাপ্লাই করা শুরু করে। এখানে আরেকটি সম্ভাবনার কথা বলা যেতে পারে। বিশেষ করে সেলিব্রেটিদের মুসলিম হওয়া এবং পাশ্চাত্যে ইসলাম দ্রুত অগ্রসরমান হওয়ার খবর নিয়ে। এগুলো বিধর্মীরা প্রচার করে মুসলিমদের মাঝে এমন ধারনা সৃষ্টি করে, সারাবিশ্বে ইসলাম খুব ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; সুতরাং মুসলিমবিশ্বের চিন্তার কিছু নেই। সেই সঙ্গে এগুলো দিয়ে অন্যান্য বিধর্মীদেরও উস্কে দেয়া হয়, যেনো তারা ইসলামের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে। যেমন ডেনমার্কের আন্দ্রে ব্রেভিক। যে চরম মুসলিমবিদ্বেষে গুলি করে খুন করেছিলো প্রায় একশো নিরীহ মানুষকে। সুতরাং এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রিয় পাঠক! এতোক্ষণের আলোচনা-পর্যালোচনা দিয়ে আমরা একথাই বুঝাতে চেষ্টা করেছি যে, আলোচ্যবিষয়গুলো নিতান্তই আমাদের ধর্মীয় আবেগের দুর্বলতা এবং ইতিহাসের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের ধর্মীয় সরলতার সুযোগ নিয়ে ইহুদি বা অন্য কেউ আমাদের সমাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে (আমরা কিন্তু এখানে কোনো নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ইহুদিদের দায়ী করিনি। হতে পারে অন্য কোনোভাবে এটি আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়েছে। তবে ইহুদিদের বিষয়টি অবশ্যপ্রনিধানযোগ্য)। এখানে শুধু দুটো প্রচলিত বিষয়ের সুলুক সন্ধান তুলে ধরা হয়েছে অথচ এমন আরো শত শত প্রচলিত ভুল ইতিহাস আমাদের সমাজে চলতি আছে। আমরা জানিও না যে, এগুলো কবে থেকে কীভাবে আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়েছে এবং এগুলোর মূল ইতিহাসটাই বা কী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এসব ইতিহাসকে আমরা কেবল নিছক ইতিহাসই মনে করি না বরং মনে করি আমাদের ধর্মের অবশ্য অনুষঙ্গ। এগুলোকে অস্বীকার করলে বা অবিশ্বাস করলে আমাদের ঈমান চলে যাবে- এমন ধারনাও অনেকের আছে। কাজেই সহজ কথায় যে চিড়া ভিজবে না, একথা বলাই বাহুল্য। তবে আমরা কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে প্রচলিত ইতিহাসকে একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছি না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ইতিহাসের ইতিহাস নিয়ে। কোনো অনুসন্ধানী গবেষক যদি এ বিষয়ে ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করতে পারেন যে ১ লা এপ্রিলে সত্যিই স্পেনে এমন বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছিলো তবে সেটি হবে বাহবা পাওয়ার মতো ব্যাপার। সে যাই হোক, এমন আরো অনেক ভুল এবং ভয়াবহ মিথ্যা ইতিহাসও আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে। যেমন পেপসি মানে হচ্ছে ‘পে ইচ পেনি টু সেভ ইসরাইল’- প্রতিটি পয়সা ইসরাইলের জন্য সংরক্ষণ করো। এটিও একটি ভুল তথ্য। শুধু পেপসিই কেনো, আমাদের মুসলিম সমাজে অনেক ভ্রান্তবিশ্বাসধারী মানুষকে মুসলিম বিজ্ঞানী, মুসলিম কবি, ইমাম বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ তাদের মধ্যে ইসলামের সঠিক বিশ্বাসই ছিলো না। এমন অনেকজন আছে যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতেন। এমন আরো নানা ‘মজাদার’ চরিত্রের লোকদের আমাদের সমাজে খুব সম্মান এবং গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়!

ইসলাম এমন একটি বিধান যা বুকে নিয়ে বয়ে  বেড়ায় শান্তির পয়গাম। যা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একমাত্র চলার পথ।
নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত জীবন ব্যবস্থা (সূরা ইমরান ১৯)
আর এই ইসলামই মানবজীবনে মুক্তি, শান্তি, সফলতার একমাত্র পন্থা। ইসলাম সঠিকভাবে বুঝার জন্য আল্লাহ হযরত আদম (আ). থেকে শুরু  করে রাসূলে করিম সা. পর্যন্ত ৮ জন রাসূল সহ অনেক নবী পাঠিয়েছেন। সকল নবী রাসূলের দাওয়াতের বিষয় একটিই ছিল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই)। আর ইসলামকে অনুসরণ করার জন্য ছোট বড় সর্বমোট ১০৪টি কিতাব নাযিল করেছেন যার মধ্যে আল-কোরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আর এই কোরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি।” আনআম : ৩৮ আর রাসূল (স) এর বাণী হলো,
যদি কেউ আল্লাহর বাণী কোরআন ও হাদীসকে অনুসরণ করে তাহলে কোনদিনও পথ ভ্রষ্ট হবে না। [ বিদায় হজ্জ]
রাসূল (স) এর অমীয় বাণীকে বুকে লালন করেই রাসূল (স) এর পরবর্তী ইসলামী খেলাফতের শাসকবৃন্দ ইসলামের এই প্রজ্জলিত আলোক শিখা পৌঁছিয়ে দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। রাসূল (স) যে খেলাফতের ভিত্তি মদিনাতে স্থাপন করেছিলেন তার পরবর্তী খলিফাগণ তা প্রসারিত করার লক্ষ্যে আপ্রাণ কাজ করেছেন। যার ফলশ্রæতিতে ফ্রান্সের পিরিনিজ পর্বতমালা থেকে  ইন্দোনেশিয়া যাকার্তায় কায়েম হয়েছিল এক প্রদীপ্ত সালতানাতের। খিলাফতে রাশিদার ৩০ বছর এবং তার পরের উসমানীর শাসনামলে এই আলো উজ্জ্বল করেছিল অর্ধজাহানব্যাপী। এ সময় যেমনিভাবে অনুশীলন হতো সঠিক ইসলামের তেমনি ভাবেই আলো জ্বলছিল দুনিয়াব্যাপি। সেই আলোর ধুমকেতু যেমনিভাবে ভারতবর্ষে এসেছিল মুহাম্মদ বিন কাশিমের হাত ধরে। তেমনিভাবেই স্পেনের আকাশে দেখা দিয়েছির  এমন একটি ক্ষেত্রের যার ছায়া সকলের নিকট পৌঁছে দিল সমভাবে। অন্ধকারাচ্ছন্ন স্পেনকে আলোর চাহনি দিল তারিক বিন যিয়াদের ইদ্দোম সাহসী এক ঘূর্ণীঝড়। যে ঝড় মিথ্যা কলুষিত স্পেনে এনেছিল আলোর সরল পথ।


স্পেনের সমৃদ্ধ ইতিহাস


৭ম শতক ছিল দুনিয়ার বুকে এক নতুন সূর্যের উদয়ের সময়। পৃথিবী দেখেছিল এক নতুন শক্তিকে, যাদের নগন্য শক্তি পৃথিবীর বিশাল বিশাল ঝড়ের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণীকে সত্য প্রমাণিত করার জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে যারা অর্জন করেছিল অর্ধজাহানের খিলাফত। ৭ম শতকের প্রথম দিকেই দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়েছিল ইসলামের আলো। রোমান, ভারতবর্ষ, এশিয়া, তুর্কিস্থানসহ অর্ধজাহানে তখন চলছিল মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস গড়ার সময়। ঠিক এমনই সময় স্পেনের ইতিহাস লেখা হচ্ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায়। তৎকালে স্পেনের রাজা ছিল পথরিক রাজ রডরিক। সে খ্রিস্টান হলেও ইহুদীদের উপর আর ছিল খুব ক্ষোভ। স্পেনে তখন চলছিল জাতী প্রথার চরম রূপ। এ জাতী প্রথার শিকার ছিল ইহুদীরা। সমকালীন সময়ের প্রথা অনুসারে অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা তাদের মেয়েদের আদব-কায়দা শিক্ষার জন্য তাদের রাজদরবারে পাঠাতেন। তখন কিউটার শাসনকর্তা ছিল কাউন্ট জুলিয়ান। সে ইহুদী হলেও সে ছিল রাজার একান্ত প্রিয়। সে তার মেয়ে ফ্লোরিন্ডাকে নিয়ম অনুযায়ী রাজদরবারে পাঠায়। তাকে শিক্ষা দেয়া তো দূরের কথা তার উপর চালালো পাশবিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। ফ্লোরিন্ডা তার খবর জানিয়ে চিঠি লিখলো তার বাবার কাছে। মেয়ের দূর্দশার কথা জানতে পেরে রাগে ছুটে গেলেন রাজদরবারে রাজাকে হত্যা করতে কিন্তু সে তা না করে সম্মানের সহিত তার মেয়েকে নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি চাইলেন। রাজা মনে করেছিল সে এখানকার কোনখবর জানেনা। তাই রাজা ফ্লোরিন্ডাকে তার বাবার সাথে পাঠিয়েদিল। জুলিয়ানের অনেকগুলি পোষা ঈগল, যা রাজার খুব পছন্দের ছিল। তাই জুলিয়ানকে বিদায় দেবার সময় রাজা তাকে বলে সে যেন কিউটা পৌঁছে কিছু ঈগল তার জন্য পাঠিয়ে দেয়। তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে জুলিয়ান বলে আমি এমন সব ঈগল পাঠাবো যা আপনার রাজ্যের চেহারা পাল্টিয়ে দেবে। জুলিয়ানের সেই ঈগল ছিল মুসিলমদের ঐক্যবদ্ধ এক বাহিনী। তার জন্যই কিউটা থেকে জুলিয়ান গেল কায়রোয়ানে।
কায়রোয়ান ছিল মরক্কোর সীমান্তবর্তী এলাকা। যা ছিল মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসায়েরের দখলে। সে শুধু মওকা খুঁজছিল স্পেন আক্রমণের। অবশেষে আসলো সেই মুহাজির মুসার কাছে মুসাকে তার মেয়ের উপর ঘটে যাওয়ার কাহিনী বললেন। সাথে সাথে মুসাকে আমন্ত্রণ জানালেন স্পেন অভিযানের …. জুলিয়ানের এই আবেদন লুফে নিল মুসা। তিনি খলিফা ওয়ালিদ বিন আমালিতের  কাছে অনুমতি নিয়ে তিনি খলিফা ওয়ালিদ বিন আমালিতের কাছে অনুমতি নিয়ে ৪০০ সৈন্যের একটি পরীক্ষামূলক অভিযান চালালেন। এ অভিযানে সফল হওয়ার পূর্ণ অভিযানের জন্য আবেদন করলেন ওয়ালিদের নিকট। চূড়ান্ত অভিযানের অনুমতি পাবার পর কায়রোয়ান থেকে ৭০০০ সৈন্যের বাহিনী ৪টি যুদ্ধজাহাজে পাঠালেন স্পেনের উদ্দেশ্যে। যার সেনাপতি ছিল তারিক বিন যিয়াদ।কায়রোয়ান বন্দর থেকে তারিক মাত্র ৭০০০ সৈন্য নিয়ে ৪টি জাহাজে করে স্পেনের উদ্দেশ্যে রওনা করলো মুসলিম বাহিনী। ৭১১ সালের ২১ এপ্রিল জাহাজে আরোহণের কিছুক্ষণ পরই তারিক জাহাজে ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর রাতে স্বপ্নে তিনি রাসূল সা. এর যিয়ারত লাভ করেন। স্বপ্নে রাসূল সা. তাকে আশ্বস্ত করে বলেন “হে তারিক, তুমি অগ্রসর হও । চিন্তিত হইও না, তুমিই সফল হবে। এই স্বপ্ন দেখে তারিক বিপুল উদ্যমে অগ্রসর হয় আন্দালুসিয়ার দিকে। সৈন্যদল নিয়ে বাদ ফজর জিব্রাল্টার প্রণালীতে সবুজ ভূমিতে নামলো তারিক।জাহাজ নোঙর ফেললো কিউটার বন্দরে (জাবালুত তারিক/ বর্তমান নাম যার জিব্রাল্টার প্রণালী)।৭০০ সৈন্যে ও ৪ টি জাহাজ ভাসছিল ভূমধ্যসাগরের স্পেন তীরে। ফজর নামাজ পড়ে জাহাজ থেকে নামলেন তারিক। স্পেনে নেমে দিলেন এক ভয়ংকর ঘোষণা। তিনি মাল্লাদের বললেন “সবকটি জাহাজে আগুন লাগিয়ে দাও।” তার এই অবাক করা সিদ্ধান্ত মানতে পারছিল না। অনেকে। তখন তারিক তাদের উদ্দেশ্যে বললেন “হে মুজাহিদ মুসলিম ভাইয়েরা, এখন তোমাদের পালাবার বা পিছু হটার কোন রাস্তা নেই। তোমাদের সামনে জিহাদের ময়দান আর পিছনে আলজিয়ার্সের অথৈ সমুদ্র। এখন তোমাদের যেকোন একটা পথে চলতে হবে, হয় আত্মহত্যা করে জাহান্নামে যেতে হবে নতুবা শাহাদাৎ বরণ করে জান্নাতের অমীয় সুধা পান করতে হবে, এছাড়া তৃতীয় কোন পথ  খোলা নেই।” এই বক্তব্যের পর সৈন্যরা প্রস্তুত হলো নতুন ভাবে, সিদ্ধান্ত নিল, শহীদ হবার। 
স্পেনে তারিকের আগমনের খবর পেয়ে রাজা রডিরিক তার বিশ্বস্ত সেনাপতি থিওডোমির কে পাঠালেন ইসলামের অগ্রযাত্রা থামানোর জন্য। কিন্তুু আল্লাহ চেয়েছিলেন ইসলামের বিজয়। মুসলিম বাহিনী ও থিরডোমির মধ্যে অনেকগুলো খন্ড যুদ্ধ হলো। জয়ী হলো ইসলামের নগন্য শক্তিই। বার বার পরাজয়ের পর থিওডোমির রাজা রডরিকের কাছে চিঠিতে লিখলেন” এমন এক জাতীর আমি আজ মুখোমুখি, যারা খুব বিস্ময়কর। তারা আকাশ থেকে নেমে এসেছে নাকি জমিন ফুঁড়ে উঠে এসেছে তা আল্লাহই জানে। এখন আপনি নিজে যিদি তাদের বিরুদ্ধে না নামেন তাহলে তাদের অগ্রযাত্রা আর রোধ করা যাবে না।”রডরিক তার সেনাপতির এই চিঠি  পেয়ে প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য নিয়ে এগিয়ে গেলেন মুসলিমদের উদ্দেশ্যে। এখবর পেয়ে তারিক মুসার কাছে আরো  সৈন্য সহায়তা চাইলে মুসা মাত্র ৫০০০ সৈন্যের একটি কাফেলা তারিকের কাছে পাঠালেন।
লাক্কা প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলো লড়াইয়ের জন্য ১০০০০০ এর বিরুদ্ধে মাত্র ১২০০০। তবুও মনোবল হারালেন না মুসলিম বাহিনী। তাদের মনোবল দেখে রডরিকই ভয় পাচ্ছিল। ৮ দিন স্থায়ী হবার পর আসলো সেই মুহূর্ত। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ নগন্য শক্তির কাছে হার মানলো রডরিকের বিশাল বাহিনী। নিহত হলো রাজা রডরিক। কোন কোন মতে জানা যায় তারিক নিজ হাতে তাকে হত্যা করেছিল কিন্তু ঐতিহাসিকদের মতে রডরিক ওয়াদেল কুইভারের উত্তাল স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল, কারণ তার ঘোড়া নদীতে ভেসে উঠতে দেখা গিয়েছিল। ৩০ এপ্রিল রডরিকের মৃত্যুর পর মুসলিম বাহিনী স্পেনের জনগণের সাহায্যে জয় করলো মালাগা, কর্ডোভা, ভিগোসহ বেশ কিছু অংশ।
স্পেনে তারিকের বিজয়ের খবর শুনে মুসা নিজেই কায়রোয়ান থেকে কিছু লোক নিয়ে স্পেনে আসলো। তিনিও স্পেনের বিভিন্ন শহর আয়ত্তে আনার পর তারিকের সাথে টলেডোলে গিয়ে মিলিত হলেন। তারপর তাদের আক্রমণে ইসলামের ছায়ায় আসে বর্তমান রাজধানী মাদ্রিদ, সারাগোসা, টারাগোনা, বার্সেলোনা এবং পিরিনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল। 
৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদের স্পেন বিজয়ের পর ১৪৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলমানরা স্পেনে বিচরণ করে  স্পেনের ইতিহাস সমৃদ্ধ করে। স্পেনের প্রথম বাদশাহ স্পেনের স্বপ্নদ্রষ্টা মুসা বিন নুসায়েরের পুত্র আব্দুল আজিজের আমল থেকেই স্পেনের ইতিহাস লেখা হয় স্বর্ণের কলম দিয়ে। এসময় সমগ্র স্পেনে ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিকাশ লাভ করে। তৎকালীন স্পেন ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান- বিজ্ঞান, শিল্প-বাণিজ্য, সাহিত্য, অর্থনীতি, দর্শন, গবেষণায় ইউরোপের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম শাসনামলে স্পেনের রাজধানী ছিল (Granada)। এসময় মুসলমানরা স্পেনে অসংখ্য মসজিদ শুধুমাত্র গ্রানাডাতেই মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৭০০। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল কর্ডোভা গ্রান্ড মসজিদ। স্পেনের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় লা-মাদরাজা যার পূর্বের নাম আল মাদ্রাসা এ সময় মুসলমানরা গ্রানাডায় তৈরী করেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণ আল হামরা (লাল প্রাসাদ)যা বর্তমান, স্পেনের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র । কিন্তু স্পেনে মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে এগিয়ে নিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তা হলো কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে শিক্ষালাভ করেই ছাত্ররা সূচনা করে শিল্প বিপ্লবের। শিক্ষা ক্ষেত্রকে আরো উন্নত করার জন্য গ্রানাডায় তৈরী করা হয় তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী। যার নাম দেওয়া হয় আল ইলম বর্তমানে গ্রানাডা স্ট্রেটস লাইব্রেরী। স্পেনে কাগজের প্রচলনও শুরু করে মুসলমানরা। আধুনিক ইউরোপে যে সমস্ত আচার-আচরণ, রীতি-নীতি প্রচলন আছে যার বড়াই করে সমগ্র বিশ্ব তার সবই মুসলমানরা আমদানি করেছিল। বর্তমান ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম যা বার্সেলোনায় অবস্থিত তাছিল তৎকালীন মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। স্পেনে মুসলমানদের হাতের ছোঁয়া পড়েছিল চিত্র শিল্পেও। যার ফল স্বরূপ আজকের দুনিয়ায় পেইন্ট শিল্পের অন্যতম বাজার স্পেন। 
দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের সময় স্পেনের মানবতাকে ডুকরে কেঁদে উঠতে হয়নি। নির্যাতিত-নিষ্পেষিত জাতী পেয়েছিল একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র। যেখানে নারীরা তাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করতো না, গরীব-দূখীদের না খেয়ে মরতে হতো না, জোর করে ধর্মান্তরিতর সাথে কেউ পরিচিত ছিল না। স্পেনের এই শান্তি সুশাসনের প্রভাব পড়লো পাশের রাষ্ট্রগুলোতেও। ফলে একই সাথে ইসলামের দাওয়াত পৌছালো ইউরোপের আনাচে কানাচে। সমগ্র বিশ্বের Model হলো আন্দালুসিয়া। মুসলিম শাসিত এই ৮০০ বছর শুধু স্পেনের নয় বরং তুর্কিস্থান, মধ্যআফ্রিকা, এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরান, ইরাকসহ অর্ধজাহানের স্বর্ণযুগ। এসময় একাধারে দুনিয়া ব্যাপী ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে।যা দেখে টনক নড়ে উঠে ক্রুসেডিয়দের। তারা হিংসার ছোবল মারেন মুসলমানদের প্রতি। স্পেন থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করার জন্য আঁটতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও April Fool….
 ৮ম-১৫ শতাব্দী এই দীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলমানরা স্পেনে বিচরণ করে স্পেনকে গড়ে তুলেছিল ইউরোপের রাজধানী। এ সময় স্পেন যেমনি ভাবে সমৃদ্ধ হয় ঠিক তেমনি ভাবেই স্পেনের উপর কুনজর পড়ে ইহুদী-খ্রিস্টান চক্রের। যার ফলেই অঢ়ৎরষ ঋড়ড়ষ  এর মতো একটি ঘটনা স্পেনের বুক লাল করেছিল।স্পেন দখলের পর মুসলমানদের ইচ্ছা ছিল ইউরোপে জয়ের। কিন্তু ইউরোপ জয় করতে গিয়ে মুসলমানরা বুঝতে পারলো এর জন্য তলোয়ারের চেয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান বেশী কার্যকর।এর ফলে মুসলিম সমাজ তখন শিক্ষার দিকে ঝুকে পড়লো। কিন্তু খ্রিষ্টানরা তাদের পদ্ধতির পরিবর্তন করলো না। তারা সেই তলোয়ারকেই ধরে রইলো। ফলে ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মে মাসারার যুদ্ধের পর থেকে খ্রিষ্টানদের নানামুখী আগ্রসন নিতে থাকে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে আক্রোশ ছিল ক্রুসেডিয়দের তা আরও শক্তিশালী রূপ ধারণ করে ১০ম শতাব্দীতে। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্পূর্ণ ইসলামী দুনিয়ার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে খ্রিষ্টানদের ভয়াবহ তুফান। এই তুফানের কবলে পড়ে ১০৯৮ সালে মুসলমানদের হাত থেকে এন্টিয়ক হারিয়ে যায়। এরপর থেকে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের মুসলিম নিধন আন্দোলন। এন্টিয়ক যুদ্ধে জয়ের পর তারা মনোবল নিয়ে আক্রমণ চালায় ইসলামী খিলাফতে। আর সেই লোলুপ দৃষ্টি স্পেনের দিকে আসে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে। খ্রিষ্টান গোয়েন্দারা মুসলমানদের ঐক্যে ভাঙন ধরানোর জন্য ইসলাম গ্রহণ করে ইমামতি শুরু করে স্পেনের বিভিন্ন মসজিদে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু (বিদায়াত) প্রবেশ করিয়ে মুসলমানদের ঈমানে আঘাত হানা। কারণ তা রা জানতো মুসলমানদের অশির যুদ্ধে পরাজিত করা যাবে না। তাই স্পেন আক্রমণকারী এক খ্রিষ্টান নেতা বলেছিলেন,” আমাদের এই অভিযান সে দিনই অগ্রসর হবে যেদিন দেখবে গ্রানাডা সীমান্তে পাহারারত মুসলিম শিশুরা তলোয়ার ছেড়ে সেতারার তার নিয়ে খেলা করছে।” আর মুসলিমদের হাতে সেই তলোয়ারের পরিবর্তে সেতার তুলে দেয়ার দায়িত্ব ছিল আলেম লেবাসে মুনাফিকদের উপর। ১২৫০-১৪৬৯ এই দীর্ঘ ২’শ বছর খ্রিষ্টীয় স্পাইরা মুসলমানদের সাথে এতই ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল যে পানির মধ্যে তেলের অন্তরণ একাকার হয়ে গিয়েছিল।
১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দ… : মুসলিম বিদ্বেষী খ্রিষ্টানদের পোপ ৫ম ফার্ডিন্যান্ড ও রাগী ইসাবেলা মুসলিম নিধনের জন্য পরস্পরে বিবাহ করে।মুসলিম সেনা কমান্ডার মুগীরাকে আবু দাউদ নামক এক খ্রিষ্টানদের দালার মালাগাতে নিয়ে শহীদ করে। এই থেকে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের চক্রান্ত। আবু দাউদ মুগীরকে খবর দেয় মালাগার একটি এলাকা মুসলমানদের সহযোগীতার জন্য একজন নেতা চাচ্ছে যাতে করে তারা সেনাদলে যোগ দিতে পারে। এই খবর শুনে মুগরীরা চুটে যায় মালাগা কিন্তু সেখানে পৌছাবার আগেই আবু দাউদের ভাড়া করা গুন্ডারা মুগীরাকে হত্যা করে মালাগার রাজপথে ফেলে রাখে। এরপর তারা মুগীরার ছেলে বদরকে হত্যা করতে আসলে বদরের চাচা তাকে নিয়ে চিরতরে আল হামরা থেকে পালিয়ে গ্রানাডা সীমান্তের এক গহীন জংগলে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে স্পেন সীমান্তে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের আক্রমণ। ১৪৮৩ সালে ফার্ডিন্যান্ড একটি ছোট বাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালায় মালাগা সীমান্তে।এই সময় তারা মালাগার খাদ্যভান্ডারে আগুন লাগিয়ে দেয়। অজস্র মানুষকে হত্যা করে তারা মালাগা দখলে নিতে চায় কিন্তু তৎকালীন স্পেনের বাদশাহ আবুল হাসান মালাগা উদ্ধারের জন্য সেখানে গেলে আবু দাউদ হাসানের ছেলে আব্দুল্লাহকে প্ররোচনা দিয়ে স্পেনের মসনদে বসায়। আব্দুল্লাহ মসনদে বসেই খ্রিষ্টানদের দালালী করতে শুরু করে। আবুল হাসান এই খবর শুনে অসুস্থ হয়ে মালাগাতেই মারা যায়।
১৪৮৯ এর ৪ঠা ডিসেম্বর : ফার্ডিন্যান্ড আক্রমণ চালায় রেজার নগরীতে। মুসা বিন আবিগাচ্ছান বদর বিন মুগীর কে নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে গেলে আব্দুল্লাহ তাদের রুখে দাঁড়ায়। আব্দুল্লাহর এই সব কাজের পেছনে হাত ছিল আবু দাউদের। সে তাকে স্বপ্ন দেখায় সমগ্র স্পেনের রাজা হবে সে। বদর আব্দুল্লাহর কাছ থেকে পালিয়ে গেলেও মুসা আব্দুল্লাহর সৈন্যদের কাছে আটক হয়। ফলে মুসলমানদের জন্য কেবল গ্রানাডা ছাড়া সকল জায়গাই প্রকিূলে চলে যায়। নিজ দেশ থেকেই মুসলমানরা বিতারিত হতে থাকে। স্পেনের দরজা মালাগা দখলের পর ফঅর্ডিন্যান্ডের পরবর্তী টার্গেড পরে উত্তরের রাইয়ান থেকে দক্ষিণের আল মিরিয়া। এ এলাকার দায়িত্ব ছিল আল জাগলের উপর।তার এই সালতানাতে ছিল সমৃদ্ধ সেনাবাহিনীইে এলাকায় হামলার প্রস্তুতি শুরু হয় আবু দাউদের এক কুবুদ্ধির পর। সে রাজা ফার্ডিন্যান্ডের কাছে বলে আমাদের কিছু কিছু সৈন্য হামলা করবে ভিগো, তাহলে মুসলিমদের দৃষ্টি থাকবে ভিগোর দিকে আর তখন আমরা আল মিরিয়া আক্রমণ করবো। সেই অনুযায়ী একটি ছোট দল যায় ভিগোর দিকে আর এই খবর শুনার পর বদর (সীমান্ত ঈগল) ছুটে যায় ভিগোর দিকে, আর আল জাগল যায় আল মিরিয়ার দিকে। বদরের কাছে প্রথম দিনই গুটিয়ে যায় খ্রিষ্টানরা। অন্যদিকে আল জাগলের চতুরতায় এবারের মতো আল মিরিয়া রক্ষা পেলেও আব্দুল্লাহ আল মিরিয়া থেকে আল জাগলকে বিতাড়িত করে। এর পর আল মিরিয় ও ভিগো এক সাথে আক্রমণ করে খ্রিষ্টানরা। বদর মনসুরকে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে এমন সময় ভিগো পৌছায় যখন ভিগোর উপর দিয়ে খ্রিষ্টানদের এক ঝড় বয়ে গেছে। ভিগোবাসী দুর্ভিক্ষে জর্জরিত হলে খ্রিষ্টানরা প্রতিটি রাস্তায় পরিখা খনন করে ভিগোকে খাদ্যশূন্য করে দেয়। সামনে ও পেছন থেকে হামলা এবং মুনাফেকদের হামলায় বদরের প্রায় ২ হাজার সৈন্য শহীদ হয়। মারাত্মকভাবে আহত হয় বদর। 
দুর্ভিক্ষে জর্জরিত হয়ে ভিগোবাসী আল পিকরার সবক’টি কিল্লার দরজা খুলে দেয়। ফলে মালাগা, টলেডোর সাথে খ্রিষ্টানদের দখলে যায় ভিগো। এরপর মুসলমানদের কাছে থাকে শুধু গ্রানাডা। আব্দুল্লাহ গ্রানাডা দখলের জন্য ফার্ডিন্যান্ডকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলে কারাগার থেকে পালায় মুসা বিন আবিগাচ্ছান। সে দেখা করলো বদরের সাথে। বদরের ৩ হাজার সৈন্য নিয়ে অবরোধ করলো আবু আব্দুল্লাহর প্রসাদ। ইতিমধ্যে আবু আব্দুল্লাহর চাকর আবুল কাসেম ফার্ডিন্যান্ডের সাথে একটি চুক্তি করে। ফলে মুসলমানরা হারিয়ে ফেলে তাদের ঈমানী শক্তি। তাই শেষবারের মতো গ্রানাডার ১০ লাখ মুসলমানদের জাগাতে প্রকম্পিত হলো শের-এ-গ্রানাডার শেষ গর্জন। তার এই গর্জন চিরদিন আল হামরার প্রসাদের লৌহ কপাট খুঁজে বেড়াবে। বক্তব্য শুরুর পূর্বে মুসা আল হামরার সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে ২ রাকায়াত নফল নামাজ পড়লেন তারপর আল-হামরার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের শেষ সাথী ঘোড়ার পিঠে বসে গ্রানাডাবাসীর জন্য তার শেষ নসীহত।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Instagram