অবরুদ্ধ গাজা

ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত গাজা হচ্ছে এমন একটি এলাকা যা পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন। এই এলাকাটি ৪১ কিলোমিটার বা ২৫ মাইল দীর্ঘ এবং ১০ কিলোমিটার চওড়া। একদিকে ভূমধ্যসাগর, তিন দিকে ইসরায়েল ও দক্ষিণ দিকে মিশরের সিনাই সীমান্ত। শ’খানেক বর্গমাইল আয়তনের এই ছোট এলাকাটুকুর মধ্যে বাস করেন প্রায় ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি। এলাকাটি কড়া প্রহরাধীন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। অবরুদ্ধ এই ছোট্ট এলাকাটির মধ্যে কি ভাবে দিন কাটাচ্ছেন গাজার অধিবাসীরা?

সোমবার গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে যে বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলিতে প্রায় ৬০ জন নিহত হন, এরা প্রায় সবাই গাজার অধিবাসী।

এদের বেশিরভাগই ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় বাড়ি ছেড়ে পালানো বা উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধর। অনেকেই এখনো বাস করেন শরণার্থী শিবিরে। তারা এখনো স্বপ্ন দেখেন নিজের হারানো বসতভূমি (যা এখন ইসরায়েলে) সেখানে ফিরে যাবার। এখানকার অধিবাসীরা মনে করেন গাজা হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগার।

এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করেন ৫ হাজার ৪৭৯ জন লোক। ধারনা করা হয়, আগামি তিন বছরে তা ৬ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। গাজার জনসংখ্যা ২০১৫ সালের ছিল ৬ লাখ ৩০ হাজার। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ২০৩০ সালে এই সংখ্যা ৩১ লক্ষে গিয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হয়। গাজার স্কুলগুলোর ওপর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার প্রচন্ড চাপের কারণে ৯৪ শতাংশ স্কুলই দু’শিফট করে চলে – একটি সকালে আরেকটি বিকালে।

গাজায় মানুষের মধ্যে অধিকাংশ দারিদ্র্য আর বেকার, আর কঠোর সীমান্ত প্রহরা আর চেক পয়েন্ট পেরিয়ে বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। সীমান্ত নিরাপত্তা লংঘনের কোন রকম চেষ্টাকে ইসরায়েল তার প্রতি সরাসরি হুমকি বলে মনে করে। গত বছরের এক হিসেব অনুযায়ী গাজার ৪৪ শতাংশ লোকই বেকার। বিশেষ করে উদ্বেগের বিষয় হলো যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৬০ শতাংশেরও বেশি।

গাজার ভেতর থেকে ইসরায়েলে রকেট হামলার জবাবে তিনবার এই এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। প্রতিবারই ব্যাপক সংখ্যায় বেসামরিক লোককে হত্যা করা হয়েছে।

চিকিৎসার জন্য এখানকার লোকদের আগে মিশরের ভেতরে যাবার সুযোগ ছিল, কিন্তু তা এখন সীমান্তে ইসরাইলি বাহিনীর বাধার মুখে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ওষুধ বা ডায়ালাইসিস মেশিনের মতো চিকিৎসা যন্ত্রপাতিও এখন গাজায় আসা সম্ভব হচ্ছেনা। যে কারনে গাজার হাসপাতালগুলোয় ওষুধ আর চিকিৎসা যন্ত্রপাতির অভাব এখন প্রকট। এছারা বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে তিনটি হাসপাতাল এবং ১০টি মেডিক্যাল সেন্টার তাদের সেবা স্থগিত করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্থাস্থ্য বিভাগ।

এছারা বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেনো গাজার প্রতিদিনের সঙ্গী। গাজার লোকেরা গড়ে দিনে মাত্র ছয় ঘন্টা বিদ্যুৎ পেয়ে থাকে। বেশির ভাগ বিদ্যুৎ আসে ইসরায়েল থেকে, তবে গাজার একটি নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। আর কিছু বিদ্যুৎ আসে মিশর থেকে। কিছু লোক ডিজেলের জেনারেটর ব্যবহার করে, তবে তা খুবই ব্যয়বহুল।

গাজার লোকেরা সামান্ন কিছু খাদ্য সাহযোগিতা পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি সামান্ন। এখানে পাঁচ লক্ষর বেশি লোক মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এছারা আবাসনের ঘাটতিও প্রকট।

ইসরায়েলের স্বঘোষিত সীমান্ত-সংলগ্ন প্রায় একমাইলের বাফার জোনে ফিলিস্তিনিরা চাষবাস করতে পারে না।এমনকি সমুদ্রে তীর থেকে একটা নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গাজার মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতেও পারেন না। গাজা থেকে রকেট হামলা হলেই ইসরায়েল এই মাছ ধরার এলাকা আরো কমিয়ে দেয়। কোন ফিলিস্তিনি জেলের নৌকা সেই সীমার কাছাকাছি এলেই ইসরাইলি নৌবাহিনীর সৈন্যরা প্রায়ই গুলি চালায়।

গাজায় বৃষ্টিপাত হয় খুবই সামান্য। কোন বড় মিঠা পানির জলাধারও নেই। গাজার বাড়িগুলোতে পাইপে যে পানি আসে তার সরবরাহ অনিয়মিত। ৯৭ শতাংশ বাড়িকেই নির্ভর করতে হয় ট্যাংকার দিয়ে সরবরাহ করা পানির ওপর।

গাজায় বৃষ্টি হলে পানি আর পয়োবর্জ্যে রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়

গাজায় পয়:প্রণালী ব্যবস্থা হচ্ছে আরেকটি গুরুতর সমস্যা। প্রায় ৯ কোটি লিটার বর্জ্য পাম্প করে ভূমধ্যসাগরে বা খোলা পুকুরে ফেলা হয়। যার ফলে গাজার পানির স্তরের ৯৫ শতাংশই দূষিত হয়ে আছে। এছারা বৃষ্টি হলে পানি আর পয়োবর্জ্যে রাস্তা সয়লাব হয়ে যায়। তারপরও বাধ্য হয়েই এই রকম পরিবেশের মধ্যেই বাস করছেন গাজার লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি।

গাজার ইতিহাসঃ গাজা এক সময় মিশরের অধিকারে ছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল এলাকাটি দখল করে নেয়। পরে ২০০৫ সালে ইসরায়েল এলাকাটির দখল ছেড়ে দিয়ে ইসরায়েলি সৈন্য এবং প্রায় ৭ হাজার ইহুদি বসতি স্থাপনকারী সেখান থেকে চলে যায়।

এখন এলাকাটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে। তবে ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হামাস গোষ্ঠী শাসন করতো এই গাজা। হামাস ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনি আইনসভার নির্বাচনে জয়ী হয়, কিন্তু তার পর প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহর সাথে তাদের সংঘাত সৃষ্টির পর তারা গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

হামাসের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর ইসরায়েল এই এলাকাটির ওপর বিভিন্ন অবরোধ আরোপ করে। গাজা ও ফিলিস্তিনের অন্য এলাকার মধ্যে লোকজন ও পণ্যের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। মিশরও গাজার দক্ষিণ সীমান্তে অবরোধ আরোপ করে।

ফলে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে এক সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাত হয় ২০১৪ সালে।  হামাসের লক্ষ্য ছিল তাদের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানো।

মিশর ও গাজার মধ্যে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে সে সময় গড়ে ওঠে চোরাচালানের সুড়ঙ্গের এক নেটওয়ার্ক। এগুলো দিয়ে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য মিশর থেকে গাজায় ঢুকতো। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময় মিশর এই রাফাহ সীমান্তে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্কগুলোও বন্ধ করে দেয়।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে এরেৎজ ক্রসিং দিয়ে পারাপার করতো প্রতিদিন ২৬ হাজার ফিলিস্তিনি। আর ২০১৭ সালের প্রথম ৬ মাসে এরেৎজ দিয়ে ইসরায়েলে ঢুকেছে ২৪০ জনেরও কম ফিলিস্তিনি।

গাজার অর্থনৈতিক অবস্থাঃ এদিকে গাজার বাসিন্দাদের গড় আয়ও কমে গেছে। বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সালে গাজার একজন অধিবাসীয় গড় বার্ষিক আয় ছিল ২ হাজার ৬৫৯ ডলার। ২০১৮ সালে সে আয় কমে নেমে এসেছে ১ হাজার ৮২৬ ডলারে।

গাজায় দারিদ্র্যের হার ৩৯ শতাংশ, যা পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের তুলনায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সামাজিক ভাতা না থাকলে এ হার আরো বেড়ে যেতো বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। ধারণা করা হয় যে গাজার ৮০ শতাংশ লোকই কোন না কোন রকমের সামাজিক কল্যাণভাতার ওপর নির্ভরশীল।

লেবাননের প্রভাবশালী মুফতি শেইখ রাশিদ কাব্বানি গত (বুধবার) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হারাম। কোনো মুসলমানেরই উচিত নয় ইসরাইলের সঙ্গে আপোশ করা।

তিনি আরও বলেছেন, ফিলিস্তিন হচ্ছে মুসলিম ভূখণ্ড। মুসলমানদের এই ভূখণ্ডকে ইহুদিবাদীরা ১৯৪৮ সালে দখলে নিয়েছে। ফিলিস্তিনকে মুক্ত করা ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি বিশ্বের সব মুসলমানের জন্য ফরজ। এক বিঘত ভূমির বিষয়েও আপোশ করা যাবে না। ফিলিস্তিন ও পবিত্র স্থানগুলো মুক্ত করার জন্য সবার পক্ষ থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *