আসল দাওয়াতী ও দায়ী

الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد

দাওয়াতে খায়র

দাওয়াতে খায়র অর্থ কি ?
দাওয়াত অর্থ আহবান এবং খায়র অর্থ কল্ল্যাণ। সুতরাং দাওয়াতে খায়র অর্থ – কল্ল্যানের পথে আহবান।

কেন এই দাওয়াতে খায়র মজলিশ ?

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরাআনে পাকে আর ইরশাদ হচ্ছে – তোমাদের মাঝে এমন এক টা দল থাকা চাই, যারা কল্ল্যানের পথে আহবান জানাবে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্ধ কাজে বাধা প্রদান করবে, আর এসব লোকই লক্ষ্যস্তলে পৌছে।
সুরা আল ইমরান আয়াত ১০৪

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআন এ পাকে আর ও ইরশদ হচ্ছে – যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আল্লাহ তোমাদের ব্যাতিত অন্য লোকদের তোমাদের স্তলবর্তি করবেন। অতঃপর তারা তোমাদের মত হবেনা।
সুরা- মুহাম্মদ,আয়াত ৩৮

অর্থাৎ অন্য কোন স্মপ্রদায়কে দিয়ে দেওয়া হবে এই সৌভাগে্্যর মুকুট , যা হবে আমাদের জন্য বডই দুর্ভাগ্যজনক ।

সুতরাং মুসলমান হিসাবে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করা দরকার ততটুকু জ্ঞান অর্জনের জন্য দাওয়াতে খায়র মজলিসের আয়োজন।

তাই আসুন শত ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে দুনিয়ার সকল কাজকে না বলে আখেরাতের জন্য কিছু সময় ব্যয় করে আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের রেজামন্ধি হাসিল করার চেষ্টা করি আল্লাহ আমাদেরকে এ ধরনের নেক কাজে অংশগ্রহণ পুর্বক নেক আমল করার তৌফিক দান করুক।

:

দাওয়াত ও তাবলীগ দ্বীনের এক বহুত বড় কাজ। এই কাজ যেন সুচারুরূপে শরঈ তরিকায় সম্পন্ন হতে পারে, তজ্জন্য কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা গ্রহণ জরুরি। কাজের সাথে জড়িতদের মানসিকতা গঠনও একান্ত প্রয়োজন। এ সম্পর্কে আজকের অবসরে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি কথা।

১. উমুমি ময়দানে শরীয়তের মূল তাকাজা তিনটি- দাওয়াত-তাবলীগ, তালীম-তাযকিয়া, জিহাদ-সিয়াসত। তিনটিই আল্লাহর রাস্তা। হাদীসে এসেছে-

مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ العِلْمِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ حَتّى يَرْجِعَ.

যে ইলম অর্জনে বের হয়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায়। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬৪৭

অন্য হাদীসে এসেছে-

مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللهِ هِيَ العُلْيَا، فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ عَزّ وَجَلّ.

যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন বুলন্দ করার জন্য লড়াই করে, সে আল্লাহর রাস্তায়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৩

পুরো দ্বীনই বরং সাবীলুল্লাহ, আল্লাহর রাস্তা। আর দাওয়াত ও তাবলীগ হল আল্লাহর রাস্তারই একটি ধাপ। ইরশাদ হয়েছে-

اُدْعُ اِلٰی سَبِیْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَ الْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَ جَادِلْهُمْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ .

আপনি স্বীয় রবের পথে দাওয়াত দিন হেকমত-কৌশল ও সুন্দর নসীহতের মাধ্যমে। আর (প্রয়োজন হলে) ওদের সাথে অধিকতর উত্তম পন্থায় যুক্তিতর্ক করুন। -সূরা নাহল (১৬) : ১২৫

এই তিন কাজকে নবীওয়ালা কাজ বলে। আরেক ভাষায় বলে, নবুওতের কাজ, ফারায়েজে মানসাবে নবুওত, মানসাবে রেসালাতের দায়িত্ব।

২. মানুষের ময়দানে দ্বীনী কাজের সূচনা হয়েছে দাওয়াত-তাবলীগ দ্বারা। দাওয়াত যারা কবুল করেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে গড়ে তুলেছেন দ্বীনের তালীম-তাযকিয়ার মাধ্যমে। আর জিহাদ ও সিয়াসতের মধ্য দিয়ে নবীজী শরীয়তের বুলন্দি, নেফায (রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োগ) ও হেফাজত নিশ্চিত করেছেন। নবুওতের সূচনালগ্নে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

یٰۤاَیُّهَا الْمُدَّثِّرُ،  قُمْ فَاَنْذِرْ.

হে চাদরওয়ালা! উঠুন, মানুষকে সতর্ক করুন। -সূরা মুদ্দাছছির (৭৪) : ১-২

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-

اَطِیْعُوا اللهَ وَ اَطِیْعُوا الرَّسُوْلَ،  فَاِنْ تَوَلَّوْا فَاِنَّمَا عَلَیْهِ مَا حُمِّلَ وَ عَلَیْكُمْ مَّا حُمِّلْتُمْ،  وَ اِنْ تُطِیْعُوْهُ تَهْتَدُوْا،  وَ مَا عَلَی الرَّسُوْلِ اِلَّا الْبَلٰغُ الْمُبِیْن.

তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তোমরা রাসূলের আনুগত্য কর। যদি তারা আনুগত্য-বিমুখ হয়, তবে নবীকে যতটুকু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার যিম্মাদারি ততটুকুই। আর তোমাদেরকে যত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার দায় তোমাদের উপর। ‘রাসূলের দায়িত্ব’ কেবল পরিষ্কারভাবে তাবলীগ করা-পৌঁছে দেওয়া। -সূরা নূর (২৪) : ৫৪

আরও ইরশাদ হয়েছে-

یٰۤاَیُّهَا الرَّسُوْلُ بَلِّغْ مَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْكَ مِنْ رَّبِّكَ،  وَ اِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَه .

হে রাসূল! আপনি পৌঁছে দিন, যা আপনার কাছে আপনার রবের তরফ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। যদি তা না করেন, তবে তো আপনি আল্লাহর রেসালা-পয়গাম পৌঁছালেন না। -সূরা মায়েদা (৫) : ৬৭

আয়াতে  উল্লেখিত ‘রাসূলের দায়িত্ব’ শব্দ-বন্ধ থেকেই প্রতীয়মান হয়, দাওয়াত ও তাবলীগ হল নবুওত ও রেসালতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

আর তালীম ও তরবিয়তকে নবুওতের ফারায়েজে মানসাবি (নবুওতের পদগত দায়িত্ব) হিসাবে ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ بَعَثَ فِیْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیْهِمْ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَة .

মুমিনদের উপর আল্লাহ বড় অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে এমন একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের সামনে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করে শোনান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের তালীম প্রদান করেন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬৪

আল্লাহ তাআলার দরবারে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কী কী মৌলিক কাজের জন্য একজন নবী পাঠানোর আরজি পেশ করেছেন, তা কুরআন মাজীদে এসেছে এইভাবে-

رَبَّنَا وَ ابْعَثْ فِیْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْهُمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِكَ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ وَ یُزَكِّیْهِمْ ، اِنَّكَ اَنْتَ الْعَزِیْزُ الْحَكِیْمُ.

হে আমাদের রব! তাদের মাঝে এমন একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের সামনে আপনার কালাম তিলাওয়াত করে শোনাবেন, কিতাব ও হিকমতের তালীম প্রদান করবেন এবং তাদের তাযকিয়া করবেন। -সূরা বাকারা (২) : ১২৯

নবীজী নিজেই ইরশাদ করেন-

إِنّ اللهَ لَمْ يَبْعَثْنِي مُعَنِّتًا، وَلَا مُتَعَنِّتًا، وَلَكِنْ بَعَثَنِي مُعَلِّمًا مُيَسِّرًا.

কাউকে কষ্টে নিক্ষেপকারী বা কারো পদস্খলনকামী হিসাবে আল্লাহ আমাকে পাঠাননি। আমাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন সহজকারী ও শিক্ষকরূপে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১০৪

অন্য হাদীসে এসেছে-

خَرَجَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ ذَاتَ يَوْمٍ مِنْ بَعْضِ حُجَرِهِ، فَدَخَلَ الْمَسْجِدَ، فَإِذَا هُوَ بِحَلْقَتَيْنِ، إِحْدَاهُمَا يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ، وَيَدْعُونَ اللهَ، وَالْأُخْرَى يَتَعَلّمُونَ وَيُعَلِّمُونَ، فَقَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: كُلّ عَلَى خَيْرٍ، هَؤُلَاءِ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ، وَيَدْعُونَ اللهَ، فَإِنْ شَاءَ أَعْطَاهُمْ، وَإِنْ شَاءَ مَنَعَهُمْ، وَهَؤُلَاءِ يَتَعَلّمُونَ وَيُعَلِّمُونَ، وَإِنّمَا بُعِثْتُ مُعَلِّمًا فَجَلَسَ مَعَهُمْ.

একবার নবীজী কামরা থেকে বের হয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন, তখন মসজিদে দুটি হালকায় দ্বীনী কাজ হচ্ছিল। এক হালকার লোকেরা কুরআন মাজীদ পাঠ করছিলেন এবং দুআ করছিলেন। আরেক হালকার লোকেরা দ্বীন শিখছিলেন এবং শিক্ষা দিচ্ছিলেন। নবীজী বললেন, উভয় হালকা নেক কাজে রয়েছে। এরা কুরআন পাঠ করছে দুআ করছে। আল্লাহ চাইলে তাদের বাসনা পূরণ করবেন বা করবেন না। আর এরা দ্বীন শিখছে শেখাচ্ছে। ‘আমি তো শিক্ষক হিসাবে প্রেরিত হয়েছি’-এই বলে নবীজী শিক্ষার মজলিসে বসে পড়লেন। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২২৯

আর জিহাদ ও সিয়াসতে মুদুন (সমাজ-পরিচালনা)-কে নবুওতের দায়িত্ব বলে ঘোষণা করে নবীজী ইরশাদ করেন-

كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الأَنْبِيَاءُ، كُلّمَا هَلَكَ نَبِيّ خَلَفَهُ نَبِيّ، وَإِنّهُ لاَ نَبِيّ بَعْدِي، وَسَيَكُونُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُونَ.

নবীগণ বনী ইসরাইলকে (রাজনৈতিকভাবেও) পরিচালনা করতেন। এক নবীর প্রস্থান হতেই আরেক নবী আগমন করতেন। কিন্তু আমার পরে কোনো নবী নেই। তবে আমার (ধর্ম-রাজনৈতিক স্থলাভিষিক্ত) খলিফা (আমীরুল মুমিনীন) হবে এবং অনেক হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৫৫

আরও ইরশাদ হয়েছে-

مَنْ تَرَكَ مَالًا فَلِوَرَثَتِهِ وَمَنْ تَرَكَ كَلّا فَإِلَيْنَا.

যে সম্পদ রেখে মারা যাবে, তার সম্পদ পাবে ওয়ারিশরা। আর যে নির্ধন অবস্থায় ওয়ারিশ রেখে যাবে, তার ওয়ারিশদের দায়িত্ব নেব আমরা। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৩৯৮

অর্থাৎ রাষ্ট্র-প্রধান হিসাবে উম্মতের আর্থ-সামাজিক দায়িত্ব নবীজী নিজের যিম্মায় নিয়েছেন। একবার নবীজী ইরশাদ করেন-

أَنَا مُحَمّدٌ، وَأَنَا أَحْمَدُ، وَأَنَا نَبِيّ الرّحْمَةِ، وَنَبِيّ التّوْبَةِ، وَأَنَا الْمُقَفّى، وَأَنَا الْحَاشِرُ، وَنَبِيّ الْمَلَاحِمِ.

আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি নবীয়ে রহমত, তওবার নবী, আমি মুকাফ্ফী (সর্বশেষ আগমনকারী), আমি হাশির (আমার পিছনে পিছনে সকলকে একত্রিত করা হবে), আমি যুদ্ধ-জিহাদের নবী। -শামায়েলে তিরমিযী, হাদীস ৩৬৮

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

هُوَ الَّذِیْۤ اَرْسَلَ رَسُوْلَهٗ بِالْهُدٰی وَ دِیْنِ الْحَقِّ لِیُظْهِرَهٗ عَلَی الدِّیْنِ كُلِّهٖ،  وَ كَفٰی بِاللهِ شَهِیْدًا.

তিনি সেই সত্ত্বা, যিনি আপন রাসূলকে সুপথ ও দ্বীনে হক দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যেন তিনি এই দ্বীনকে অন্য সব ধর্মের উপর (দালীলিক, প্রায়োগিক ও রাজনৈতিকভাবে) বিজয়ী করেন। -সূরা ফাতহ (৪৮) : ২৮

নবীজী ইরশাদ করেন-

بُعِثْتُ بَيْنَ يَدَيِ السّاعَةِ بِالسّيْفِ حَتّى يُعْبَدَ اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ…

কিয়ামতের পূর্বলগ্নে আমাকে তলোয়ার দিয়ে পাঠানো হয়েছে। যাতে এক আল্লাহর ইবাদত হতে পারে, যার কোনো শরিক নেই।… -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৫১১৫

৩. এই তিন ময়দানের দ্বীনী কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি। সুতরাং সামর্থ্য অনুযায়ী তিন ময়দানের কাজ চালু রাখা, চালু করার পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া উম্মতের উপর জরুরি দায়িত্ব। বাকি সাময়িকভাবে স্থান-কাল-পাত্রভেদে শর্ত সাপেক্ষে একেক সময় একেক কাজ ও তার নেজাম তারজিহ (প্রাধান্য) পায়। যার তফসিল অনেক দীর্ঘ। তারজিহাত চূড়ান্ত করার জন্য অনেক অনেক ইলম দরকার, অনেক বেশি সতর্কতা ও সমঝদারি প্রয়োজন।

৪. দাওয়াত ও তাবলীগ হল দ্বীনের তলব পয়দা করার জরিয়া (মাধ্যম)। যার ভিতর দ্বীনের তলব নেই, তার ভিতর দ্বীনের তলব পয়দা করা দাওয়াতের কাজ। যখন কারো মাঝে দ্বীনের চাহিদা জাগ্রত হয়, সেই দ্বীনী চাহিদা পুরা করার জন্য তাকে কুরআন-সুন্নাহর শরণাপন্ন হতে হয়, যারা কুরআন-সুন্নাহর তালীমের সাথে জড়িত, তাদের কাছে আসতে হয়। তালীম ও দাওয়াতের হাকীকতের মাঝে এতটুকুই পার্থক্য বলা হয় যে, যার মাঝে দ্বীনের তলব নেই, তার কাছে একটুখানি দ্বীন পৌঁছানোর নাম দাওয়াত। আর যার মাঝে তলব আছে, তাকে সমুদ্বয় দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার নাম তালীম।

মোটকথা, দাওয়াত সাবীলুম মিন সুবুলিল্লাহ (আল্লাহর রাস্তাসমূহের একটি রাস্তা)। তালীম সাবীলুম মিন সুবুলিল্লাহ। সিয়াসতে শরইয়্যাহ (ইসলামী শরীয়া প্রয়োগ ও বিজয়ী করার রাজনীতি) সাবীলুম মিন সুবুলিল্লাহ। এই তিন কাজ একে অপরের অপরিহার্য সহযোগী। এর কোনো একটাকে অবহেলা করলে দ্বীনের স্বরূপ উদ্ভাসিত হয় না। তাই এই তিন কাজের কোনো কাজে অংশ নিতে পেরেই আত্মতৃপ্ত হয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কোনো এক কাজকেই সব কিছু ভাবা উচিত নয়। এইজন্য এক ময়দানের ব্যক্তিকর্তৃক আরেক ময়দানের কর্মীকে তুচ্ছ ভাবা মারাত্মক ‘তাআছ্ছুব’ (অন্যায় পক্ষপাত), যা হারাম! এক ময়দানের গুরুত্ব দিতে গিয়ে আরেক ময়দানকে ছোট করা বড় ধরনের আত্মপ্রতারণা, যা সম্পূর্ণ গর্হিত।

৫. অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত উম্মতের অতি গুরুত্বপূর্ণ যিম্মাদারি। আর দাওয়াত মুসলিমদের মাঝেও হতে হবে। কোনো খাস আমল ও বিধানের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার জন্যও দাওয়াত হতে পারে, শিরক-বিদআত ও নাস্তিকতার ব্যাপারে সতর্কতা তৈরির জন্য দাওয়াত হতে পারে। দাওয়াতের আরও অনেক ক্ষেত্র আছে। তাছাড়া এই এক ময়দানের কাজও তো কয়েক পদ্ধতিতে কয়েক স্তরে করা যায়। সঠিক নিয়মে যুক্তিতর্ক করা, ওয়ায-নসীহত করা দাওয়াতেরই এক তরিকা, যার কথা কুরআনে এসেছে [সূরা নাহল (১৬) : ১২৫]। নবীজী ঘরেঘরে বাজারে-ঘাটে গিয়ে সরাসরি দাওয়াত দিয়েছেন। চিঠির মাধ্যমেও দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত ও তাবলীগের চলমান শেকেলে যুক্তিতর্ক, ওয়াজ মাহফিল ও চিঠির দাওয়াতের চেয়ে গাশতের দাওয়াত অধিক মকবুল। সুতরাং ইলিয়াস রাহ.-এর বাতলানো এই শেকেলকে একটু খাস করে বললে হবে, সাবীলুম মিন সুবুলিদ্ দাওয়াহ (দাওয়াতের কয়েক পদ্ধতির এক পদ্ধতি)। মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ.-এর দাওয়াতের মূল তরতিব ছিল চিঠি। এই শেকেলের মাধ্যমে সে যুগে দ্বীনী দাওয়াতের বিরাট কাজ আঞ্জাম পেয়েছে এবং সফল হয়েছে। রহমাতুল্লাহ কিরানবী রাহ.-এর দাওয়াত ছিল মোনাযারার শেকেলে। তাঁর এই তরিকার দাওয়াতের ফলে কত মানুষের যে ঈমানের হেফাজত হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তেমনি জুমার মিম্বর ও মওসুমি মাহফিলের মাধ্যমে দাওয়াতের বিরাট কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন বহু আলেম। শরীয়াবিধি বাস্তবায়নে জাতিকে উদ্বুদ্ধকরণের দাওয়াতও রাজনৈতিক শিরোনামে অনেক আগ থেকেই চলে আসছে। বর্তমানে দাওয়াতের প্রয়োজনে প্রায় সবাই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ব্যবহার করছে। সুতরাং দাওয়াতকে বিশেষ কোনো তরতীব ও শেকেলের মাঝে খাস মনে করা ঠিক নয়।

৬. সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি-উদ্যোগে দাওয়াতের কাজ হয়েছে। এক ব্যক্তি ও তার অল্পসংখ্যক অনুসারীদের দরদী প্রচেষ্টায় বিরাট বিরাট সাফল্য এসেছে। ধারাবাহিকভাবে সব যুগেই দাওয়াতের কাজ হয়েছে। কোনো যুগেই দাওয়াত ও তালীম একেবারে বন্ধ ছিল না। যে যুগে যেমন দরকার ছিল, তার সমস্ত না হলেও কাছাকাছি তাকাজা পুরা হয়েছে। কাজের নেজামে কেবল পরিবর্তন এসেছে। মৌলিক নীতিমালা ঠিক রেখে কিছু এন্তেজামি সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে যুগে যুগে। অতীতের এক একজন দায়ী কী পরিমাণ দাওয়াতের কাজ করেছেন, তা চিন্তা করলে আমাদের কালের সুসংগঠিত বিশাল আয়োজনকেও অতি সামান্য মনে হয়। ইতিহাস বলে, হিন্দুস্তানে এক খাজা মুঈনুদ্দীন আজমিরী রাহ.-এর দাওয়াতে প্রায় কোটি মানুষ দ্বীন কবুল করেছে!

৭. হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. যুগের চাহিদা সামনে রেখে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাপূর্ণ দাওয়াতী কাজের যে তরতীব ও নেজাম পেশ করেছেন, এই নেজামের কিছু অংশ তো সরাসরি মাসনূন আর কিছু মোবাহ। পুরো শেকেল ‘মাসনূন’ নয় এবং ‘মানসূস’ও নয়। বাকি এই তরতীবের সাফল্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এই নেজামের দাওয়াতে এখনো খায়র বেশি (যদি নেযাম যথাযথ রক্ষা করা হয় এবং এই নেযামকে অন্যায় পরিবর্তনের হাত থেকে রক্ষা করা যায়)। এরপরও বর্তমান দাওয়াতের কাজ আগেরচে’ও বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে কিংবা আল্লাহ তাআলার কাছে অধিক মকবুল হচ্ছে- বলা মুশকিল। আগে যে পরিমাণ মানুষ মুসলমান হয়েছে, এখন তা কোথায়? আগের দাওয়াতে রাষ্ট্রীয়ভাবেও দ্বীন কায়েম হয়েছে, এখন সেই পরিবর্তিত রাষ্ট্র কোথায়? হাঁ, এর মাধ্যমে সর্বগ্রাসী পতনের গতি কমানো গেছে। যুগের চাহিদা অনুসারে দ্বীনের মৌলিক দাওয়াত গতি লাভ করেছে। দ্বীনের অন্যান্য শো‘বার মতো যুগের চাহিদা সামনে রেখে দাওয়াতের শো‘বাতেও হরকত এসেছে।

৮. দ্বীন হল কুরআন ও হাদীসের সমষ্টি। কুরআন-হাদীসের সমর্থন ছাড়া কোনো কাজ দ্বীনী কাজ হতে পারে না। কুরআন-হাদীসের এই সমর্থন আলেমগণের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। এইজন্য আহলে ইলমের প্রধান ব্যস্ততা তালীম হলেও তাঁরাই দাওয়াত ও সিয়াসতের প্রধান তত্ত্বাতধায়ক, সমস্ত কাজের ভালো-মন্দ নিরূপক। নবীজী ইরশাদ করেন-

خُذُوا الْعِلْمَ قَبْلَ أَنْ يَذْهَبَ. قَالُوا: وَكَيْفَ يَذْهَبُ الْعِلْمُ يَا نَبِيّ اللهِ، وَفِينَا كِتَابُ اللهِ؟ قَالَ: فَغَضِبَ، ثُمّ قَالَ: ثَكِلَتْكُمْ أُمّهَاتُكُمْ أَوَلَمْ تَكُنِ التّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ، فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمْ شَيْئًا؟ إِنّ ذَهَابَ الْعِلْمِ أَنْ يَذْهَبَ حَمَلَتُهُ، إِنّ ذَهَابَ الْعِلْمِ أَنْ يَذْهَبَ حَمَلَتُهُ.

ইলম বিদায় হওয়ার আগে অর্জন করে নাও। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর নবী! ইলম আবার বিদায় নিবে কীভাবে? আমাদের কাছে তো আল্লাহর কিতাব রয়ে গেছে! বর্ণনাকারী বলেন, একথা শুনে নবীজী একরকম রাগই করলেন। এরপর বললেন, আরে বোকা! বনী ইসরাঈলের কাছে কি তাওরাত-ইঞ্জিল ছিল না? কিন্তু শুধু কিতাবের বিদ্যমানতা দিয়ে তাদের গোমরাহী ঠেকানো যায়নি। ইলম চলে যাওয়ার অর্থ আহলে ইলম চলে যাওয়া। ইলম চলে যাওয়ার অর্থ আহলে ইলম চলে যাওয়া। -সুনানে দারেমী, হাদীস ২৪৬

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ، يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ، وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ.

প্রত্যেক প্রজন্মের নির্ভরযোগ্য নেককার উত্তরসূরীরা (পূর্বসূরীদের কাছ থেকে) এই দ্বীনী ইলম ধারণ করবে। আর তারা গুলুকারীদের (বাড়াবাড়ির) বিকৃতি, ইসলাম বিরোধী বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার এবং মূর্খ-জাহেলদের অপব্যাখ্যা বিদূরিত করবে (দ্বীনের স্বরূপ সংক্ষরণ করবে)। -শরহু মুশকিলিল আছার, বর্ণনা ৩৮৮৪

এইজন্য আলেমগণ একইসঙ্গে দাওয়াতসহ সকল দ্বীনী কাজের সঠিক দিকগুলোর প্রথম সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক, ভুল দিকগুলোর প্রথম সমালোচক ও সতর্ককারক।

হযরত মাওলানা তাকী উসমানী দা. বা. বলেন, আমার পিতা মুফতি শফী রাহ. হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর সাথে নেযামুদ্দীনে দেখা করতে গেলেন। তখন ইলিয়াস রাহ. অসুস্থ ছিলেন। আব্বাকে পেয়ে হযরত জারজার হয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, সাধারণ মানুষ এই জামাতে প্রচুর পরিমাণে শরীক হচ্ছে। কিন্তু জামাতে আহলে ইলম সংখ্যায় কম। আমার আশংকা, সাধারণ মানুষের হাতে জামাতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে হতে পারে পরবর্তীতে তারা কাজকে ভুল পথে পরিচালিত করবে। এই জামাত যেন বিপথগামী না হয়, এর দায় যেন আমার উপর না বর্তায়, এই জন্য আমার দিল চায়, আহলে ইলম বেশি বেশি এই জামাতে দাখিল হোক এবং এই জামাতের পরিচালনার কাজ আঞ্জাম দিক। -তাকরীরে তিরমিযি ৫/২১৩

৯. এই তিন কাজের প্রত্যেকটিই এমন, যার হক আদায় করার জন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষণ ওয়াকফ করাও যথেষ্ঠ নয়। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তির পক্ষে তিন ময়দানেরই হক আদায় করা কী করে সম্ভব? যদিও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাই তিন ময়দানের যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন এবং তিন কাজেরই পূর্ণ তত্ত্বাবধান ও তদারকি করেছেন। নবীজীর কর্মযোগ্যতা ও কর্মস্পৃহা তো এক বিশাল মুজেযা। কিন্তু পরবর্তীদের পক্ষে একসঙ্গে তিন কাজের হক আদায় করা সম্ভব হয়নি। তাই শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে একেকজন একেক ময়দান বেছে নিয়েছেন। অপরাপর ময়দানে সময়-সুযোগ মতো অংশ নিয়েছেন। খালিদ বিন ওয়ালীদ রা. জীবনভর জিহাদের ময়দানে কাজ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর প্রধান শোগল-ব্যস্ততা ছিল তালীম। আবু যর গিফারী রাহ.-এর জীবন কেটেছে দাওয়াত ও আমর বিল মারূফ নাহি আনিল মুনকারের ময়দানে। পরবর্তীদের মাঝে এই কর্মবণ্টন-নীতি আরও পরিষ্কার। কিন্তু তখন এক ময়দান আরেক ময়দানের পূর্ণ সমর্থক ও সহযোগী ছিল। বর্তমানে আমরা এক ময়দানের কর্মীরা অন্য ময়দানের সহীহ তরিকার কর্মীকেও প্রতিপক্ষ ভাবি, তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাই। প্রথমে নিজেদের একটা নাম দিই, বিশেষ কিছু প্রতীক নির্ধারণ করে নিই, এর উপর সহযোগিতা-অসহযোগিতা এবং মহব্বত ও দুশমনির ভিত্তি স্থাপন করি। এভাবে আমরা বিভাজনের প্রাচীর খাড়া করি। অথচ এসব কখনো সহযোগিতা-অসহযোগিতা এবং মহব্বত ও দুশমনির ভিত্তি হতে পারে না। সহযোগিতা-অসহযোগিতা এবং মহব্বত ও দুশমনির ভিত্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

تَعَاوَنُوْا عَلَی الْبِرِّ وَ التَّقْوٰی  وَ لَا تَعَاوَنُوْا عَلَی الْاِثْمِ وَ الْعُدْوَانِ .

আর তোমরা নেককাজ ও খোদাভীতির আমলে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালংঘনে কেউ কারো সহযোগী হয়ো না। -সূরা মায়েদা (৫) : ২

সুতরাং যেখানে যতটুকু নেককাজ হচ্ছে, সেখানে ততটুকু সহযোগিতা। আর যতটুকু বদকাজ হচ্ছে, ততটুকু অসহযোগিতা। বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি কাম্য নয়। ইনসাফ-এতেদাল এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য।

১০. দাওয়াতের মেহনতে কমতির কারণে আজ আমাদের যে দশা তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? কালিমা, নামায, ইলম ও যিকির, তাসহীহে নিয়ত, ইকরামুল মুসলিমীন, দাওয়াত ও তাবলীগ- এ ছয় শিরোনামে কাজ চলছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আরও বহু শিরোনামের দাওয়াতী ময়দান বলা যায় খালিই পড়ে আছে। আসলে এখন অধঃগতি ও গাফলত সব ময়দানে। ভেবে দেখুন, কুরআন-সুন্নাহর ইলম অর্জনের মেহনত কি খুব সন্তোষজনক? জিহাদ ও সিয়াসতে শারইয়্যারই বা কী অবস্থা! ব্যক্তিগত নেক-আমলে আমাদের উদাসিনতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? সুতরাং আমরা যেমন দাওয়াতের বিভিন্ন ময়দানে পিছিয়ে আছি, সিয়াসতেও পিছিয়ে আছি। মুসলমানদের আসমানী তালীম ও জমিনী তালীমের মান তলায় নেমে গেছে। এমতাবস্থায় সহীহ তরিকায় তিন ময়দানই জিন্দা করার ব্যাপক ফিকির প্রয়োজন।

১১. আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার যৌথভাবে দাওয়াত ও সিয়াসতের শাখা। দাওয়াতের ময়দানে আমর বিল মারূফ বেশি হয়। আর সিয়াসতের ময়দানে নাহি আনিল মুনকার বেশি হয়। আমর বিল মারূফ করলে নাহি আনিল মুনকার আর লাগবে না, এমন ধারণা ঠিক নয়। নবীজী ইরশাদ করেন-

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ.

তোমাদের কেউ গর্হিত কিছু দেখলে হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগ করে) পাল্টে দিবে, এই সামর্থ্য না থাকলে জবান দিয়ে চেষ্টা করবে, তাও না পারলে হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করবে। আর এটা ঈমানের দুর্বলতম দাবি। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৯

এই জন্য বদদ্বীনীর অন্ধকার দূর করতে নবীজী শুধু দাওয়তের আলো ব্যবহার করেছেন তা নয়, যখন সামর্থ্য হয়েছে, তখন অন্ধকার বিদূরণের জন্য জিহাদের তলোয়ার ও সিয়াসতের দোররাও ব্যবহার করেছেন।

১২. দাওয়াতী মেযাজ হল সর্বাবস্থায় ক্ষমা, কোমলতা, মায়া-মমতা, উদারতা ইত্যাদি। কিন্তু সিয়াসী ময়দানের মেযাজ এর থেকে খানিকটা ব্যতিক্রম। সেখানে কড়া-কঠোর সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে হয়। সমালোচনা করে কথা বলা লাগে। মোটকথা শরঈ সীমার ভিতর থেকে সিয়াসতের ময়দানে যা কিছু হয়, তা দাওয়াতের ময়দানের আচরণ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রম নবীজীর সীরাতেও আছে। যার দাওয়াত গ্রহণের সম্ভাবনা থাকতো, নবীজী তার সাথে দাঈসুলভ আচরণ অব্যাহত রাখতেন। কিন্তু যার ক্ষেত্রে বুঝে গেছেন যে, তার দাওয়াত কবুলের সম্ভাবনা নেই, নবীজী তার সাথে সিয়াসী আচরণ করেছেন। যে ব্যক্তি নবীজীকে একা পেয়ে সরাসরি তরবারি উঁচিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল, নবীজী তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। অন্য দিকে ইবনে খতলের ব্যাপারে বলেছেন, ওকে কাবার গিলাফে ঝুলে থাকতে দেখলেও মেরে ফেলবে! শাসক হিসাবে নবীজী কা‘ব ইবনে আশরাফকে নিজে গোয়েন্দা পাঠিয়ে হত্যা করিয়েছেন। একদিকে কাফেরদের সমালোচনায় হাসসান বিন সাবেতকে কবিতা রচনার হুকুম করেছেন, আবার আম্মাজান আয়েশার রূঢ় কথার কারণে নবীজী বলেছেন, থাক্ আয়েশা! ন¤্রভাষী হও, রূঢ় ভাষা বাদ দাও (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৯৩৫)। একদিকে তায়েফ থেকে এসে দুআ করছেন, হে আল্লাহ! আমার কওমকে বুঝ দিয়ে দিন, তারা অবুঝ। কিন্তু নবীজী বীরে মাউনার ঘটনার পর এক মাস পর্যন্ত কাফেরদের উপর লানত করেছেন। যারা সেজদারত অবস্থায় নবীজীর পিঠের উপর উটের ভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল, তাদের নাম ধরে ধরে নবীজী অভিশাপ দিয়েছেন। এই দুই ধরনের আচরণের একটা মূলত দাওয়াতের ময়দানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, আরেকটা সিয়াসতের ময়দানের জন্য। দুটোই দ্বীনের তাকাযা, শরঈ সীমার ভিতরে কোনোটাই দ্বীন-বিরোধী নয়।

১৩. স্মরণ রাখতে হবে, যেসমস্ত সোনালি উসূলের কারণে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর এই তরিকা ব্যাপক পরিসরে মকবুল হয়েছে এবং পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে, তা সর্বাবস্থায় সংরক্ষণ করা দরকার। এইগুলো লংঘিত হওয়ার কারণে আজ খোদ নেযামুদ্দিনেই ফেতনা আরম্ভ হয়েছে, এই তরিকাটি চরমভাবে তার মকবুলিয়াত ও পৃষ্ঠপোষকতা হারাচ্ছে। সুতরাং সেই বুনিয়াদি উসূলগুলো স্মরণ রেখেই ছয় উসূলের কাজ করতে হবে, কিছুতেই বুনিয়াদি উসূলগুলো বিসর্জন দেওয়া যাবে না। এগুলো সার্বজনীন উসূল। যুগযুগ ধরে তাবলীগের মুরুব্বিগণের মুখে আমরা এই উসূলগুলো শুনে আসছি। মুহতারাম মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দা. বা. তাঁর এক বয়ানে মূলনীতিগুলো তুলে ধরেছেন।

এই বুনিয়াদি মূলনীতিগুলোর প্রথমটি হল, যারা এই কাজের নেতৃত্ব দেবে, তারা আকিদা-বিশ্বাসে, চিন্তা-চেতনায় ও আমলে-আখলাকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী হবে। সুতরাং এই উসূল অনুসারে অধিকাংশ আলেম যার ব্যাপারে অনাস্থা-আশংকা প্রকাশ করবেন, তার হাতে জামাতের শরঈ যিম্মাদারী সোপর্দ করা যাবে না। যার কথাবার্তা-আচার-আচরণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বাইরে চলে যায়, তার হাতে বড় ধরনের এন্তেজামি কাজও ন্যাস্ত না করা।

দ্বিতীয় হল, দ্বীনের অন্য হালকা ও তার কর্মপন্থার কোনো সমালোচনা করবে না। তালীম, সিয়াসত, জিহাদ, খানকা, ওয়ায-মোনাযারা ইত্যাদি কাজের লোকজনকে বাঁকা চোখে দেখবে না, পারলে সহযোগিতা করবে এবং মোটের উপর সহীহ তরিকায় কর্মরত ঐ হালকার কোনো ব্যক্তিকে নিজেদের হালকায় আনার জন্য কোনো ধরনের জবরদস্তি করবে না।

তৃতীয় হল, নিজেরা ফিকহি মাসআলা মেনে চলবে। মাসআলা শিখবে আলেমগণের কাছে গিয়ে। কিন্তু এই জামাতের মিম্বর থেকে ফতোয়া বা মাসআলা দেওয়া হবে না। আলেমগণের ইখতেলাফী মাসআলা বলার তো প্রশ্নই আসে না। আর যেহেতু এতদঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ হানাফী মাযহাব মতো কুরআন-সুন্নাহর উপর আমল করে, তাই এই জামাতের কেন্দ্র হানাফী মাযহাব অনুসরণ করবে। কিন্তু অন্য মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারে সাধরণ কাউকে বাধা দেওয়া হবে না।

চতুর্থ হল, কেন্দ্র থেকে সাধারণ স্তর পর্যন্ত সবাই মশওয়ারা সাপেক্ষে কাজ করবে। মশওয়ারা ব্যতীত একক সিদ্ধান্তে কোনো কাজ চলবে না।

এগুলো হল উসূলের উসূল। এগুলো লঙ্ঘন হওয়ার কারণে আজ পুরো তরিকা বেবরকতির শিকার। সবাই নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার দ্বারা এই নীতিগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, মারকাযে এর কতটুকু অনুসৃত হচ্ছে। আসুন আমরা সবাই এই উসূলগুলো জিন্দা করি। নিজেদের মানসিকতা পরিশুদ্ধ করি। উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধান কবুল করি। দ্বীনের এই মোবারক জামাতকে আপন করি। কাজ নিয়ে বেশি বেশি বের হওয়ার ফিকির করি। আল্লাহ তাআলা সাবইকে তাওফিক দান করুন। এই কাজকে আল্লাহ তাআলা হেফজত করুন-

বিগত ১৯৮৬ ইংরেজীতে রাহনুমা-ই শরীয়ত ও তরীক্বত, মুর্শিদে বরহক, পেশওয়া-ই আহলে সুন্নাত হযরতুলহাজ্ব আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ হুযূর কেবলা রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলায়হি হযরত শাহানশাহে বাগদাদ গাউসুস্ সাক্বালাঈন গাউসুল আযম শায়খ আবদুল ক্বাদির জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর অকৃত্রিম ভক্তবৃন্দ, বিশেষত সিলসিলা-ই আলিয়া ক্বাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার অগণিত পীর-ভাই ও ভক্তবৃন্দের সংগঠিত রাখার জন্য এক মজবুত দ্বীনী সংগঠন হিসেবে ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’-এর গোড়াপত্তন করেন। এ সংগঠন আজ তার অসংখ্য শাখা-পল্লবে সজীব হয়ে এক মহীরূহের রূপ ধারণ করেছে- আলহামদু লিল্লাহ্। এ সংস্থা আজ নিজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বের বহু রাষ্ট্রেও বিস্তার লাভ করেছে। এ নিষ্কলুষ আধ্যাত্মিক সংগঠন আজ ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহু কর্মসূচী সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করে আসছে।

একটি মজবুত সংগঠন যেহেতু ব্যাপকাকারে কোন আদর্শ কিংবা যুগোপযোগী গুরুত্বপূর্ণ কাজ সহজে বাস্তবায়ন ও সম্পন্ন করতে পারে, সেহেতু গাউসিয়া কমিটির উপর অন্যান্য কর্মসূচীর সাথে সাথে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বর্তানো হয়েছে। তা হচ্ছে ‘দাওরা-ই দাওয়াত-ই খায়র’ (পূন্যময় কাজের প্রতি আহ্বানের জন্য প্রদক্ষিণ করা)। বিগত ২০০৯ ইংরেজিতে হুযূর ক্বেবলার সুযোগ্য উত্তরসূরী পীরে ত্বরীক্বত, রওনকে আহলে সুন্নাত হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব ক্বেবলা দামাত বরকাতুহুমুল আলিয়া বাংলাদেশ সফরকালে ‘আলমগীর খানক্বাহ্’ শরীফে এক ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে এ বরকতময় কর্মসূচী ঘোষণা করেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ্। তাঁরই নির্দেশিত নিয়মে গাউসিয়া কমিটি এ কর্মসূচী বাস্তবায়নের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং সাফল্যের সাথে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

‘দাওয়াত-ই খায়র’-এর জন্য বের হওয়া ও প্রদক্ষিণ করার গুরুত্ব অপরিসীম। এটা আরবী ‘আমর বিল মা’রূফ নাহী আনিল মুন্কার’ (সৎকাজের নির্দেশ দান ও অসৎকাজে বাধা প্রদান’-এর প্রতিশব্দ। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছিয়ে দিয়ে তা হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি অতীব বরকতময় পন্থা। পবিত্র ক্বোরআনে এর নির্দেশ বিভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বনবী হুযূর-ই আক্রাম বাস্তবে এ বরকতময় কাজটি নিজেও করেছেন, সাহাবা-ই কেরামের মাধ্যমেও করিয়েছেন এবং বহু হাদীস শরীফে বিশ্ব মুসলিমকে এ জন্য তাকীদ দিয়েছেন ও উৎসাহিত করেছেন। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম জাতি হিসেবে মুসলমানদেরকে ঘোষণা করে তাদের অন্যতম প্রশংসিত কাজ ও বৈশিষ্ট্য নির্দ্ধারণ করেছেন তাঁদের সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজে বাধাদানকে। যেমন এরশাদ হয়েছে-

‘‘কুনতুম খায়রা উম্মাতিন উখ্রিজাত লিন্না-সি তা’মুরূ-না বিল মা’রূফি ওয়া তানহাউনা ‘আনিল মুনকারি।” (অর্থাৎ তোমরা হলে শ্রেষ্ঠতম ওইসব উম্মতের মধ্যে, যাদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। মানবজাতির মধ্যে সৎকাজের নির্দেশ দিচ্ছো এবং মন্দ কাজে বাধা দিচ্ছো। ৩:১১০, কান্যুল ঈমান)

সমাজে যখন অন্যায়-অবিচার ও অধার্মিকতা এবং ধর্মীয় কাজে উদাসীনতা ও অবহেলা ছড়িয়ে পড়ে তখন ‘দাওয়াত-ই খায়র’ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তখন এ কাজটা সবাই বর্জন করলে আল্লাহর আযাব আম (ব্যাপক) হয়ে যায়। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এরশাদ করতে শুনেছি, ‘‘মানুষ যখন মন্দ কাজ হতে দেখে, অতঃপর তা প্রতিরোধ করে না, তখন আল্লাহ্ অবিলম্বে ব্যাপকভাবে সবাইকে শাস্তি দেন।’’ তখন তাদের দো‘আ কবুল হয় না। যেমন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দাও, মন্দ কাজে বাধা দাও, এর পূর্বে যে, তোমরা দো‘আ করবে, কিন্তু তোমাদের দো‘আ কবুল হবে না। তোমরা আল্লাহর দরবারে চাইবে, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে দেবেন না আর তোমরা তাঁর নিকট সাহায্য চাইবে, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন না।’’ আল্লাহ্ তাদের উপর বরকত, মঙ্গল ও সাফল্যকে হারাম করে দেন।

হযরত ইয়ূশা’ ইবনে নূন আলায়হিস্ সালাম-এর নিকট আল্লাহ্ তা‘আলা ওহী নাবিল করলেন, ‘‘আমি তোমার সম্প্রদায়ের চল্লিশ হাজার নেক্কার এবং ষাট হাজার হকদার, মোট এক ল লোককে ধবংস করবো।’’ তিনি আরয করলেন, ‘‘হে আল্লাহ্! বদকাররা তো শাস্তিযোগ্য, নেক্কারদের অপরাধ কি?’’ আল্লাহ্ তা‘আলা বললেন, ‘‘তারা আমার প থেকে দায়িত্ব পালন করেনি বরং অসৎ লোকদের হিদায়ত কিংবা প্রতিহত না করে পার্থিব স্বার্থে পানাহার ও চলাফেরায় তাদের সঙ্গ দিয়েছে।’’ [তাম্বীহুল গাফেলীন]

আল্লাহ্ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘‘ক্বূ—আন্ফুসাকুম ওয়া আহলী-কুম নারা- ওয়াক্বূ-দুহান্না-সু ওয়াল হিজারাহ্।’’ (তোমরা দোযখ থেকে বাঁচাও নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে, যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর। ৬৬:৬, কান্যুল ঈমান) সুতরাং ইসলামের শিাগুলো যেমন নিজেকে শিা করতে হয়, নিজের পরিবার-পরিজনকেও শিা দিতে হয়। আল্লাহ্র কঠিন শাস্তি থেকে নিজেকে যেমন রা করতে হয়, তেমনি পরিবারের সদস্যদেরকেও রা করতে হয়। সেভাবে নিজের অধিনস্থদেরকেও হিদায়তের পথে রাখার দায়িত্ব প্রত্যেকের উপর বর্তায়। সহীহ্ বোখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর হাবীব এরশাদ করেছেন- তোমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকের উপর তার অধিনস্থদের দায়িত্ব বর্তায়। অনুরূপ পাড়া-প্রতিবেশী ও এলাকার লোকজনকে হিদায়তের দায়িত্ব ও প্রত্যেককে নিতে হয়। এ প্রসঙ্গে তাফসীর-ই নঈমীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দোযখ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে এভাবে- কাফিরকে ঈমানের দাওয়াত দেবে, ফাসিক্ব বা পাপাচারীকে তাক্বওয়ার দিকে ডাকবে, গাফিলদের জাগ্রত করবে, এ সম্পর্কে যাদের জ্ঞান নেই তাদেরকে শিা দেবে ইত্যাদি।

সুতরাং এসব দায়িত্ব পালনের নিমিত্তই ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’ প্রতি সপ্তাহে সুপরিকল্পিতভাবে ‘দাওয়াহ্-ই দাওয়াত-ই খায়রের ব্যবস্থা করেছে। এ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শিা করে ওই পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ নিয়ম অনুসরণ করে ‘দাওয়াতে খায়র’ সম্পন্ন করার জন্য আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের প্রকাশনা বিভাগ প্রমাণ্য পুস্তক ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ প্রকাশ করেছে। প্রত্যেক ‘দাওয়াত-ই খায়র’-এর প্রারম্ভে পবিত্র ক্বোরআনের সহীহ্ তরজমা ও তাফসীর উপস্থাপনের জন্য ‘কান্যুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান’ ও ‘কান্যুল ঈমান ও নূরুল ইরফান’-এর বঙ্গানুবাদ অবলম্বনের প্রস্তাব করা হয়েছে, হাদীস শরীফ থেকে বয়ান করার জন্য ‘মিরআত শরহে মিশকাত’ (বঙ্গানুবাদ) অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা অনুসরণের জন্য হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সাবির শাহ্ মুদ্দাযিল্লুহুল আলীর উপরিউক্ত ভাষণের বঙ্গানুবাদ পাঠ-পর্যালোচনার পরামর্শ দিচ্ছি।

নিজে হিদায়ত গ্রহণের সাথে সাথে অন্যের নিকট হিদায়তের বাণী পৌঁছানো ও যে কোন নেক কাজের প্রশিণ দেওয়ার সাওয়াব অকল্পনীয়। প্রত্যেক নেক কাজ যেহেতু আমাদের আক্বা ও মাওলা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামই শিক্ষা দিয়েছেন এবং আল্লাহর কাজে ওই ইবাদতই কবুল হয়, যা নবী করীমের অনুকরণও আনুগত্যের মাধ্যমে করা হয়, সেহেতু ওই কাজ যিনি শিা করেন কিংবা যিনি নেক কাজের দাওয়াত পৌঁছান তিনিতো তার সাওয়াব পাবেনই, তদসঙ্গে যাঁদের মাধ্যমে ওই নেক্কাজ আমলকারী পর্যন্ত পৌঁছে থাকে তাঁদের নিকটও, এমন সর্বোচ্চে নবী করীম পর্যন্ত ওই কাজের সাওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পৌঁছে থাকে। নবী করীমের নিকট কারো পক্ষ থেকে সাওয়াব পৌঁছলে তা তার জন্য কত সৌভাগ্যের কারণ হবে তা সহজে অনুমান করা যায়।

এপ্রসঙ্গে ‘মাওয়াহিব-ই লাদুনিয়াহ্’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মুসলমান যে নেক কাজই করুক না কেন, তার এক সাওয়াব তো যে কাজটি করছে সে পাবে, দু’টি পাবেন তার মুর্শিদ, চারটি পাবেন তাঁর মুর্শিদের মুর্শিদ, আর আটটি পাবেন তাঁর মুর্শিদের মুর্শিদের মুর্শিদ। এভাবে যতো উপরে যাবেন, সাওয়াব বাড়তে থাকবে। এভাবে যখন এ সাওয়াব হুযূর-করীর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দরবার পর্যন্ত পৌঁছে, তখন তা অগণিত ও অসংখ্য হয়েই পৌঁছে।

এতো একজন বা এক উম্মতের নেক কাজ। এখন প্রতিদিন কত সংখ্যক উম্মত বা আমলকারী কত নেক কাজ করছে আর মুর্শিদগণের মাধ্যমে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে কত সাওয়াব পৌঁছছে তা’তো হিসাব-নিকাশেরও বাইরে। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَه مِثْلُ اَجْرٍ فَاعِلِه অর্থাৎ ‘‘যে ব্যক্তি নেক কাজের প্রতি পথ দেখান, তিনি ওই কাজ সম্পন্নকারীর মতো সাওয়াব পান।’’ [মিশকাত শরীফঃ কিতাবুল ইল্ম]

সমগ্র জাহানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পথপ্রদর্শক তো হুযূর-ই করীম হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। যে কেউই কোন প্রকার নেক কাজ করে অথবা ক্বিয়ামত পর্যন্ত করবে, সে তো হযূর-ই আক্রামের পথপ্রদর্শনের কারণেই করে ও করবে। এখন চিন্তা করুন, হুযূর-ই আক্রাম-এর সাওয়াব ও প্রতিদানের অবস্থা কি! আর মধ্যখানে পথ প্রদর্শকগণও কতগুণ বেশী সাওয়াব পাচ্ছেন।

‘শতরঞ্জ’ বা দাবার ছক আবিষ্কারক তাঁর আবিষ্কৃত ‘ছক’টা নিয়ে তাঁর দেশের বাদশার নিকট গেলেন। বাদশাহ্ এমন আবিষ্কার দেখে খুশী হলেন আর বললেন, ‘‘কিছু পুরস্কার চাও!’’ বললেন, ‘‘আমার আবিস্কৃত ছকটির খানা বা ঘরগুলো চাউল দিয়ে এভাবে ভর্তি করে দিন যেন প্রত্যেক আগের খানায় তার পেছনের খানার দ্বিগুণ হয়। অর্থাৎ প্রথম খানায় একটি চাউল হলে তার সম্মুখস্থ দ্বিতীয় খানায় দু’টি, তৃতীয় খানায় চারটি, চতুর্থ খানায় আটটি, পঞ্চম খানায় ষোলটি চাউল হবে। এভাবে সব খানা ভর্তি করে দিন! বাদশাহ্ এত সূক্ষ্ম হিসাব বুঝার চেষ্টাও করেন নি, বরং বললেন, ‘‘এ হিসাব কে করবে? তুমি গিয়ে আমার বাবুর্চি খানা থেকে দু’বস্তা চাউল নিয়ে যাও!’’ লোকটি আরয করলেন, হুযূর! আমাকে ওই হিসাবে দিন!’’ যখন হিসাব করা হলো, তখন দেখা গেলো সমগ্র ভূ-পৃষ্ঠেও এত পরিমাণ চাউল উৎপন্ন হয়নি, যতটুকু এ লোকটি তার হিসাবানুযায়ী চাচ্ছেন।

এর কারণ হচ্ছে- দাবার ছকে ৬৪টি খানা বা ঘর আছে। আর চাউলের হিসাবও যদি এভাবে করা হয়- আট চাউলে এক রত্তি, আট রত্তিতে এক মাশাহ্, বার মাশায় এক তোলা, আশি তোলায় এক সের, চল্লিশ সেরে এক মণ। এ হিসাবানুসারে মাত্র চব্বিশ খানা বা ঘরে এক মণ হয়। তারপর যখন প্রতিটি খানায় দ্বিগুণ করে হিসাব করা হলো, তখন শেষ পর্যন্ত এত পরিমাণ চাউল দাঁড়ালো যে, যদি ওই চাউলের মূল্যে স্বর্ণ দেয়া হয়, আর স্বর্ণ ও চাউলের হিসাবও এভাবে করা হয় যে, আগেরকার আমলের হিসাবানুযায়ী, চাউল এক টাকায় চার সের হয় এবং স্বর্ণ পঁচিশ টাকায় এক তোলা; তবে স্বর্ণ দাঁড়ায় উনিশ কোটি মণ, আর চাউলের হিসাব তো করাই সম্ভব হয় না।

এটা ছিলো চৌষট্টি খানার হিসাব, যা ওই যুগের বাদশাহ্ দিতে পারেন নি। কিন্তু আমাদের আক্বা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উম্মতের আমল যখন পৌঁছে, তখন তাও দ্বিগুণ, চারগুণ, আটগুণ হয়ে বৃদ্ধি পায় এবং এত বেশী হয়ে যায় যে, তার হিসাব করা সম্ভবপর হয় না। উপরিউক্ত উদাহরণে পার্থিব বাদশাহ্ দাবার আবিষ্কারককে তার হিসাবানুসারে পুরস্কার দিতে পারেন নি; কিন্তু এখানে সাওয়াবের বেলায় হিসাব-যতোই বৃদ্ধি পাক না কেন, প্রতিদান দাতা তো স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা। তাঁর ধন-ভাণ্ডারে অভাব কিসের? তাতো অসীম। এ-ই হচ্ছে রসূলে পাকের সম্মান বা মান-মর্যাদা এবং সাওয়াবের একটা মাত্র দিক। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন- وَاِنَّ لَكَ لَاَجْرًا غَيْرُ مَمْنُوْنٍ অর্থাৎ হে হাবীব! আপনার জন্য রয়েছে বন্ধ হয় না এমন সাওয়াব। এভাবে যিনি ভাল কাজের দাওয়াত পৌছান তাঁর এবং তিনি যেই মুর্শিদ বা ঊর্ধ্বতন পথপ্রদর্শকের নির্দেশে তা করবেন, তাঁর ও তাঁর ঊর্ধ্বতন পথ প্রদর্শকদের সাওয়াবেরও আন্দাজ করুন!

সুতরাং আসুন, দাওয়া-ই দাওয়াত-ই খায়র এ অংশ গ্রহণ করে এমন বরকতময় সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদেরকে ধন্য করি।  আল্লাহ্ তাওফীক্ব দিন

দাওয়াতে খায়র বিষয়ক দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ

রাহনুমা-ই শরীয়ত ও ত্বরীকত, হযরাতুল হাজ্ব আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব [দামাত বরকাতুহুমুল আলিয়া]’র দাওয়াতে খায়র বিষয়ক দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ

আ‘ঊযু-বিল্লাহি মিনাশ্ শায়ত্বানির রাজীম।
বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহীম।
ইন্নাল্লা-হা ওয়ামালা-ইকাতাহু ইয়ুসল্লূ-না ‘আলান্নবিয়্যি ইয়া- আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ
সল্লু আলায়হি ওয়াসাল্লিমূ তাসলীমা। আস্সালাতু ওয়াস্ সালামু আলাইকা এয়া রাসূলাল্লাহ্! ওয়া আলা-আলিকা ওয়া আস্হাবিকা এয়া রাহমাতাল্লিল আলামীন।
আমার অত্যন্ত সম্মানিত ক্বেবলা বাবাজী রাহ্মাতুল্লাহি আলায়হি হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং কেবলা হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির রূহানী সন্তানগণ, আমার প্রিয় ভাইয়েরা! আস্সালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্।

আমি, আপনারা সব ভাই, যত ভাই এখানে উপবিষ্ট আছেন- আন্জুমানের কর্মকর্তাবৃন্দ, জামেয়ার পরিচালক ও ব্যবস্থাপকবৃন্দ, শিক মণ্ডলী, ছাত্রবৃন্দ, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ-এর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আরো যারা উপবিষ্ট আছেন সবাইকে মুবারকবাদ দিচ্ছি। মুবরাকবাদ এজন্য দিচ্ছি যে, আজ আমরা যেখানে বসে আছি, আজ আমরা যে উদ্দেশ্যে অপেমান হয়ে বসে আছি, আজকের পর যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে ও কাজ করতে হবে- তা একটি মহান উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য মহান। আমরা হলাম নগণ্য। (মকসদ আযীম হ্যায়। হাম খাক্সার হ্যায়) আল্লাহ্ তা’আলা মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে চয়ন করে নিয়েছেন। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের চয়ন করে আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের উপর বড় ‘ইহসান’ করেছেন। (মহা অনুগ্রহ করেছেন।) আল্লাহ্ তা’আলা অন্য কারো মাধ্যমেও এ কাজ নিতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন।

(হুযূর পীর সাহেব কেবলা তাঁর বক্তব্যের তরজমা করে দেয়ার আপো না করে সরাসরি তাঁর বক্তব্যের প্রতি মনোযোগ দেয়ার উপর জোর দিয়ে বলেন, সরাসরি বক্তার বক্তব্য শোনার মধ্যে একটি বিশেষ উপকার ও তৃপ্তি আছে। তিনি আরো বলেন- আপনারা উর্দু শিখুন! আমিও ইন্শা-আল্লাহ্ বাংলা শেখার চেষ্টা করবো। হযরাতে কেরামের কৃপাদৃষ্টিতে এটাও হয়ে যাবে ইন্শা-আল্লাহ্! তারপর বলেন) বাবাজীর কৃপাদৃষ্টি, হযরত চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির কৃপাদৃষ্টি, হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির কৃপাদৃষ্টি, পীরে তরীক্বত হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ দামাত বরকাতুহুমুল আলীর কৃপাদৃষ্টি আপনাদের প্রতি, আমাদের প্রতি রয়েছে।

হযরত তাহের শাহ্ সাহেব হুযূর তো, মা’শা আল্লাহ্, এ মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হলেন এ মিশনের সিপাহসালার। আর আমরা হলাম তাঁর সিপাহী। (ইউনিফর্ম পরিহিত, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত (অঝঋ) ভাইদের প্রতি ইঙ্গিত করে হুযূর কেবলা বলেন-) ওই দিকে যাঁরা বসে আছেন তাঁরাও সিপাহী, আমরাও সিপাহী। তারা ওয়ার্দি (ইউনিফর্ম) পরেছেন, আর আমরা পরিনি। আমরা যখনই বাংলাদেশে এসেছি, তখন, বিশেষ করে আজও ফোনে তাঁর সাথে আলাপ হয়েছে। আজ হযরত তাহের শাহ্ সাহেব হুযূরের ফোন এসেছে। তিনি জিজ্ঞাসা করছিলেন- গাউছিয়া কমিটির সভা হচ্ছে কিনা, হলে আমরা এখনো মিটিং এ যাইনি কেন? আমি বলেছি, আজ এখানে হরতাল হয়েছে। এ কারণে অনুষ্ঠানসূচীতে কিছুটা রদবদল করতে হয়েছে; প্রোগ্রাম শুরু হতে একটু বিল¤¦ হয়েছে। আমাদের যে উদ্দেশ্য, তাঁরও একই উদ্দেশ্য। আমি তাঁর মধ্যে এ ব্যাপারে যে আগ্রহ ও ব্যতিব্যস্ততা দেখেছি, তা আজকের প্রোগ্রামের জন্য অতি গুরুত্বগুর্ণ। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আল-হামদুলিল্লাহ্!

ভাইয়েরা আমার! আমি এব্যাপারে হযরত তাহের শাহ্ সাহেব হুযূরের কথা বললাম। বিষয়টি এ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এতে হযরত তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হিও রয়েছেন, হযরত খাজা চৌরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিও সামিল রয়েছেন। আমার আক্বার কৃপাদৃষ্টিও এর প্রতি রয়েছে আমার আক্বার দয়া এর সাথে রয়েছেন। কতোই মহান এ বিষয়!

বস্তুতঃ হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ বিগত ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে এ মিশনের সূচনা করেছেন। আজ আমি সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্কে সাথে নিয়ে খানক্বাহ্ শরীফের উপর থেকে দেখছিলাম। দেখলাম এ জামেয়া, খানক্বাহ্ শরীফ তো এখন একটি পূর্ণ ‘রিয়াসত’ (ুদ্র রাজ্য বিশেষ)-এ পরিণতি হয়েছে। (দ্বীন ও শরীয়তের) একটি বিরাট বাগানে পরিণত হয়েছে। এ মহান কাজ সমাধা করে এ পর্যন্ত আসার জন্য তিনি আপনাদেরকেই নির্বাচন করেছেন।

প্রত্যেক যুগ ও সময়ের একেকটি দাবী ও চাহিদা আছে। যুগের চাহিদানুসারে বাবাজী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এসব কাজ সমাধা করেছেন। তিনি বাঁশখালীর শেখের খিলে এক মাহফিলে তাক্বরীর করছিলেন। তাক্বরীরের শুরুতে যখন আয়াত শরীফ- ‘‘ইন্নাল্লা-হা ওয়া মালা-ইকাতাহূ ইয়ুসল্লূ-না আলান্নাবিয়্যি; এয়া- আইয়্যূহাল্লাযী-না আ-মানূ-সল্লূ আলায়হি ওয়া- সাল্লিমূ তাসলী-মা’’ তিলাওয়াত করলেন, তখনতো দুরূদ শরীফ পড়া জরুরী ছিলো। কিন্তু ‘তাদের’ কেউই দুরূদ শরীফ পড়লো না। তাঁর সাথে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা বলেছেন, এরপর বাবাজী এমন ‘জালাল’ অবস্থায় ছিলেন, এতই ক্রোধান্বিত ছিলেন যে, তাঁর চোখে তখন রক্তাশ্র“ ঝরার উপক্রম হয়েছিলো। আর আপন মুরীদদেরকে বসালেন এবং বললেন, ‘‘আমাদেরকে এখানে (নাজির পাড়া) একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেখান থেকে যোগ্য ওলামা বের হবেন, সকাল-সন্ধ্যা অহরহ তাতে দ্বীনী শিা চলতে থাকবে।’’

আমি একদা একটি ফটোতে দেখছিলাম। বাবাজী দণ্ডায়মান ছিলেন। তাঁর মাথার উপর বাঁশের তৈরী ছাউনী (দালান তৈরী করার প্রাথমিক অবস্থায়) ছিলো। বাবাজীর সাথে আরো অনেকে ছিলেন। (আমি কারো নাম বলছিনা।) আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে-প্রাথমিক অবস্থায় এখানে বাঁশ-বেড়ার তৈরী ঘর দণ্ডায়মান ছিলো। তিনি ওটা দিয়ে শুরু করেছিলেন। (এটা হয়তো সেন্টারিং-এর দৃশ্য ছিলো, অথবা নির্মাণ সামগ্রী রাখার জন্য তৈরীকৃত সাময়িক ঘরের ফটো ছিলো। অন্যথায় জামেয়ার কার্যক্রম দালানেই আরম্ভ হয়েছিলো-প্রকাশক)

আজ দেখছি এ আযীমুশ্শান মাদরাসা, আযীমুশ্শান খানক্বাহ্ শরীফ! তদ্সঙ্গে এখানে তিনি খোদা ও রসূল-প্রেমের বাজার বসিয়েছেন। আজ মাত্র পঞ্চাশ/ষাট বছর হলো। যেখানে একদিন বাঁশ-বেড়া দাঁড়ানো ছিলো, সেখানে যখন আল্লাহর ওলীর হাত লাগলো, তাঁর বরকতময় ইশারা হলো, তখন আপনারা এত বড় প্রতিষ্ঠান কায়েম করেছেন; যাতে আজ প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে। এরপর থেকে আরো মাদরাসা প্রতিষ্ঠালাভ করতে লাগলো। সুতরাং এ কাজও আপনাদের অব্যাহত রাখতে হবে।
এ মাদরাসা, এ সিলসিলাহ্ একটি মজবুত কিল্লা। পুরানা যুগে সিপাহীদের জন্য কিল্লা তৈরী করা হতো। যেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহ হতো সেখানে সৈন্যদের সংরণের জন্য কিল্লা নির্মাণ করা হতো। আপনারাও তো সিপাহী, আমরাও সিপাহী। আমরা বলি-
‘‘সবসে আওলা ওয়া আ’লা হামারা নবী- সবসে বা-লা ওয়া ওয়ালা হামারা নবী’’
আমরা আযমতে মোস্তফার পতাকা উড্ডীন করে রেখেছি। বাতিলরা বলে-হুযূর -ই আকরামের সম্মান এতটুকু; এর থেকে কম করতে হবে, ইত্যাদি। আর আমরা বলি-
সবসে আওলা ওয়া আ’লা হামারা নবী-
সবসে বা-লা ওয়া ওয়ালা হামারা নবী।
আপনে মাওলা কা পেয়ারা হামারা নবী,
দো-নোঁ আলম কা দুলহা হামারা নবী-
কওন দে-তা হ্যায়? দেনে কো মুঁহ্ চাহিয়ে,
দেনে ওয়ালা হ্যায় সাচ্চা হামারা নবী।
নবীর মহত্ব বর্ণনা করা এমন বিষয়, যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান- ইন্নাল্লা-হা ওয়ামালা-ইক্বাতাহূ ইয়ুসল্লূ-না আলান্নাবীয়্যি; এয়া আইয়্যুহাল্লাযী-না আ-মানূ সল্লূ আলায়হি ওয়াসা সাল্লিমূ- তাসলীমা-। (নিশ্চয় আল্লাহ্ ও তাঁর ফিরিশ্তাগণ নবী-ই আক্রামের উপর দুরূদ পড়ছেন, (তাঁর মহত্ব বর্ণনা করছেন) হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর দুরূদ পড়ো এবং অতি যতœ সহকারে সালাম পড়ো!) যে কাজটির নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেটা তারা ছেড়ে দিচ্ছে। নির্দেশও এমনি যে, সেটা অবশ্যই পালন করতে হবে। এমন নয় যে, ইচ্ছা হলে পালন করবে, ইচ্ছা না হলে ছেড়ে দেবে। আমরা এ নির্দেশ পালন করেই যাচ্ছি, এ নির্দেশের পয়গাম মানুষের কাছে নিয়ে যাচ্ছি, যাতে হুযূর- আক্রামের চর্চা হয়।

তখন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন প্রকট ছিলো। আল্লাহর অনুগ্রহক্রমে আপনারা মাদরাসা নির্মাণ করেছেন। এ সিলসিলার ঝাণ্ডাও বাবাজীর বাচ্চাদের হাতে রয়েছে। পান্তরে, বাতিলরাও তাদের ছোট ছোট শক্তি নিয়ে এগুচ্ছিলো। সাথে সাথে হুযূর-ই আক্রামের শানে বেয়াদবীও চলতে থাকে। বাতিলরা তাদের মতা দেখাতে লাগলো। মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো। তখন বাবাজি সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি সাহেব দেখলেন, বাবাজি সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ সাহেব প্রত্য করলেন যে, বাতিল মাথাচাড়া দিয়েই যাচ্ছে। তখন তাঁরাও এ কথা প্রমাণিত করলেন যে, হুযূর-ই আক্রামের যাঁরা নাম নেন ও যাঁরা হুযূরের প্রেমিক ও প্রশংসাকারী তাঁরাও দুর্বল নন। তারা সীমাবদ্ধও নন। সুতরাং তিনি নিজের (বেলায়তী) মতা প্রদর্শন করলেন। আপনারা আপনাদের পূর্ণ সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। মাদরাসার খিদমত করেছেন, জশ্নে জুলূসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বের করেছেন। এ সবের প্রভাব এতোই কার্যকর হয়েছে যেমন- ‘স্বর্ণকারের শতসহস্র টুক্টাক্, আর কামারের হাতুড়ির এক আঘাত’’ অর্থাৎ ‘স্বর্ণকার হাজার বার টুক্টাক্ করে যতটুকু করতে পারে না,কর্ম্মকার তার হাতুড়ির একটি মাত্র আঘাতে তার চেয়ে বেশী কাজ সম্পন্ন করতে পারে।’ (উদাহরণ স্বরূপ একথা বলা হলো।)

হুযূরের রূহানী বাচ্চারা সারা বছর এমন দ্বীনী কাজ করতে থাকেন। তাঁরা চেষ্টারত থাকেন- কিভাবে হুযূর-ই আক্রামের শান-মান বৃদ্ধি পায়। যখন বাবাজির ফৌজ বের হয়, রসূলে আক্রামের আশিক্বগণ যখন লাখো লাখো সংখ্যায় বের হয়, তখন তা ওই কর্ম্মকারের আঘাতের মতো হয়ে বাতিলের উপর আঘাত করে। আ’লা হযরত বলেন-
ইয়ে রেযা কে নেযে কী মার হ্যায়,
জো বাতিল কে সীনোঁ মে ওয়ার হ্যায়।
অর্থাৎ এটা আহমদ রেযার বর্মের মার। যা বাতিলের বুকে গিয়ে আঘাত হানে। অনুরূপ, এসব খিদমত আমার আক্বার বর্মেরই আঘাত, হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটিরই আঘাত, যা বাতিলের বে গিয়ে লাগে। যখন জোরে শোরে জুলূস বের হয়, তখন বাতিলপন্থীরা নিজ নিজ ঘরে ঢুকে পড়ে। নিজেদের মুখ ঘোমটায় ঢেকে নেয়। আল্লাহর অনুগ্রহক্রমে আপনারা এখান থেকে জুলূস বের করতে শুরু করেছেন, আর এখন বাংলাদেশের কোণায় কোণায় জুলূস বের হতে আরম্ভ করেছে। যারা আগে জুলূস দেখলে চাদরে মুখ ঢেকে নিতো, তারাও আজ জুলূস বের করতে আরম্ভ করেছে।

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান- ইয়ুরী-দূনা লিয়ুত্বফিঊ-নূরাল্লা-হি বিআফ্ওয়া-হিহিম্; ওয়াল্লা-হু মুতিম্মু নূ-রিহী ওয়া লাউ কারিহাল কা-ফিরূ-ন। (তারা চায় আল্লাহ্র নূরকে মুখের ফুৎকার দিয়ে নিভিয়ে দিতে, আর আল্লাহ্ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ করবেনই, যদিও অপছন্দ করে কাফিরগণ।) [সূরা সাফ্ : আয়াত-৮, পারা-২৮] তারা চাচ্ছে এ নূরকে, এ সূর্যকে, যা আলোকদীপ্ত হয়েছে, তাদের মুখের ফুৎকার দ্বারা নিভিয়ে দিতে। ওই আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ, যা হুযূর-ই আক্রামেরই শান, কারো মুখের ফুৎকারেও কি নেভানো যেতে পারে? কখনো না।
নূরে খোদা হ্যায় কুফরকে আসর সে খান্দাহ্যন
ফূঁকূঁ সে ইয়ে চেরাগ বুঝায়া নেহীঁ যা সেক্তা।
(কুফরের অপৎপরতার কারণে আল্লাহর নূর আরো বেশী আলোকিত হয়; আরো অধিক শোভা নিয়ে হেসে ওঠে। মুখের ফুঁক দ্বারা এ প্রদীপকে নেভানো যায় না।)
ওইসব নির্বোধকে দেখুন! তারাও তাদের মুখের ফুঁক দ্বারা ওই প্রদীপকে নেভাতে চাচ্ছে! (এটাতো সম্ভব হয়নি, বরং নবীর মহত্ব ও মর্যাদার প্রচার আরো বেশি হয়েছে।)
এমন একটা সময় ছিলো, যার চাহিদানুসারে এ জামেয়া, এ আন্জুমান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ জুলূসের প্রবর্তন করা হয়েছে। এমনকি সময়ের চাহিদা ও দাবী যা যা ছিলো, তার সবই যথাসময়ে পূরণ করা হয়েছে। আজ থেকে ২৪/২৫ বছর পূর্বে একই কারণে ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু এ দীর্ঘ ২৪/২৫ বছরেও এ কমিটির তেমন কোন উন্নয়নমূলক কাজ নজরে পড়ছে না। অবশ্য, আপনাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে। সুতরাং আপনারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সেটার শাখা-প্রশাখা কায়েম করেছেন। আজ এ প্রতিনিধি সভায় বেইজ যাঁদের গলায় শোভা পাচ্ছে- তাঁরা সবাই ‘গাউসিয়া কমিটি’র প্রতিনিধি। আজ কমিটির ২৫ বর্ষপূর্তি (সিল্ভার জুবিলী বা রজত জয়ন্তী) উদ্যাপনের কথা চলছে কিন্তু কমিটি এখনো যেন তার প্রাথমিক পর্যায় বা সোপান অতিক্রম করছে।

আমি, বাবাজি (হযরত ক্বেবলা তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- এ যে ‘গাউসিয়া কমিটি’ গঠিত হয়ে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে। এ কমিটি গঠনের হিক্মত কি? এটা আবার কখনো ‘আন্জুমান’-এর প্রতিপ হয়ে দাঁড়াবে না তো? তখন বাবাজি হযরত তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেছিলেন, ‘‘আপনার প্রশ্নের জবাব তো আমি এখন দিচ্ছি না; সময়ই এ প্রশ্নের জবাব দেবে। হয়তো আমি তখন (এ জাহেরী) দুনিয়ায় থাকবো না।’’

আহলে সুন্নাতের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। যদি আমরা আমাদের কাজ নব উদ্যমে আরম্ভ করি, প্রতিটি অলিগলিতে, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, বাজারের দোকানগুলোতে, মোটকথা সর্বত্র আহলে সুন্নাতের বাণী পৌঁছানোর জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি, তবে এ কাজ আরো বেগবান হবে। (এ পথে আমাদের কোন ভয় নেই। কারণ) আপনাদের হাতের উপর বাবাজি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির হাত রয়েছে। আপনাদের কোন ভয় নেই। আপনারা ভয় করবেন না। আপনাদের কোন তি কিংবা অসুবিধা হবে না। আপনাদের প্রতি বাবাজি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির কৃপাদৃষ্টি রয়েছে। হযরত জুনায়দ বাগদাদীর ঘটনা পড়–ন! তিনি এমনি এক পর্যায়ে বলেছিলেন- ‘‘আমি সরকার-ই দু’আলমের দামন ধারণ করে আছি।” দামন যখন ধারণ করেছেন, তখন তিনি গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেবেন। সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে, হাত পা নাড়তে নাড়তে যদি মজবুত জাহাজে উঠে আসা যায়, তখন বাইরে ঝড়, তুফান চলতে থাকলেও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। আলহামদু লিল্লাহ! আমরাও আমাদের কাক্সিত গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- বাবাজি তো আমাদেরকে এ কাজে নিয়োজিত করেছেন। এখন আমরা কি শুধু আমাদেরকে বাঁচাবো? পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য কি কোন চিন্তা-ভাবনাই করবো না? আমাদের সন্তান-সন্তুতির চিন্তা, আশ-পাশের লোকদের চিন্তা, অন্যান্য মুসলমান ভাইদের চিন্তা কি কখনো করবো না? অবশ্যই করতে হবে। এজন্যই আজ গাউসিয়া কমিটির দায়িত্ব ওই চিন্তা-ভাবনা করা। কমিটি ও এর শাখাগুলোকে ভাবতে হবে এখন কী করা চাই। কাজতো আমরা করছি। মাদ্রাসা ইত্যাদিও প্রতিষ্ঠালাভ করছে। কিন্তু অন্যদিকে বাতিলপন্থীরা নতুন নতুন পদ্ধতিতে কাজ করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় কি তাদেরকে কাজ করতে দিয়ে আমাদের নিরব থাকা উচিৎ হবে, না তাদের লাগাম ধরে রুখে দিতে হবে? হ্যাঁ, তাদের রুখতে হবে। অবশ্য, তাদের রুখার জন্য কী করা চাই? তারা যদি ভারী হাতিয়ার নিয়ে ধেয়ে আসে, তখন কি তাদেরকে হাত দিয়ে রুখবে? যদি এসব লোক অলিতে-গলিতে ও বাজারে গিয়ে তাদের হাতিয়ার ব্যবহার করে, তবে তাদেরকে রুখার জন্য কি ওই পুরানা হাতিয়ার ব্যবহার করে ান্ত হলে চলবে? অবশ্যই আমাদের নিকট পুরানা যেসব হাতিয়ার আছে সেগুলোকেও সংরণ করতে হবে।

যেমন- গাউসিয়া কমিটির শাখা-প্রশাখাও গঠন করতে হবে, মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি বলছি না- ওইসব কাজ ছেড়ে দিন, এ কাজগুলো করুন। জামেয়াগুলোও পরিচালনা করতে হবে, মাদরাসাও চালাতে হবে, সিল্সিলার কাজও চালিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে বাইরে থেকে আমাদের দ্বীনের উপর যেসব হামলা চালানো হচ্ছে তার মোকাবেলার জন্যও আমাদের অনুরূপ হাতিয়ারব্যবহার করতে হবে। আমাদের নিজেদেরকে বাঁচাতে হবে, আমাদেরও ভাইবোনদের বাঁচাতে হবে। হুযূর আলাইহিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর উম্মতকে বাঁচাতে হবে।
আর এখন তো ফিৎনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ফিৎনা খুব দ্রুত গতিতে ছড়ায়। কিন্তু তার পরিণাম ভাল হয় না। আমি ঐতিহাসিক ঘটনার দিকে যাচ্ছি না। হুযূর- আক্রামের পবিত্র যুগের ঘটনাবলীরও কোন উদ্ধৃতি এখন দিচ্ছি না। আমি এ যুগের কথা বলছি। পাকিস্তানে এসব গোস্তাখ রাতের বেলায় পাহাড়ের উপর থেকে ডেকে ডেকে বলে, হে অমুক! আমরা আগামী কাল সকালে তোমাদের অমুককে যবাই করে ফেলবো। বাস্তবেও তারা সকালে এসে গণ-মানুষেরই সামনে মানুষ যবাই করে। আউলিয়া-ই কেরামের নিদর্শনগুলোকেও ছাড়ছে না। সেখানে গিয়ে, মাযারে গিয়ে যায়েরীনকে হত্যা করছে। মাযারের পবিত্রতা বিনষ্ট করছে। কিন্তু (পাকিস্তানের) আর্মি ও প্রশাসন নিরব থাকে। তাছাড়া, তারা জিহাদের নামে হাজার হাজার মানুষকে পাহাড়ের উপর থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে। টেনে-হিঁছড়ে নিয়ে গিয়ে গর্ত ও নদীতে ফেলে দিয়েছে। সম্মানিত মানুষকে অপমান করে লাশ বানিয়ে নিপে করেছে। অতি দ্রুতগতিতে এসব অপকর্ম সম্পন্ন করেছে। আমাদেরকেও ফিৎনার পথ রুদ্ধ করতে হবে। নিরাপত্তা ও শান্তির পথ খুঁজে বের করে মানুষকে ওই পথে চালাতে হবে।

এ েেত্র আউলিয়া কেরামের মিশনই একমাত্র মুক্তির পথ। বাতিলগণ এ মিশন থেকে মানুষকে সরাতে চায়। যখন থেকে মানুষ আউলিয়া-ই কেরামের মিশন থেকে সরে গেছে, তখন থেকে তারা ফিৎনার শিকার হয়েছে। আমাদের কাজ বাতিলের সাথে লড়াই করা; হযরাত (আউলিয়া-মাশাইখ)-এর দামনের সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করা, যাতে ফিৎনার পথ রুদ্ধ করা যায়। দুনিয়া থেকে এখন নিরাপত্তা ও শান্তি চলে গেছে। এমতাবস্থায় নিজেদেরকে ও আমাদের সন্তান-সন্তুতিকে বাঁচাতে হবে। মুসলমানদের রা করতে হবে। যদি আমরা এ কাজটি না করি, আল্লাহ্ মা করুন! আমরা যদি এ কাজ থেকে বিরত থাকি, তবে হে আমার সাথীরা! আমাদের আক্বা নারায হবেন, তাজদারে মদীনা অসন্তুষ্ট হবেন। লোকেরা গোমরাহ্ হতে থাকবে। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানদের এ কান্তিকালে এর খিদমত আন্জাম দেয়া আপনাদের দায়িত্বে বর্তানো হয়েছে। আল্লাহর মিশন আপনাদের হাতে দেয়া হয়েছে। অবশ্য আপনারাও দায়িত্ব পালনের প্রমাণ দিয়েছেন। তখন এক সময় ছিলো। বাবাজি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি আয়াত শরীফ পড়েছিলেন। কেউ সেটার জবাবদাতা ছিলো না। (তার প্রতিকারও তিনি করেছেন।) আজ চতুর্দিকে দুরূদ শরীফের সুরে আকাশ-বাতাস মুখরিত হচ্ছে। কবি বলেন-
আজ উন্কী মাহাক্নে দিলকে গুন্ছে খিলা দিয়ে
জিস রাহ্ চল দিয়ে কূসে বসা দিয়ে।
(আজ তাঁর খুশ্বু হৃদয়ের বৃে ফুল ফুটিয়েছে। তিনি যে পথ দিয়ে গিয়েছেন সেটাকে আবাদ করে দিয়েছেন।)
তিনি (হযরত বাবাজি সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি) আজ বাংলাদেশের অলিতে গলিতে পর্যন্ত যিকরে মোস্তফা (হুযূর করীমের চর্চা) ছড়িয়ে দিয়েছেন। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন। নিজেরা দুরূদ শরীফ পড়ছেন, অন্যান্য লোকও পড়ছেন। এমনকি বাতিলগণও হিদায়ত লাভ করে দুরূদ শরীফ পড়ছে। এ ইশক্বে মোস্তফার উন্নতি সাধন আপনাদেরই দায়িত্বে বর্তানো হয়েছে। অবশ্য ইশক্বের পাঠশালার ধরণ কিছুটা ভিন্ন। কবি বলেন-
মকতবে ইশ্ক্ব কা আন্দায নিরালা হ্যায়।
উস্কো ছুট্টি নেহীঁ মিলী, জিস্নে সবক ইয়াদ কিয়া।
(ইশক্বের পাঠশালার নিয়ম-নীতি ভিন্ন ধরনের। এখানে ওই শিার্থী ছু’টি পায় না, যে সবক হৃদয়স্থ করেছে।)
এমনিতে মাদ্রাসা ও স্কুলগুলোতে নিয়ম হচ্ছে- যে ছাত্রটি সবক শিখে ফেলে তাকে শিক বলেন- শাবাশ! তুমি যেহেতু সবক শিখে নিয়েছো, সেহেতু তোমার ছুটি! তুমি যেতে পারো! কিন্তু এ ইশক্বের পাঠশালায় আপনারা যেহেতু সবক শিখে নিয়েছেন, সেহেতু আপনারা ছুটি পাবেন না। গাউসিয়া কমিটির দায়িত্ব আপনাদের পালন করতে হবে। এ কাজ আপনাদেরই দায়িত্বে। একথা আমি বলছি না। আমি টেপ রেকর্ডারের প্লেয়ার-যন্ত্র মাত্র। যেমন- মাওলানা সাহেব ওয়ায-তাক্বরীর করেন। সেটা রেকর্ডার রেকর্ড করে, আর প্লেয়ার সেটাই শোনায়। খিদমতের এ সব কথাও আমি বলছি না, হযরত তাহের শাহ্ সাহেব ক্বেবলা বলছেন না। এটা আমার আক্বার ফরমান। মাশা-ইখ হযরাতের ইচ্ছা। তাঁরা আপনাদের থেকে কাজ নিতে চান। আমরা তো সিপাহী (সিপাহ্সালারের নির্দেশ পালন করা আমাদের কাজ)। আমরা এখানে এসেছি মেহমান হিসেবে। এ সফরে কখনো এখানে আসি, কখনো ওখানে যাই। কাজ কিন্তু আপনাদেরকেই সমাধা করতে হবে।
দেখুন! কান্ত হয়ে পড়বেন না। অলসতা করবেন না। কেউ যদি অলসতা করে, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। এ অলসতার পরিণতিও আজব ধরনের! আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
ওয়া ইন্ তাতাও ল্লাউ ইয়াস্তাবদিল কাউমান গায়রাকুম আল আয়াত…।
অর্থাৎ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, যে দায়িত্ব বর্তানো হয়েছে তা পালন করতে গিয়ে যদি অলসতা করো, আর একথা ভাবো যে, ‘আমরাতো জুলূস বের করছি, ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্যাপন করছি, মাদরাসাও পরিচালনা করছি। আবার এর উপর হযরত তাহের শাহ্ সাহেব ক্বেবলা বলছেন- গাউসিয়া কমিটিতেও এসে কাজ করো, আমরা এতোগুলো কাজ করতে পারবো না!’ আমার কথা হলো আপনারা একথা ভাবতেও পারবেন না! আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমাচ্ছেন-
‘‘ফাইন তাতাওয়াল্লাউ’’ যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, ‘‘ইয়াস্তাবদিল ক্বাউমান গাইরাকুম’’- এ জায়গায় তোমাদের ব্যতীত অন্য জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে দেবেন। আপনাদেরকে ডিউটি থেকে সরিয়ে দেবেন। এটা কতো ভয়ানক কথা! আল্লাহ্ তা‘আলা অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে দেবেন। কাজতো আল্লাহ্ পাক নেবেনই। কাজ করতে করতে আগে বাড়তে হবে; পেছনে যাবেন না। এ কথার দায়িত্ব তো আল্লাহ্ তা‘আলা আপন বদান্যতায় নিয়েছেন- কাজ কার থেকে নেবেন।
কাজ করার জন্যও বিশেষ বিশেষ লোক থাকে। এ বিশেষ লোক হিসেবে আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাদেরকে বেছে নিয়েছেন। কথিত আছে যে, মুহাব্বতের জন্যও কিছু খাস্ দিল্দার লোক থাকেন। আর ওই খাস দিলদার লোক আপনারাও। যদি আমরা অনুপযুক্ত প্রমাণিত হই তবেই তো ‘ইয়াস্তাবদিল ক্বাউমান’ আল্লাহ্ অন্য জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসবেন। বলবেন- ‘তোমরা পেছনে সরে দাঁড়াও। অন্য জনগোষ্ঠী একাজ সমাধা করবে।’ সুতরাং খোদা না করুন, এ কাজ যদি আমরা করতে ব্যর্থ হই, তবে তা আমাদের অকৃতকার্যতার পরিচায়ক হবে। এ কেমন মারাত্মক অকৃতকার্যতা? দুনিয়াতেও অকৃতকার্য, আখিরাতেও অকৃতকার্য। এ কারণে কাজ আপনাদেরকে করতেই হবে। হযরাত এ কাজ আপনাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আজই আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যে সব লোক কান্ত- পরিশ্রান্ত হয়ে গেছেন, তাঁরা যেন চুপিসারে কেটে পড়েন। কিন্তু আপনাদের দ্বারা এমনটি হতে পারে না। হযরত ইমাম হোসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁর সাথীদের বলেছিলেন, খুব সম্ভব এটা তাঁর শাহাদাতের পূর্ববর্তী রাতে বলেছিলেন, ‘‘হে আমার সাথীরা! এটা অতি মুশকিল কাজ। মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এর হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই।
আমি দৃঢ়তার সাথে দ্বীনের হিফাযত করবোই। এটা বড়ই সংকটপূর্ণ সোপান। যদি তোমরা চাও, তবে আজ রাতেই তোমরা চলে যেতে পারো। যদি আমার সামনে থেকে চলে যেতে তোমাদের লজ্জাবোধ হয়, তবে আমি চেরাগ নিভিয়ে নিচ্ছি। অন্ধকারের মধ্যেই তোমরা চলে যেতে পারো।’’ কিন্তু তাঁর সাথীরা বলেছিলেন, ‘‘আমরা আপনাকে ছেড়ে যেতে পারি না।’’ এ মিশনেও আপনাদের মধ্যে হোসাইনী জযবাহ্ থাকতে হবে। এ জয্বাহ্ (উদ্দীপনা) নিয়েই আপনাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। কাজের প্রয়োজন। যদি কেউ একথা বলেন- ‘আমাদের এসবের দরকার নেই।’ (তবে এটাতো হতেই পারে না।)
বাজারে গিয়ে লোকেরা সওদা টেষ্ট করে নেয়। আমাদের পানি রাখার প্রয়োজনে আমরা বাজার থেকে কলসী কিনি; কিন্তু কেনার আগে কলসীটাকে ভাল করে দেখে নিই-তাতে কোন ছিদ্র আছে কিনা। যদি ঠিকটাক পাই তবে সেটা উপরে তুলে বাজিয়ে দেখি- আওয়াজ সঠিক আসছে কিনা। যদি আওয়াজও সঠিক আসে তবেই সেটা খরিদ করি। বাবাজি আপনাদেরকেও সওদা করেছেন। কিন্তু যারা কান্ত হয়ে পড়েছেন, আর বলেন- ‘আমাদের এখন ছুটির দরকার, তাহলে ছুটি তো নেই-ই। (শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হযরত পীর সাহেব ক্বেবলা বলেন), ‘‘এমন কেউ আছেন কি?’’ (সবাই বললেন, ‘‘না’’।)
(হুযূর ক্বেবলা খুশী হয়ে পবিত্র ক্বোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-)
আল্লাহ্ তা‘আলার ফরমান হচ্ছে- ‘‘ওয়ালতাকুম মিন্কুম উম্মাতুঁই ইয়াদ্‘ঊ-না ইলাল্ খায়রি ওয়া ইয়া’মুরূ-না বিল মা’রূ-ফি ওয়া ইয়ানহাউনা ‘আনিল মুনকারি;’’ (তরজমা: তোমাদের মধ্য থেকে একটা দল এমনই হওয়া চাই যে, তারা সৎকাজের প্রতি ডাকবে, ভাল কথার হুকুম দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে। আর এসব লোক সফলকাম।) [পারা-৪, রুকূ-২’ কান্যুল ঈমান] নেকীর দিকে নম্রতা ও ভালবাসার সাথে মানুষকে আহ্বান করতে হবে।
এ কাজ সিলসিলাও করছে, জামেয়াগুলোও করছে, একই কাজ গাউসিয়া কমিটিকেও করতে হবে। তবে প্রত্যেক কাজের একটি স্বতন্ত্র ধরন রয়েছে। এ দেখুন, ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ (প্রণীত ও প্রকাশিত) হয়েছে। এখানে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান সাহেবও আছেন, তাঁর সাথে অন্যান্য দ আলিমগণও রয়েছেন। তাঁরা আমাদের হাতে ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ পৌঁছিয়েছেন। এ ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ প্রত্যেকের নিকট থাকা চাই। এটা পড়তে হবে। এটাও পড়বেন, সাথে সাথে ক্বোরআন মজীদ এবং হাদীস শরীফও পড়বেন। আমি মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান সাহেবের সাথে কথা বলেছি। মাশাআল্লাহ! তিনি বলেছেন- বাংলা ভাষায় ক্বোরআন মজীদের তরজমা (অনুবাদ)ও হয়েছে, তাফসীরও হয়েছে- ‘কান্যুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান’ এবং ‘কান্যুল ঈমান ও নূরুল ইরফান’ হাদীস শরীফও হয়েছে; যেমন- ‘মিরআত শরহে মিশকাত’। আপনাদের মাহফিলগুলোতে এ তরজমা ও তাফসীর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলো) থেকে বয়ান করবেন, তরবিয়াতী নেসাব থেকেও। আমাদের বুনিয়াদী কাজ হচ্ছে- ক্বোরআনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। আমাদেরকে একথা বুঝতে হবে যে, মুসলিম উম্মাহ্র ক্বোরআনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কতোই ভয়ঙ্কর!
আপনারা একটি বিষয় ল্য করেছেন, মসজিদগুলোতে এটা দেখা যায় যে, বাতিল ফির্কাগুলো ক্বোরআনকে পেছনে ঠেলে দেয় আর তাদের তাবলীগী নেসাবকে এগিয়ে দেয়। আর আমাদের ডাকতে হবে ক্বোরআনের দিকে। এখানে একটি বুঝার বিষয় রয়েছে। তা হচ্ছে এ যে ‘তারবিয়াতী নেসাব’ তৈরী করা হয়েছে তা আমাদের সিল্সিলার পরিচয় বহন করে। কিন্তু মূল মকসূদ (উদ্দেশ্য) হচ্ছে ‘ক্বোরআন’। সুতরাং সাথে সাথে ক্বোরআনের চর্চাও চালিয়ে যেতে হবে। যেমন-প্রত্যেক মাহফিলে পবিত্র ক্বোরআন থেকে, হোকনা একটি দু’টি আয়াত একজন তাফসীরসহ পড়বেন, আর সবাই শুনবেন। তারপর ‘হাদীস-ই রসূল’ এবং ‘গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব’ থেকেও একই নিয়মে পড়বেন ও শুনবেন। ‘গাউসিয়া নেসাব’ থেকে আমলের বিষয়গুলোও পড়বেন। হুযূর ক্বেবলা মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান’র উদ্দেশ্যে বলেন) ক্বোরআন মজীদ ও হাদীস শরীফ থেকে কিছু বিষয়বস্তু নির্বাচন করে দিতে হবে।
এর কর্ম-পদ্ধতি হচ্ছে- প্রত্যেক বৃহস্পতিবার আসরের পর, আসরের নামাযের পর, এ কাজের জন্য বিভিন্ন ‘টীম’ তৈরী করবেন। মহল্লায়-মহল্লায়, অলিতে গলিতে ও বাজারগুলোতে আর যেখানে যেখানে প্রয়োজন মনে করবেন তিন-তিন, চার-চার, পাঁচ-পাঁচ জনের টীমগুলো গিয়ে মানুষকে দাওয়াত দেবেন-‘‘ভাই! মাগরিবের নামাযের পর অমুক মসজিদে একটি সংপ্তি দ্বীনী মাহফিল হবে। আসুন! মাহফিলে ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে আলোচনা (বয়ান) হবে।’’ যে ক্বোরআনকে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হিদায়তের জন্য দিয়েছেন, তা থেকে সারগর্ভ আলোচনা হবে। গণমানুষকে একথা বুঝানোর চেষ্টা করবেন যে, আমরা ক্বোরআনকে ছেড়ে দেয়ার কারণে আজ লাঞ্ছিত হচ্ছি। আল্লামা ইকবালও একথা বলেছেন-
উয়হ্, যমানে মে মু‘আয্যায থে মুসলমাঁ হো-কর,
আওর তোম খা-র হুয়ে তা-রেকে ক্বোরআঁ হো-কর।
অর্থ: মুসলমানী নিয়ে তারা মুখ্য ছিলো ধরা তলে, আর তোমরা ক্বোরআন ছেড়ে যাচ্ছো আজি রসাতলে। [জাওয়াব-ই শেক্বওয়া] অর্থাৎ মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কও দুর্বল হয়েছে ক্বোরআনকে ছেড়ে দেয়ার কারণে। বাতিল ফির্কাগুলোর কাণ্ড দেখুন! তারা সুকৌশলে ক্বোরআনকে পেছনে ঠেলে দিয়ে তাদের নেসাবকে এগিয়ে দিয়েছে। এভাবেই তারা এগিয়ে চলেছে। আমরা কিন্তু ক্বোরআনকে আগে আগে রেখে, আমাদের নেসাবকে সাথে রেখে এগিয়ে যাবো। ইন্শা-আল্লাহ্! আমরা এ কাজ শুরু করবো।
তারপর মাগরিবের নামাযের পর থেকে এশা পর্যন্ত এ দাওয়াতী মাহফিল করবেন। মসজিদগুলোতে এশার নামায যথাসময়ে সম্পন্ন করে নেবেন। আর কতটুকু সময় লাগে তা-ই নেবেন। অবশ্য মসজিদ ছাড়া অন্যত্র, যেমন-এখানে (খানক্বাহ্ শরীফ) ইচ্ছা করলে আমরা এশার নামায একটু দেরীতেও সম্পন্ন করতে পারি। এ কাজের জন্য যতটুকু সময়ের দরকার তা অবশ্যই ব্যয় করবেন। সাথী-বন্ধুদের এতে সামিল করবেন, যথানিয়মে এ প্রোগ্রামকে বাস্তবায়িত করবেন। যেসয জায়গায় আমাদের গাউসিয়া কমিটি আছে, সে সবস্থানে ভাইদের সাথে আলিমদেরকে সামিল করবেন। আমি আলিমদের উদ্দেশ্যেও বলছি- আপনাদেরও এ কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আপনাদেরও সময় দেয়া দরকার। গাউসিয়া কমিটি ও এর শাখাগুলো এ কাজের মনিটরিং করবে। এটা অতি প্রয়োজনীয়। তারা এসব কাজের রেকর্ড সংরণ করবেন।
আমাদের গাউসিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আপনি এগিয়ে আসুন! আপনি আরো তৎপর হোন! আপনার দায়িত্ব পালনে স্থির ও অবিচল থাকুন! বাতিলের সাথে মোকাবেলা করতে হবে! জওয়ানদের মতো আপনাকে কাজ করতে হবে। কমিটিগুলোর আপনাকে খবর রাখতে হবে। সেগুলো সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি না থাকলে চলবে না।
এটা একটা জিহাদ। যুদ্ধের ময়দানে এক ধরনের জিহাদ। এটাও দ্বীনী/এক ধরনের জিহাদ। এটা নাফ্সের সাথে জিহাদ। এটা বৃহত্তর জিহাদ। একদা ময়দানে কুফর ও কাফিরের সাথে জিহাদ ছিলো। সাহাবা-ই কেরাম যুদ্ধ করে ফিরে এসেছেন। হুযূর-ই আকরামের দরবারে বর্ণনা দিচ্ছিলেন কে কিভাবে যুদ্ধ করেছেন, কতজন শহীদ হয়েছেন, কতজন জখমপ্রাপ্ত হয়েছেন। কে কতজন কাফিরকে কতল করে জাহান্নামে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন ইত্যাদি। তখন হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন- ‘‘এখন জিহাদে আসগর থেকে জিহাদে আকবরের দিকে যাও! ছোটতর জিহাদ থেকে বৃহত্তর জিহাদের দিকে অগ্রসর হও! আশাদ্দুল জিহাদি জিহাদুল হাওয়া।’’ (কঠিনতর জিহাদ হচ্ছে নাফ্স বা প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করা)। দেখুন! যে জিহাদের মধ্যে কাফিরদের মোকাবিলা ছিলো, যেখানে জীবন-মৃত্যুর ব্যাপার ছিলো, সেটা ছিলো ছোটতর জিহাদ। আর যে কাজ আপনাদের দ্বারা নেয়া হচ্ছে সেটা হচ্ছে জিহাদে আকবর (বড়তর জিহাদ)। এ জিহাদেও আপনাদেরকে কামিয়াব হতে হবে। জিততে হবে। এ জন্য কর্মতৎপর হতে হবে, কিছু সময় ব্যয় করতে হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
আপনারা যখন এ কাজ শুরু করবেন, তখন বাতিল ফির্কাগুলো পেরেশান হয়ে যাবে। তখন বাতিল ফির্কাগুলো আপনাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রও করতে পারে; যাতে আপনাদের কাজ রুখে যায়। সুতরাং এমন যেন না হয় যে, কিছুদিন এ কাজ করবেন, তারপর স্তব্ধ হয়ে যাবেন। না, আপনাদেরকে এ দায়িত্ব (যিম্মাদারী) পালনই করতে হবে। এ কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ কাজ করতেই হবে। আমি কিন্তু মৌখিক জমা-খরচে বিশ্বাস করি না। হযরাতে কেরামও রাখেন না কারণ, মৌখিক জমা, খরচও হয়ে যায়। তাই এ কাজ জযবাহ্ নিয়ে, আগ্রহের সাথে করতে হবে। বাতিল আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ছে, তাদের অশুভ দৃষ্টি এখন আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রতি। তাদের দৃষ্টি এখন আমাদের প্রতিটি জিনিষের দিকে। এখন যদি আমরা নিদ্রাবিভোর হয়ে থাকি, তখনতো তারা আরো বে-পরোয়া হয়ে যাবে। এর পরিণাম কি হবে?
আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন- ‘‘ইন্নাল্লাহা লা- ইয়ুগায়্যিরু মা- বিক্বাউমিন হাত্তা- ইয়ুগায়্যিরু- মা- বি আন্ফুসিহিম।’’ (নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা কোন জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতণ না তারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে।) আল্লাহ তা‘আলা একথাও এরশাদ করেছেন, যা আমি পূর্বেও উল্লেখ করেছি, যদি তোমরা অলস হয়ে যাও তবে আল্লাহ তা‘আলা অন্য জনগোষ্ঠীকে তোমাদের স্থলে নিয়োগ করবেন। তারা বলবে, তোমরা পেছনে যাও, এ কাজ তোমাদের দ্বারা হবে না। এটা তোমাদের সাধ্যে নেই।’ সুতরাং আমাদের অবস্থা আমাদেরকেই বদলাতে হবে। এজন্য প্রস্তুতি আমাদেরকেই নিতে হবে। আজই আমাদেরকে ডিসাইড করতে হবে। ফয়সালাকারী আলোচনা করে নিতে হবে। আমরা চুপ করে বসে থাকলে তো বাতিল এগিয়ে যাবে। সুতরাং বাতিলকে আপনাদেরকেই রুখতে হবে। ‘‘আমরা বাতিলকে রুখবই’’-এ জয্বা আমাদের থাকতে হবে। অবশ্য, কাজের জন্য চাই জোশ, আর কাজ করতে বের হলে প্রয়োজন হবে হুঁশ। বাতিলদেরকে আর আমরা পথভ্রষ্ট করতে দেবো না।
এ কাজের জন্য ‘বিস্তরাহ্’ (বিছানা ইত্যাদি) বহন করতে হবে না। বিছানা ইত্যাদির উপর তো আমাদেরই সাওয়ার হবার কথা। তা আমাদের উপর কেন সওয়ার হবে? এটাতো ‘নেছার’ বা স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। সুতরাং যেসব জায়গায় আপনাদের সাথী (সহকর্মী) আছেন, যেখানে আমাদের মারকিয (শাখা-প্রশাখা, সুন্নী ও পীরভাই) আছে, ওই জায়গার জন্য বের হোন! যেখানে গাউসিয়া কমিটির শাখা-প্রশাখা রয়েছে, ওখানে প্রোগ্রাম তৈরী করুন! আমাদের সংখ্যা তো, আলহামদু লিল্লাহ্; ছোট নয়, অনেক বড়। কাজেই, হযরাতেরও উদ্দেশ্য এ নয় যে, আমরা বসে থাকি। তাঁরা চান আমরা ময়দানে বের হয়ে পড়ি।’ ‘ইন্শা-আল্লাহ্! আমরা অবশ্যই বের হবো! এটা কোন মা’মূলী কাজ নয়। তাই হিকমতের সাথে আমরা বের হবো। বাহ্যত! এটার প্রকৃতি যাই মনে হোক না কেন? এর ফলাফল অতি চমৎকার। হুদায়বিয়ার সন্ধির ধারাগুলো বাহ্যত আমাদের দুর্বলতার পরিচায়ক বলে মনে হয়েছিলো। কিন্তু তা ছিলো হিকমত বা প্রজ্ঞায় ভরা। এটা মহা বিজয়ের দরজা খুলে দিয়েছিলো। কাফিরগণ হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মক্কায় বহু কষ্ট দিয়েছিলো। তাঁকে হিজরত করতে বাধ্য করেছিলো। হুযূরের সাথে সাহাবা-ই কেরামও হিজরত করেছেন- কেউ আগে, আর কেউ পরে। কিন্তু এসব কাজেই অগণিত হিকমত ছিলো। সুতরাং আমাদের মধ্যেও কাজের জন্য চাই জোশ ও উদ্দীপনা, আর কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে চাই হিকমত বা সুন্দর সুন্দর কৌশল।
আমাদের এ কাজ করতে হবে বড়ই নম্রতার সাথে। ভালবাসার সাথে, যখন আমরা কাজ শুরু করবো তখন হিকমতের সাথে করবো। সঠিক দিক-নির্দেশনা মেনে চলবো। এটা অত্যন্ত জরুরী।
এ প্রসঙ্গে আমি আলোচনা করেছি। এ মুহূর্তে আমাদের চাই একটি ‘থিংক ট্যাংক’ (চিন্তা-গবেষণার বিভাগ)। প্রত্যেক বিষয়ের জন্য একটি বিশেষ ‘জনগোষ্ঠী’ থাকা দরকার। যেমন কেউ থাকেন লেখক, কেউ বক্তা, কেউ পাঠক ও গবেষক। আমি আরো আলোচনা করবো। এ থিংকট্যাংকার গাউসিয়া কমিটি সুন্দরভাবে পরিচালনা পন্থা-পদ্ধতি তৈরি করবেন। ‘ফিডব্যাক’ বের করবেন। বিগত সময়গুলোতে আমাদের সামনে যে সব সমস্যা এসেছে, আগামীতেও আসতে পারে। সেগুলোও তাতে আসতে হবে। তাঁরা বসে গভীরভাবে পর্যবেণ ও চিন্তা-ভাবনা করে সেগুলোর সমাধান বের করবেন। আমরা যদি হিকমত ছেড়ে দিয়ে শুধু জয্বাহ্ (আবেগ) নিয়ে চলি, তবে আমরা হয়তো কাক্সিত ফল পাবো না। এ কাজের জন্য জযবাহ্ও থাকতে হবে, হিকমতও। এ দু’টি সাথে নিয়ে এগুতে হবে। আপনারা সিদ্ধান্ত নিন। ইন্শা-আল্লাহ, আল্লাহ্ তা‘আলাই আপনাদের হিফাযত করবেন। হযরাতে কেরামের কৃপাদৃষ্টির সন্ধানে থাকুন! তাঁদের কৃপাদৃষ্টি আমাদের প্রতি থাকলে, ইন্শা-আল্লাহ্, আমরা কামিয়াব হবোই। আল্লাহ্ তা‘আলা নসীব করুন! আমীন!!
আরো একটি কথা আমি বলতে চাই। তা হলো-
গাউসিয়া কমিটি ও এ মিশনের জন্য যদি কোন পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তবে টেলিফোনেও কথা হতে পারে। আমি আসতেও পারবো। এমনকি এক ঘন্টার জন্যও যদি প্রয়োজন হয়, তবে আমি এসে যাবো ইন্শা-আল্লাহ! সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ও আসতে পারবে। যখনই এতদুদ্দেশ্যে প্রয়োজন হবে, আমরা দৌঁড়ে এসে যাবো, ইনশা-আল্লাহ্! আমাদের চাই কাজ।
আর একটি কথা। তা হচ্ছে- আপনারা কখনো ভুলবেন না যে, এ ‘গাউসিয়া কমিটি’ যা বাংলাদেশে গঠিত হয়েছে, যদি আমরা কাজ করি, তবে আপনারা দেখবেন- এটার কাজ সমগ্র দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। আজ গোটা দুনিয়া উদ্গ্রীব হয়ে আছে। ইনশা-আল্লাহ্ এটাকে গোটা দুনিয়ায় প্রসারিত করতে হবে।
আপনারা ভাইদের আমি পুনরায় শোক্রিয়া আদায় করছি, ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ সব কাজ, মাদ্রাসা পরিচালনা, গাউসিয়া কমিটি চালানো- একেক টি বড় বড় কাজ। মুহাব্বত ও জয্বার সাথে এগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য তো আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ্র সন্তষ্টি রয়েছে, তাঁর মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সন্তুষ্টির মধ্যে, তাঁর মাহবূবের সন্তুষ্টি নিহিত আছে তাঁর মাহবূবের আশিক্বদের সন্তুষ্টির মধ্যে, ওলী ও গাউসগণের সন্তুষ্টির মধ্যে। হুযূরের সন্তুষ্টি, ইনশা-আল্লাহ্, আমাদেরকে আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছাবে।
আপনারা ধন্য। এটা হযরাতের প থেকে একটা তোহ্ফা। এটাকে সংরণ করুন! আপনারা ভাগ্যবান। এ সৌভাগ্যের জন্য আপনাদের গর্ববোধ করা দরকার। তাকাব্বুর বা অহংকার নয়, আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা চাই। গোটা দুনিয়াও এমন সৌভাগ্যের জন্য হা-পিত্যেশ করছে। আল্লাহ তা‘আলা কাজ আমাদের থেকে নিচ্ছেন! আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাদেরকে কাজের উপর দৃঢ়তা দান করুন! আমীন!!
ওয়া -আ-খির দাওয়া-না আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন!!।

অঙ্গীরকারনামা
আমাদের মনে হয়, আমরা যে কাজটি করতে যাচ্ছি, আমরা আজ যে কাজের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি, সেটাকে আমাদের পূর্ণ নিয়ম মাফিক ও গুরুত্বসহকারে সম্পন্ন করতে হবে। আমার ধারণা মতে এটা একটা বড় কাজ। কোন বড় কাজ অঙ্গিকার সহকারে করা চাই, অঙ্গিকারও, আল্লাহর দরবারে দো‘আ-প্রার্থনাও। আসুন, আগামীতে যে কাজটি করবো, তা অঙ্গিকারের সাথে করি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Instagram