কসরের নামায যে ভাবে আদায় করতে হয়

মুসাফিরের নামাজ

দুর সফরে বা লম্বা ভ্রমনে চার রাকাত বিশিষ্ট নামাযকে দুই রাকাত করে পড়াকে কসর সালাত বলে। বা ফরজ সালাত কে অর্ধেক বা কমায় পড়াকে কসর বলে।

  মূসা ইবনু ইসমায়ীল (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং সালাত (নামায/নামাজ) কসর করেন। কাজেই (কোথাও) আমরা উনিশ দিনের সফরে থাকলে কসর করি এবং এর চাইতে বেশী হলে পুরোপুরি সালাত আদায় করি।

باب مَا جَاءَ فِي التَّقْصِيرِ وَكَمْ يُقِيمُ حَتَّى يَقْصُرَ

حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ عَاصِمٍ، وَحُصَيْنٍ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ أَقَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم تِسْعَةَ عَشَرَ يَقْصُرُ، فَنَحْنُ إِذَا سَافَرْنَا تِسْعَةَ عَشَرَ قَصَرْنَا، وَإِنْ زِدْنَا أَتْمَمْنَا‏.‏

 কসর সম্পর্কে বর্ণনা এবং কতদিন অবস্থান পর্যন্ত কসর চলবে।

  আবূ মা’মার (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গেমদিনাথেকে মক্কায় গমণ করি, আমরা মদিনা ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি দু’রাকা’আত, দু’রাকা’আত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন। (রাবী বলেন) আমি (আনাস (রাঃ)-কে বললাম, আপনারা মক্কায় কত দিন ছিলেন তিনি বললেন, আমরা সেখানে দশ দিন ছিলাম।

باب مَا جَاءَ فِي التَّقْصِيرِ وَكَمْ يُقِيمُ حَتَّى يَقْصُرَ

حَدَّثَنَا أَبُو مَعْمَرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، يَقُولُ خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى مَكَّةَ، فَكَانَ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ حَتَّى رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ‏.‏ قُلْتُ أَقَمْتُمْ بِمَكَّةَ شَيْئًا قَالَ أَقَمْنَا بِهَا عَشْرًا‏

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমনকারীকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির অবস্থায় নামাজ পরার নিয়মকে মুসাফিরের নামাজ বলে।

যদি কোন ব্যক্তি মোটামুটি ৪৮ মাইল (৭৭.২৩২ কিলোমিটার) রাস্তা অতিক্রম করে কোন স্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজ এলাকার লোকালয় থেকে বের হয়, তাকে ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মুসাফির বলা হয়। তখন তাকে ইসলামী বিধান মোতাবেক মুসাফিরের নামাজ আদায় করতে হয়। 

ইসলামে মুসাফিরের নামায: এটা মুসলিম পর্যটকদের একটি বৈশিষ্ট্য। লম্বা ভ্রমণে চার রাকাআত বিশিষ্ট নামায দুই রাকাআত পড়া।

মুসাফিরের নামায 

মুসাফির ব্যক্তি পথিমধ্যে চার রাকাআত বিশিষ্ট ফরয নাম (অর্থাৎ জোহর,আসর ও ঈশার ফরয নামায) কে দুই রাকআত পড়বে। একে কছরের নামায বলে।

তিন রাকআত বা দুই রাকাআত বিশিষ্ট ফরয নামায, ওয়াজিব নামায এমনিভাবে সুন্নাত নামায পূর্ণ পড়তে হবে। এ হলো পথিমধ্যে থাকাকালীন সময়ের বিধান। আর গন্তব্য পৌঁছার পর যদি সেখানে ১৫ দিন বা তদুর্ধকাল থাকার নিয়ত হয় তাহলে কছর হবে না- নামায পূর্ণ পড়তে হবে। আর যদি ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত থাকে তাহলে কছর হবে। গন্তব্যস্থান নিজের বাড়ি হলে কছর হবে না, চাই যে কয় দিনই থাকার নিয়ত করুক।

মুসাফিরের জন্য নামায সংক্ষিপ্ত করে পড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রিয় বান্দাদের জন্য উপহার স্বরূপ। তাই মুসাফিরের জন্য ওয়াজিব হলো সেই উপহার গ্রহণ করা।

কছর করা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

আল্লাহ পাক কুরআনে বলেন,:

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا ۚ إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا

অর্থ: তোমরা যখন যমীনে সফর কর এবং তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, কাফিরগণ তোমাদেরকে বিপন্ন করবে, তখন সালাত কছর করলে তাতে তোমাদের কোনও গুনাহ নেই। নিশ্চয়ই কাফিরগণ তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।[২]

অনেক হাদীসে এসেছে, মুহাম্মাদ (সা.) হজ্জ,ওমরা, যুদ্ধসহ যে কোন সফরে কছরের নামায পড়তেন। ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত: “আমি মুহাম্মাদ (সা.) এর সাথে ছিলাম, তিনি সফরে (চার রাকাআত বিশিষ্ট নামায) দুই রাকাআতের বেশি পড়তেন না। আবুবকর ও ওমর একই রকম নামায পড়তেন।”

-বুখারী ও মুসলিম।

বিমান, গাড়ি, স্টিমার, ট্রেন, উট, পর্বতারোহণ ও পদব্রজ ভ্রমণের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সবগুলোই সফর বা ভ্রমণের আওতাভুক্ত। সব সফরেই নামায কছর করতে হবে।

কছরের নামায কখন শুরু করতে হবে:

মুসাফির তার নিজের এলাকা ত্যাগ করার পূর্বে কছরের নামায পড়া জায়েয হবে না।

একাধিক নামায একত্রীকরণ

মুসাফিরের জন্য দু’টি নামায এক সাথে পড়ার অবকাশ রয়েছে । উদাহরণস্বরূপ: জোহরের নামাযকে আসরের নামাযের সময়ে দেরী করে একসাথে পড়া। প্রত্যেক নামাযকে আলাদা আলাদা করে পড়তে হবে। প্রথমে জোহর তারপর আসর পড়তে হবে।

আসরের নামাযকে সময়ের আগে জোহরের সময়ে একসাথে পড়াও জায়েয আছে। এক্ষেত্রেও প্রথমে জোহর তারপর আসর পড়তে হবে।

তদ্রুপভাবে মাগরিব ও ঈশার নামাযের ক্ষেত্রেও করতে পারবে।

ফজর ও জোহর বা মাগরিব ও আসর একত্রে পড়া জায়েয নেই।

সফরের সময় জামাআতে নামায: 

মুসাফিরের জন্য মুকীমের ইমাম হয়ে নামাজ পড়া জায়েয আছে। এক্ষেত্রে সে দুই রাকাত নামায আদায় করে সালাম ফেরাবে এবং মুকীম একাকী নামায শেষ করে নিবে। মুসাফিরের জন্য মুস্তাহাব হলো সালাম ফিরিয়ে মুক্তাদীর বলা” আপনারা নামায পূর্ণ করুন, আমি মুসাফির” ।

মুসাফির ব্যক্তি মুকীম ইমামের পিছনে নামায পড়লে কছর করবে না, পূর্ণ নামাযই পড়তে হবে।

ইমাম মুসলিম ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেন-“মুসাফির ইমামের সাথে চার রাকাআত পড়বে, আর একা পড়লে দুই রাকাআত পড়বে।”

মুসাফিরের জন্য আরো কতিপয় মাসআলা 

  • মুসাফির ব্যক্তির ব্যস্ততা থাকলে ফজরের সুন্নাত ব্যতীত অন্যান্য সুন্নাত ছেড়ে দেওয়া দুরস্ত আছে। ব্যস্ততা না থাকলে সব সুন্নাত পড়তে হবে।
  • যারা লঞ্চ, স্টীমার, প্লেন, বাস, ট্রাক ইত্যাদির চালক বা কর্মচারী, তারাও অনুরূপ দূরত্বের সফর হলে পথিমধ্যে কছর পড়বে। আর গন্তব্য স্থানের মাসআলা উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী হবে।
  • ১৫দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত হয়নি এবং পূর্বেই চলে যাবে চলে যাবে করেও যাওয়া হচ্ছে না- এভাবে ১৫দিন বা তার বেশী থাকা হলেও কছর পড়তে হবে।

    স্থায়ী ও অস্থায়ী আবাসের বিধান

    স্থায়ী আবাসস্থল পরিবর্তন করে অন্যস্থানে মূল আবাস গড়লে স্থায়ী বসবাসের জন্য সেখানে না যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে আগের অবস্থানস্থল মৌলিক আবাসন হিসেবে গণ্য হবে না, এমনকি সেখানে তার মালিকানা জায়গা-জমিন থাকলেও নয়, বরং সেখানেও সফরের সীমানা অতিক্রম করে গেলে মুসাফিরই থাকবে- (আল মাবসূত, সারাখসী ১/২৫২)

    কোনো জায়গায় ১৫ দিন বা ততধিক অবস্থানের নিয়ত করলে সে সেখানে মুকিম হয়ে যাবে। সেখান থেকে সামানা-পত্রসহ প্রস্থানের আগ পর্যন্ত সেখানে পূর্ণ নামাজ পড়বে এবং মুকিমের বিধান জারি থাকবে- (বাদায়েউস সানায়ে ১/১০৪)।

    মহিলারা বিবাহের আগ পর্যন্ত তার বাবার বাড়িতে স্থায়ী আবাস হিসেবে মুকিম থাকবে।

    তবে বিবাহের পর যদি স্বামীর বাড়িতে মৌলিকভাবে থাকে এবং বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে, তাহলে স্বামীর বাড়ি তার মৌলিক আবাসন হিসেবে ধর্তব্য হবে এবং বাবার বাড়িতে মুসাফির থাকবে, আর যদি বাবার বাড়িতে মৌলিকভাবে থাকে, তাহলে তা তার মূল অবস্থানস্থল হিসেবেই বাকি থাকবে- (আল বাহরুর রায়েক ২/১২৮, রদ্দুল মুহতার ২/১৩১)। আর পুরুষগণ তার শ্বশুরবাড়িতে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করলে মুসাফিরই থাকবে। হ্যাঁ, কেউ যদি সেখানে স্থায়ী আবাস করে নেয়, তাহলে তা ভিন্ন কথা।

    মুসাফিরের সুন্নত পড়ার বিধান

    মুসাফির ব্যক্তির জন্য তার চলন্ত অবস্থায় বা তাড়াহুড়া থাকলে ফজরের সুন্নাত ছাড়া অন্যান্য সুন্নাতে মুয়াক্কাদা না পড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্বাভাবিক ও স্থির অবস্থায় সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়তে হবে- (এ’লাউস্ সুনান ৭/১৯১, রদ্দুল মুহতার ১/৭৪২)।

    শ্বশুরবাড়িতে

  • যদি নিজের শ্বশুরবাড়িতে যায়, আর যদি সেখানে সব কিছুর ব্যবস্থাপনা থাকে, তাহলে তিনি কসর করবেন না। কারণ হলো তিনি নিজের পরিবারের কাছে গেছেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে, শ্বশুরবাড়িতে গেছেন, সেখানে তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা নেই, থাকার ব্যবস্থা নেই, পরিবারের কেউ নেই, সবাই সেখানে বাইরের অথবা নিজেই গেছেন সেখানে মুসাফিরের মতো, যদি এমনটি হয়ে যায় তাহলে তিনি মুসাফির। কারণ সেখানে যদি কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকে পরিবার বা আত্মীয় বলতে কেউ না থাকে, তাহলে সেখানে তিনি মুসাফিরই। তাহলে সেখানে তিনি কসর করবেন।
Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *