ছাত্র সংগঠন গুলোর আয়ের উৎস..

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পূর্বে ও পরবর্তী সময়ে নানা সংকটের সময় জনমুখী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার ইতিহাস রয়েছে ছাত্র সংগঠন গুলোর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো – ছাত্র বা শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত এই ছাত্রসংগঠন গুলো।
তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে ব্যয় হয় তা কীভাবে সংগ্রহ করা হয়?

বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের গঠনতন্ত্র ঘেটে দেখা যায় যে, প্রায় প্রতিটি ছাত্রসংগঠনের তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট হারে চাঁদা ধার্য এবং অনুদান থেকেই আসে মূল অর্থায়ন।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটির নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

এই দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে দলীয় সদস্যদের চাঁদাকেই মূল ধরা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের জন্য বিভিন্ন হারে চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের প্রত্যেক সদস্য মাসিক ২০ টাকা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ১৫ টাকা, জেলা কমিটির সদস্যরা ১০টাকা এবং নিম্নতম কমিটির সদস্যরা মাসিক ৫ টাকা হারে চাঁদা দেবেন।

ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, “দলের তহবিলে সদস্যদের মাসিক হারে ৫ টাকা করে চাঁদা দেয়ার নিয়ম রয়েছে।”

চাঁদা ছাড়াও এককালীন অনুদান, সদস্য ফি এবং ছাত্রলীগ কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন পুস্তিকা বা বই বিক্রি করেও সংগঠনের তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে এই গঠনতন্ত্রে।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল

বিএনপি দলের ছাত্র সংগঠনটির নাম জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার জানান, ছাত্রদলের লিখিত কোন গঠনতন্ত্র নেই। খসড়া গঠনতন্ত্রে সদস্যদের চাঁদা দিতে হবে এধরণের কোন উল্লেখ নেই।

তিনি জানান, গঠনতন্ত্রটি খসড়া হওয়ার কারণে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এটিতে পরিবর্তন আনা হয়।

তবে তহবিলে সংগ্রহের ক্ষেত্রে নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের উপরই নির্ভর করতে হয়।

নেতা-কর্মীদের চাঁদা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। তবে দলের বা শুভাকাঙ্ক্ষী যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে সাহায্য করতে চান সেটা গ্রহণ করা হয় বা বিবেচনাধীন থাকে বলে জানান তিনি।

তবে লিখিত গঠনতন্ত্র না থাকায় সংগঠনটির একেকটি ইউনিট একেক ভাবে তহবিল সংগ্রহ করে থাকে বলেও জানান তিনি।

তবে ছাত্রদলের একজন কর্মী মানসুরা আলম বলেন, তিনি কখনো চাঁদা দেননি।

তিনি বলেন, “সদস্য হওয়ার সময় ১০০ টাকা করে ফি দিতে হয়। সেটা জানি। কিন্তু দলের তহবিলে আমি কখনো কোন চাঁদা দেইনি। কমিটির কাউকে চাঁদা দিতে হয় কিনা সেটাও জানি না।”

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

ইসলামী ছাত্রশিবির কর্মপদ্ধতি ও সংবিধানে উল্লেখিত অর্থব্যবস্থায় বলা হয়েছে এ সংগঠনের সর্বস্তরে বায়তুল মাল বা অর্থ তহবিল থাকবে।

এর উৎস সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, “সকল সদস্য, কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের এয়ানত ও দান এবং প্রকাশনার মুনাফা একমাত্র আয়ের উৎস।”

এছাড়া সংগঠনের প্রত্যেক শাখাগুলো নিয়মিতভাবে বায়তুল মাল থেকে নির্ধারিত অংশ ঊর্ধ্বতন এয়ানত বা অর্থ প্রদান করে। এবং সংগঠনটির নেতাকর্মীদের এককালীন দান ও এ সংগঠনের আয়ের উৎস।

বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন

বামপন্থী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদজানান, দুইভাবে সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে থাকেন তারা।

এরমধ্যে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গণ চাঁদা সংগ্রহ করার কথা জানান তিনি। এছাড়া রাস্তায় হকার বা ফুটপাতের দোকানদারদের কাছ থেকেও গণ চাঁদা আদায় করা হয়।

তবে এটির হার কখনোই নির্ধারণ করে দেয়া হয় না। ৫ টাকা থেকে শুরু ১০০টাকা পর্যন্ত বা যার যা ইচ্ছা সে হারেই চাঁদা সংগ্রহ করা হয়।

সাধারণত দলের কোন বড় কর্মসূচী বা সম্মেলনকে সামনে রেখে এ ধরণের চাঁদা আদায় করে থাকেন তারা।

আর নিয়মিত চাঁদা দেয় শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে। এছাড়া সংগঠনের সাবেক সদস্য যারা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয়, বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি।

এছাড়া দলের কমিটিতে যে সদস্যরা থাকেন তাদের কাছ থেকেও মাসিক হারে চাঁদা আদায় করা হয়ে থাকে বলেন মি. মাহমুদ।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী জানান, তিন উপায়ে দলের তহবিল সংগ্রহ করা হয়। এগুলো হচ্ছে গণ চাঁদা, সাবেক চাঁদা এবং প্রকাশনা থেকে আয়।

তিনি বলেন, ছাত্র চাঁদা বা গণ চাঁদা যা মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। সাবেক সদস্যদের কাছ থেকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা আদায় করা হয়। এর আওতায় রয়েছে শুভানুধ্যায়ী চাঁদা।

সংগঠনটির প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত আয় দলীয় তহবিলে জমা হয়। এছাড়া ওই প্রকাশনায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের অর্থও যোগ হয় দলীয় তহবিলে।

তিনি বলেন, “বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তহবিল সংগ্রহ করা।”

ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

এদিকে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন কর্মকৌশলে উল্লেখিত অর্থব্যবস্থায় বলা হয়েছে এ আন্দোলনের সর্বস্তরে বায়তুল মাল বা অর্থ তহবিল থাকবে।

এর উৎস সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, “সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের এয়ানত ও এককালীন দান এবং প্রকাশনার মুনাফা হবে বায়তুল মালের উৎস।”

এছাড়া অধস্তন শাখাগুলো নিয়মিতভাবে বায়তুল মাল থেকে নির্ধারিত অংশ ঊর্ধ্বতন শাখায় দিতে বাধ্য থাকবে।

দলটির নেতাকর্মীদের এককালীন দান তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেরাই নির্ধারণ করে থাকেন বলে জানা যাচ্ছে।

তবে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের গঠনতন্ত্র ও অর্থব্যবস্থা ও ইসলামী ছাত্রশিবির এর অর্থব্যবস্থা প্রায় একই রমকম দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ছাত্রশিবির এর গঠনতন্ত্র ও অর্থব্যবস্থা হুবহু নকল করে তাদের অর্থব্যবস্থা তৈরী করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Instagram