যে নিজেকে চিনতে পারে-সে স্রষ্টাকে জানতে পারে

এক মানুষ সাধনা করতে করতে সৃস্টিকর্তা কে জানতে পারে।আর অপর মানুষ তার বিপরীতভাবে হাটতে হাটতে স্রষ্টাকে অবিশ্বাস করে।  মানবজাতি হল সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত। কিন্তু এই মানুষের যে রকম হাত, পা, মাথা, চোখ, মুখ ইত্যাদি রয়েছে, তেমনি পশুপাখি ও জীবজন্তুকেও এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।

মানুষ ক্ষুধা পেলে যেমনি আহার করে, তেমনি পশুপাখিও আহার করে। কিন্তু ভবিষ্যৎ জীবন বা পরকাল নিয়ে পশুপাখির কোন চিন্তা নেই। তারা বিচারের জন্য পরকালে উত্থিত হবে না। পক্ষান্তরে আশরাফুল মাখলুকাত মানুষকে আল্লাহপাক এমন জ্ঞান দান করেছেন যা পশুপাখি ও জীবজন্তুকে করেননি। আল্লাহপ্রদত্ত এই জ্ঞানের কারণেই মানুষকে তার হাকিকত জানতে হবে। জানতে হবে আমি কে? কোথা থেকে আগমন করেছি এবং কোথায় আমার গন্তব্য। আর সেখানে কী নিয়ে যাব। বুজুর্গরা বলেছেন, ‘মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু; অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার প্রতিপালক আল্লাাহর পরিচয় লাভ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ওয়ানাহ্নু আকরাবু ইলায়হি মিন হাবলিল ওয়াবিদ। ’ অর্থাৎ এবং আমি বান্দার কাছে তার (গর্দানের) শাহ্রগের (ধমনীর) চেয়েও অধিক নিকটবর্তী; (সূরা ক্বাফ : ১৬)। এত নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও বান্দা কেন তাকে পাবে না। তাই আল্লাহপাক ঘোষণা করেন, ‘ওয়াল্লাজিনা জাহাদু ফিনা লানাহ্দিয়ান্নাহুম সুবুলানা। ’ যারা আমার (সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টির) জন্য কঠোর চেষ্টা ও সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের পথপ্রদর্শন করব; (সূরা আনকাবুত : ৬৯)।

একটি বিষয় লক্ষণীয় এই যে, বাঁশের তৈরি বাঁশি ফুঁ দিলে সুর করে কাঁদে, আর বলে, কেন তাকে তার মূল থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করা হল। তাই সে মূলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য কাঁদে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির ঝরনাধারা এঁকেবেঁকে তার মূলের দিকে ধাবিত হয়। অবশেষে তার মূল উৎস সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হয় এবং নিজ অস্তিত্ব বিলীন করার মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করে। একইভাবে মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত ফানাফিল্লাহ ও বাকাবিল্লাহের মাধ্যমে আপন অস্তিত্বকে আল্লাহর মধ্যে বিলীন না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারবে না। বস্তুত, এ পথে রয়েছে অনেক বাধা। প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, প্রতিটি মানুষের দেহে একটি গোশতের টুকরা রয়েছে। যখন এটা নিষ্কলুস থাকে, তখন সমস্ত দেহ স্বচ্ছ ও পবিত্র থাকে। আর এটা যখন পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত থাকে তখন সমস্ত দেহ অস্বচ্ছ ও অপবিত্র হয়ে যায়। এটা হল ক্বালব।

এ অবস্থায় সে নেক আমল ও আল্লাহর জিকিরে স্বাদ পায় না। সুতরাং পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে ক্বালবকে শক্তিশালী করতে হবে। আর ক্বালবকে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করার প্রধান হাতিয়ার হল আল্লাহর জিকির। তাই আল্লাহ বলেছেন, ‘আলা বিজিকরিল্লাহি তাতমাঈন্নুল কুলুব’। নিশ্চয়ই আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই ক্বালবে প্রশান্তি লাভ করা যায়। পার্থিব বস্তু দিয়ে ইহকাল ও পরকালের স্থায়ী শান্তি লাভ করা যায় না। কাজেই জিকিরের মাধ্যমে ক্বালবকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর মধ্যে নিজকে বিলীন করে দিতে হবে।

উল্লেখ্য, সমস্ত মানুষের রূহ সৃষ্টির পর আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগতে একত্রে আল্লাহপাক জিজ্ঞাসা করেন, ‘আ-লাসতু বিরাব্বিকুম? কালু বালা। ’ অর্থাৎ আমি কি তোমাদের রব বা প্রতিপালক নই? সমস্ত রূহ জবাবে বলেছিল, হ্যাঁ। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা মানুষের মধ্যে রূহ দিয়ে আলমে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন। অস্থায়ীভাবে কিছুদিন থাকার পর দুনিয়া ছেড়ে আলমে বরযখ বা কবরে যেতে হবে। এখানেও মহান আল্লাহর অভিপ্রায় অনুযায়ী অবস্থানের পর হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে প্রত্যেকের জীবনের পাপ-পুণ্যের হিসাব নেয়ার জন্য। সর্বশেষে আমল অনুযায়ী অনন্তকালের সুখ ও পরম শান্তির স্থান বেহেশত প্রদান করা হবে। সেখানে সরাসরি মহান আল্লাহর দিদারের মাধ্যমে পরম তৃপ্তি ও আনন্দ লাভ করবে। আবার পাপের কারণে অনেকে ভয়াবহ শাস্তির স্থান দোজখে নিক্ষেপিত হবে। মূলত এ দুটো হল মানবজাতির সর্বশেষ গন্তব্যস্থল।

এখন চিন্তা করুন, আল্লাহ পাকের সৃষ্টি মানুষের একটি মাথা সারা বিশ্বের বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সৃষ্টি বা আবিস্কারের থেকেও বিস্ময়কর নয় কি? অথচ কম্পিউটারের মত তার নেই কোন অপারেটর, নেই কোন নিয়ন্ত্রক। স্বয়ংক্রিয় ভাবেই সে আপন গতিতে চলছে এবং মানুষের দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত সময়ের যাবতীয় ঘটনাপঞ্জি ও স্মৃতি সে ধারণ করে চলে; যা কখনো বিস্মৃত হয় না। মানুষ যদি চিন্তা করে যে, তার ছোট্ট এই মাথার শক্ত হাড্ডির নীচে কে এই কম্পিউটারের চেয়েও শক্তিশালী ও স্বয়ংক্রিয় মেশিন স্থাপন করল, তাহলে সেই মহা বিজ্ঞানীকে খুঁজে পেতে তো তার কষ্ট হবার কথা নয়। কিন্তু মানুষ কি কখনো বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে থাকে?

মানুষের হাতে ও পায়ে বিশটি আঙ্গুল আছে। প্রতিটি আঙ্গুলের মাথার অংশের জায়গায় শক্ত আবরণ দেয়া আছে, যাকে বলা হয় নখ। আঙ্গুলের মাথায় এই শক্ত আবরণ বা নখ কেন দেয়া হলো, মানুষ কি তা ভেবে দেখেছে?

আপনি যখন নামায আদায় করতে সিজদায় যান, তখন দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে আপনাকে সিজদায় যেতে হয়। আপনি যদি ঐ আঙ্গুলের নখ বড় হবার কারণে ঐ নখ পরিমাণের থেকে একটু বেশী কেটে ছোট করেন, তাহলে দেখবেন, সিজদায় গিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুল খাড়া করে তাতে ভর দিয়ে সিজদায় যেতে বা দ্বিতীয় বৈঠকে ডান পা খাড়া করে আপনি বসতে পারবেন না। আঙ্গুলের ব্যাথায় আপনার শরীর কুঁকড়ে যাবে।

এখন চিন্তা করুন, আঙ্গুলের মাথায় কেন শক্ত আবরণ দিবার দরকার ছিল। এতে সেই সত্যই কি প্রমাণ হয় না যে, আল্লাহ কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করেন নাই? আর যদি আপনার হাতের বা পায়ের আঙ্গুলে ঐ আবরণ বা নখ না থাকত, তাহলে আপনার নামায আদায় করা বা হাত পায়ের শক্ত কাজগুলো সহজে করতে পারতেন না, জুতা পরতে, শক্ত মাটিতে হাঁটতে এবং হাতে কোন শক্ত বস্তু ধরতে আপনার কষ্ট হতো। তাছাড়া এই নখ হাত-পায়ের সৌন্দর্যকেও বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। বান্দার যাতে কষ্ট না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রেখে মহান স্রষ্টা আল্লাহ মানুষের হাত-পায়ের আঙ্গুলের মাথায় যে শক্ত আবরণ দিয়ে বান্দার কষ্ট লাঘব করে দিয়েছেন, এর জন্য কি আমরা আল্লাহর শোকরগুজারী বান্দা হবো না? এই সৃষ্টি কৌশল চিন্তা করেও কি আমরা স্রষ্টাকে চিনবো না, তাঁর অস্তিত্বকে স্বীকার করে আনুগত্যে রত হব না?

আপনি আপনার হাত ও পায়ের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, উপর দিক থেকে কতগুলি রগ বা শিরা নেমে এসে হাত ও পায়ের প্রতিটি আঙ্গুলে পৃথকভাবে শিরাগুলিকে সংযোগ করানো হয়েছে, যাতে শরীর থেকে রক্ত ঐ শিরা দ্বারা প্রবাহিত হয়ে আঙ্গুলগুলি সজিব ও সক্রিয় রাখে। আবার দেখবেন কতগুলো উপশিরা মূল শিরার উপর দিয়ে আঙ্গুলগুলির ফাঁকে রক্ত সঞ্চালন করছে। যদি ঐ শিরাগুলো নিয়মিত রক্ত সরবরাহ না করত, তাহলে আপনার আঙ্গুলগুলো অবশ হয়ে অকেজো হয়ে পড়তো, আপনি হাতে কিছু ধরতে পারতেন না, পায়ে চলতে পারতেন না, আপনাকে বিছানায় পড়ে থাকতে হতো। আপনি একজন অক্ষম ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে পড়তেন।

এই যে, সুচিন্তিত স্থাপন, যা প্রয়োজনের এক চুল বেশীর নয় কমও নয়, এটা কি এমনি এমনিই হওয়া সম্ভব, না স্রষ্টার সৃষ্টি? যদি স্রষ্টার সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে সেই মহা কৌশলী স্রষ্টা সম্বন্ধে আমরা উদাসীন কেন? কেন আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ প্রকাশ করে তার আনুগত্য স্বীকার হতে গাফেল হয়ে আছি? যে স্রষ্টা আমাদের দেহ কাঠামো সুন্দর ভাবে গঠন করে অঙ্গ প্রত্যাঙ্গগুলি যথাযথ স্থানে স্থাপন করে স্বয়ংক্রিয় নিয়মে সচল করেছেন, আনুগত্যহীন বা নাফরমানীর কারণে সচল অঙ্গগুলো যদি অচল করে দেন, তাহলে আমাদের অবস্থা কি হবে, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?

কত মানুষই তো পঙ্গু হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করছে, অথচ তারাও এক দিন আমাদের মতই সুস্থ্য সবল ছিল। এসব দেখে শুনেও কি আমরা নিজেদের দেহ কাঠামো সম্বন্ধে চিন্তা ভাবনা করে সেই মহান স্রষ্টা আল্লাহকে চিনবো না, তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করব না?

হে মানুষ! গভীর ভাবে চিন্তা কর, আল্লাহ পাক মাথার দুই পাশে দুটি কান সৃষ্টি করে মস্তিস্কের সাথে সংযোগ করে দিয়েছেন। এই কানের মাঝখানে একটি ছিদ্র আছে এবং পাশ দিয়ে কয়েকটি পেচানো স্তর আছে। এই পেচানো স্তরগুলো এই জন্য যে, গোসল করতে মানুষ যখন নদীতে বা পুকুরে নেমে ডুব দেয় অথবা বাসায় যখন কূয়া বা ইন্দ্রা থেকে পানি তুলে মাথায় ঢালে, তখন যাতে ঐ পানি কানের ছিদ্র পথে মস্তিস্কে না পৌছতে পারে অথবা কানের ভিতর আটকে গিয়ে মানুষের ক্ষতি করতে না পারে।

এছাড়া কানের প্রধান কাজ হলো বাইরের যে কোন কথা বা শব্দ ধারণ করে মস্তিস্ক নামের কম্পিউটারে প্রেরণ করা। যেখানে ঐ কথা বা শব্দ আজীবন সংরক্ষিত হয়ে থাকে। আবার প্রয়োজনে মানুষ স্বরণ শক্তির মাধ্যমে মস্তিস্কে সংরক্ষিত ঐ শব্দ বা কথা জিহবা দ্বারা বের করে প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। এখন আপনার বা আমার কানের ঐ শব্দ গ্রহণ শক্তি যদি নষ্ট হয়ে যায়, যদি কিছুই শুনতে না পায়, তাহলে জীবনটাই তো বৃথা হয়ে যাবে। আপনারা কি দেখেন না, আল্লাহ বান্দাকে শিক্ষা দিবার জন্য অঙ্গহানীর অভাব অনুভব করার জন্য আপনার আমার আশেপাশে কতগুলি লোক কে কালা, বোবা, অন্ধ করে রেখেছেন, যাতে তাদের দুঃখ কষ্ট দেখে অঙ্গহানীর অভাব অনুভব করে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন এবং আল্লাহর নিয়ামতের শোকর গুজারী হতে পারেন।

আবার লক্ষ্য করুণ, আপনার-আমার মুখের ঠিক মাঝখানে নাক নামের একটি বস্তু সৃষ্টি করে রেখেছেন। এই নাকের দুই পাশে দুটি ছিদ্র দেয়া হয়েছে। এই ছিদ্রও মস্তিষ্কে গিয়ে সংযোজিত হয়েছে। এই নাকের কাজ হলো, ভিতর থেকে দূষিত বায়ু বের করে দেয়া এবং নির্মল বায়ু ভিতরে প্রবেশ করিয়ে মানুষকে জীবিত থাকতে সাহায্য করা। মানুষ যতক্ষণ জীবিত থাকে, ততক্ষণই তার শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে। শ্বাস প্রশ্বাস জীবন রক্ষার একটি মাধ্যম। এখন চিন্তা করুন, এই শ্বাস প্রশাস গমন-নির্গমণের এই মেশিন আপনার আমার মস্তিষ্কে কে স্থাপন করে বিরাম হীনে ৮০/৯০ বছর চালু রাখল।

যে মেশিন একটি সেকেন্ডের জন্যও বন্ধ হলো না? এই নাকের আর একটি কাজ হলো, অখাদ্য পঁচা-বাসি দুর্গন্ধযুক্ত আহার থেকে মানুষকে রক্ষা করা। যে কোন খাদ্য দ্রব্য নাকের কাছে ধরলেই মানুষ বুঝতে পারবে বা নাক তাকে জানিয়ে দেবে যে, জিনিসটি খাবার উপযোগী না অনুপযোগী। নাকের এই ঘ্র্রাণ ক্ষমতা যদি না থাকত, তাহলে মানুষ কি পচা-বাসি পৃথক করতে সক্ষম হত? না হতে না। ফলে অখাদ্য কু-খাদ্য আহার করে নানা রোগে আক্রাš হয়ে জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলত। এখন চিন্তা করুন, আপনার দেহকে সুস্থ্য রাখার জন্য এবং শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণের জন্য কোন মহাকৌশলী কোন মহা কুদরতে আপনার আমার মুখের মাঝখানে নাকের মত মহাউপকারী এই নিয়ামত স্থাপন করেছেন? এই নাকের কার্যকারিতা চিন্তা করেও কি আমরা সেই মহান স্রষ্টাকে চিনব না?

নাকের দু’পাশে যেমন দু’টি ছিদ্র আছে তেমনি দুই কানেও দু’টি ছিদ্র আছে এবং নাক ও কানের উভয় ছিদ্রই মস্তিষ্কে গিয়ে মিশেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ছিদ্র ব্যতিত নাকে বা কানের অভ্যন্তরে আর কিছুই দৃষ্টি গোচর হবে না। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নাকের কাজ কান দ্বারা বা কানের কাজ নাক দ্বারা কোন দিনও সমাধা হয় না। অর্থাৎ নাক দ্বারা শব্দ গ্রহণ বা কান দ্বারা শ্বাস প্রশ্বাস নেয়া যায় না। তাহলে কৌশলগত হিকমতের সাথে এই স্থাপন কে করল? কোন প্রকৃতি, না মহাকৌশলী আল্লাহ?

আপনার-আমার মুখগহ্বরে একখন্ড মাংস পিন্ড আছে। শরীরে অন্য স্থানের মত ঐ জিহবার ক্ষমতার কথা চিন্তা করলে বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে উপায় নাই। আপনি এক গ্রাস মিষ্টি শরবত অথবা এক শিশি তেতো ঔষধ হাতের তালুতে অথবা শরীরের যে কোন স্থানে ঢেলে দিন। কিছুই বুঝতে পারবেন না। অথচ এক ফোটা ঔষধ অথবা শরবত জিহবায় দিবার সাথে সাথে জিহবা আপনাকে জানিয়ে দেবে কোনটা মিষ্টি আর কোনটা তেতো।

এছাড়া আমরা এখন বিভিন্ন মজাদার খাবার মুখে দেই, তখন খাবারের কি স্বাদ জিহবা আমাদের জানিয়ে দেয়। আমরা বুঝতে পারি, কোন দ্রব্যের কি স্বাদ। এছাড়াও জিহবাকে মানুষ সাউন্ড বক্স হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। মনের ভাব আদান প্রদানের একমাত্র মাধ্যম হলো জিহবা। অথচ জিহবা এক খন্ড মাংস বৈ আর কিছুই নয়। আর মাংসের কি ক্ষমতা আছে  বলতে পারে বা শব্দ করতে পারে। জন্তু জানোয়ারের জিহবা তো মানুষের জিহবার থেকে অনেক বড়, তারা তো কথা বলতে পারে না। মানুষ কিভাবে পারে? এই কেনর ভেদ কি মানুষ কখনো জানার চেষ্টা করেছে?

আল্লাহ নিজ কুদরতি হাতে মাটির খামির দ্বারা একমাত্র মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর সমস্ত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন ‘কুন’ শব্দ দ্বারা। তাই কুদরতি হাতের খামিরের সবটাই কুদরতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মাটির খামির হয়ে ওঠে কুদরতে এক নূরের পিন্ড। যেমন কেউ যদি হাতে সুগন্ধি মেখে আটা বা ময়দার খামির করে রুটি তৈরী করে, তাহলে সব রুটিগুলোই সুগন্ধিতে ভরে যাবে। তাই কুদরতি হাতে আল্লাহ পাক যখন মাটিকে খামির করে আদম (আ.)এর দেহের অঙ্গ প্রত্যাঙ্গ তৈরী করেন, তখন যে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিয়ে যে কাজ করাবেন, সেই কাজের ইচ্ছা তাঁর কুদরতি মনে জাগ্রত করেই ঐ অঙ্গ গঠন করেন। যার কারণে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পতিত হয়ে সেভাবেই সেগুলো সচল হয়ে ওঠে।

আবার যখন কোন নাফরমান বান্দার কোন অঙ্গ বিকল করে দিবার ইচ্ছা করেন, তখনি সে অঙ্গ বিকল বা অকেজো হয়ে যায়। অর্থাৎ সব কিছুই সেই মহান শক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যদি আল্লাহ পাক আপনার-আমার কথা বলার ইচ্ছা শক্তি প্রত্যাহার করে নেন, তাহলে আল্লাহ পাকের কোন ক্ষতি হবে না। কারণ, তিনি বান্দার মুখাপেক্ষী নন, বান্দাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তাহলে আপনার-আমার কি অবস্থা হবে? তখন আমরা কি আমাদের মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারব? অথবা আমরা কি লোক সমাজে উঠা-বসা বা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারব? তখন জীবিত থাকার চেয়ে মৃত্যুই হবে আমাদের কাছে শ্রেয়।

তাই আমাদের কী উচিত নয়, সেই নিয়ামত দাতার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে কান্নাকাটি করা? যেন তিনি যেসব নিয়ামত দান করেছেন সেগুলো কে বিকল করে না দেন। যেমন- আমাদের শিক্ষা দিবার জন্য অনেককেই বোবা করে রেখেছেন। যদিও তাদের জিহবা আছে, কিন্তু সেই জিহবার কার্যকারিতা নেই। কারণ এই কার্যকারিতার ইচ্ছা শক্তি আল্লাহ পাক তুলে নিয়েছেন। সামান্য এই একখন্ড মাংসের অভাবে আপনার আমার সমস্ত জীবনটাই যদি অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে ঐ কুদরতি মাংসের খন্ড যিনি কুদরতি ভাবে স্থাপন করলেন, সেই মহা বিজ্ঞানীকে জানবার বা চিনবার চেষ্টা কি আমরা কোন দিন করেছি?

চিন্তা করুন, পৃথিবীতে বৈজ্ঞানিক ভাবে যত কিছু আবিস্কার হচ্ছে, সেই আবিস্কারের হুবহু নকল তৈরী হচ্ছে। কিন্তু মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ যে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে মানব দেহখানা তৈরী করেছেন, আল্লাহ পাকের মৌলিক এই সৃষ্টিতে একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও কি সমস্ত পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা মিলে তৈরী করতে পেরেছে? যেমন- একটি হাত কাটা গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে অনুরূপ একখানা হাত, একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেলে, অনুরূপ একটি চোখ অথবা মানুষের দেহের অভ্যন্তরে স্থাপিত ছোট্ট একটি কিড়নী (মূত্র থলি)র মত বস্তুও কি মৌলিক উপাদানে আবিস্কার করে মানুষের দেহে সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছে? যদি সক্ষম না হয়ে থাকে, তাহলে সেই মহা বিজ্ঞানী আল্লাহকে মানুষ ভুলে থাকে কীভাবে? যেখানে একটি মানব দেহের যে কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আল্লাহর কুদরতের কথা মনে পড়ে যায়।

একটি চেহারার দিকে তাকালে সেই মহান ও শ্রেষ্ঠ শিল্পীর শিল্প চাতুর্য মানুষকে বিস্ময়ে হতবাক করে তোলে। অথচ মানুষ কত গাফেল। মানুষের চিন্তায়ই আসে না যে, সে একদিন অস্তিত্বহীন ছিল। তার এই অস্তিত্বদান করে সর্বশ্রেষ্ঠ অবয়বে কে তাকে পৃথিবীতে আনল? কে তাকে ধন সম্পদ দান করে খাটের গদীতে নরম বিছানায় আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করল? কে তাকে পরম শান্তিদাত্রী-সৌন্দর্যের প্রতীক একজন নারীকে অর্ধাংগিনী করে তার বাহু পাশে স্থান দিয়ে চরম তৃপ্তি দান করেন?

মানুষ কি ভাবে না, যিনি তাকে অস্তিত্ব দান করে পৃথিবীতে এনে অগাধ সুখ-শান্তি দান করলেন, তিনি আবার ইচ্ছা করলে তার অস্তিত্ব দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত করে সব সম্পদ কেড়ে নিতেও পারেন। অতিতে এমন অনেক রাজা বাদশা ও ধনকূবেরকে আল্লাহ নাফরমানীর কারণে ধূলির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। এসব ইতিহাস তো দুনিয়াতেই মজুদ আছে। কারুন, শাদ্দাদ, ফিরাউন; এদের পরিণতির কথা কি মানুষ ভুলে গেল?

আল্লাহ পাক নারী ও পুরুষ সকলের প্রতি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, আমার বিধান, আমি মানুষকে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন দান করব। তার পর যৌবনের নির্দিষ্ট সময় পার হলে ধীরে ধীরে তাকে বার্ধক্য দান করে চুল পাকাব, দাঁত ফেলাব, শরীরে চামড়া ঢিলা করে শক্তিহীন করব। তোমরা পৃথিবীর মানুষ যত বিজ্ঞানী ও কৌশলী আছ, তারা একাত্র হয়ে যদি পার, আমার এই বিধান রদ কর। কিন্তু তোমরা তা কখনোই পারবে না।

আল্লাহ আরো বলেন, আমি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সন্তানকে তার মায়ের গর্ভে রেখে দুনিয়ায় আনব। তোমরা কি পারবে ঐ সময়ের দু’মাস আগে বা দু’মাস পরে তাকে প্রসব করাতে? আমি সন্তানকে দশ মাস পর্যন্ত মায়ের গর্ভে রেখেছিলাম জীবন্ত অবস্থায়। তখন তার আহারের প্রয়োজন হয় নাই, পায়খানা প্রস্রাবের প্রয়োজন হয় নাই। প্রসবের পর তোমরা কি দু’টি দিনও ঐ সন্তানকে আহার না করিয়ে পায়খানা প্রস্রাব না করিয়ে রাখতে পারবে? এরপরও কি তোমরা আল্লাহকে চিনবে না। তাঁর কুদরতের শুকরিয়া আদায় করবে না?

আফসোস, শয়তান আমাদের উপর এমন ভাবে ভর করেছে যে, আমরা হীরাকে পায়ে ঠেলে কাঁচকে নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করেছি।

আমরা যদি একবার জ্ঞান-চক্ষু মেলে নিজের এই সাড়ে তিন হাত দেহখানার প্রতি দৃষ্টি ফেলে একবারও গভীরভাবে চিন্তা করি, তাহলে আল্লাহর দীদার পেতে আমাদের পাহাড় জঙ্গলে যেতে হবে না, ঘরে বসেই আমরা আল্লাহর দীদার পেয়ে যাব। “মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু”। এটাই হলো আল্লাহকে পাওয়ার মূলমন্ত্র। আল্লাহ পাক তাঁর অবুঝ বান্দাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

মানুষের শরীর নিয়ে কিছু অজানা গুরুত্বপূর্ন তথ্যঃ-
১. জীবদ্দশায় একজন মানুষ প্রায় ১৫০ লাখ কোটি তথ্য মনে রাখতে পারে।
২. তৃষ্ণা পাওয়া মানে, শরীর ১ শতাংশ পানি এরমধ্যেই হারিয়ে ফেলেছে।
৩. মস্তিষ্ক প্রতি ঘন্টায় ২৭৪ কিলোমিটার বেগে স্নায়ুতে অনুভূতি প্রেরণ করতে পারে।
৪. ক্যামেরার পারিভাষায় মানুষের চোখ ৫৭৬ মেগাপিক্সেলের।
৫. মানুষের নাক আর কানের বৃদ্ধি কখনো বন্ধ হয় না।
৬. মানুষের দেহের চার ভাগের এক ভাগ হাড়ই থাকে তার পায়ে।
৭. খাবার খেতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগলেও তা সম্পূর্ণ হজম করতে আপনার শরীরের প্রায় ১২ ঘন্টা সময় লাগে।
৮. মানুষের ডিএনএ-এর ৯৮.৪ শতাংশ শিম্পাঞ্জির সাথে এবং ৭০ শতাংশ জোঁকের সাথে মিলে যায়।
৯. মানুষের মস্কিষ্ক দিনের বেলার তুলনায় ঘুমের সময় বেশি সক্রিয় থাকে।
১০. মানুষের মস্তিষ্ক অক্সিজেন ছাড়া বড়োজোর পাঁচ থেকে দম মিনিট বেঁচে থাকতে পারে।
১১. জীবনে যদি একবারও চুল না কাটেন, তবে তা ৭২৫ কিলোমিটার লম্বা হবে।
১২. গন্ধ শুঁকেও ওজন কমানো সম্ভব!! আপেল আর কলার ঘ্রাণে নাকি ওজন কমে!
১৩. পৃথিবীতে একমাত্র একটি প্রাণীই চিৎ হয়ে ঘুমাতে পারে- মানুষ।
১৪. সুস্থ সবল কিডনি প্রতিদিন প্রায় ৩০০ বার মানুষের শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে।
১৫. একজন মানুষের জীবদ্দশায় তার শরীর থেকে ২২ কিলোগ্রাম চামড়া খসে পড়ে।
১৬. মানুষের মস্কিষ্কের স্মৃতিশক্তি ধারণ ক্ষমতা ৪ টেরাবাইটেরও বেশি।
১৭. পাকস্থলীতে তৈরি অ্যাসিড লোহা পর্যন্ত গলিয়ে দিতে পারে।
১৮. মানুষের আঙুলের ছাপ তৈরি হয় মাত্র ৩ মাস বয়সে, তাও ভ্রুণ অবস্থায়।
১৯. মানুষের মুখের লালায় ওপিওরফিন নামে এক পেনকিলার পাওয়া যায়, যেটা মরফিনের থেকে ৬ গুণ বেশি শক্তিশালী।
২০. আমাদের মস্তিষ্কে যে বিদ্যুৎশক্তি আছে তা দিয়ে একটা ১০ ওয়াটের বাল্ব জ্বালানো সম্ভব।
২১. মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের জিভে স্বাদকোরক (টেস্টবাড) কম থাকে।
২২. দাঁতের এনামেল মানুষের শরীরের সবচেয়ে শক্ত পদার্থ।
২৩. নিজের নাক টিপে ধরে রেখে গুনগুন করা অসম্ভব।

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *