তাজমহল মন্দির না মসজিদ

 এই কেমন ৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার স্নান করল তাজমহল

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম এই স্থাপত্য। শিল্প-ইতিহাস-সৌন্দর্য্যের টানে বিশ্বের পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে আগ্রার তাজমহল। ইতিহাসের গন্ধে ভরপুর এই স্মৃতিসৌধের গায়ে সাম্প্রতিককালে লেগেছে রাজনৈতিক রঙ। তবু যমুনাপাড়ের রোমাঞ্চকর স্থাপত্যর গরিমা আজও চির অমলিন। তবে উষ্ণতা বৃদ্ধি, দূষণে তার গায়ে লেগেছে ‘কালো দাগ’। এদিকে এবার পর্যটক খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাই দূষণ কলঙ্কের দাগ মুছতে ৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার স্নান করল মমতাজের স্মৃতিতে গড়া শাহজাহানের তাজমহল। তবে শুধু স্নানই নয়, বলা যেতে পারে মহাস্নান করল তাজমহল। রীতিমতো ‘বিউটি থেরাপির’ ঢঙে ‘ক্লে প্যাক’ মাখিয়ে স্নান করানো হল আশ্চর্য পাথুরে স্থাপত্যকে।

শ্বাশত ভালবাসার নিদর্শন-তাজমহল।

মোঘল স্থাপত্যের এই অনন্যশৈলীর মাধ্যমে মানব হৃদয়ের ভালবাসার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা সত্যিই প্রশংশনীয়।
মনুষ্য সৃষ্ট পৃথিবীর সাতটি বিস্ময়ের একটি এ তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায়, যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। এ বিস্ময়ের সৌন্দর্যের বর্ণনা যেকোন ভাষাতীত।
সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনী বিশ্বের সাড়া জাগানো প্রেম কাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাদের মতো এরকম অমর প্রেম কাহিনী আরও অনেক রয়েছে। তবে সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনীটি একটি বিশেষ কারণে সাড়া জাগিয়েছে। তা হলে মমতাজের জন্য সম্রাট শাহজাহানের বানানো বিখ্যাত সেই তাজমহল। আজ তাজমহলের খুঁটিনাটি তথ্য এখানে তুলে ধরবো।
সময়টা ছিল ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দ। সম্রাট শাহজাহানের বয়স তখন ২০ বছর। একদিন আগ্রার বাজার দিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ শাহজাহানের চোখ চলে যায় পরমা সুন্দরী এক মেয়ের দিকে। আরজুমান্দ বানু বেগম নামের মেয়েটির বয়স ১৫। প্রথম দেখাতেই আরজুমান্দ বেগমকে ভালো লেগে যায় শাহজাহানের। পরবর্তীতে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে মমতাজের বিয়ে হয় যুবরাজ খুররমের (সম্রাট শাহজাহান) সঙ্গে। (কিন্তু উইকিপিডিয়ায় বলা আছে বিয়ের সময় তাদের দুজনের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৫ ও ১৪)। তবে এর আগে রাজনৈতিক কারণে পারস্যের রাজকন্যাকে বিয়ে করেন সম্রাট শাহজাহান। পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীর নাম পরিবর্তন করে রাখেন মমতাজ ।মমতাজই ছিলেন শাহজাহানের সব চেয়ে প্রিয় বেগম । উনিশবছরের বিবাহিত জীবনে মমতাজের মোট চোদ্দটি সন্তান হয়। মমতাজ ১৬৩১ সালে ৩৯ বছর বয়সে বুরহানপরে ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। স্ত্রী হারানোর শোকে মুহ্যমান শাহজাহান তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির জন্য নির্মাণ করেন ভালবাসার এই অপরূপ নিদর্শন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সাতদিন সাতরাত শাহজাহান কিছু খান নি। ঘর থেকেও বার হন নি। সাতদিন পর শাহজাহান বাইরে বেরোলেন। তখন তার চুলের রং ধুসর হয়ে গেছে , মুখ ফ্যাকাসে।

প্রেম কাহিনী
সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনী যতটা আলোচিত ততটাই আলোচিত যে, মমতাজ আসলে সম্রাট শাহজাহানের কততম স্ত্রী। উইকিপিডিয়ার মতে, মমতাজ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের ২য় স্ত্রী। কোথাও বলা হয়েছে মমতাজ শাহজাহানের ৩য় স্ত্রী, কোথাও বলা আছে ৪র্থ স্ত্রী। আসলে কততম স্ত্রী তা কোথাও সঠিকভাবে বলা নেই।
সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনীতে বলা হয়েছে সম্রাট শাহজাহান মমতাজকে বাজারে দেখতে পান এবং প্রথম দেখাতেই মমতাজকে পছন্দ করে ফেলেন। কিন্তু এও শোনা যায় শাহজাহানের সাথে বিয়ে হওয়ার আগেও মমতাজের বিয়ে হয়েছিল এবং সম্রাট শাহজাহান মমতাজের সেই স্বামীকে হত্যা করে তারপর মমতাজকে বিয়ে করেছিল। শুধু তাই নয় মমতাজের আগেও সম্রাট শাহজাহানের আরও ৩ জন স্ত্রী ছিলেন এবং মমতাজকে বিয়ে করার পরও সম্রাট শাহজাহান আরও তিনটি বিয়ে করেন। এমনকি মমতাজ মারা যাওয়ার পর শাহজাহান মমতাজের আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন। তাজমহলের ডিজাইনারের নাম ছিল- ঈশা মোহাম্মদ। তিনি তার স্ত্রীকে উপহার দেয়ার জন্য একটি ভাস্কর্য বানিয়েছিলেন। পরে সম্রাট শাহজাহানের পছন্দ হওয়াতে সেই ডিজাইনের আদলে বানানো হয় বিশ্ববিখ্যাত তাজমহল এবং সেই ব্যক্তিটির চোখ নষ্ট করে দেওয়া হয় যাতে তিনি নতুন করে আর এই ডিজাইন তৈরি করতে না পারেন। শুধু তাই নয়, যে ২০ হাজার শ্রমিক দিন রাত খেটে এই মহলটি তৈরি করেছিলেন তাদের হাতও কেটে দিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। ভালোবাসার এক নিষ্ঠুর ও নৃশংসতম ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে সম্রাট শাহজাহান-মমতাজের প্রেম কাহিনী ও তাজমহলের পেছনে।
তাজমহলের নির্মাণকালীন তথ্য:

আজ যেখানে তাজমহল দাঁড়িয়ে, সেখানটা ছিল মহারাজা জয় সিংহের সম্পত্তি। শাহজাহান মধ্য-আগ্রার একটি প্রকান্ড রাজপ্রাসাদের বিনিময়ে ওই জমিটি অধিগ্রহণ করেন। তাজমহলের নির্মান শুরু হয় ১৬৩২ সালে; মমতাজের মৃত্যুর এক বছর পর। ২০ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রচেষ্টায় ১৬৪৮ সালে, মমতাজের মৃত্যুর ১৭ বছর পর গম্বুজ গুলোর নির্মান কাজ শেষ হয়; যদিও পুরো কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। শুধু মানুষ নয়; এ মহান কীর্তির ভাগিদার ১০০০ হাতী, যারা নির্মাণের জন্য মার্বেল পাথর পরিবহনে নিয়োজিত ছিল। এই সৌধ নির্মাণে বিভিন্ন ধর্মের স্থাপত্যের অনুকরণ করা হয়;  মুসলমানদের মসজিদের মতো করা হয় তাজমহলের চারটি মিনার ও মাথার গম্বুজ ।

পুরো তাজমহল ১৮০ ফুট উঁচু যার প্রধান গম্বুজটি ২১৩ ফুট উঁচু এবং ৬০ ফুট চওড়া এবং এর চারপাশে চারটি মিনার আছে যার প্রতিটির উচ্চতা ১৬২.৫ ফুট। পুরো কমপ্লেক্সটির আকার ১৯০২X১০০২ ফুট। শুধু তাজমহলটি ১৮৬X১৮৬ ফুট মার্বেল পাথরের উপর নির্মিত। এর প্রধান প্রবেশদ্বার ১৫১X১১৭ ফুট চওড়া এবং ১০০ ফুট উঁচু। তাজমহল নির্মানের জন্য পাঞ্জাব থেকে আনা হয় স্বচ্ছ মার্বেল পাথর, চীন থেকে সবুজ পাথর, তিব্বত থেকে স্বচ্ছ ও নীল পাথর এবং শ্রীলংকা থেকে নীলমনি। তাছাড়া ভারত, পাকিস্তান, পারস্য ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৮ রকমের মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি করা হয় এই অনন্য স্থাপত্য।

তৎকালীন নির্মাণ খরচ অনুমান করা কঠিন ও কিছু সমস্যার কারণে তাজমহল নির্মাণে কত খরচ হয়েছিল তার হিসাবে কিছুটা হেরফের দেখা যায়। তাজমহল নির্মাণে তৎকালীন আনুমানিক ৩২ মিলিয়ন বা $১০০০০০০ ডলার রুপি খরচ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু শ্রমিকের খরচ, নির্মাণে যে সময় লেগেছে এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক যুগের কারণে এর মূল্য অনেক, একে অমূল্য বলা হয।

তাজমহল যে জমির ওপর দাঁড়িয়ে, সেই জমি ছিল অত্যন্ত নীচু । প্রচুর মাটি ফেলে সেই জমি কে যমুনা নদীর তীরের উচ্চতা থেকে প্রায় ৫০ মিটার [১৬০ ফুট] উচু করা হয়। ঠিক এখনকার earthquake proof বহুতলের column নির্মাণের মতো্ই সেখানে অনেকগুলি পাতকুয়া খোঁড়া হয় ও তারপর সেগুলি পাথর,বালি ও মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। তাজমহলের এই ভিতটি ভূমিকম্প বা প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না । ওই ভরাট-করা পাতকুয়াগুলির ওপর এক বিশাল মঞ্চ তৈরী করে তার ওপর সৌধের র্নিমাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। এখনকার বাড়ি তৈরী করতে হলে বাঁশের তৈরী ভারা লাগে । তাজমহল নির্মাণের জন্যে যে ভারা তৈরী করা হয় তাও এক আশ্চর্য নজির । প্রকান্ড এক ইঁটের তৈরী ভারা বানানো হয়েছিল তাজমহলের ওপরের কাজের জন্যে । সেই ভারা এতটাই বড় ছিল যে রাজমিস্ত্রিরা জানায় ভারা ভাঙতে তাদের কযেক বছর সময় লেগে যাবে । তখন শাহজাহান র্নিদেশ দেন এই ভারার ইঁট যে কেউ নিয়ে যেতে পারে একেবারে বিনামূল্যে । রাতারাতি সেই প্রকান্ড ভারা অদৃশ্য হয়ে যায়।রাজ্যের হাজার হাজার গরিব কৃষক সেই ভারার ইঁট খুলে নিয়ে যায় তাদের নিজেদের গৃহ নির্মানের জন্যে।

এর প্রধান নকশাকার ছিলেন ওস্তাদ আহমেদ লাহুরি আরও ছিলেন আবদুল করিম মামুর খান এবং মাকরামাত খান যারা সে সময়ের সবচেয়ে নিখুঁত, পারদর্শী ও উচ্চ পর্যায়ের প্রকৌশলী এবং নকশাকার ছিলেন। এছাড়া তাজমহলের বিখ্যাত ক্যালিওগ্রাফিগুলো করেছিলেন তৎকালের ক্যালিওগ্রাফার আবদুল হক, যার প্রশংসনীয় ক্যলিওগ্রাফি দেখে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট নিজেই তাকে ‘আমানত খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

তাজমহল ছিল হিন্দু মন্দির!

একজন ভারতীয় এমপি এবং কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করছে তাজমহল ছিল একটি হিন্দু মন্দির। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির ভিনয় কাটিয়ার এমনকি তাজমহলের নাম বদলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। তিনি বলছেন, একজন হিন্দু শাসক তাজমহল তৈরি করেছেন।

ভারতের গণমাধ্যমে তার এই দাবি ব্যাপক প্রচার পায়। অনেক ডানপন্থী গোষ্ঠী তাঁর এই দাবি সমর্থন করে।

বিবিসির ‘রিয়েলিটি চেক’ অনুসন্ধানের রায়

এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রমাণ নেই। বরঞ্চ ইতিহাসবিদদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ,এমনকি ভারত সরকার পর্যন্ত মনে করেন, এই সৌধ ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।

তাজমহল কে তৈরি করেছে?

ভারতের সরকারীভাবে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শাহ জাহান তাজমহল তৈরি করেছিলেন তাঁর মৃত স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে।ভারতের মোগল শাসকরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে তারা ভারত শাসন করে।মোগল শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে ইসলামী শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপারে মোগলদের যে অনুরাগ, তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হয় তাজমহলকে।ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ তাজমহলকে বর্ণনা করেছে ‘মোগল স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত নিদর্শন’ হিসেবে।আর তাজমহল নিয়ে ভারত সরকারের যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে বলা হচ্ছে, “ইসলামী স্থাপত্যকলার সঙ্গে ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে গড়ে উঠা সেসময়ের স্থাপত্য রীতির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহারণ এটি।”এতে আরও বলা হয়, মোগলরা যখন তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ করে, তখনও তারা তাদের পারস্য এবং তুর্কী-মোঙ্গল শেকড় নিয়ে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু ততদিনে তারা একই সঙ্গে নিজেদের ভারতীয় বলেও ভাবতে শুরু করেছে।

পৃথিবীতে ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রায় চারশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রা’র ঐতিহাসিক তাজমহল। এর সৌন্দর্যে আজো সারা বিশ্বের প্রেমিকের চোখ তৃপ্ত হয়।

এটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ও বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের স্মৃতিতে এই স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি করেছিলেন।

তাজমহল নিয়ে অনেক গল্প ও কল্পকাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তবে এসবের বেশিরভাগেরই যথাযথ প্রমাণ না থাকলেও কাহিনীগুলো বহু বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে রটে বেড়াচ্ছে। আজ আমরা তাজমহল সম্পর্কিত কয়েকটি রহস্যময় ও দৃঢ় কল্পকাহিনী সম্পর্কে জানাবো।

তাজমহল ও সম্রাজ্ঞী আরজুমান্দ বানু বেগম

অনেকেই হয়ত একটু ভ্রু-কুঁচকে তাকাতে পারেন আরজুমান্দ বানু আবার কে? তবে এই আরজুমান্দ বানুই হচ্ছেন মমতাজ মহল, যে নামে সারা পৃথিবীতে তিনি অমর হয়ে আছেন। পূর্ব-পুরুষদের মতো সম্রাট শাহজাহানের হেরেমেও ছিল অনেক স্ত্রী। তবে এতো রানীদের মাঝে এমন কেউ ছিলেন না যিনি মমতাজের মতো তার হৃদয় হরণ করতে পেরেছেন।

মমতাজ ছিলেন তার তৃতীয় স্ত্রী। ১৯ বছরের পরিণয় জীবনে তাদের মোট সন্তান হয়েছিল ১৪টি। শেষ সন্তান জন্মদানের সময় তার প্রয়াণ ঘটে। এতে শাহজাহান এতোটাই কষ্ট পান যে তিনি তার স্ত্রীর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার নাম রাখা হয় তাজমহল। এটি তৈরিতে প্রায় ২২ বছর সময় লেগেছিল। এর নিমার্ণ কাজ শুরু হয় ১৬৩২ সালে ও শেষ হয় ১৬৫৩ সালে।

কর্মীদের হাত কাঁটার আদেশ

তাজমহল সম্পর্কে একটি খুবই প্রচলিত কল্পকাহিনী হলো এমন স্মৃতিস্তম্ভ যেন দ্বিতীয়টি আর নির্মিত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য শাহজাহান কারিগরদের হাত কাঁটতে আদেশ দিয়েছিলেন।

বহু লোক এই কাহিনী বিশ্বাস করলেও এটি নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। সুতরাং, এটি স্রেফ একটি পৌরাণিক কাহিনী হিসেবেই এটি মানুষের মুখে রটে বেড়াচ্ছে।

তাজমহলের খুঁত

যদিও আমরা তাজমহলকে নিখুঁত বলে বিবেচনা করি তবে এটি তা নয়। মহলটির মূল হলের সিলিংয়ে একটি ছোট গর্ত রয়েছে। কথিত আছে যে কারিগরদের একজন ইচ্ছে করেই এই গর্তটি রেখে দিয়েছিলো যেন শাহজাহানের নিখুঁত মহলের স্বপ্ন সত্য হতে না পারে।

নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর সকল কারিগরের হাতকাটার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি এটি করেছেন বলে ধারণা করা হয়।।

এটি কি মমতাজের প্রথম সমাধি ছিল?

মমতাজের মৃত্যুর পরে ও তাজমহলে রাখার আগে তার মরদেহ পৃথক স্থানে দাফন করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর ঠিক পরে তাকে বুহানপুরে সমাহিত করা হয়। তারপরে, দেহ আগ্রায় স্থানান্তরিত করা হয় এবং তাজমহলের কমপ্লেক্সে ১২ বছর তাকে সমাধিস্থ করা হয়। অবশেষে এটি তাজমহলের বেসমেন্টে স্থানান্তরিত হয় যেখানে এটির চূড়ান্ত বিশ্রামের স্থানটি পাওয়া যায়।

রহস্যজনক ঘর!

ধারণা করা হয়ে থাকে যে, তাজমহলের ভেতর অসংখ্য গুপ্ত কক্ষ রয়েছে। শাহজাহানের সময় থেকেই এই কক্ষগুলো তৈরি করা হয়েছিল এবং বর্তমান ব্যবস্থাতেও এই কক্ষগুলোতে খুব বেশি পরিবর্তন করা হয়নি।

অনেকের ধারণা, তাজমহলের ভেতরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। কারণ, শ্বেতপাথরের নিচেই একটি লাল পাথরের তৈরি সিঁড়ি চলে গিয়েছে এবং নদীমুখ করে থাকা ২২টি ঘরের মাঝে একটি ঘর রয়েছে যেটিকে মন্দিরের প্রবেশকক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

শাহজাহান বেশ শক্ত করেই এই ঘরের মুখ পাথরের সাহায্যে সিলগালা করে দিয়েছিলেন। মুঘল অন্য কোনো নিদর্শনের মাঝে এমন কোনো স্থাপনা পাওয়া যায়নি, যেখানে এমন চাতুরতার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। তবে এটি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সত্যিই কি শাহজাহান এই কক্ষের সিলগালা করেছিলেন, নাকি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্র?

তাজমহলের রঙ বদলানোর ক্ষমতা

তাজমহল প্রকৃতপক্ষেই এক বিস্ময় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে যে মহলটির রঙ দিনের সময় এবং আকাশের অবস্থার সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।  এটা ধারণা করা হয়ে থাকে যে, তাজমহল হচ্ছে ওই রমণীর প্রতিকৃতি যিনি তার মনের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটাতে সমর্থ হন।

ভোরের আলোয় এক হালকা গোলাপীর মূর্ছনায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে তাজমহল। সন্ধ্যার এটি দুধভরা সাদা দেখায়। চাঁদনি রাতে একটি হালকা নীল রঙের আভায় এক মনোমুগ্ধকর রূপ নেয়। এই পরিবর্তনগুলো তাজমহলকে দিয়েছে অনন্য এক বৈচিত্র্য।

ক্যালিগ্রাফি বনাম বৈদিক চিত্রকলা

আল্লাহ তাআলা’র ৯৯টি নামের অসাধারণ এক ক্যালিগ্রাফির সমন্বয় রয়েছে তাজমহলের অভ্যন্তরে। প্রতি বছর যারা তাজমহল দেখতে আসেন তারা এই ক্যালিগ্রাফি দেখে আশ্চর্য হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাজমহল কি আসলে একটি কবর, নাকি ভালোবাসার নিদর্শন, নাকি অজানা এক রহস্যের ভান্ডার? তাজমহলের ভেতরে পাওয়া ২২টি কক্ষের ভেতর বৈদিক চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। শাহজাহান এই চিত্রকলাগুলোকে প্লাস্টার করে আবৃত করারও কোনো প্রয়োজন মনে করেননি। তিনি শুধু সিলগালা করে কক্ষগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। তাহলে এই ২২টি কক্ষের প্রয়োজন আসলে কি ছিল? জনগণের নিকট থেকে তাদের লুকানোরই বা দরকার ছিল কি? এমন সব নানা প্রশ্নে ঘুরপাক খাচ্ছে রহস্যসন্ধানীরা।

তাজমহল (হিন্দি: ताज महल, উর্দু: تاج محل) ভারতের উত্তর প্রদেশে আগ্রায় অবস্থিত একটি রাজকীয় সমাধি। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম যিনি মুমতাজ মহল নামে পরিচিত, তার স্মৃতির উদ্দেশে এই অপূর্ব সৌধটি নির্মাণ করেন। সৌধটি নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে যা সম্পূর্ণ হয়েছিল প্রায় ১৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে। সৌধটির নকশা কে করেছিলেন এ প্রশ্নে অনেক বিতর্ক থাকলেও, এটি পরিষ্কার যে শিল্পনৈপুণ্যসম্পন্ন একদল নকশাকারক ও কারিগর সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন যারা উস্তাদ আহমেদ লাহুরির সাথে ছিলেন, যিনি তাজমহলের মূল নকশাকারক হওয়ার প্রার্থীতায় এগিয়ে আছেন। 

তাজমহলকে (কখনও শুধু তাজ নামে ডাকা হয়) মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি আকর্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়, যার নির্মাণশৈলীতে পারস্য, তুরস্ক, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে। যদিও সাদা মার্বেলের গোম্বুজাকৃতি রাজকীয় সমাধীটিই বেশি সমাদৃত, তাজমহল আসলে সামগ্রিকভাবে একটি জটিল অখণ্ড স্থাপত্য। এটি ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল।  তখন একে বলা হয়েছিল ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের সর্বজনীন প্রশংসিত শ্রেষ্ঠকর্ম।

সূচনা ও প্রেরণা 

তাজমহল বিশ্বের অপূর্ব সুন্দর স্মৃতিসৌধ ও মনোমুগ্ধকর নিদর্শন। ভালোবাসার অবিশ্বাস্য স্মরণীয় ভাস্কর্য। ইসলামিক স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন যা শান্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক।

শাহজাহান, যিনি তাজমহল নির্মাণ করিয়েছিলেন

১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাহান, যিনি মুঘল আমলের সমৃদ্ধশালী সম্রাট ছিলেন, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মুমতাজ মহল-এর মৃত্যুতে প্রচণ্ডভাবে শোকাহত হয়ে পড়েন। মুমতাজ মহল তখন তাদের চতুর্দশ কন্যা সন্তান গৌহর বেগমের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ।

তাজমহলের নির্মাণ কাজ মুমতাজের মৃত্যুর পর শুরু হয়। মূল সমাধিটি সম্পূর্ণ হয় ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে এবং এর চারদিকের ইমারত এবং বাগান আরও পাঁচ বছর পরে তৈরি হয়। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে আগ্রা ভ্রমণ করে ফরাসি পর্যটক ফ্রান্সিস বেরনিয়ার (François Bernier) লিখছিলেন:

বাংলা অনুবাদঃ

১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হুমায়ূনের মাজার দেখতে প্রায় তাজমহলের মতন

প্রভাব 

তাজমহল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নকশার উপর, বিশেষ করে পারস্য ও মুঘল স্থাপত্য অনুসারে। নির্দিষ্ট কিছু নকশা তিমুর ও মুঘল ইমারতের মত হুবহু করা হয়েছে। যাদের মধ্যে তিমুরের গুর-ই-আমির, সমরখন্দে মুঘল সাম্রাজ্যের পূর্বসূরী,  হুমায়ূনের মাজার, ইমাদ-উদ-দৌলার মাজার (কখনো ডাকা হয় শিশু তাজ নামে), এবং দিল্লীতে শাহজাহানের নিজের তৈরি দিল্লী জামে মসজিদ। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায়, মুঘল ইমারত পরিমার্জনের এক নতুন স্তরে পৌছায়।  যেখানে পূর্ববর্তী মুঘল ইমারতসমূহ তৈরি হয়েছিল লাল বেলে পাথরে, শাহজাহান চালু করেছিলেন সাদা দামি মার্বেল পাথরের প্রচলন।

Share on Facebook

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *