আইএস মোসাদের সৃষ্টি

ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের এবার বুঝি তীরে এসে তরী ডুবল। উইকিলিকস জানিয়েছে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আইএস এর প্রতিষ্ঠাতা। আইএস এর জন্য যাদের কাছ থেকে হিলারি অর্থ সংগ্রহ করেছেন, সেসব দেশের নামসহ পুরো তালিকা প্রকাশ করেছে উইকিলিকস।

এসব তথ্য প্রকাশের পর হিলারির জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছেন। কনজারভেটিভ ডেইলি পোস্ট জানিয়েছে, উইকিলিকস হিলারির যেসব ই-মেইল ফাঁস করেছে, তাতে আইএস প্রতিষ্ঠায় হিলারি এবং ওবামার সম্পৃক্ততার শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে। অথচ বেশ কিছু প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম এসব খবর প্রকাশ করছে না। 

ডেইলি পোস্ট বলেছে, ‘হিলারি বর্তমান সময়ে কী কী করছে- তার চেয়ে ট্রাম্পের অতীত ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেই বেশি পছন্দ করছে গণমাধ্যমগুলো। কিন্তু আমরা তাদের মতো নই। আইএসের সঙ্গে হিলারির যে সম্পৃক্ততা রয়েছে সাহসী এবং দেশপ্রেমিক জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের মতো আমরাও সেগুলোর প্রমাণ দেব। কেননা আমরা যতটুকু ধারণা করেছি আইএসের সঙ্গে হিলারির তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

হিলারির ফাঁস হওয়া ই-মেইলে আইএস এবং অন্যান্য সুন্নি সংগঠনকে অর্থ সহায়তায় কাতার এবং সৌদি আরবের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সৌদি আরব এবং কাতারের কাছ থেকে বড় ধরনের অর্থ সহায়তা পাওয়ার কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন হিলারি। কিন্তু এই দুটি দেশ থেকেই তিনি সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা পেয়েছেন।

হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করেছিলেন। ওইসব দেশ হিলারিকে তার সংগঠনের জন্য বড় ধরনের অর্থ সহায়তা দিয়েছিল। হিলারির কারণেই এসব অস্ত্র সৌদি, কাতার এবং লিবিয়া হয়ে জঙ্গিদের হাতে পৌঁছেছে। আর এভাবেই জন্ম হয়েছে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস এর।

‘সৌদির ইতিহাস না জানলে আইএস’র উত্থান বোঝা যাবে না’ : অ্যালস্টার ক্রুক

যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স এর একজন সাবেক কর্মকর্তা অ্যালস্টার ক্রুক । তার রচিত বিখ্যাত একটি বই  ‘Resistance: The Essence of Islamic Revolution’। সম্প্রতি ‘হাফিংটন পোস্ট’ নামের একটি পত্রিকায় ‘You Can’t Understand ISIS If You Don’t Know the History of Wahhabism in Saudi Arabia’ শিরোনামে তার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধ টি অনুবাদ করেছেন মাহমুদুর রহমান ।

বৈরুত। ইরাকের সৎকার মঞ্চে দা’য়িশ তথা আইএস’র উত্থান দেখে পশ্চিমাদের অনেকেই অবাক হয়ে গেলেন। সুন্নি যুবকদের মাঝে আইএস’র প্রতি চুম্বকের মত আকর্ষণ দেখে কিংকর্তব্যবিমুঢ়, আর এদের সহিংস কার্যকলাপে ভীত হয়ে পড়লেন এবং আইএস’র এই প্রকাশের সময়ে তাদের সম্পর্কে সৌদির দোটানা এবং অনির্বচনীয় মনোভাব, ভাবতে বাধ্য করেছে, “সৌদি কি নিজেদের জন্য আইসিসকে হুমকি মনে করে না?”

এটা পরিষ্কার যে সৌদির শাসক গোষ্ঠী এখনও এই প্রশ্নে বিভক্ত। অনেকে বলতে চান যে আইএস আসলে ইরানি শিয়া এবং সুন্নি সংঘাতের জের ধরে শুরু হওয়া একটা যুদ্ধ যার মাধ্যমে একটা নতুন সুন্নি রাষ্ট্র জন্ম নেবে, যা সুন্নিরা নিজেদের বলে দাবী করবে এবং এক্ষেত্রে তারা দা’য়িশ-এর ‘সালাফিস্ট’ তত্ত্ব মেনে চলে।

অন্যান্য সৌদিবাসী আবদুল-আল-আজিজের বিরুদ্ধে ওয়াহাবি ভ্রাতৃত্ব বা বিদ্রোহের ইতিহাসের কথা চিন্তা করে, এ নিয়ে আরও ভীত হয় (‘ওয়াহাবি ইখওয়া’ বা ‘ওয়াহাবী ভ্রাতৃত্ব’ বলতে একটা কথা প্রচলিত আছে, যার সাথে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের কোন সংযোগ নেই। এবং এই লেখায় যেসব প্রসঙ্গে ভ্রাতৃত্ব কথাটি ব্যবহার হবে, তা সব ক্ষেত্রেই ওয়াহাবি ভ্রাতৃত্ব, ইসলামি ভ্রাতৃত্ব নয়), যা ১৯২০ সালে সৌদিতে ওয়াহাবি মতবাদকে জনপ্রিয় করে তোলে।

অনেক সৌদিবাসীই এখন দা’ইয়িশের গোঁড়া মতবাদের ব্যপারে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন।

সৌদির দ্বৈত নীতি

আইএস নিয়ে সৌদির অভ্যন্তরীণ অনৈক্য এবং উত্তেজনার মূল কারণ, দেশটির সহজাত (এবং অনিশ্চিত) রাজনৈতিক মতবাদ এবং ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।

সৌদি পরিচয়ধারী প্রভাবশালী একটি অংশ সরাসরি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল আল ওয়াহাব (ওয়াহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠাতা)-এর থেকে এসেছে এবং এর গোঁড়া ব্যবহার চলতে চলতে ইবনে সৌদের ‘পিউরিটানিজম’ চলে আসে (পরবর্তীতে তিনি অনেকের মাঝে একজন সামান্য নেতা হয়ে বেদুইনদের সঙ্গে তর্কাতর্কি এবং লড়াইয়ে রত হন আর নেজদ এর মরুবাসীদের আক্রমণ করেন)।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় এই দ্বৈততার দ্বিতীয় কারণ ১৯২০ সালে স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে বাদশাহ আবদুল আল আসাদ এর পরবর্তী পদক্ষেপঃ ভ্রাতৃত্বকে দাবিয়ে রাখার প্রচেষ্টা (এটা করা হয়েছিল ব্রিটেন এবং আমেরিকার সাথে কূটনৈতিক সু-সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য); মূল ওয়াহাবী প্রীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান; ১৯৭০ সালে পেট্রোডলার অর্জনের সুযোগ ছিনিয়ে নেওয়া, যাতে ভ্রাতৃত্ববোধের আগুন প্রশমিত হয়ে রপ্তানি বিষয়ক সমস্যা সূচনা হয়; মুসলিম বিশ্বের “সহিংস বিপ্লবকে” সরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করার চেষ্টা।

কিন্তু এই “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” কোন নিরীহ সংস্কারবাদ ছিল না। এটা, মূর্তিপূজক ও অন্যান্য মতবাদের প্রতি আবদুল আল ওয়াহাবের তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ; এবং তিনি ইসলাম থেকে বেদায়াতি কর্মকাণ্ড দূর করার প্রত্যয় গ্রহণ করেন।

 প্রতারক মুসলিম

আমেরিকান লেখক-সাংবাদিক, স্টিভেন কোল লিখেছেন যে চতুর্দশ শতাব্দীর ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনে তাইমিয়ার এই উগ্র শিষ্য, আবদুল-আল-ওয়াহাব কি করে সমগ্র আরব থেকে মক্কা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানো ভব্য, শিল্পী, তামাক সেবী, ভাঙের বেপারী, তবলা বাজানো মিশরীয় আর অটোমান অভিজাতদের” অবজ্ঞা করেছেন।

আবদুল-আল-ওয়াহাবের দৃষ্টিতে এরা মুসলিম ছিলেন না; এরা ছিল ছদ্মবেশী মুসলিম, অর্থাৎ প্রতারক। এমনকি ওয়াহাবের দৃষ্টিতে, তিনি স্থানীয় বেদুঈনদের মাঝেও তেমন ভালো আচরণ খুঁজে পাননি। তারা পবিত্র সাধু ব্যক্তিদের প্রতি তাদের অতিরিক্ত শ্রদ্ধা আর মাজার তৈরির মাধ্যমে আহাদের কোপের শিকার হয়। উদাহরণ স্বরূপ কবরকে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু বলা হয়েছিল।

আবদুল-আল-ওয়াহাব মতে এগুলো বিদআত, অর্থাৎ ঈশ্বরের নিয়মের বিরোধী কাজ।

তার পূর্বসূরি বা গুরু তাইমিয়ার মত, আবদুল-আল-ওয়াহাব বিশ্বাস করতেন যে নবী মুহাম্মদ যতদিন মদিনাতে ছিলেন, সেটাই ছিল আদর্শ মুসলিম সমাজ (সর্বোৎকৃষ্ট সময়), এবং সেই আদর্শ সব মুসলমানের গ্রহণ করা উচিত (বিশেষত সালাফি তত্ত্বে)।

শিয়া, সূফী এবং গ্রীক দার্শনিকদের বিরুদ্ধে তাইমিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। খ্রিষ্টানদের উপাসনার সাথে মিল আছে বলে ঘোষণা দিয়ে রসূলের কবর জিয়ারত এবং তার জন্মদিন পালনেরও বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তাইমিয়া। পূর্বের এই শিক্ষা আত্তীকরণের সাথে আবদুল-আল-ওয়াহাব বলেন, ইসলাম সম্পর্কে নিজের জানার গণ্ডির ভেতর কোন মানুষ যদি “সন্দেহ বা দ্বিধা” প্রকাশ করে, তবে সে তার জীবন ও সম্পদের নিশ্চয়তা হারাবে।

আবদুল-আল-ওয়াহাবের তত্ত্বের একটা মতবাদ, ‘তাকফির’-এর মূল হয়ে ওঠে। তাকফিরি মতবাদের অধীনে আবদুল-আল-ওয়াহাব বা তার অনুসারীরা, সার্বভৌমত্বের (বা রাজার) বিরুদ্ধে যায় এমন কর্ম সম্পাদনকারীকে কাফের বলে ঘোষণা দিতে পারতো। যে সকল মুসলিম মৃত কিংবা সাধুদের সম্মান দেখায়, ওয়াহাব তাদের নিন্দা করেন। তিনি বলেন এই অনুভূতি স্রষ্টার, একমাত্র স্রষ্টার প্রাপ্য। ওয়াহাবী ইসলাম তাই সাধু-দরবেশ, কিংবা মৃতদের প্রতি সব ধরনের প্রার্থনাকে, মাজারে যাওয়া, দরবেশ কিংবা ইসলামী সাধুদের জন্মদিনে উৎসব পালন করা, এমনকি মহানবীর জন্মদিন পালন করা, সাথে সাথে কবরে নাম ফলক ব্যবহার পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে।

আবদুল-আল-ওয়াহাব এমন একটা অনুক্রম দাবী করেন, যা লিখিত এবং বাস্তব ও হাতে কলমে কাজ করবে। তিনি বলেন যে, প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ব্যাক্তিগতভাবে একজন মুসলিম নেতার (খলিফা, যদি থাকেন) কাছে আনুগত্য স্বীকার করা। তিনি লিখিত আদেশ জারি করেন, “কেউ যদি এই নিয়ম লঙ্ঘন করে, তবে তাকে হত্যা করা হবে, তার স্ত্রী-কন্যাকে অত্যাচার করা হবে এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।” আবদুল আল ওয়াহাব যাদের মুসলিম বলে গণ্য করতেন না, সেই সব শিয়া, সূফী আর ‘ধর্মভ্রষ্ট মুসলিম’দের নামের তালিকা তৈরি করে তাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন।

এখানেই দেখা যায় ওয়াহাবীদের সাথে আইএস এর কোন পার্থক্য নেই। ফাটলটা পরে দেখা যাবেঃ পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল আল ওয়াহাবের তত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে “এক শাসক, একক কর্তৃত্ব, একটি মসজিদ” তিন স্তম্ভ দ্বারা যথাক্রমে সৌদি বাদশাহ, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে ওয়াহাবী শাসনতন্ত্র, এবং পুরো বিশ্বের উপর তাদের কর্তৃত্ব বোঝানো হয়েছে।

এখানেই ফাটল, ফারাক;আইএস এই তিন স্তম্ভ— যার উপর মুসলিম শাসন টিকে আছে তা—অস্বীকার করে। এই ফারাকটুকু ছাড়া বাকি সব কিছুই ওয়াহাবী আন্দোলনের সদৃশ, যা সৌদি আরবের জন্য হুমকি স্বরূপ।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ১৭৪১-১৮১৮

এরকম প্রচণ্ড উগ্রবাদের কারনে আবদুল-আল-ওয়াহাব নিজ শহর থেকে বিতাড়িত হন এবং কিছুদিন পর ১৭৪১ সালে ইবনে সৌদ এবং তার গোত্রের কাছে আশ্রয় লাভ করেন। আবদুল আল ওয়াহাবের দর্শনের মাঝে ইবনে সৌদ আরবের ঐতিহ্য এবং নিয়ম বদলে ফেলার আভাস পেয়েছিলেন এবং তা ছিল ক্ষমতা দখলের পথ।

আবদুল আল ওয়াহাবের তত্ত্ব গ্রহণ করে ইবনে সৌদের দল সহজেই সেসব কাজ করতে পারলো, যা তারা সব সময় করে আসছে। আর তা হল প্রতিবেশী গ্রাম আক্রমন এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন। এবং এখন এটা তারা আরবের ঐতিহ্য অনুসরণ করে নয়, বরং জিহাদ হিসেবে করছে। ইবনে সৌদ এবং আবদ-আল-ওয়াহাব নতুন করে শহীদি তত্ত্ব টেনে আনলেন। যা বলে জিহাদে মৃত্যুর সাথে সাথে মৃত স্বর্গারোহণ করবে।

শুরুতে তারা কাছাকাছি কিছু এলাকা ধ্বংস করে সেখানে নিজেদের নিয়ম জারি করে ( বিজিত এলাকার অধিবাসীদের দুটি সুযোগ থাকতো, ওয়াহাবী হওয়া, বা মৃত্যু)। এই সম্মিলিত শক্তি ১৭৯০ সনের মধ্যে বেশীরভাগ আরব অঞ্চলে নিজেদের শাসন জারি করে এবং তারপর মদিনা, সিরিয়া ও ইরাকের দিকে ধেয়ে যায়।

তাদের কৌশল—যেমন আজকে আইএস’র—বিজিত অংশের মানুষকে নিজেদের সামনে নত করা। তারা ভীতি ছড়াতে চেয়েছিল। ১৮০১ সালে এই মিত্র শক্তি ইরাকের পবিত্র শহর কারবালা আক্রমণ করে। তারা শিশু ও নারী সহ প্রচুর শিয়া হত্যা করে। অনেক শিয়া কবর, মাজার গুড়িয়ে দেয়। এমনকি মহানবীর নাতি ইমাম হুসেইনের কবরও বাদ যায়নি।

লেফটেন্যান্ট ফ্রান্সিস ওয়ার্ডেন নামক এক ব্রিটিশ অফিসার, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে লিখেছেন, “তারা পুরো শহরটি লুঠ করে, এবং ইমাম হুসেইনের কবরে হামলা করে, সে সঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজার অধিবাসী তাদের চাতুর্যপূর্ণ নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়।”

সৌদি রাষ্ট্রের প্রথম ঐতিহাসিক, ওসমান ইবনে বিশর নাজদি লিখেছেন যে ইবনে সৌদ ১৮০১ সনে কারবালায় ধ্বংসযজ্ঞ চালান। তিনি গর্বের সাথে সে ধ্বংসের বর্ণনা দেন এভাবে, “আমরা কারবালা দখল করি, অধিবাসীদের হত্যা ও দখল (দাস হিসেবে) করি, তারপর আল্লাহর শোকর গুজার হই, তিনিই পৃথিবীর বাদশাহ, এবং কৃতকর্মের জন্য আমরা ক্ষমা না চেয়ে বলি, ‘অন্যান্য অবিশ্বাসীদের জন্যও একি প্রতিষেধক’।”

১৮০৩ সালে আব্দুল আজিজ পবিত্র শহর মক্কায় প্রবেশ করেন, এবং ভীত সন্ত্রস্ত শহর তার কাছে আত্মসমর্পণ করে (মদিনাকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়)। আবদ-আল-ওয়াহাবের অনুসারীরা তাদের আওতার মধ্যে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ, কবর ও মাজার সমুহ ধ্বংস করে। এবং একদম শেষে তারা শতাব্দী পুরনো ইসলামিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।

কিন্তু ১৮০৩ সালে এক শিয়া গুপ্তহন্তার হাতে বাদশাহ আবদুল আজিজ নিহত হন (কারবালা ধ্বংসের প্রতিশোধ হিসেবে তাকে হত্যা করা হয়)। তার পুত্র সৌদ বিন আবদুল আজিজ সিংহাসনে বসেন এবং আরব বিজয় চালিয়ে যান। এরপর অটোমান শাসকগণ আর চুপ করে বসে তাদের সাম্রাজ্য টুকরো হয়ে যাওয়া দেখতে পারলেন না। মিশরীয় বাহিনীর সাথে মিলে অটোমান বহর ১৮১২ সালে ওয়াহাবী শক্তিকে মদিনা, জেদ্দা এবং মক্কা থেকে বিতারন করে। ১৮১৪ সালে সৌদ বিন আবদুল আজিজ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার দুর্ভাগা পুত্র আবদুল্লাহ বিন সৌদকে অটোমানরা ইস্তানবুল নিয়ে যায় এবং সেখানে বীভৎসভাবে তাকে হত্যা করা হয় (এক পর্যটক জানান যে আবদুল্লাহ বিন সৌদকে তিন দিন ধরে ইন্তানবুলের পথে পথে লাঞ্ছিত করা হয়, এরপর ফাঁসি দেওয়ার পর শিরচ্ছেদ করা হয়, তার ছিন্ন মস্তক একটি কামানে ভরে ছুড়ে দেওয়া হয় এবং তার শরীর থেকে তার হৃৎপিণ্ড বের করে নেওয়া হয়।)

১৮১৫ সালে মিশরীয়রা (অটোমানদের পক্ষে) যুদ্ধে ওয়াহাবী সেনাদের পর্যুদস্ত করে ফেলে। ১৮১৮ সালে অটোমানরা ওয়াহাবী রাজধানী দারিয়াহ ধ্বংস করে। প্রথম সৌদি রাজ্যের আর অস্তিত্ব রইল না। বেঁচে যাওয়া কিছু ওয়াহাবী মরুভূমিতে আত্মগোপন করে নতুন করে জোট করার চেষ্টা করে এবং উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত নিশ্চল হয়েই পড়ে থাকে।

আইএস এর মাধ্যমে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

যারা এই ইতিহাস বুঝতে পেরেছেন, ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে সমসাময়িক ইরাকে ইসলামিক স্টেট বা আইএস’র উত্থান বুঝতে তাদের খুব কষ্ট হবেনা। বস্তুত অষ্টাদশ শতাব্দীতে নেজদ-এ ওয়াহাবী তত্ত্ব নির্জীব হয়ে যায়নি, বরং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে অটোমানদের জড়িয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এটি প্রাণ ফিরে পায়।

আল সৌদ বাহিনী—বিংশ শতাব্দীর নবজাগরনে—চতুর রাজনৈতিক আবদুল-আল-ওয়াহাবের দ্বারা একটি সংক্ষিপ্ত তত্ত্বের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরব বেদুঈন গোষ্ঠীকে ভ্রাতৃত্বের নামে একত্রিত করে এবং ওয়াহাব ও ইবনে সৌদের নেতৃত্বে লড়াইয়ে এনেছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওয়াহাবী ‘মরালিস্ট’দের পরিচালিত উগ্র, আধা-স্বাধীন আন্দোলন আবার পুনরুজ্জীবিত হল। পূর্বের মত আবার, ভ্রাতৃত্বের নামে ১৯১৪ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে তারা আবার মক্কা, জেদ্দা ও মদিনা দখল করতে সক্ষম হল। আবদুল-আল-আজিজ ভাবতে লাগলেন ‘ভ্রাতৃত্বের’ বিপ্লব তার জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। ভ্রাতৃত্ব বিদ্রোহ করল এবং তার ফলে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ১৯৩০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এবং তাদের পরাজয়ের পর বাদশাহ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।

বাদশাহ আজিজের জন্য পূর্ববর্তী সময় ছিল অসাধারণ। বিভিন্ন উপদ্বীপে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছিল, এবং ব্রিটেন ও আমেরিকা ছিল তার অনুগ্রহ প্রার্থী, যদিও তখনও আরবের প্রকৃত শাসক শরিফ হুসেইনকেই সমর্থন করতেন। আসলে সৌদির উচিত ছিল কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা।

এরই মধ্যে ওয়াহাবী আন্দোলনকে একটি বিদ্রোহী বিপ্লবী আন্দোলন বা ধর্মীয় তাকফিরি শুদ্ধিকরণ প্রথা থেকে বের করে একটি রক্ষণশীল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দাওয়াত হিসেবে পরিচয় করানো হল এবং রাজকীয় সৌদি পরিবার এবং বাদশাহর প্রতি তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা হল।

তৈল সম্পদ ওয়াহাবী আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিলো।

তৈল সম্পদের আবির্ভাব নিয়ে ফরাশি পণ্ডিত গাইলস কেপেল লেখেন, সৌদি লক্ষ্য ছিল “মুসলিম বিশ্বে ওয়াহাবী আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া। ইসলামকে ওয়াহাবী করন, সেজন্য ধর্মের মধ্যে থেকে আওয়াজ তোলার মত মানুষ কমাতে হবে এবং একজন বা একটি নীতিকে সামনে আনতে হবে, এমন একটি আন্দোলন দরকার যা জাতীয়তা অতিক্রম করে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এই মর্মে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ শুরু হল, এখনও যা অব্যাহত।

এই প্রোজেক্টে প্রচুর টাকা খরচ করার চতুরতা করা হল—এবং সৌদি চাইল সুন্নি ইসলামকে আমেরিকার সামনে তুলে আনতে কেননা, এটি ওয়াহাবী নীতিকে শিক্ষা, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণ করে সমগ্র ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে— যা পশ্চিমা রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণকে সৌদির উপর নির্ভরশীল করে তুলবে। এমন এক নির্ভরশীলতা যা বাদশাহ আজিজের সাথে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের এক রণতরীতে সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে।

পশ্চিমারা দেশটির দিকে তাকিয়েছেন এবং এর সম্পদ; দৃশ্যমান আধুনিকতা; এবং দক্ষ ইসলামিক শাসন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা ভেবে নিয়েছিলেন যে দেশটি আস্তে আস্তে আধুনিকতার দিকে ঝুকছে এবং ধীরে ধীরে সুন্নি ইসলাম রাষ্ট্রে আধুনিকতা ছড়িয়ে দেবে।

কিন্তু সৌদি ভ্রাতৃত্ব সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, যা ১৯৩০ সালে আদতে হারিয়ে যায়নি। তারা সেদিকেই ছিল, কিন্তু উপরে উপরে তা কখনও প্রকাশ করত না। একদিকে আইএস ওয়াহাবী তত্ত্ব মানে, অন্যদিকে আবার তারা গোঁড়া। এটিকে ওয়াহাবী আন্দোলনের একটি সংশোধিত রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর এটিই আইএস’র প্রতি সৌদির আজকের দ্বৈত নীতির মূল কারন।

আইএস হল “মদিনা পরবর্তী” একটি আন্দোলন, এটি নবীর নীতির চেয়ে প্রথম দুই খলিফার নীতি বেশি ধারন এবং অনুসরণ করে, এবং তারা সৌদির শাসনের তীব্র বিরোধিতা করে।

তেলের আবিষ্কারের পর সৌদি বাদশাহি আরও দৃঢ় হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক রুপে ফুলে ফেঁপে ওঠে, বাদশাহ ফয়সালের আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টার পরও ভ্রাতৃত্বের পয়গাম আবার শক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। “ভ্রাতৃত্ব তত্ত্ব” অনেক বিশিষ্ট নাগরিক নারী ও পুরুষ এবং শেখদের সমর্থন পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে। এক হিসেবে ওসামা বিন লাদেন আসলে ভ্রাতৃত্বের একজন পরবর্তী যুগের প্রতিনিধি ছিলেন।

আজকে বাদশাহর শাসনের বৈধতার ক্ষেত্রে আইএস’র চেষ্টা সন্দেহজনক কিছু নয়, বরং এটি সৌদি-ওয়াহাবী তত্ত্বে ফেরার একটি পথ।

সৌদির সঙ্গে পশ্চিমের বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কর্মকাণ্ডে (সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধবাদ, বা’থইজম, নাসেরিজম, সোভিয়েত এবং ইরানী অনুপ্রেরণা), পশ্চিমারা তাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ওয়াহাবী আন্দোলনের ব্যপারটি তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন।

অথচ অন্য সব ক্ষেত্রে, যেখানেই পশ্চিমা গয়েন্দারা গোঁড়া ইসলামী আন্দোলনের সন্ধান পেয়েছেন সেখানেই মার্কিন সেনা পাঠানোর জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছেন, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের যুদ্ধে নামিয়েছেন।

তাহলে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকালে প্রিন্স বান্দরের সৌদি-পশ্চিমা আদেশপত্র যদি সহিংস, ভীতি উদ্রেককারী নতুন ধারার ভ্রাতৃত্ব আন্দোলন রুপে প্রকাশ করে, আমাদের কি তাতে অবাক হওয়ার কথা? যদি আমরা ওয়াহাবী আন্দোলন সম্পর্কে একদম স্বল্পও জানি, তবু সিরিয়ার বিদ্রোহীরা যে পঙ্খিরাজের মত বিলুপ্ত প্রাণীতে পরিনত হবে, এটা বুঝে কি আমাদের অবাক হওয়া উচিত? কি করে আমরা আশা করি যে গোঁড়া ওয়াহাবী আন্দোলন মধ্যমপন্থী তৈরি করবে? এবং “এক নেতা একক কর্তৃত্ব এবং একটি মসজিদ” তত্ত্ব; যেখানে বলা হয় এটি না মানলে মৃত্যু অবধারিত, সেই তত্ত্ব থেকে আমরা মধ্যমপন্থা বা সহনশীলতা পাওয়ার কথা কি করে ভাবতে পারি?

কিংবা, সম্ভবত, আমরা কখনও ভেবেই দেখিনি।

নাদিয়া মুরাদ: যৌনদাসী থেকে নোবেল বিজয়ী

প্রথম ইরাকি হিসেবে নোবেল পাওয়া ২৫ বছর বয়সী নাদিয়া মুরাদের পথটি মোটেও সহজ ছিল না

প্রথম ইরাকি হিসেবে নোবেল পাওয়া ২৫ বছর বয়সী নাদিয়ার পথটি মোটেও সহজ ছিল না

নাদিয়া মুরাদ, একজন বিশ্বনন্দিত নোবেলজয়ী নারীর নাম। নোবেল জয় করে গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করেছেন ইরাকের এই ইয়াজিদি মানবাধিকারকর্মী। বাস্তবতার কঠিন নির্যাতনের জাল থেকে বেরিয়ে এসে ঘুরে দাঁড়িয়ে কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এ পুরস্কারটি অর্জন করলেন তিনি, তা নিয়ে অবাক পুরো বিশ্ব।

প্রথম ইরাকি হিসেবে নোবেল পাওয়া ২৫ বছর বয়সী নাদিয়ার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। ইরাকের সংখ্যালঘু ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন পৃথিবী নির্মমতম জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বর্বরতা। শিকার হয়েছেন অবর্ণনীয় নির্যাতনের। পার করেছেন ইতিহাসের নিকৃষ্টতম কিছু সময়।

আইএস’র অত্যাচারে ভয়াবহতম অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সময় অতিবাহিত করা এই সাহসী নারী একসময় উত্তর ইরাকের সিঞ্জারের পাহাড়ি এলাকায় নিজ গ্রামে শান্তিময় জীবন অতিবাহিত করেছেন। তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জিহাদি জঙ্গিরা ২০১৪ সালে যখন সিরিয়া এবং ইরাকে ত্রাসের রাজত্ব শুরু করে তখন থেকেই তার দুঃস্বপ্নের শুরু। 

ঐ বছরের আগস্টের এক দুঃস্বপ্নময় দিনে আইএস জিহাদিদের কালো পতাকা বহনকারী একটি গাড়ি নাদিয়ার গ্রামে প্রবেশ করে। এরপর আইএস জঙ্গিরা পুরুষদের হত্যা করে, শিশুদের জঙ্গি বানানোর উদ্দেশ্য বন্দী করে এবং নারীদের জোরপূর্বক শ্রম ও যৌনদাসী হতে বাধ্য করে।আইএসের একটি পক্ষের কাছে যৌনদাসী হিসেবে মুরাদকে বিক্রি করে দেয় আরেকটি পক্ষ। 

এরপর সিরিয়ান, ইরাকি, তিউনিসিয়ান ও ইউরোপিয়ান আইএস জঙ্গিদের নিষ্ঠুর লালসার শিকার হতে হয় তাকে। যন্ত্রণায় কেটেছে তার প্রতিটি মুহূর্ত। এর তিন মাস পর নভেম্বরে অনেক কষ্ট-সংগ্রাম-কৌশল করে পালিয়ে আসেন তিনি। পালিয়ে এসেই তিনি ক্ষ্যান্ত হননি, বরং যোগ দেন আইএসের হাতে বন্দি ইয়াজিদি নারীদের মুক্তির সংগ্রামে। রুখে দাঁড়ান নারী পাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। পরিণত হন ইয়াজিদিদের মুক্তির প্রতীকে। 

যৌন নিপীড়িত-নির্যাতিত এই নাদিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করেন ইয়াজিদি সম্প্রদায়সহ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের শরণার্থীদের আইনজীবী হিসেবে। মানবাধিকার আদায়ে এই ভূমিকার জন্য তাকে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সম্মানজনক শাখারভ পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়।২০১৫ সালে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সামনে তুলে ধরেছিলেন নিজের ভয়ানক অভিজ্ঞতা। আইএসের হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় তার তিন মাসের মাসের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ংকরের চেয়েও বেশি কিছু। আইএস তাকে স্বঘোষিত খেলাফতের রাজধানী মসুলে নিয়ে যায়। সেখানে তিনটি মাস তিনি বারংবার গণধর্ষিত, নির্যাতিত এবং প্রহৃত হন। 

জাতিসংঘে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের যখন বন্দি করা হলো, তখন ওদের যৌন নির্যাতনের বিষয়ে শোনা কথাগুলো স্মরণ করে মনে-প্রাণে চাইছিলাম, এমন পাশবিক লালসার শিকার হওয়ার আগে যেনো আমাদের মেরে ফেলা হয়। কিন্তু, ওরা আমাদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করে দিলো তাদেরই আরেকটি পক্ষের কাছে। এরপর কী যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে! প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয়েছে, আমাদের মেরে ফেলা হয় না কেনো, কেনো আমাদের এভাবে তিলে তিলে নির্যাতন করা হচ্ছে?”

নাদিয়া সেই বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, “তিন হাজারেরও বেশি নারী আইএসের হাতে যৌনদাসী হিসেবে বন্দি রয়েছে। আইএস এই হতভাগ্যদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে! ইচ্ছেমতো জায়গায় বিক্রি করছে নারীদের”।

জিহাদি জঙ্গিরা নারী ও বন্দীদের দাস হিসেবে বিক্রি করার জন্য ক্রীতদাস বাজার গড়ে তুলেছিল এবং একই সাথে ইয়াজিদি নারীদের ধর্ম ত্যাগ করার জন্য বাধ্য করেছিল। উল্লেখ্য, জিহাদিদের তথাকথিত পৌত্তলিক ইসলামিক ধ্যান ধারণায় ইয়াজিদিদের কাফির বলে গণ্য করা হয়। কুর্দি ভাষাভাষী এই সম্প্রদায়টি একটি প্রাচীন ধর্মকে অনুসরণ করে এবং একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে যা তারা একটি প্রতীকী ময়ূরের মাধ্যমে উপস্থাপন করে থাকে।

সহিংসতায় হতভম্ব, মুরাদ পালানোর জন্য চেষ্টা শুরু করেন এবং মসুল থেকে একটি মুসলিম পরিবারের সহায়তায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হন । এসময় তিনি মিথ্যা পরিচয়পত্র নিয়ে ক্যাম্পের অন্যান্য বিচ্ছিন্ন ইয়াজিদিদের সাথে মিশে গিয়ে ইরাকি কুর্দিস্তানের দীর্ঘপথ অতিক্রম করেন। এখানেই, তিনি জানতে পারেন, তার মা-সহ ছয় ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে।

পরে ইয়াজিদিদের মিত্র একটি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি জার্মানিতে তার বোনের কাছের চলে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তারপর থেকেই তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন, তার ভাষায় “আমার জনগণের যুদ্ধে”। এরপর থেকেই তিনি তার সাথে ঘটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং অত্যাচারিত গণমানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তার যুদ্ধ শুরু করেন। এখনও তিনি নিখোঁজ ও নির্যাতিত ইয়াজিদিদের জন্য তার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধেও তিনি কঠিন ভূমিকা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যা তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করলো। ০৫ অক্টোবর ওসলোতে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী দু’জনের নাম ঘোষণা করে নরওয়েজিয়ান কমিটি। তার একজন নাদিয়া।

আইএস কাদের সৃষ্টি??

 আইএস মোসাদের সৃষ্টি
আইএস মোসাদের সৃষ্টি
যুগান্তর ডেস্ক |  
বৈঠক শেষে তোলা ছবিতে ম্যাককেইনের সঙ্গে আবুবকর বাগদাদি ও আইএসের আরেক শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ নূর (গোল চিহ্নিত) -সংগৃহীত
দুনিয়াব্যাপী ‘ইসলামী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধের স্বঘোষিত খলিফা ও সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নেতা খলিফা আবুবকর আল বাগদাদি মুসলমান নন। তিনি একজন ইহুদি। তার আসল নাম আকা ইলিয়ট শিমন। এর চেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ‘ইসলামী শাসনব্যবস্থা’ কায়েমের আদর্শে মত্ত আইএস ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সৃষ্টি। এ জঙ্গিগোষ্ঠীর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রত্যেকেই মোসাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। মোসাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতেই আইএস জঙ্গিদের ‘যুদ্ধকৌশল’ শেখানো হয়।
সুসংগঠিত এ জঙ্গিগোষ্ঠীটি ‘ইসলামিক স্টেট’ নামে আত্মপ্রকাশের আগে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের সিনিয়র সিনেটর ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জন ম্যাককেইনের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছে। গোড়ার দিকের ওই গোপন বৈঠকগুলোতে মোসাদের বেশ কয়েকজন সদস্য ও আইএসপ্রধান বাগদাদি উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদন ঘেঁটে বিশ্বব্যাপী আতংক সৃষ্টি করা ইসলামিক স্টেট ও এর প্রধান খলিফা আবুবকর আল বাগদাদির পরিচয় নিয়ে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সাবেক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) গোপন নথিতেও এ ব্যাপারে উল্লেখ আছে বলে জানিয়েছে ‘আমেরিকান ফ্রি প্রেস’ নামের ওয়েবসাইট। সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী সংগঠন বলে পরিচিত আইএসের উত্থান হয় গত বছরের জুনে। ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল অংশ দখলে নিয়ে ইসলামিক স্টেট নাম দিয়ে খেলাফত ঘোষণা করেন বাগদাদি।
প্যারিসে ভয়াবহ হামলার পর একই কথা বলেছেন কিউবার সাবেক নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। সংবাদ সম্মেলন করে দু’জনই বলেছেন, আইএস ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী অস্ত্র। বিশ্বব্যাপী নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য আইএস নামের এ ভয়ানক কালসাপ মাঠে নামিয়েছে তারা।
ইসলামিক স্টেট সৃষ্টির এক বছর আগে ২০১৩ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন সিরিয়ায় আবুবকর আল বাগদাদিসহ অর্ধডজন শীর্ষ জঙ্গি নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। সম্প্রতি সেই বৈঠকের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ইউটিউবে। মার্কিন প্রচারমাধ্যম এবিসি নিউজ ও সিএনএনের একটি ভিডিও স্নাপশটে এ ছবির ব্যাপারে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আমেরিকান ফ্রি প্রেসের প্রতিবেদন জানায়, ইহুদি পিতা-মাতার কোলে জন্ম নেন বাগদাদি। এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যানুযায়ী, বাগদাদিকে টানা এক বছর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে মোসাদ। একই সময়ে আরবি ভাষা ও ইসলামী শরিয়ার ওপর কোর্স করেছেন বাগদাদি। এ সময় তিনি ইব্রাহিম ইবনে আওয়াদ ইবনে ইব্রাহিম আল বদরি নাম ধারণ করেন। তবে বাগদাদির পরিচয় সম্পর্কে ছড়ানো হয়েছে- তিনি ১৯৭১ সালের ২৮ জুলাই ইরাকের সামারায় জন্মগ্রহণ করেন। বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের সময় সামারায় একটি মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন বাগদাদি। পরে তিনি ‘আমিরে দায়েশ’ উপাধি গ্রহণ করেন।
এডওয়ার্ড স্নোডেন প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের গোপন দলিলের বাগদাদির তথ্য প্রথম প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ইন্টারনেট রেডিও আজিয়াল ডটকম। পরবর্তী সময়ে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা এ তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে। ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার পর্যালোচনা নিয়ে এ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় আরবি পত্রিকা ইজিপ্রেসে। যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি নিউজ প্রচারিত একটি ভিডিওর বরাত দিয়ে সোশিও-ইকোনমিক হিস্ট্রি নামের একটি ওয়েবসাইট দাবি করেছে, মার্কিন প্রভাবশালী সিনেটর জন ম্যাককেইন আবুবকর আল বাগদাদিসহ কয়েকজন আইএস কর্মকর্তা ও সিরিয়ার বিদ্রোহী কয়েকজন নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। ২০১৩ সালের জুনে যখন এ বৈঠকটি হয়, তখন বাগদাদির মুখে লম্বা দাড়ি ছিল না। ওই বৈঠকে বাগদাদির সহযোগী আইএসের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ নূরও উপস্থিত ছিলেন। উইকিপিডিয়ায় প্রদর্শিত আবুবকর বাগদাদির ছবির সঙ্গে ওই ছবির মিল পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল আরাবিয়াও ওই ছবিটি প্রকাশ করেছে। সিএনএনের একটি ভিডিওতেও বাগদাদির সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে দেখা যায় জন ম্যাককেইনকে। গ্লোবাল রিসার্চ নামের একটি গবেষণা ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, ২০০৪ সাল থেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে আবুবকর আল বাগদাদি। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বুস্কা কারাগারে ছিলেন তিনি। পলিটিসাইট ডটকমের তথ্যানুযায়ী, সিআইএ’র তত্ত্বাবধানেও বাগদাদি সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Follow by Email
Facebook
Twitter
Instagram