জামে মসজিদ এর নীতিমালা

প্রস্তাবনা:

 সাধারণ অর্থে মসজিদ মুসলমানের নামাজের ঘর হলেও মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং মুসলমানদের সব ধরনের কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু। মসজিদ মুসলমানদের শিক্ষালয়, পরামর্শ সভাস্থল ও সমাজ-সংস্কৃতির উৎসস্থল।

শেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর যে ইসলামিস রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সে রাষ্ট্রের সচিবালয় ছিল মসজিদে নববী। তিনি সেখানে লোকদের কোরআন শিক্ষা দিতেন, মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করতেন, জ্ঞান শিক্ষা দিতেন, মামলা-মোকাদ্দমার বিচার করতেন। ইসলামি রাষ্ট্রের সংহতি ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ সভা করতেন, বিয়ে পড়াতেন, এমনকি যুদ্ধের কৌশল নিয়ে সাহাবিদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে এমন আরও অসংখ্য কাজ করেছেন বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।

বর্তমানে আমাদের সমাজে মসজিদ আছে, মিম্বর আছে, মসজিদে নামাজও হচ্ছে। কিন্তু মসজিদের কর্মসূচিগুলো দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে গেছে। মসজিদগুলো ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে যাচ্ছে। মসজিদগুলো পরিণত হয়েছে শুধু ইবাদতের জায়গায়।

ইসলামি সমাজ ও সংস্কৃতির উৎসস্থল মসজিদের সেবা ও তত্ত্বাবধানের কাজে যারা আছেন বিষয়টি নিয়ে তারা ভাবেন কিনা- বলা মুশকিল। অথচ ইসলামে মসজিদ পরিচালনাকারীদের আলাদা ফজিলতের কথা বিবৃত হয়েছে। এখন যদি মসজিদের খাদেম, কমিটি, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা পরিচালনায় নিযুক্তরা মসজিদের কর্মসূচিতে ভিন্নতা এনে মসজিদগুলোকে আবাদের পরিবর্তে মসজিদগুলোকে প্রাণহীন করে তুলেন, তবে সেটা কী ইসলাম সম্মত হবে?

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, ইসলামের সহিহ আকিদা, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যাদের কমতি  তারা মসজিদের খেদমতের জন্য কোনোভাবেই উপযুক্ত নয়। তাহলে মসজিদের সেবা করবেন কারা?

আলোচ্য বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর মসজিদ আবাদকারী (তত্ত্বাবধায়ক ও খাদেম) তো সে লোকেরাই হতে পারেন, যারা আল্লাহ এবং পরকালকে বিশ্বাস করেন, নামাজ কয়েম করেন, জাকাত দেন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করেন না। তাদের সম্পর্কেই এ আশা করা যায় যে, তারা সঠিক-সোজাপথে চলবে।’ -সূরা আত-তওবা : ১৮

উপরোক্ত আয়াত থেকে মসজিদ পরিচালনায় নিযুক্তদের যে অত্যাবশ্যকীয় যোগ্যতাগুলো থাকতে হবে তা নিম্নরূপ-

এক. তাদের ঈমানদার হতে হবে।
দুই. পরকালের বিশ্বাস এবং জবাবদিহিতা তীব্র অনুভূতি তাদের থাকতে হবে।
তিন. তারা নামাজ কায়েম করবে।
চার. তারা জাকাত দানে অভ্যস্ত হবে।
পাঁচ. তারা নির্ভীক হবে। সত্য উপস্থাপন করতে তারা কারো সমালোচনা বা রক্তচক্ষুকে ভয় পাবে না।

মসজিদের খাদেম বলা হয় তাদের, যারা মসজিদ প্রতিষ্ঠা, সম্প্রসারণ, পরিচালনা ও উন্নয়নের কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। মসজিদের খেদমত একটি মহান কাজ। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ফজিলত সম্পর্কে বহু বাণী উপস্থাপিত হয়েছে। আর এ কারণেই এ কাজে সম্পৃক্ত হওয়াকে মুসলমানরা সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করেন। এজন্য আমরা যারা আল্লাহর ঘরের সেবা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করব, তাদের এ গুণগুলো অর্জন করতে হবে। কারণ এ শর্ত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত। আর আমরা যারা মসজিদের তত্ত্বাবধায়াক নির্বাচন করব তাদেরও লোক বাছাইয়ের জন্য কোরআনের আরোপিত শর্তগুলোকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে নিছক রাজনৈতিক প্রভাব বলয় বা অন্য কোনো বৈষয়িক বিষয়কে অধিক গুরুত্ব প্রদান করলে পবিত্র কোরআনের শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হবে।

পবিত্র কোরআনে আরোপিত শর্তগুলোর প্রথমটিতে বলা হয়েছে-

যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। আল্লাহর ‘জাত’ ‘সিফাত’ (গুণ) ‘হুদুদ’ ও ‘ইখতিয়ার’ (ক্ষমতা) বিষয়ক বিশ্বাসগুলো অন্তরের সঙ্গে মেনে নেওয়া, মুখে তা প্রকাশ করা এবং জীবন ও কর্মে সেই বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোই হলো ঈমান। এ তিনটি বিষয়ের সমন্বয়কেই ঈমান বলা হয়।

দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, পরকালে বিশ্বাস করে অর্থাৎ তার মধ্যে তার কাজের ব্যাপারে শুধু মসজিদের অডিটরের কাছে জবাবদিহিতার ভয় নয় বরং পরকালে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার তীব্র অনুভূতি থাকে। এ অনুভূতি তার হিসার-নিকাশে স্বচ্ছতা নিয়ে আসে।

তৃতীয় শর্তে বলা হয়েছে, তারা নামাজ কায়েম করে। মসজিদের খাদেম তথা কমিটির একজন সদস্যকে এ ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন এবং সচেষ্ট হতে হবে। সাপ্তাহিক বা বার্ষিক মুসল্লি দিয়ে এ কাজটি চলতে পারে না।

চতুর্থ শর্তে বলা হয়েছে, তারা জাকাত প্রদান করে। অর্থাৎ অর্থলিপ্সা তাদের পেয়ে বসে না। উপার্জিত সম্পদ তারা খোদার নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় করে। তারা কেবল ভোগই করে না, ত্যাগ করতেও জানে।

পঞ্চম শর্তে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অর্থাৎ সব কাজে তারা আল্লাহকে ভয় করে এবং সত্য প্রকাশে তারা নির্ভীক। সত্য উপস্থাপন করতে তারা নিন্দুকের সমালোচনা বা অপশক্তির রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না।

মসজিদ প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও উন্নয়ন কাজে যারা নিয়োজিত হবেন বা যাদের নিয়োজিত করা হবে, তাদের উপরোক্ত মৌলিক গুণাবলীর পাশাপাশি কতগুলো মানবীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক গুণাবলী থাকতে হবে। এগুলো না থাকলে তিনি একজন ভালো ‘আবেদ’ হতে পারবেন, কিন্তু একজন সফল মসজিদ পরিচালক হতে পারবেন না । অপরিহার্য গুণাবলীর পাশাপাশি অপর গুণাবলীর আধিক্যই মসজিদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সুনিশ্চিত করবে এবং মসজিদের আলো দ্বারা আলোকিত হবে সমাজ ও দেশ।

মসজিদ কমিটি: যোগ্যতা, গঠন, দায়িত্ব

বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থায় মসজিদ পরিচালনা কমিটি মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অংশ। মসজিদের যথাযথ ব্যবহার, মসজিদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও উন্নতি ইত্যাদি বহুলাংশে নির্ভর করে মসজিদ কমিটির যোগ্যতা ও সদিচ্ছার ওপর।

বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থায় মসজিদ পরিচালনা কমিটি মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অংশ। মসজিদের যথাযথ ব্যবহার, মসজিদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও উন্নতি ইত্যাদি বহুলাংশে নির্ভর করে মসজিদ কমিটির যোগ্যতা ও সদিচ্ছার ওপর। কিন্তু সঠিক জ্ঞানের চর্চা না থাকায় এবং নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক মসজিদের কমিটিতে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা যায়।

মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে একটি মূলনীতি বলে রাখা আবশ্যক। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, মসজিদ কমিটির পদকে নেতৃত্ব মনে করা চরম বোকামী। মসজিদ কমিটির কোথাও জায়াগা হলে এটাকে নিছক খেদমত মনে করা দরকার। এ খেদমত আল্লাহর ঘরের খেদমত। মুসল্লিদের খেদমত। তাই দুনিয়ার কোনো চাওয়া-পাওয়া ব্যতিরেকে মুক্তমনে শুধু আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছায় ইবাদত মনে করে খেদমতের মানসিকতা নিয়ে কমিটিতে অংশ নিতে হয়। সামাজিক পদমর্যাদা বৃদ্ধির অভিলাষে কমিটিতে যোগ দেওয়া হারাম।

কমিটি গঠন পদ্ধতি ও মেয়াদকাল
প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিতে ক্ষেত্রবিশেষ অর্থের অপচয় হয়, দলাদলির সৃষ্টি হয়, কোন্দল বৃদ্ধি পায়, পরষ্পর শত্রুতার স্থায়ী বীজ বপন হয় ও মহল্লাবাসী বিভক্ত হয়ে যায়। তাই পরামর্শের ভিত্তিতে কমিটি গঠন যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে মহল্লার মুরুব্বি, নামাজি, পরহেজগার ও জ্ঞানীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

কমিটির মেয়াদ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে আলেমদের অভিমত হলো, কাউকে কোনো দায়িত্ব দেয়ার পর তিনি যতদিন পর্যন্ত সুস্থতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতার শিকার না হোন এবং স্বেচ্ছায় অব্যাহতি না নেন- ততদিন পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে না সরানো ভালো। এতে করে কাজের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে।

কমিটির যোগ্যতা ও গুণাবলী
মসজিদ কমিটি অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। যে কারও হাতে এ দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া ঠিক না। তাই কাউকে মসজিদ কমিটির জন্য বাছাই করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া দরকার- মসজিদ কমিটির দায়িত্ব নেয়ার মতো যোগ্যতা তার আছে কি-না।

আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন থেকে কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাকবে। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কীভাবে আমানত নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, যখন অযোগ্যকে দায়িত্ব দেয়া হবে তখন থেকে কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাক। -সহিহ বোখারি: ৬৪৯৬

মসজিদ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার যোগ্যতা নয়টি। যথা-

১. মোতাওয়াল্লি বা কমিটির সভাপতি হবেন তারা-
ক. মসজিদের জমিদাতা, খ. তদীয় কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি, গ. ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান, ঘ. তদীয় নিযুক্ত স্থানীয় প্রশাসক, ঙ. কোরআন-সুন্নাহমতে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতি, চ. মহল্লাবাসী কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি।
২. প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়া।
৩. মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া।
৪. ওয়াকফ, দান ইত্যাদি সংগ্রহ ও ব্যয় সম্পর্কে শরয়ী মাসআলার জ্ঞান থাকা।
৫. মসজিদ ব্যবস্থাপনার বৈষয়িক যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা।
৬. আমানতদার হওয়া। অর্থ আত্মসাৎ ও তসরুফ তো দূরের কথা সাময়িক তসরুফেরও কোনো আশঙ্কা না থাকা।
৭. এমন কোনো কাজের অভ্যাস না থাকা- যেগুলো মানুষকে সর্বস্বান্ত করে। যেমন- জুয়াখেলা, মদপান করা ইত্যাদি।
৮. কোনো কবিরা গুণাহতে প্রকাশ্যে লিপ্ত না থাকা। অতএব, যারা নামাজ পড়ে না, নামাজের জামাতে শরিক হয় না, রোজা রাখে না, ফরজ হওয়া সত্ত্বেও হজ করে না, জাকাত দেয় না, সুদি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, সুদ গ্রহণ করে এককথায় প্রকাশ্য পাপকাজে লিপ্ত কাউকে মসজিদ কমিটির জন্য মনোনীত করা নাজায়েয।
মসজিদ কমিটির কোনো সদস্যের ব্যাপারে কোনো কবিরা গুণাহতে জড়িত থাকার বিষয়টি সমাজে প্রকাশ পেয়ে গেলে তাকে বরখাস্ত করা ওয়াজিব। এমনকি, সে যদি জমিদাতা কিংবা ওয়াকফকারী কর্তৃক মনোনীতও হয় তবুও তাকে বরখাস্ত করতে হবে। -আদ দুররুল মুখতার, ওয়াকফ অধ্যায়
৯. মসজিদ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার আগ্রহ ও চেষ্টা না থাকা।

আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমরা কোনো পদপ্রার্থী বা পদপ্রত্যাশীকে পদ দেই না। -সহিহ বোখারি: ৭১৪৯
তিনি (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, তুমি পদপ্রার্থী হবে না। যদি প্রার্থী হয়ে পদ পাও তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা তোমার ওপর নিক্ষেপ করা হবে। আর যদি প্রার্থী না হয়ে পদ পাও তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনে তোমাকে সাহায্য করা হবে। -সহিহ বোখারি: ৭১৪৭
নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, অতি শীঘ্রই তোমরা পদের প্রতি লোভী হবে। কিয়ামতের দিন তা লজ্জার কারণ হবে। -সহিহ বোখারি: ৭১৪৮

মসজিদ কমিটির দায়িত্ব

১. মসজিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও উপার্জনের হেফাজত করা। শরিয়ত অনুমোদিত প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করা। অপ্রয়োজনীয় ও শরিয়তে অনুমোদিত নয়- এমনসব খাতে সম্পদের ব্যয় না করা। ইদানিং দেখা যাচ্ছে, শরিয়ত অনুমোদনবিহীন খাতে মসজিদের সম্পদ ব্যয়ের প্রবণতা বেড়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
২. আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব স্বচ্ছভাবে সংরক্ষণ করা।
৩. সাধ্যমতো সর্বাধিক উপযুক্ত ইমাম নিয়োগ দেয়া। এ ব্যাপারে বিজ্ঞ আলেমদের থেকে পরামর্শ নেয়া।
৪. যোগ্য মোয়াজ্জিন নিয়োগ দেয়া।
৫. প্রয়োজন অনুপাতে খাদেম নিয়োগ দেয়া।
৬. প্রয়োজন অনুসারে মসজিদের নির্মাণ, মেরামত ও সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা।
৭. অজু, ইস্তেঞ্জা, পানি, বাতি, পাখা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট হওয়া।
৮. মসজিদ আবাদের উদ্যোগ নেয়া। মসজিদ আবাদের অর্থ হলো- নিয়মিত আজান ও জামাত হওয়া, শিশুদের জন্য মক্তব থাকা, বয়ষ্কদের জন্য কোরআন এবং শরিয়তের ফরজ পরিমাণ জ্ঞান শেখার ব্যবস্থা থাকা ও দাওয়াতের কাজ চালু থাকা।

কমিটির সকল সদস্যদের উচিৎ উল্লেখিত দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে পালনে যত্নবান হওয়া।

ইমাম হওয়ার জন্য অনেক শর্ত-শারায়িত উল্লেখ রয়েছে। তবে যেসব শর্ত না হলে কারো জন্য মসজিদের ইমাম হওয়া কিংবা ইমাম নিয়োগ দেয়া উচিত নয় তা হচ্ছে- (১) ক্বিরায়াত বিশুদ্ধ হওয়া, (২) ইমাম হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়িল জানা এবং ক্বলবী ইলম তথা ইলমে তাছাওউফ অর্জনের উদ্দেশ্যে কোশেশে নিয়োজিত থাকা, (৩) সম্মানিত সুন্নত উনার পাবন্দ হওয়া, (৪) ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ তরক না করা, (৫) বেপর্দা না হওয়া, (৬) হালাল-হারাম তমিজকারী হওয়া, (৭) আক্বীদা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত উনাদের অনুযায়ী হওয়া ইত্যাদি।

ইমামের যোগ্যতা ও গুণাবলী 

আরবী ‘ইমাম’ শব্দের অর্থ নেতা। আর এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Leader. ইংরেজি একটি প্রবাদ বাক্যে Leader. বা নেতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, He is the Leader, Who knows the way, who go’s the way and who show’s the way. অর্থাৎ ‘যিনি সঠিক পথ সম্পর্কে জানেন, সেই পথে চলেন এবং মানুষকে পথ দেখান তিনিই নেতা।’ অর্থাৎ নেতাকে জানতে হবে জীবন চলার সঠিক পথ সম্পর্কে; শুধু জানলেই হবে না বরং তাঁকে অনুসরণ করতে হবে সেই পথ এবং একইসাথে তিনি অনুসারীদেরকে সেই সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।

যে কাউকে ইমাম হিসেবে পরিগণিত করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। দ্বীনী বা ধর্মীয় কাজে ইমামতির জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও গুণাবলী অর্জিত না হলে তাকে ইমাম হিসেবে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না। কেননা, সমাজে ও মসজিদে ইমামতির জন্য তার কিছু মৌলিক যোগ্যতা থাকা চাই। একজন ইমামের যে সকল গুণাবলী বা যোগ্যতা থাকা আবশ্যক সে সম্পর্কে ইসলামে পরিস্কার দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে মুসলিম মিল্লাতের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ইমামতির আসনের জন্য যোগ্য হিসেবে মহান আল্লাহ্র কাছে প্রমাণিত হওয়ার জন্য তাঁকে অগ্নীতে নিক্ষেপ , সন্তানকে কুরবানী  এবং দেশ থেকে হিজরতের মতো বড় বড় কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে।  সে-সব পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহীম (আ.) সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। সুতরাং তাকওয়া, খোদাভীতি এবং মহান রাব্বুল আ’লামীনের প্রতি পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পনই ইমামের প্রথম যোগ্যতা হওয়া আবশ্যক। তবে শুধু তাকওয়া থাকলেই হবে না, ইমামতির জন্য আরো কিছু যোগ্যতা ও গুণাবলী থাকা আবশ্যক। পবিত্র কালামে পাকের সূরা বাকারা-এর আয়াত-১১২, সূরা মুমিনিন-এর আয়াত-০১, সূরা আহযাব-এর আয়াত-২২ তে একজন ইমামের যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে একজন ইমামের যে সকল যোগ্যতা থাকা আবশ্যক তা হলোঃ
১.    মুসলমান হওয়া;
২.    আলেম হওয়া; অর্থাৎ দ্বীনী ইল্ম বা শরিয়াতের পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে;
৩.    বালিগ হওয়া;
৪.    সুস্থ্য ও স্বাভাবিক হওয়া:
৫.    পুরুষ হওয়া;
৬.    স্বাধীন হওয়া;
৭.    বিভিন্ন প্রকার ওযর ও অসুবিধামুক্ত হওয়া।

এসব যোগ্যতা থাকলে একজন ব্যক্তি ইমামতি করতে পারবেন। কিন্তু কোন একটি মসজিদে এধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন একাধিক ব্যক্তি থাকলে সে-ক্ষেত্রে কে ইমামতি করবেন বা কে ইমামতির যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন সে ব্যাপারেও শরিয়াতে স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে অবশ্য নির্ধারিত ইমাম দায়িত্ব পালন করে থাকেন; প্রত্যেক ওয়াক্তে পৃথক পৃথক ইমাম নির্বাচনের কোন প্রয়োজন হয় না এবং মসজিদ পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী কর্তৃপক্ষ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ইমাম নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হয় না। ফলে ইমামতির দায়িত্বটি অনেকটা কমিটির কর্তা ব্যক্তিদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।

তবে ২০০৬ সালের মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় সদাশয় সরকার মসজিদের সকল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিধিমালা প্রন্তাব করা হয়েছে। এর তফশিল অংশে মসজিদের খতীব, পেশ ইমাম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম প্রভৃতি পদে নিয়োগের জন্য পৃথক পৃথক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হলে মসজিদে যোগ্য ইমাম নিয়োগ ও তাঁদের দায়িত্ব কর্তব্য ও অধিকার বান্তবায়ন সহজ হবে। কিন্তু বান্তবতা হলো ওই নীতিমালাটি এখনো কেমনভাবে কার্যকর করাতো দূরে কথা মসজিদ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোই হয়নি। ফলে ইমামদের অবস্থার কোন পরিবর্তন এর দ্বারা সাধিত হয়নি।

ইমামের দায়িত্ব ও কর্তব্য :

ইমাম প্রধানতঃ আলেম বা দ্বীনী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিগণই হয়ে থাকেন। সে হিসেবে তাঁরা ‘ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’ অর্থাৎ নবী-রসূলগণের ওয়ারিশ।  নবী-রসূলগণ কোন বৈষয়িক সম্পত্তি রেখে যাননি। তাঁরা রেখে গেছেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও তার আলোকে পরিচালিতব্য মিশন। পৃথিবীতে আর কখনও নবী-রসূল (আ.)-এর আগমন ঘটবে না। কেননা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-ই সর্বশেষ রসূল। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) যে মিশন নিয়ে দুনিয়ায় এসেছেন সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন-
হে নবী! আমিতো তোমাকে পাঠাইয়াছি সাক্ষীরূপে ও সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আল্লাহর

অনুমতিক্রমে তাঁহার দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জল প্রদীপরূপে।
মহানবী (স.) নিষ্ঠার সাথেই আল্লাহ প্রদত্ত ওই দায়িত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিপালন করেছেন। কিন্তু তিনিও ছিলেন একজন মানুষ। সুতরাং এ নশ্বর পৃথিবী থেকে তাঁকে বিদায় নিতে হবে এটাই স্বাভাবিক। তাঁর তীরোভাবের পর ইসলামের এই কার্যক্রম কীভাবে সম্পন্ন করা যাবে সে সম্পর্কে তিনি পরিকল্পনা পেশ করেছেন। বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে এ প্রসঙ্গে তিনি পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি আল্লাহর কুরআন ও তাঁর হাদীস রেখে যাচ্ছেন, যা পরবর্তীতে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করবে। সুতরাং যারা এ দুটো জিনিসকে আঁকড়ে ধরবে তারাই সফল হবে। এর ব্যতিক্রম হলে মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য লাভ করা সম্ভব হবে না। ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হিসেবে মহানবী (স.) প্রদত্ত সেই দায়িত্ব আঞ্জাম দিবেন বর্তমান আলেম সমাজ; বিশেষ করে দেশের মসজিদে নিয়োজিত সম্মানিত ইমামগণ এটাই ইসলামের দাবি। যুগ যুগ ধরে দেশের আলেম সমাজের ওপর অর্পিত রয়েছে এই দ্বীনী দায়িত্ব।

ইমাম সমাজ সে দায়িত্ব পালন করছেন না তা নয়। কিন্তু সু-সমন্বিতভাবে ও সঠিক উপায়ে ইমামতির দায়িত্ব পালনে তাঁরা সক্ষম হলে এ সমাজ তথা দেশের চিত্র পাল্টে যেতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। আর একারণেই দেশের উন্নয়নে তাঁদেরকে সম্পৃক্ত করার প্রশ্নটি বিভিন্ন মহল থেকে বেশ গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে। ইমামগণ কি আসলের দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কোন অবদান রাখছেন? বা তাঁরা কি তা রাখতে সক্ষম এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গভীর গবেষণার প্রয়োজন। তেমন কোন গভীর গবেষণার অভাবে ইমামদের কর্মকা- সমাজ তথা জাতির সামনে অনেকটা অলক্ষেই রয়ে গেছে। দেশের ইমাম সমাজের কর্মকা- ও তাঁদের সমস্যা ও সমাধানের উপায় সম্পর্কে আলোকপাত করলে প্রকৃত চিত্র সামনে চলে আসবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালের ৩০ নভেম্বর ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ নামে একটি প্রজ্ঞাপন জারী করে। ওই প্রজ্ঞাপনে একজন ইমামের দায়িত্ব-কর্তব্য কি হবে সে সম্পর্কে এর ২৪(৩)(ক) উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ইমাম-
(অ)    মসজিদের আমানতদার হিসেবে কাজ করিবেন;
(আ)    মসজিদের সাধারণ মুসুল্লী ও এলাকাবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বভাব, চরিত্র, আমল আখলাক উন্নয়নে সাধ্যানুযায়ী অবদান রাখিবেন;

এখানে উপ-অনুচ্ছেদ (অ)-তে ‘মসজিদের আমানতদার হিসেবে কাজ করবেন’ বলতে ধর্মীয় দৃষ্টিতে একজন ইমামের যে দায়িত্ব রয়েছে তা নিষ্ঠার সাথে পালনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে,    আর উপ-অনুচ্ছেদ (অ)-তে তাঁর সামাজিক দায়-দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় ও রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত এসকল দায়িত্বের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় ইমাম শুধুমাত্র নামায পড়ানোর মধ্যেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখবেন না; বরং তাকে সামাজিক নেতৃত্বের আসলে আসীন হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আজকের সমাজে নানা ধরনের অনাচার, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন চলছে। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক উষ্কানীমূূলক কর্মকা-, বাল্যবিয়ে, যৌতুকসহ সব ধরনের অনাচার থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। চারিদিকে যখন এসব অনাচার চলছে, তখন ইমামগণ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। বিশেষ করে ইসলামে নিষিদ্ধ জঙ্গিবাদ আর সাম্প্রদায়িক উষ্কানীমূলক কর্মকা- থেকে জাতিকে রক্ষা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা এমূহুর্তে সবচেয়ে বড় কাজ। সুতরাং ইমামগণ মসজিদে খুৎবার পাশাপাশি সকল প্রকার আলোচনা ও মাহফিলে এসব বিষয় সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন এবং জাতিকে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিবেন বলে জাতি প্রত্যাশা করে।

একটি সফল রেজুলেশনের ৫টি ধাপ রয়েছে, 

১, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের প্যাড, এখানে সবার উপরে বড় করে বাংলা ও ইংরেজিতে সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের নাম লিখে নিচে ঠিকানা লিখতে হবে

২, ভূমিকা, ভূমিকায় লিখতে হবে “অদ্য……….. (তারিখ) রোজ……(বার)………..(সময়)…………(স্থান)…………… (সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের নাম যার সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে) এর সভাপতিত্ব এক………….(বৈঠকের ধরন) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, উক্ত বৈঠকে নিম্নোক্ত বিষয়ে আলোচনা পূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়,

৩, আলোচ্য সূচি, এ অংশে বৈঠকের আলোচনার বিষয় বস্তু ধারাবাহিক ভাবে লিখতে হবে,

৪, উপস্থিতি স্বাক্ষর,  কমিটির সকলের নাম পদবী সহ ধারাবাহিক ভাবে লিখে স্বাক্ষর করতে হবে, উল্লেখ্য উপস্থিত বা অনুপস্থিত সকলের নাম তালিকায় থাকবে, বৈঠকে অনুপস্থিত যারা থাকবেন তাদের স্বাক্ষরের ঘরে সাধারণ সম্পাদক অথবা বৈঠক পরিচালনাকারী বৈঠক শেষে ক্রস চিহ্ন দিবেন

৫, সিদ্ধান্তাবলি,আলোচ্য বিষয়াদির ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তাবলি ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে|

পরিবর্তনে যুগউপযুগী পদক্ষেপ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজ মসজিদ সংস্কার ও আধুনিকধারা বজায় রাখতে সক্ষম হবে ইনশাল্লাহ।মসজিদ হবে মুসলিম সমাজের প্রাণ কেন্দ্র। সমাজের সকল সামাজিক ও ধর্মীয় কর্ম কান্ড মসজিদ ভিত্তিক হলে সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার দূর হবে।

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *